বিশ্ব ইজতেমার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিচার এবং তাবলিগ জামাতের কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধসহ মোট ছয় দফা দাবি জানিয়েছে মাওলানা সাদপন্থি তাবলিগ জামাতের অনুসারীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের (মাওলানা সাদ অনুসারী) মিডিয়া সমন্বয়ক মো. সায়েমের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই দাবিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে সম্প্রতি ‘ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ’ ব্যানারে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। সাদপন্থিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ওই সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা মূল তাবলিগ জামাতের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং তাদের উপস্থাপিত বক্তব্যগুলো সম্পূর্ণ অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানকে কেন্দ্র করে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে ২০১৮ সালে টঙ্গী ময়দানে ইসমাইল মণ্ডল ও শামসুদ্দিন বেলাল, ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বেলাল হোসেন ও মিজানুর রহমান, ২০১৯ সালে কিশোরগঞ্জে আব্দুর রহিম রাজন এবং ২০২৩ সালে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শামসুল হকের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় ইজতেমা ময়দান খালি করার বিষয়ে একটি লিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নের পাশাপাশি ১৭ ডিসেম্বর রাতে ডা. আসগরের নামে প্রচারিত কথিত অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট গভীরভাবে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির জোরালো অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মসজিদে তাবলিগের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ বাধানো হচ্ছে এবং এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে নানামুখী পাল্টাপাল্টি প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা সামগ্রিক ধর্মীয় পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধর্মীয় কার্যক্রমের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব বিরোধ আইনানুগ উপায়ে নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়।
মাওলানা সাদপন্থিদের পেশ করা ছয় দফা দাবিগুলো হলো
১. বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসারীদের উদ্যোগে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের জন্য দ্রুত সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২. সহিংসতার তদন্ত ও বিচার
২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতা, প্রাণহানি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।
৩. রাজনৈতিক ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধ
তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ধর্মভিত্তিক দলের রাজনৈতিক নেতা এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠনের অযাচিত হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে বন্ধ করা।
৪. ইজতেমা ময়দানের ব্যবহার নিশ্চিত করা
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং ময়দান দখলসংক্রান্ত যাবতীয় অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
৫. মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি
বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে উদ্ভূত বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
৬. মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রমের নিরাপত্তা
‘তৌহিদি জনতা’ বা অন্য যে কোনো পরিচিতি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে দেশের কোনো মসজিদে তাবলিগের নিয়মিত কার্যক্রমে বেআইনি বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, তাবলিগ জামাতের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসনকে পুরোপুরি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, সব পক্ষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং উত্থাপিত দাবিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দেশের সার্বিক ধর্মীয় পরিবেশ, শান্তি, শৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে সংশ্লিষ্ট সব মহলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
/আশিক