গাজার রক্ত ঝরতেই থাকুক? দিল্লিতে ইসরায়েলকে সামরিক আশ্বাস ভারতের

বিশ্ব ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ জুলাই ২৫ ১৮:৩৭:৩৪
গাজার রক্ত ঝরতেই থাকুক? দিল্লিতে ইসরায়েলকে সামরিক আশ্বাস ভারতের

গাজায় চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ভারত ও ইসরায়েল সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। বুধবার (২৩ জুলাই) দিল্লিতে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিশ্বজুড়ে যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি বাড়ছে, তখন এই বৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থানকে বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো করে তুলেছে।

ইসরায়েলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত গাজায় প্রায় ৫৯ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুর বড় অংশ নারী ও শিশু। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে, ইতোমধ্যে অন্তত ১১৫ জন শিশু ও নারী ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু সোমবারেই অনাহারে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং ও ইসরায়েলি ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আমির বারামের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়। ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব বৈঠকে ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করে সকল জিম্মির মুক্তির দাবি করেন। ইসরায়েলও ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।

সেই দিনই দিল্লির মেয়র রাজা ইকবাল সিং ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রেউভেন আজারের সঙ্গে দেখা করে ইসরায়েলের পাশে থাকার বার্তা দেন। তিনি বলেন, ভারত ও ইসরায়েলের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। বৈঠকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইসরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়। মেয়রের এই অবস্থান এবং মন্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি খোলা চিঠিতে বলা হয়, “এই কঠিন সময়ে” ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণাটি ফিলিস্তিনিদের রক্তের সঙ্গে নির্মম তামাশা। তারা এই বক্তব্যকে সত্য বিকৃতি ও নৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উল্লেখ করে।

এই সামরিক ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ভারত ও ইসরায়েল সম্প্রতি ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন এগ্রিমেন্ট’ (IPA) চূড়ান্ত করারও ঘোষণা দিয়েছে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো পারস্পরিক বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফিলিস্তিনি গবেষক ড. আব্দুল্লাহ মোয়াসওয়েস মন্তব্য করেন, ভারতের ক্ষমতাসীন দল ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে ভোটারদের সামনে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, যেখানে ইসরায়েলপ্রীতি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক আবেগে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারও বটে। তবে ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছে, যেন ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করা হয়। জানা গেছে, দিল্লি ইতোমধ্যেই ইসরায়েলকে কমব্যাট ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যেগুলো গাজা যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারত সরকার জানিয়েছিল, তারা ‘জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে’ ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সরকারের এই অবস্থান নিয়েও এখন প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন মহল। সমালোচকদের মতে, এই ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান আদতে ইসরায়েলের প্রতি একপেশে সমর্থনের আরেক রূপ।

-রফিক, নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ