আমের যত কাহিনি

২০২৫ মে ২৪ ১৬:৪৬:২৫
আমের যত কাহিনি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ ‘আম’ শুধু একটি ফল নয়, বরং এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত এক ঐতিহ্যের নাম। ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার বছরের পুরোনো এই ফল আজ বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় ফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পৃথিবীর বহু দেশে আম জন্মায় না, তবুও যারা একবার এই মিষ্টি ফলের স্বাদ পেয়েছেন, তারা ভুলতে পারেন না। গ্রাম বা শহর—গ্রীষ্ম এলেই হাটবাজার থেকে শুরু করে আমবাগানজুড়ে ম–ম করে আমের সুবাস। এ যেন গ্রীষ্মকালের অনিবার্য প্রতীক।

প্রাচীন ইতিহাসে আমের উপস্থিতি

আমের ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে এর উৎপত্তি। রামায়ণ, উপনিষদ ও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে আমের উল্লেখ রয়েছে। গৌতম বুদ্ধ আমবাগানে বিশ্রাম নিতেন বলেও প্রচলিত ধারণা রয়েছে বৌদ্ধ সমাজে। মহাবীর আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে মোগল সম্রাটদের পর্যন্ত এই ফল ছিল প্রিয় তালিকায়।

আম শব্দের উৎস ও ছড়িয়ে পড়া

‘আম’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃতের ‘আম্র’ থেকে। তামিলে ‘মাঙ্গা’, সেখান থেকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে ইংরেজি ‘Mango’। ব্রিটিশ ও পর্তুগিজদের হাত ধরে আম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

আম: রাজা-বাদশাহদের পছন্দ

মোগল আমলে আম শুধু রাজাদেরবাগানেই চাষ হতো। সম্রাট আকবর ‘লাখবাগ’ নামে এক লাখ আমগাছের চারা লাগিয়ে আম চাষে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ‘আইন-ই-আকবরি’-তে আমের বিভিন্ন প্রজাতির বিবরণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে সিরাজউদ্দৌল্লা ও মুর্শিদ কুলি খাঁ আমচাষে বিপ্লব আনেন।

বাংলাদেশের আমচাষ ও উৎপাদন

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও জাতীয় বৃক্ষ আমগাছ এবং আমকেই ফলের রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়। বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, মেহেরপুরসহ ৪০টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদন হয়।

বিশ্বে আমের উৎপাদন ও রপ্তানি

বিশ্বে বছরে ৪৬ মিলিয়ন টনের বেশি আম উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে একাই ভারত উৎপাদন করে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ আম রপ্তানি করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। তবে বিশ্ববাজারে আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠা আম

বাঙালি সংস্কৃতিতে আম শুধু খাবার নয়, একটি আবেগ, উৎসব ও আত্মীয়তার প্রতীক। জামাইষষ্ঠী থেকে শুরু করে আত্মীয়দের বাড়িতে আম পাঠানোর রেওয়াজ আজও প্রচলিত। পান্তাভাতে কাঁচা আম, আমচুর, আমদুধ কিংবা আমের জুস—সব কিছুতেই এই ফলের উপস্থিতি চোখে পড়ে।

আমের কাহিনি যত বলা যায়, ততই বিস্মিত হতে হয়। এটি যেমন ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, তেমনি কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। গ্রীষ্ম এলে যেমন প্রকৃতি তার রূপবদল ঘটায়, তেমনি আমও ফিরে আসে বাঙালির প্রতীক্ষিত রসনা জাগানিয়া স্বপ্ন হয়ে।

ট্যাগ: আম

শীতের ভোরে প্রকৃতির অপূর্ব সাজ

২০২৫ নভেম্বর ২৭ ০৮:৪৫:১৯
শীতের ভোরে প্রকৃতির অপূর্ব সাজ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশজুড়ে শীত এখন পুরোপুরি তার আবহ নিয়ে হাজির। কুয়াশায় মোড়ানো আকাশ, হিমেল বাতাসের তীব্র ছোঁয়া, ভোরের আলোয় ঝলমলে শিশিরবিন্দু, খেজুরের রস বিক্রেতার ডাক সব মিলিয়ে শীতের সকাল যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। বছরের সবচেয়ে শীতল ঋতু হিসেবে শীত সাধারণত বাংলা ক্যালেন্ডারের পৌষ ও মাঘ মাস জুড়ে থাকে এবং এই সময়ে প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতিতে নানা বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন দেখা যায়।

শীতের ভোরে প্রাকৃতিক দৃশ্য হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। আকাশে হালকা বা ঘন কুয়াশার চাদর, দূর থেকে দেখা যায় গাছপালা আর পথঘাট ধূসর পর্দায় মোড়া। ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা শিশিরবিন্দু রোদ উঠলে মুক্তোর মতো আলো ছড়ায়। পুকুরপাড়, কৃষিজমি, গ্রামের রাস্তা সবকিছুই যেন স্নিগ্ধ ঠান্ডার কোমল ছোঁয়ায় নতুন রূপ পায়।

আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যে দেখা যায়, শীতের সকালে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা থাকে বেশ উঁচু। এর ফলে শীত আরও তীব্র অনুভূত হয়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুরে কনকনে ঠান্ডা ও হালকা শৈত্যপ্রবাহ অনুভূত হওয়া এখন নিয়মিত। এসব অঞ্চলে সকালে ঘরের বাইরে বের হওয়া মানেই ঠান্ডার সঙ্গে যুদ্ধ।

শীতে মানুষের জীবনধারা বদলে যায়। সকালবেলা রাস্তা ঘাটে দেখা যায় গরম কাপড়ে মুড়ানো মানুষদের ব্যস্ত যাতায়াত। অফিসগামী মানুষের হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ জড়িয়ে থাকে উষ্ণতার আরাম। অনেকেই আবার ঘরে বসে উপভোগ করেন খেজুরের পাটালি কিংবা খেজুরের রস। গ্রামাঞ্চলে ভোরবেলা রস সংগ্রহের দৃশ্য শীতের অন্যতম আনন্দময় অনুষঙ্গ।

শীতকাল নানা পুষ্টিকর ফলমূল ও সবজির মৌসুম। কমলা, কুল, সফেদা, ডালিম, গাজর, ব্রোকলি, ফুলকপি, পালং শাক এসব সবজি ও ফল শুধু স্বাদেই নয়, স্বাস্থ্য উপকারিতায়ও অনন্য। শীতের সকাল তাই হয়ে ওঠে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের উপযুক্ত সময়।

সাংস্কৃতিকভাবে শীতের সকাল বাঙালির জীবনকে বরাবরই প্রভাবিত করে এসেছে। বাংলা কবিতা, গান, গল্পে শীতের সকাল তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে বারবার স্থান দখল করেছে। কুয়াশা, শিশির, শীতের রোদ, খেজুরের রস এসবই বাঙালির লোকজ স্মৃতি, আবেগ ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে।


সাগরের তল থেকে মরুভূমির বুক আসলে কী রহস্য লুকিয়ে আছে এখানে

২০২৫ নভেম্বর ২৬ ১৬:৫৯:২৫
সাগরের তল থেকে মরুভূমির বুক আসলে কী রহস্য লুকিয়ে আছে এখানে
ছবিঃ সংগৃহীত

আমাদের এই পৃথিবী তার গভীরে ঠিক কত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে তা মানুষের কল্পনারও অতীত। ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণাগার পর্যন্ত এমন কিছু প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর আজও মেলেনি। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর বর্ণনায় থাকা হারিয়ে যাওয়া শহর থেকে শুরু করে নির্জন মরুভূমিতে একা একা হেঁটে চলা পাথর সবকিছুর মধ্যেই যেন এক অলৌকিক আখ্যান মিশে আছে। প্রকৃতির এই খেয়ালি আচরণ আর ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায়গুলো যুগে যুগে মানুষের কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

রহস্যের কথা উঠলেই সবার আগে যে নাম ভেসে আসে তা হলো আটলান্টিস। দার্শনিক প্লেটোর বর্ণনায় উঠে আসা এই উন্নত সভ্যতাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভাবিয়ে তুলেছে। ধারণা করা হয় সমৃদ্ধ এই নগরীটি মাত্র একদিনের প্রলয়ে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল। এটি কি শুধুই প্লেটোর কোনো দার্শনিক উপকথা নাকি এর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে সমুদ্রের গভীরে যখনই কোনো প্রাচীন কাঠামোর সন্ধান মেলে তখনই নতুন করে আটলান্টিসকে খুঁজে পাওয়ার নেশা জেগে ওঠে। এই হারানো সভ্যতার গল্প বারবার মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির বিশালতার কাছে মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা কতটা তুচ্ছ।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক রহস্য যা সেইলিং স্টোনস নামে পরিচিত। এখানকার বিশাল পাথরগুলো মরুভূমির শুকনো মাটির ওপর দিয়ে যেন নিজে থেকেই এগিয়ে চলে এবং পেছনে রেখে যায় দীর্ঘ ও গভীর দাগ। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই অদ্ভুত চলাচলের কারণ খুঁজতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন। একসময় মনে করা হতো এটি কোনো চুম্বকীয় বা অলৌকিক শক্তির প্রভাব। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে রাতের তীব্র ঠান্ডায় মরুভূমির কাদামাটি জমে যখন বরফের পাতলা আস্তরণ তৈরি করে তখন বাতাসের সামান্য ধাক্কাতেই এই পাথরগুলো পিছলে সামনে এগিয়ে যায়। বরফ গলে গেলে শুধু পাথরের এগিয়ে যাওয়ার চিহ্নটিই পড়ে থাকে যা দর্শকদের অবাক করে দেয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চিলির ইস্টার দ্বীপের মোয়াই মূর্তিগুলোও যেন ভিন্ন এক সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগ্নেয় শিলা দিয়ে তৈরি এই বিশাল আকৃতির মূর্তিগুলোকে রাপানুই জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়া সেই আদিম যুগে মানুষ কীভাবে পাথর কাটার সরঞ্জাম ছাড়াই এত বিশাল মূর্তি তৈরি করেছিল তা এক বড় বিস্ময়। তার চেয়েও বড় রহস্য হলো এই ভারী মূর্তিগুলো দ্বীপের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবহন করা হয়েছিল কীভাবে। বিভিন্ন তত্ত্বে বলা হয়েছে কাঠ বা দড়ির সাহায্যে মূর্তিগুলোকে দাঁড় করিয়ে হাঁটানোর কৌশলে হয়তো পরিবহন করা হতো। তবে এই মূর্তিগুলোর প্রকৃত ইতিহাস আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানের দারভাজা গ্রামে রয়েছে এক জ্বলন্ত গর্ত যা নরকের দরজা বা দারভাজা গ্যাস ক্র্যাটার নামে পরিচিত। প্রায় ১৯০ ফুট চওড়া এবং ৭০ ফুট গভীর এই গর্তে গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দিনরাত আগুন জ্বলছে। তবে এই আগুনের উৎস প্রাকৃতিক নয় বরং এর পেছনে রয়েছে মানুষের হস্তক্ষেপ। ১৯৭১ সালে একটি প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র খননের সময় মাটি ধসে এই বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। তখন বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের বিস্তার ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা গর্তটিতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং ভেবেছিলেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা নিভে যাবে। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে মরুভূমির বুকে এটি আজও জ্বলছে। রাতের আঁধারে এই জ্বলন্ত গর্ত এক ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা করে যা মানুষকে প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

আটলান্টিসের মায়া থেকে শুরু করে নরকের দরজার লেলিহান শিখা পর্যন্ত এই পৃথিবী যেন রহস্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক কিছু বিস্ময় হয়তো চিরকালই অমীমাংসিত থেকে যাবে। আর এই অজানা রহস্যগুলোই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং প্রকৃতি ও ইতিহাসকে আরও নিবিড়ভাবে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।


দাদা-দাদী-নানা-নানীর অতিরিক্ত আদরে বাড়ছে 'সিক্স পকেট সিনড্রোম', জানুন বিস্তারিত

২০২৫ নভেম্বর ২৩ ১৩:১৬:৩২
দাদা-দাদী-নানা-নানীর অতিরিক্ত আদরে বাড়ছে 'সিক্স পকেট সিনড্রোম', জানুন বিস্তারিত
ছবি: সংগৃহীত

শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজে গত দুই দশকে শিশু লালন-পালনের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পরিবার ছোট হচ্ছে, সন্তান সংখ্যা কমছে, কর্মজীবী বাবা-মায়ের উপস্থিতি বাড়ছে এবং যৌথ পরিবারের ভূমিকা পুনর্নির্মিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই জন্ম নিয়েছে নতুন একটি সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, যার নাম “Six Pocket Syndrome” বা ছয় পকেট সিনড্রোম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুকে কেন্দ্র করে ছয়জন অভিভাবকের (বাবা, মা, দাদা, দাদী, নানা, নানী) ভালোবাসা, অর্থনৈতিক সমর্থন, উপহার, মনোযোগ ও সুযোগ অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।

এই সিনড্রোম একদিকে শিশুর জীবনকে আনন্দময় ও বিলাসিতায় ভরিয়ে তুললেও, অন্যদিকে তার ব্যক্তিত্ব গঠন, দায়িত্ববোধ ও মানসিক শক্তিকে বিপজ্জনকভাবে দুর্বল করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সাংস্কৃতিকভাবে সন্তানকে অত্যাধিক আদর করার প্রবণতা আগে থেকেই প্রবল, সেখানে সিক্স পকেট সিনড্রোমের বিস্তার আরও দ্রুত হচ্ছে।

শিশুকে কেন্দ্র করে ছয় পকেটের অদৃশ্য বৃত্ত

প্রথাগত বড় পরিবারে সন্তানকে ভালোবাসেন অনেকেই, কিন্তু আধুনিক নিউক্লিয়ার পরিবারে যখন একমাত্র সন্তান থাকে, তখন তার চারপাশে তৈরি হয় এক বিরাট নিরাপত্তা–সুবিধা–স্নেহ–আর্থিক প্রাচুর্যের বৃত্ত।

এই বৃত্ত তৈরি হয় ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের আর্থ-সামাজিক শক্তি থেকে - বাবা, মা, দাদা, দাদী, নানা, নানী।

শিশুটি এই ছয়জনের আর্থিক “পকেট” থেকে যা চায়, তা পেয়ে যায়। ফলাফল শিশুর চারপাশে তৈরি হয় অতিরিক্ত সুবিধা ও অতিরিক্ত প্রাচুর্যের অভ্যস্ততা, যা তার জীবনদর্শন, আচরণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, আবেগীয় পরিপক্বতা সব কিছুকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত করে ফেলে।

একটি বাস্তবচিত্র: একমাত্র সন্তান রাজ

এই প্রবণতা বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ যথেষ্ট।ধরা যাক, একটি শিশু রাজ। রাজের বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী এবং দুজনেই পরিবারে একমাত্র সন্তান। ফলে রাজের চারজন দাদা-দাদী–নানা-নানী আছেন, যাঁরা রাজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চান। পরিবারের প্রতিটি মানুষই আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

রাজের যে কোনো চাহিদা নতুন জামা, দামি খেলনা, মোবাইল, ট্যাব, ভিডিও গেম, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, পার্টি, কোচিং, বিশেষ ক্লাস সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয়ে যায়।

রাজ কোনো ইচ্ছা মনে মনে করার আগেই বাস্তবে পেয়ে যায়। মন একটু খারাপ হলে দিদা খেলনা দেন, বাবা খাবার নিয়ে আসেন, নানী নতুন জামা দেন, দাদা তাকে ঘুরতে নিয়ে যান।

ধীরে ধীরে রাজ বুঝতে শেখে “আমি চাইলে পাই। আমি যা বলি, তা হবেই।” এই মানসিক কাঠামোই হলো সিক্স পকেট সিনড্রোমের সূচনা।

অতিরিক্ত সুবিধা কীভাবে শিশুর মানসিক বিকাশকে বিকৃত করে?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুর বিকাশের জন্য শুধু ভালোবাসা নয়- সীমাবদ্ধতা, শৃঙ্খলা, অপেক্ষা করা, ব্যর্থতা মোকাবিলা ও দায়িত্ব পালন এসব শেখাও জরুরি।

কিন্তু সিক্স পকেট সিনড্রোমে সন্তান এগুলো থেকে বঞ্চিত হয়।

১. ধৈর্য ও অপেক্ষার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে

শিশু মনে করে সবকিছু “এখনই” চাই। জীবনের বাস্তব সংগ্রাম তাকে ভয় পাইয়ে দেয়।

২. সহানুভূতি দুর্বল হয়

কেউ কষ্ট পাচ্ছে, অপেক্ষা করছে, অভাবে আছে—এসব অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়।

৩. ব্যর্থতার ভীতি তৈরি হয়

সামান্য পরীক্ষায় খারাপ ফল, খেলায় হেরে যাওয়া, বন্ধুর সঙ্গে সমস্যা—এসবই তাকে অস্থির করে তোলে।

৪. ‘না’ শুনতে পারে না

যে কারণে শিক্ষাজীবন, পেশাজীবন ও ব্যক্তিজীবনে সে বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়।

৫. ভোগবাদী মানসিকতা তৈরি হয়

এই ভুল ধারণায় সে আবেগীয় পরিপক্বতা হারায়।

৬. আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে

সময় মেনে কাজ করা, পড়া, নিজের জিনিস নিজের হাতে রাখা—এসব অভ্যাস গড়ে ওঠে না।

সমাজে এর প্রভাব

এই সিনড্রোম শুধু পরিবার নয়, সমাজের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির ওপরও প্রভাব ফেলে।সিক্স পকেট সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুরা-

  • বাস্তব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে
  • মানসিক চাপ সহ্য করতে পারে না
  • দায়িত্ব নেওয়া শিখে না
  • দলগতভাবে কাজ করতে সমস্যা বোধ করে
  • ‘অভিযোগমূলক মানসিকতা’ তৈরি হয়

মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন- এমন শিশুরাই বড় হয়ে সহজে হাল ছেড়ে দেওয়া, হতাশায় ভুগা, আত্মকেন্দ্রিকতা ইত্যাদি সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি বেশি।

কেন এই সিনড্রোম দ্রুত বাড়ছে?

১. ছোট পরিবার–এক সন্তান নীতি

একটি পরিবারে যখন একটিই সন্তান থাকে, তখন তার দিকে সবাই ঝুঁকে যায়।

২. কর্মজীবী বাবা-মায়ের অপরাধবোধ

সময় দিতে না পারার বদলে তাঁরা বস্তুগত উপহার দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে চান।

৩. দাদা-দাদী-নানী-নানার আবেগীয় দুর্বলতা

তাদের কাছে নাতি–নাতনি মানেই খালি হাত ভরা।

৪. বাড়তি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

পরিবারে অনেকেরই আয় থাকায় শিশুর চারপাশে অতি-প্রাচুর্য সৃষ্টি হয়।

৫. সামাজিক প্রতিযোগিতা

অনেকে মনে করেন, “বাচ্চাকে সেরা জিনিস দিলেই সে সেরা হবে।”ফলে উপহার, টিউশন, কোচিং, ক্লাস, ডিভাইস সবই অতিরিক্ত মাত্রায় দেওয়া হয়।

সমাধান: ভালোবাসার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা

১. “না” বলার সাহস রাখুন

সব অধিকার দিলে শিশু অধিকার চিনতে শেখে না।

২. দায়িত্ব দিন

নিজের বিছানা, ঘর, জিনিসপত্র, স্কুলব্যাগ—এসবের দায়িত্ব পালন করতে দিন।

৩. উপহারের বদলে অভ্যাস শেখান

প্রচেষ্টা, সময়ানুবর্তিতা, অধ্যবসায়ের প্রশংসা করুন।

৪. ভাগাভাগি ও শেয়ারিং শেখান

এটি সামাজিক বিকাশের মূল চাবিকাঠি।

৫. পারিবারিক নীতিতে সবাইকে এক করুন

দাদা-দাদী/নানা-নানী যেন “গোপনে সবকিছু দিয়ে দেওয়ার” নীতি না নেন।

৬. আত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখান

জীবনের সত্যিকারের সফলতা পাওয়া থেকে নয়শেখা, চেষ্টা, সততা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্য থেকে আসে।

সিক্স পকেট সিনড্রোম ভালোবাসার অতিরিক্ততার ফল। কিন্তু শিশুকে শুধু সুবিধা দেওয়া নয় নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া যেটি অনেক বেশি মূল্যবান।


বিশ্বের ১০ দামী খাবার, চোখ কপালে তোলার মতো মূল্য

২০২৫ নভেম্বর ২৩ ১২:৪৪:৪০
বিশ্বের ১০ দামী খাবার, চোখ কপালে তোলার মতো মূল্য
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের খাদ্যসংস্কৃতিতে বিলাসিতা ও দুর্লভতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে একদল বিশেষ খাবার। গ্যাস্ট্রোনমির এই শীর্ষ তালিকায় সবচেয়ে দামী খাবার হিসেবে রয়েছে আলমাস ক্যাভিয়ার, যার মূল্য কেজি প্রতি দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। বিরল অ্যালবিনো বেলুগা স্টারজিয়নের ডিম থেকে তৈরি এই ক্যাভিয়ারকে অনেকেই ‘ডায়মন্ড অফ দ্য ক্যালিনারি ওয়ার্ল্ড’ বলে থাকেন।

তবে শুধু ক্যাভিয়ারই নয় দুর্লভতা, প্রাকৃতিক scarcity, পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা এবং শ্রমনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি খাবার অসাধারণ উচ্চমূল্যে জায়গা করে নিয়েছে। এগুলো শুধু খাবার নয় বরং ঐতিহ্য, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ধৈর্যের মিশেলে তৈরি একেকটি বৈশ্বিক খাদ্য উত্তরাধিকার।

হোয়াইট ট্রাফল: মাটির নিচের সাদা সোনা

ইতালির পাহাড়ি বনভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই সুগন্ধি মাশরুমকে খুঁজে পেতে প্রশিক্ষিত কুকুরের দরকার হয়। এটি কৃত্রিমভাবে উৎপাদন সম্ভব নয়, যা এর দাম প্রতি পাউন্ডে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়ে যায়। অনন্য ঘ্রাণ এবং গভীর স্বাদের জন্য ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলোতে এর চাহিদা তুঙ্গে।

সাফরন: গোলাপের সুতোয় গড়া সোনালি মসলা

এক পাউন্ড শুকনো সাফরন তৈরি করতে লাগে ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ ফুল। প্রতিটি ফুল থেকে হাতে সংগ্রহ করতে হয় মাত্র তিনটি লালচে স্টিগমা। এ কারণেই সাফরন বিশ্বের সবচেয়ে দামী মসলার মুকুট ধরে রেখেছে।

ব্লুফিন টুনা: সামুদ্রিক নিলামে মিলিয়ন ডলারের হুল্লোড়

জাপানের Tsukiji নিলামে এ মাছের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উঠেছে। বিশেষত ওতোরো অংশ যেখানে ফ্যাটের marbling চোখে পড়ার মতো সুশি ও সাশিমি প্রেমীদের কাছে অপরিসীম আকর্ষণীয়।

ওয়াগিউ ও কোবে বিফ: মার্বেল টেক্সচারের বিলাসী মাংস

জাপানি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালিত গরুর এই মাংসের marbling, butter-like texture এবং অপূর্ব স্বাদ বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। বিশেষ ডায়েট ও যত্নের কারণে এর দাম প্রতি পাউন্ডে কয়েকশো ডলার ছুঁয়ে যায়।

মাতসুতাকে মাশরুম: প্রকৃতির লুকানো রত্ন

জাপানে সাংস্কৃতিকভাবে মূল্যবান এই সুগন্ধি মাশরুম পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। চাষ সম্ভব না হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো অল্প সংখ্যক মাশরুমই আন্তর্জাতিক বাজারে আসে, যার দাম লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

আইবেরিকো হ্যাম: স্পেনের বুকে অ্যাকর্ন-ফেড রাজকীয় স্বাদ

মুক্তচারণে বেড়ে ওঠা আইবেরিয়ান শূকর শুধুমাত্র অ্যাকর্ন খেয়ে বড় হয়। কয়েক বছরের ধীর curing প্রক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় গভীর স্বাদযুক্ত, melt-in-mouth টেক্সচারের জ্যামন আইবেরিকো—বিশ্বের অন্যতম দামী হ্যাম।

মুজ চিজ: সুইডেনের একমাত্র খামারের সৃষ্টি

বিশ্বে মাত্র একটি ফার্মেই তৈরি হয় এই চিজ। মুজ দুধ সংগ্রহ কঠিন ও অতি সীমিত হওয়ায় এর দাম কেজিপ্রতি হাজার ডলারেরও বেশি।

বার্ড’স নেস্ট স্যুপ: লালচে সোনালি লালা-নির্মিত বিস্ময়

চীনা delicacy হিসেবে বিখ্যাত এই স্যুপ swiftlet পাখির লালা দিয়ে নির্মিত বাসা থেকে তৈরি হয়। দুর্গম পাহাড় থেকে বাসা সংগ্রহ করতে প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে পড়তে হয় সংগ্রাহকদের, যা এর মূল্য কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।

কপি লুওয়াক: সিভেটের পেটে ফারমেন্টেড কফির রাজা

এশীয় পাম সিভেট খেয়ে partially digest করে যে কফি বীজ বের করে, তা পরিশোধন করে তৈরি হয় Kopi Luwak। বলা হয়, সিভেটের হজমপ্রক্রিয়ায় বিশেষ fermentation স্বাদের গভীরতা তৈরি করে যা প্রতি কেজিতে কয়েক হাজার ডলার মূল্য অর্জন করে।


অস্ট্রিচ কেন পাথর খায় কারণ জানলে চমকে যাবেন

২০২৫ নভেম্বর ২২ ১৩:০৫:৩৬
অস্ট্রিচ কেন পাথর খায় কারণ জানলে চমকে যাবেন
ছবি: সংগৃহীত

দাঁত নেই—তবু কঠিন ঘাস, বীজ, শিকড়, এমনকি শক্ত ফাইবারও সহজেই হজম করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখি অস্ট্রিচ। এ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক কৌশল, যার নাম গিজার্ড স্টোন বা গ্যাস্ট্রোলিথ। অস্ট্রিচ সচেতনভাবেই ছোট পাথর গিলে ফেলে, যা পরে তার গিজার্ডে গিয়ে “অভ্যন্তরীণ দাঁত” হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক গবেষণা আবারও দেখিয়েছে, এই পাথরগুলোই অস্ট্রিচের পুরো হজমব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি।

অস্ট্রিচসহ অনেক পাখি, এমনকি কিছু সরীসৃপ এবং প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরও গ্যাস্ট্রোলিথ ব্যবহার করত। দাঁত না থাকায় অস্ট্রিচকে নির্ভর করতে হয় অত্যন্ত শক্তিশালী গিজার্ডের ওপর, যেখানে প্রবেশ করা খাদ্য পাথরের সঙ্গে ঘর্ষণ হয়ে চূর্ণ হয়ে যায়। গিজার্ডের পেশির শক্ত সংকোচন পাথরগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে ঘষে, ফলে তন্তুযুক্ত ঘাস, শক্ত বীজ ও রুট সহজেই ভেঙে যায়। এভাবে খাদ্য ছোট ছোট টুকরায় পরিণত হয়ে পুষ্টি শোষণের উপযোগী হয়।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক অস্ট্রিচের গিজার্ডে প্রায় এক কিলোগ্রাম পর্যন্ত পাথর থাকতে পারে। তবে পাথরগুলো সবসময় কার্যকর থাকে না। ঘর্ষণে ক্রমশ মসৃণ হয়ে গেলে এগুলো হজমনালী দিয়ে বেরিয়ে যায় বা কখনো কখনো উঠিয়েও ফেলে পাখিটি। এরপর তারা মাঝারি আকারের নতুন পাথর খুঁজে গিলে ফেলে, যাতে আবারও কার্যকরভাবে খাদ্য চূর্ণ করা যায়। খামারে অস্ট্রিচ পালনকারীরা তাই পাখিদের জন্য বিশেষ খাবার-গ্রিট সরবরাহ করেন, যাতে স্বাস্থ্যকর হজমপ্রক্রিয়া বজায় থাকে।

এ গবেষণা দেখিয়েছে, যদি অস্ট্রিচ পর্যাপ্ত গিজার্ড স্টোন না পায়, তবে তার হজমব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে দেখা দিতে পারে অপুষ্টি, পাচনতন্ত্রের বাধা, এমনকি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও। তাই এই পাথরগুলো তাদের বেঁচে থাকা ও পুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

অস্ট্রিচের গ্যাস্ট্রোলিথ ব্যবহারের এই প্রাকৃতিক কৌশল শুধু পাখিটির অভিযোজনশক্তিকে তুলে ধরে না, বরং প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কেও বিজ্ঞানীদের নতুন সূত্র দেয়। দাঁত ছাড়াই কীভাবে শক্ত খাদ্য হজম হতো-তার এক জীবন্ত উদাহরণ আজকের অস্ট্রিচ।


আগ্নিবলয় বনাম খনিজভাণ্ডার: দুই রিং অফ ফায়ারের রহস্য

২০২৫ নভেম্বর ২২ ১২:৪৯:২৪
আগ্নিবলয় বনাম খনিজভাণ্ডার: দুই রিং অফ ফায়ারের রহস্য
ছবি: সংগৃহীত

প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অশ্বখুরাকৃতি আগ্নেয় ও ভূকম্পন বেল্ট ঘিরে রেখেছে পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে। দক্ষিণ আমেরিকার আগ্নেয় পর্বতমালা থেকে শুরু হয়ে এটি উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূল, আলাস্কার বেয়ারিং স্ট্রেইট, তারপর রাশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া হয়ে দক্ষিণে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই ভয়াবহ ভূত্বকীয় অঞ্চলটিই বিশ্বব্যাপী পরিচিত “আগ্নিবলয়” বা Pacific Ring of Fire নামে। এর বিস্তৃতি, গঠন ও ভূমিকম্প-প্রবণতা একে পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক বেল্টে পরিণত করেছে।

এই অঞ্চলকে বিপজ্জনক করে তুলেছে প্রধানত টেকটোনিক প্লেটের ধারাবাহিক সংঘর্ষ। প্যাসিফিক প্লেট পৃথিবীর বিভিন্ন প্লেটের নিচে ঢুকে যায়, যা সাবডাকশন নামে পরিচিত। প্লেটের এই নিমজ্জন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় গভীর সমুদ্র খাদ, বিশাল ফল্ট লাইন এবং আগ্নেয়গিরির দীর্ঘ শৃঙ্খল। ফলস্বরূপ প্রতি বছর ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ঘটে, এবং বিশ্বের প্রায় নব্বই শতাংশ ভূমিকম্প ও পঁচাত্তর শতাংশ সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ঠিক এই বলয়ের মধ্যেই অবস্থান করে।

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর সমুদ্র খাদ Mariana Trench-ও এই অঞ্চলের অংশ, যা টেকটোনিক চাপের তীব্রতা নির্দেশ করে। এই কারণেই বৈশ্বিক ভূকম্পন গবেষণা, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পূর্বাভাস এবং দুর্যোগ ঝুঁকি নিরূপণের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে এই রিং অফ ফায়ার অঞ্চল।

বিশ্বের বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ারের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, কারণ এখানকার ভূকম্পন ও আগ্নেয় কার্যকলাপ পৃথিবীর অন্য অংশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ভূমিকম্প, সুনামি এবং আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাতের পূর্বাভাস দিতে এই অঞ্চল থেকে সংগৃহীত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বহু বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও সুনামির উৎস এই রিং অফ ফায়ার, যা আজও বিশ্বের লাখো মানুষের দুর্যোগপ্রবণ বাস্তবতা নির্ধারণ করে।

অন্যদিকে কানাডার উত্তরাঞ্চলে থাকা Ontario Ring of Fire সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। এটি জেমস বে লোল্যান্ডস এলাকায় অবস্থিত একটি ক্রিসেন্ট-আকৃতির খনিজসমৃদ্ধ এলাকা, যার সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় বেল্টের কোনো সম্পর্ক নেই। এই অঞ্চল ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির কারণে গঠিত হয়নি; বরং কোটি কোটি বছরের পুরোনো ভূস্তর, শিলার রূপান্তর এবং প্রাকৃতিক খনিজ জমার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।

এখানেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ chromite ভাণ্ডার। পাশাপাশি nickel, copper, cobalt, platinum group metals ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজের বিপুল উপস্থিতি এই অঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক মহাস্বপ্নে পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে ওন্টারিও রিং অফ ফায়ারকে কানাডার ভবিষ্যৎ “Super Economic Zone” বলা হচ্ছে। খনিজ উত্তোলন ও শিল্পায়নের সম্ভাব্য বিনিয়োগ মূল্য মাল্টি–বিলিয়ন ডলার আয়তনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি শিল্প এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে নিকেল-ক্রোমাইট অমূল্য সম্পদ। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের নজরে দ্রুত গুরুত্ব বাড়ছে এই অঞ্চলটির।

এই দুটি অঞ্চল একই নাম বহন করলেও বাস্তবিক বিচারে তাদের মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ার গঠিত হয়েছে টেকটোনিক প্লেটের তীব্র সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ফলে, যেখানে ভূমিকম্প-সুনামি মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর জন্য স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করে।

বিপরীতে ওন্টারিও রিং অফ ফায়ার গঠিত হয়েছে ভূতাত্ত্বিক সম্পদের উপস্থিতির ভিত্তিতে, যা প্রাকৃতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে অমূল্য। একটিকে পৃথিবীর ভয়াবহ দুর্যোগ অঞ্চল বলা হয়, অন্যটি বিশ্ব খনিজশিল্পের ভবিষ্যৎ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

এই দুই রিং অফ ফায়ার তাই একই নামের হলেও প্রকৃতি, গঠন ও গুরুত্বে একেবারেই ভিন্ন একটি বিপর্যয়ের প্রতীক, অন্যটি সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।


দিনে ঘুটঘুটে আঁধার, রাতে কুমির আতঙ্ক! ১০ হাজার কোটি ডলারের শহর এখন ভুতুড়ে নগরী

২০২৫ নভেম্বর ২০ ২১:১৬:৫০
দিনে ঘুটঘুটে আঁধার, রাতে কুমির আতঙ্ক! ১০ হাজার কোটি ডলারের শহর এখন ভুতুড়ে নগরী
ছবিঃ সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার জোহর প্রণালীর তীরে সিঙ্গাপুর সীমান্ত ঘেঁষে এক বিশাল স্বপ্ননগরী গড়ার পরিকল্পনা করেছিল চীন। নাম দেওয়া হয়েছিল ফরেস্ট সিটি। ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই শহরটি হওয়ার কথা ছিল পরিবেশবান্ধব এক আধুনিক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলো আজ দাঁড়িয়ে আছে জনশূন্য হাহাকারের সাক্ষী হয়ে। যেখানে মানুষের কোলাহল থাকার কথা ছিল সেখানে আজ বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই মহাপ্রকল্পের কাজ শুরু করেছিল দেশটির শীর্ষস্থানীয় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কান্ট্রি গার্ডেন। তাদের লক্ষ্য ছিল চারটি কৃত্রিম দ্বীপের ওপর প্রায় সাত লাখ মানুষের জন্য একটি বিলাসবহুল আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৫ সালে যখন এর নির্মাণকাজ শুরু হয় তখন চীনের আবাসন খাত ছিল তুঙ্গে। মোনাকোর চেয়ে চার গুণ বড় এই প্রকল্পটিতে গলফ কোর্স, ওয়াটার পার্ক, অফিস এবং রেস্তোরাঁ সবই রাখার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হলো ফরেস্ট সিটি এখন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটির খুব সামান্য অংশেই মানুষের বসবাস রয়েছে এবং যারা সেখানে আছেন তারাও এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। শহরের বেশিরভাগ ভবনই ফাঁকা পড়ে আছে। শপিং মল বা বিজনেস স্কুল থাকলেও নেই কোনো মানুষের আনাগোনা। স্থানীয়রা এই শহরটিকে এখন গোস্ট টাউন বা ভুতুড়ে শহর নামেই চেনে।

এই বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভুল বিপণন কৌশল। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছিল যে তারা মধ্যবিত্তদের জন্য এই শহরটি তৈরি করছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানকার অ্যাপার্টমেন্টের দাম ছিল সাধারণ মালয়েশিয়ানদের ক্রয়ক্ষমতার বহু বাইরে। জোহর বাহরুর মতো প্রধান শহরে যেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্টের গড় মূল্য ১ লাখ ৪১ হাজার ডলার সেখানে ফরেস্ট সিটির একেকটি ফ্ল্যাটের দাম হাঁকা হয়েছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার ডলার।

এছাড়া ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দাও এই প্রকল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ চীনা ক্রেতাদের জন্য ভিসা প্রদান সীমিত করেছিলেন যা প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্রেতা গোষ্ঠীকে নিরুৎসাহিত করে। পাশাপাশি চীন সরকারও তাদের নাগরিকদের বিদেশে অর্থ লগ্নির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। সবশেষে করোনা মহামারির ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ে এই বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প।

বর্তমানে ফরেস্ট সিটির পরিবেশ এতটাই থমথমে যে দিনের বেলাতেও সেখানকার হলওয়েগুলোতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করে। শহরের পাশেই রয়েছে কুমির ভর্তি নদী যা বাসিন্দাদের ভীতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা এখানে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন তারা এখন চরম হতাশায় ভুগছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব এই ভুতুড়ে পরিবেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। এক দশকের ব্যবধানে বিশাল এক স্বপ্ন এখন মালয়েশিয়ার বুকে এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আত্মহত্যার ৮০ বছর পর হিটলারের ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য

২০২৫ নভেম্বর ১৯ ২১:৩৮:০৮
আত্মহত্যার ৮০ বছর পর হিটলারের ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবিঃ সংগৃহীত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে অ্যাডলফ হিটলার এক ত্রাসের নাম, যার নির্দেশে নাৎসি বাহিনী গোটা ইউরোপকে তছনছ করে দিয়েছিল। ৬০ লাখ ইহুদি হত্যা এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক আগ্রাসনের জন্য কুখ্যাত এই একনায়কের ব্যক্তিগত জীবন ও শারীরিক গঠন নিয়ে গবেষকদের কৌতূহল আজও শেষ হয়নি। সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় হিটলারের ডিএনএ পরীক্ষা করে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এক অজানা অধ্যায় উন্মোচন করেছে। গবেষকরা দাবি করছেন, দুনিয়া কাঁপানো এই একনায়ক সম্ভবত একটি বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

নতুন একটি তথ্যচিত্র 'হিটলারস ডিএনএ: ব্লুপ্রিন্ট অফ আ ডিক্টেটর'-এ গবেষকরা হিটলারের শারীরিক সীমাবদ্ধতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্রিটেনের জিনতত্ত্ববিদ টুরি কিং এবং নাৎসি জার্মানি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স কাইয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, হিটলার সম্ভবত 'ক্যালম্যান সিনড্রোম' (Kallmann Syndrome) নামক এক জটিল জিনগত সমস্যায় ভুগছিলেন। হিটলারের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, যা সেই সময়ের গড় জার্মান পুরুষদের উচ্চতা (৫ ফুট ১০ ইঞ্চি) থেকে কম ছিল। গবেষকরা মনে করছেন, এই জিনগত ত্রুটিই তার উচ্চতা কম হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।

গবেষণার প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ অভিনব। গবেষক টুরি কিং জানান, ১৯৪৫ সালে বার্লিনের যে বাংকারে হিটলার আত্মহত্যা করেছিলেন, সেখানকার সোফায় লেগে থাকা রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই রক্তের ডিএনএ এবং হিটলারের বর্তমানে জীবিত এক আত্মীয়ের ডিএনএ মিলিয়ে এই পরীক্ষা চালানো হয়। শুরুতে বিজ্ঞানীরা সাধারণ ফলের আশা করলেও, চূড়ান্ত ফলাফল তাদের বিস্মিত করে দেয়। হিটলারের রক্তে 'PROKR2' নামক জিনের একটি পরিবর্তন বা মিউটেশন লক্ষ্য করা গেছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জিনের পরিবর্তনের কারণেই হিটলার 'ক্যালম্যান সিনড্রোম' এবং জন্মগত হরমোনজনিত সমস্যা 'হাইপোগোনাডোট্রপিক হাইপোগোনাডিজম'-এ ভুগে থাকতে পারেন। এই শারীরিক সমস্যার ফলে পুরুষদের বয়ঃসন্ধিকাল বা পিউবার্টি শুরু হতে দেরি হয় এবং শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। এর প্রভাবে অণ্ডকোষের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং যৌনাঙ্গের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে।

নাৎসি বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স কাই উল্লেখ করেছেন, বিজ্ঞানের এই নতুন তথ্যগুলো হিটলারের ঐতিহাসিক নথিপত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। ১৯২৩ সালে মিউনিখে কারাগারে থাকার সময় হিটলারের একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল যে, তিনি 'ক্রিপ্টোরকিডিজম' বা অণ্ডকোষের বিকাশজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, বিশেষ করে তার ডান অণ্ডকোষের বিকাশ স্বাভাবিক ছিল না। ঐতিহাসিক সেই তথ্যের সঙ্গে ক্যালম্যান সিনড্রোমের লক্ষণগুলো হুবহু মিলে যাওয়ায় গবেষকদের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া এই একনায়ক পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিলেও, তার নিজের শরীরের ভেতরেই হয়তো আজীবন এক জটিল জিনগত যুদ্ধ চলেছিল।


অদ্ভুত ধাতব বস্তু, রহস্যময় সংকেত: মারিয়ানার অন্ধকার গহ্বরে চীনের 'ফেন্টোজে' কী দেখল?

২০২৫ নভেম্বর ১৭ ১৮:৪৫:৫৫
অদ্ভুত ধাতব বস্তু, রহস্যময় সংকেত: মারিয়ানার অন্ধকার গহ্বরে চীনের 'ফেন্টোজে' কী দেখল?
ছবিঃ সংগৃহীত

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ পৃথিবীর গভীরতম স্থান হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রের নিচে এটি প্রায় ১১ কিলোমিটার গভীর এক অন্ধকার গহ্বর, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এখানকার পানির চাপ এতটাই প্রচণ্ড যে তা মুহূর্তেই ধাতব বস্তুকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। এই রহস্যময় স্থানটি জয়ের লক্ষ্যে চীন দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি, তাদের পাঠানো 'ফেন্টোজে' নামক ডুবোযান (সাবমার্সিবল) এমন কিছু তথ্য পাঠিয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন মারিয়ানা ট্রেঞ্চে একের পর এক মানববিহীন ডুবোযান পাঠিয়েছে, যার মধ্যে 'ফেন্টোজে' ছিল সবচেয়ে উন্নত। এই অভিযানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এমন সব অজানা জীবাণু ও মাইক্রোবের সন্ধান পেয়েছেন, যার ৮৯ শতাংশই পৃথিবীর কোনো গবেষণাগারে আগে কখনো দেখা যায়নি। এই জীবগুলো এমন এক চরম প্রতিকূল পরিবেশে টিকে আছে, যেখানে কোনো অক্সিজেন বা আলো নেই, আছে শুধু মৃত্যুর সমান ভয়াবহ চাপ।

বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, এই মাইক্রোবগুলোর জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া মানব চিকিৎসা এবং জ্বালানি প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে, গবেষকরা একই সাথে গভীর উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। কারণ তারা পৃথিবীর এই গভীরতম গহ্বরেও মানবসৃষ্ট প্লাস্টিক এবং রাসায়নিক দূষণের স্পষ্ট চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন।

তবে এই অভিযানের সবচেয়ে রহস্যজনক ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালে। সেসময় চীনের সাবমার্সিবলের সেন্সর সমুদ্রের তলায় একটি অদ্ভুত ধাতব কাঠামোর উপস্থিতি শনাক্ত করে। প্রথমে এটিকে প্রাকৃতিক খনিজ শিলা বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর গঠন পৃথিবীর পরিচিত কোনো মিশ্র ধাতুর (অ্যালয়) সঙ্গে মিলছে না।

এর পরপরই ঘটে মূল ঘটনা। ওই ধাতব বস্তুটি থেকে একটি সংকেত পাওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সাবমার্সিবলের ক্যামেরা সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ডেটা সার্ভারে ফিরে আসা কিছু ঝাপসা ছবিতে শুধু দেখা যায়, কোনো কিছু থেকে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে এবং একটি চলমান বস্তু যেন দ্রুত সেটির পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।

এই ঘটনার পর, চীনের গবেষণা সংস্থা 'চাইনিজ একাডেমি অফ সাইন্স' বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তারা শুধু বলেছে, "আমরা এমন কিছু পর্যবেক্ষণ করেছি, যা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।" চীনের এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ও নীরবতা বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমে কেউ কেউ এটিকে সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা প্রাণী বলে মনে করছেন, আবার কেউ কেউ ভিন্ন কোনো সম্ভাবনার কথাও ভাবছেন।

এই অভিযানের মাধ্যমে চীন প্রমাণ করেছে যে, তারা গভীর সমুদ্র গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে, প্রায়শই নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কারণে গভীর সমুদ্রের সব তথ্য কখনোই পুরোপুরি প্রকাশ করা হয় না। চীন হয়তো সত্যিই এমন অদ্ভুত কিছুর সন্ধান পেয়েছে, যা হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী নয়, বরং মানুষের অজানার প্রতি কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ আমাদের শিখিয়েছে যে, পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকার এবং প্রতিকূল জায়গাতেও জীবনের অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু সেই জীবন সম্পর্কে মানুষ যত জানার চেষ্টা করছে, রহস্যও যেন ঠিক ততটাই গভীর হচ্ছে।

পাঠকের মতামত:

ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা পুনরুদ্ধার করতে হবে

ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা পুনরুদ্ধার করতে হবে

রাষ্ট্রের ধারণাটি একসময় কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রের ভূমিকা এখন... বিস্তারিত