ইসলামি বর্ষপঞ্জির গুরুত্বপূর্ণ রজনীগুলোর মধ্যে শাবান মাসের মধ্যরাত একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে। এই রাতটি মুসলিম সমাজে পরিচিত “শবে বরাত” নামে, যা ফার্সি “শব” অর্থ রাত এবং আরবি “বরাআত” অর্থ মুক্তি বা অব্যাহতির সমন্বয়ে গঠিত। ধারণাগতভাবে এই পরিভাষাটি সেই রাতকে নির্দেশ করে, যখন আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়।
হাদীসের ভাষায় এই রাতকে বলা হয়েছে “লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান”, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত, যা ১৪ শাবানের দিবাগত রজনী হিসেবে চিহ্নিত (ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৯০; ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫)।
হাদীসের আলোকে শবে বরাতের ফজিলত
হযরত মু’আজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং শিরক ও বিদ্বেষে লিপ্ত ব্যক্তিরা ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করেন (সহীহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৯০; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ, হা. ৩০৪৭৯; শু‘আবুল ঈমান, হা. ৬২০৪)।
অন্য একটি বর্ণনায় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতকে ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করার এবং পরদিন নফল রোজা পালনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি আহ্বান জানাতে থাকেন কে ক্ষমা চায়, কে রিজিক চায় এবং কে বিপদ থেকে মুক্তি চায় (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ২৩৮৪; শু‘আবুল ঈমান, হা. ৩৮২২; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ২/১৩৩)।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনায়ও এই রাতের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতে দীর্ঘ সিজদায় মগ্ন ছিলেন এবং পরে ব্যাখ্যা করেন যে, আল্লাহ তায়ালা এই রজনীতে ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন (শু‘আবুল ঈমান, বায়হাকী, ৩/৩৮২–৩৮৩)।
শবে বরাতের করণীয় আমল
ইসলামি ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিসদের মতে, এই রাতে ইবাদতের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারিত নয়। বরং যেসব নেক আমল আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সহায়ক, সেগুলোর প্রতিই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ফরজ নামাজ বিশেষত মাগরিব, এশা ও ফজর জামাতের সঙ্গে আদায় করা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ, যিকির ও ইস্তিগফার পাঠের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তাওবার ক্ষেত্রে ইসলামি শিক্ষায় কয়েকটি মৌলিক শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে—পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তাৎক্ষণিকভাবে সেই কাজ থেকে বিরত থাকা, ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা এবং যদি কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে, তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা প্রার্থনা করা (মারাকিল ফালাহ, পৃ. ২১৯; ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ২/৬৩১–৬৪১)।
ইস্তিগফারের প্রামাণিক দোয়া ও ফজিলত
সায়্যিদুল ইস্তিগফার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এই দোয়াটি বিশ্বাস ও আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করবে এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহীহ বুখারী, হা. ৬৩০৬; তিরমিযী, হা. ৩৩৯৩)।
সংক্ষিপ্ত ইস্তিগফার সম্পর্কেও হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, ঘুমানোর আগে এটি তিনবার পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা বান্দার অসংখ্য গুনাহ ক্ষমা করে দেন (তিরমিযী, হা. ৩৩২৯; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১/১২)।
ব্যক্তিগত ইবাদতের গুরুত্ব
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে নফল ইবাদত ব্যক্তিগত ও একান্ত সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক হলেও, নফল ইবাদত নিরিবিলি পরিবেশে একাকী করা উত্তম বলে আলেমদের অভিমত (ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ২/৬৩১–৬৪১)।
কারা এই রাতের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকে
হাদীসের আলোকে কয়েকটি শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ রয়েছে, যারা এই সাধারণ ক্ষমার রাতেও অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকে যতক্ষণ না তারা তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসে। তাদের মধ্যে রয়েছে শিরককারী, বিদ্বেষ পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি, মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি এবং অন্যায় হত্যায় লিপ্ত ব্যক্তি (সহীহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫; মুসনাদে আহমাদ, হা. ৬৬৪২; শু‘আবুল ঈমান, ৩/৩৮৩–৩৮৫)।
বর্জনীয় কুসংস্কার ও সামাজিক আচরণ
ইসলামি সূত্র অনুযায়ী, এই রাতে আতশবাজি, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা এবং বিশেষ খাবারকে ধর্মীয় আমলের অংশ হিসেবে গণ্য করার কোনো প্রামাণিক ভিত্তি নেই। এসব কার্যক্রমকে অপচয় ও ইবাদতের পরিবেশ বিনষ্টকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (আবূ দাউদ, হা. ৪০৩১; আল-মাদখাল লি ইবনিল হাজ্জ, ১/২৯৯, ১/৩০৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৮৯)।
শবে বরাত কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, বরং এটি আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংশোধন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ। এই রাতের মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে ক্ষমা প্রার্থনা, মানবিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং নৈতিক জীবনের প্রতি পুনরায় অঙ্গীকারের মধ্যে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত রাতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
সূত্র: