ডাইনোসর রাজার দীর্ঘ যৌবন; টি-রেক্স কেন অজেয় ছিল তার নতুন রহস্য উন্মোচন

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ জানুয়ারি ২১ ২১:২৯:০২
ডাইনোসর রাজার দীর্ঘ যৌবন; টি-রেক্স কেন অজেয় ছিল তার নতুন রহস্য উন্মোচন
ছবি : সংগৃহীত

ডাইনোসর জগতের একচ্ছত্র অধিপতি এবং ‘রাজা’ হিসেবে পরিচিত টির‌্যাইনোসরাস-রেক্স বা টি-রেক্সের জীবনকাল নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা বৈজ্ঞানিক ধারণা এক নতুন গবেষণার মুখে বদলে গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, টি-রেক্সদের গড় আয়ু আগে যা ধারণা করা হতো, বাস্তবে তা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই আবিষ্কার ডাইনোসরদের শারীরিক গঠন ও তাদের রাজত্ব করার ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন রহস্য উন্মোচন করেছে।

গত কয়েক দশক ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে, টি-রেক্স ডাইনোসররা সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমির অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড এবং তাঁর গবেষক দল এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, টি-রেক্সদের গড় আয়ু ছিল ৩৫ থেকে ৪০ বছর। অর্থাৎ ডাইনোসরদের এই প্রজাতিটি তাদের আগের অনুমিত বয়সের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীতে বিচরণ করত।

গাছের কাণ্ডের বলয় বিশ্লেষণ করে যেমন গাছের বয়স বের করা যায়, গবেষকরা টি-রেক্সের বয়স নির্ধারণেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। টি-রেক্সের পায়ের হাড়ের বলয়গুলো মূলত তাদের বয়সের ছাপ বহন করে। উডওয়ার্ডের দল মোট ১৭টি জীবাশ্মের হাড় আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষ ধরনের আলোর সাহায্যে বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, আগের প্রযুক্তি ও সাধারণ আলোতে এমন কিছু বলয় ধরা পড়েনি যা টি-রেক্সের প্রকৃত বয়স প্রকাশ করতে পারে। এই ‘অদৃশ্য’ বলয়গুলো শনাক্ত করার মাধ্যমেই জানা গেছে যে, টি-রেক্সরা দীর্ঘ জীবন পার করত এবং পূর্ণ বয়সে পৌঁছানোর সময় এদের ওজন প্রায় ৮ টনের কাছাকাছি হতো।

পিয়ারজে (PeerJ) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় টি-রেক্সের শারীরিক বৃদ্ধি নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের আগের ধারণা ছিল যে, ২৫ বছর বয়সের পর টি-রেক্সদের দেহের বৃদ্ধি থেমে যেত। তবে নতুন তথ্য বলছে, তাদের শারীরিক বিকাশ ছিল বেশ ধীরগতির। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় তারা মাঝারি আকারের দেহ নিয়ে কাটাত এবং জীবনের শেষ ধাপে পৌঁছানোর আগে হঠাৎ খুব দ্রুত আকারে বড় হয়ে উঠত।

অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড বলেন, “ধীরে ধীরে বড় হওয়া টি-রেক্সদের জন্য বড় আশীর্বাদ ছিল। এর ফলে তারা দীর্ঘ সময় ধরে শিকারি হিসেবে সক্রিয় থাকতে পারত এবং বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরণের প্রাণী শিকার করার সক্ষমতা অর্জন করত।” এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই টি-রেক্স তাদের সময়ের সবচেয়ে সফল ও শক্তিশালী মাংসাশী প্রাণীতে পরিণত হয়েছিল।

এই নতুন গবেষণাটি কয়েক মাস আগের একটি আলোচিত বৈজ্ঞানিক বিতর্ককে পুনরায় উস্কে দিয়েছে। ২০০৬ সালে মন্টানায় পাওয়া ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’-এর একটি জীবাশ্মকে এত দিন ২০ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু গত অক্টোবরে এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, সেটি টি-রেক্স নয় বরং ‘ন্যানোটাইর‍্যানাস’ নামের ভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর। ওই দাবির মূল ভিত্তি ছিল যে ২০ বছর বয়সেই টি-রেক্স পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায়।

তবে উডওয়ার্ডের বর্তমান গবেষণা বলছে, ২০ বছর বয়সেও টি-রেক্সের শারীরিক বিকাশ অসম্পূর্ণ থাকত। ফলে ওই বিতর্কিত জীবাশ্মটি আসলে টি-রেক্সের শিশু সংস্করণ কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণা কেবল টি-রেক্স নয়, সামগ্রিকভাবে ডাইনোসরদের জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস এবং বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিতে পারে।


পৃথিবী: প্রাণ, পানি আর রহস্যের গল্প

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ২১ ১৬:৫১:৫৬
পৃথিবী: প্রাণ, পানি আর রহস্যের গল্প
ছবি: সংগৃহীত

সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবী শুধু আরেকটি গ্রহ নয়; এ পর্যন্ত জানা মহাবিশ্বে এটি একমাত্র স্থান যেখানে জীবনের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত। সূর্য থেকে এর অবস্থান, উপযুক্ত তাপমাত্রা, তরল পানির উপস্থিতি, সুরক্ষামূলক বায়ুমণ্ডল এবং শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীকে অন্য সব পরিচিত গ্রহ থেকে আলাদা করেছে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে নীল, সাদা ও বাদামি রঙের এক জীবন্ত গোলক হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু এর এই সুন্দর বাহ্যিক রূপের আড়ালে আছে জটিল ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস।

সূর্য থেকে দূরত্বই জীবনধারণের প্রথম শর্ত

পৃথিবীর সূর্য থেকে গড় দূরত্ব প্রায় ১৪৯.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। এই দূরত্ব এমন এক অঞ্চলে পড়ে, যাকে প্রায়ই “habitable zone” বা জীবনোপযোগী অঞ্চল বলা হয়। এখানে তাপমাত্রা এমন যে পানি দীর্ঘ সময় ধরে তরল অবস্থায় থাকতে পারে। পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫.২৫ দিন, আর নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে লাগে প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। এই ঘূর্ণন ও পরিক্রমণের সমন্বয়ই দিন-রাত ও ঋতুচক্র সৃষ্টি করেছে।

পৃথিবীর অক্ষ প্রায় ২৩.৪৪ ডিগ্রি কাত হয়ে আছে। এই সামান্য হেলানই ঋতুর জন্ম দিয়েছে। বছরের এক অংশে উত্তর গোলার্ধ বেশি আলো ও তাপ পায়, অন্য অংশে দক্ষিণ গোলার্ধ। ফলে জলবায়ু একঘেয়ে থাকে না; বরং পরিবর্তনশীল থাকে, যা জীববৈচিত্র্যের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে।

পৃথিবী কেন নীল দেখায়

মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে সবচেয়ে বেশি নীল দেখায়, কারণ এর পৃষ্ঠের প্রায় ৭১ শতাংশই পানি দ্বারা আচ্ছাদিত। মহাসাগর, সাগর, উপসাগর ও অন্যান্য জলভাগ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে এক অনন্য চেহারা দিয়েছে। এই জলমণ্ডল শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, জীবনের ভিত্তিও বটে। পৃথিবীর মোট পানির প্রায় ৯৭ শতাংশ লবণাক্ত, যা মহাসাগরে রয়েছে। অবশিষ্ট অল্প অংশের বেশিরভাগই বরফ বা ভূগর্ভস্থ পানি; নদী, হ্রদ ও বায়ুমণ্ডলে থাকা পানির পরিমাণ খুবই কম হলেও জীবনচক্রে তার গুরুত্ব অপরিসীম।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল: জীবনের ঢাল

পৃথিবীর চারপাশে তুলনামূলক পাতলা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর একটি বায়ুমণ্ডল রয়েছে। এতে প্রায় ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন, ২১ শতাংশ অক্সিজেন এবং অল্প পরিমাণে আর্গন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস আছে। এই বায়ুমণ্ডল পৃথিবীকে বহু বিপদ থেকে রক্ষা করে। এটি ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় অংশ আটকে দেয়, মহাজাগতিক ছোট কণাকে পুড়িয়ে ফেলে, তাপমাত্রাকে একটি সহনীয় সীমায় ধরে রাখে এবং আবহাওয়া ও জলচক্র পরিচালনা করে।

বায়ুমণ্ডলটি আবার বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। ট্রপোস্ফিয়ারে আবহাওয়া তৈরি হয়, স্ট্রাটোস্ফিয়ারে ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আটকে দেয়, আর উপরের স্তরগুলোতে আয়নিত কণার উপস্থিতি অরোরা বা মেরুপ্রভা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই পুরো কাঠামো পৃথিবীর জীবমণ্ডলকে টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য।

অক্সিজেনভরা বায়ুমণ্ডল আসলে জীবনেরই সৃষ্টি

আজকের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে বিপুল পরিমাণ মুক্ত অক্সিজেন রয়েছে, তা আদিকাল থেকেই ছিল না। প্রাচীন পৃথিবীতে অক্সিজেন ছিল খুবই কম। পরে আলোকসংশ্লেষী জীব, বিশেষত সায়ানোব্যাকটেরিয়া, দীর্ঘ সময় ধরে অক্সিজেন উৎপাদন করতে করতে বায়ুমণ্ডলকে বদলে দেয়। অর্থাৎ পৃথিবীতে জীবন শুধু বায়ুমণ্ডলের ওপর নির্ভর করেনি, বরং বায়ুমণ্ডলকেও গঠন করেছে। অক্সিজেনের এই উত্থানই জটিল প্রাণীর বিকাশের পথ খুলে দেয়।

পৃথিবীর জলচক্র: এক অবিরাম পুনর্জন্ম

পৃথিবীর জীবনধারণে জলচক্রের ভূমিকা মৌলিক। সূর্যের তাপে মহাসাগরের পানি বাষ্পীভূত হয়, বায়ুমণ্ডলে উঠে মেঘ তৈরি করে, পরে বৃষ্টি বা তুষার হয়ে স্থলে পড়ে। এই পানি নদী হয়ে আবার সাগরে ফিরে যায়, কিছু অংশ মাটির নিচে সঞ্চিত হয়, কিছু অংশ উদ্ভিদ ব্যবহার করে এবং কিছু আবার বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। এই অবিরাম চক্র শুধু পানির পুনর্বণ্টনই করে না, বরং আবহাওয়া, মাটি গঠন, শিলার ক্ষয়, নদীর গতিপথ এবং কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

পৃথিবীর ভেতরে আছে স্তরবিন্যাসিত এক জগৎ

পৃথিবী বাইরে থেকে দৃঢ় গোলক মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ গঠন বহুস্তরবিশিষ্ট। সবচেয়ে বাইরে আছে ভূত্বক, এর নিচে ম্যান্টল, আর কেন্দ্রে কোর। মহাদেশীয় ভূত্বক তুলনামূলক পুরু এবং মূলত গ্রানাইটজাত শিলায় গঠিত, আর মহাসাগরীয় ভূত্বক পাতলা ও প্রধানত ব্যাসল্টিক।

ম্যান্টল পৃথিবীর আয়তনের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে। এটি কঠিন হলেও ভূতাত্ত্বিক দীর্ঘসময়ে ধীরে ধীরে প্রবাহমান পদার্থের মতো আচরণ করে। আরও গভীরে রয়েছে কোর, যার বাইরের অংশ তরল ধাতব এবং ভেতরের অংশ কঠিন। পৃথিবীর মোট লোহার বড় অংশ এই কোরে কেন্দ্রীভূত।

পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র: অদৃশ্য রক্ষাকবচ

পৃথিবীর তরল বাইরের কোরে বিদ্যুৎ পরিবাহী ধাতুর গতিশীলতা থেকে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই ক্ষেত্র মহাশূন্যে একটি বিশাল ম্যাগনেটোস্ফিয়ার সৃষ্টি করে, যা সূর্য থেকে আসা চার্জিত কণার বড় অংশকে প্রতিরোধ করে। যদি এই চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকত, তবে সৌরবায়ু ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলকে ক্ষয় করে দিতে পারত, যেমনটা সম্ভবত মঙ্গলে ঘটেছে।

এই চৌম্বক ক্ষেত্রই ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট তৈরি করেছে এবং মেরু অঞ্চলে মেরুপ্রভার মতো চমৎকার দৃশ্যের জন্ম দেয়। যদিও এই ক্ষেত্র স্থির নয়; পৃথিবীর ইতিহাসে বহুবার এর মেরুতা বদলেছে। অর্থাৎ উত্তর চৌম্বক মেরু দক্ষিণে, আর দক্ষিণ উত্তর দিকে সরে গেছে। এই উল্টোপাল্টা পরিবর্তন এখনো ভূ-চৌম্বক গবেষণার বড় বিষয়।

প্লেট টেকটোনিক্স: পৃথিবীর জীবন্ত ভূতত্ত্ব

পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর প্লেট টেকটোনিক্স। পৃথিবীর বহিরাবরণ একটানা নয়; এটি বড় বড় কঠিন প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো ধীরে ধীরে সরে যায়, কোথাও একে অন্যের থেকে দূরে সরে নতুন ভূত্বক তৈরি করে, কোথাও মুখোমুখি ধাক্কা খেয়ে পর্বতমালা তোলে, আবার কোথাও পাশাপাশি সরে গিয়ে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমুদ্রতল তৈরি ও ধ্বংস হয়, মহাদেশ সরে যায়, আগ্নেয়গিরি জন্ম নেয়, ভূমিকম্প হয় এবং দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর চেহারা বদলে যায়। হিমালয়, আন্দিজ, আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যমহাসাগরীয় রিজ, প্রশান্ত মহাসাগরের অগ্নিবলয় সবই এই প্লেট গতির ফল।

কেন শুধু পৃথিবীতেই পূর্ণাঙ্গ প্লেট টেকটোনিক্স

সৌরজগতের শিলা গ্রহগুলোর মধ্যে পৃথিবীতেই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক প্লেট টেকটোনিক্স সবচেয়ে সক্রিয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে পৃথিবীর আকার, অভ্যন্তরীণ তাপ, এবং বিশেষ করে পানির উপস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছে। পানি শিলাকে তুলনামূলক নরম করে এবং ভূত্বককে সাবডাকশনে সহায়তা করে। শুক্রের মতো গ্রহে পানি হারিয়ে যাওয়ায় সেই ধরনের সক্রিয় প্লেট প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি।

পৃথিবীর জন্ম: তারকা ধূলি থেকে প্রাণের গ্রহ

পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪.৫৬ বিলিয়ন বছর আগে, যখন সৌরজগত গঠনের সময় সূর্যকে ঘিরে থাকা গ্যাস-ধূলির চাকতি থেকে ধীরে ধীরে কঠিন পদার্থ জমাট বেঁধে বড় হতে থাকে। ছোট কণা থেকে বড় পাথুরে টুকরা, সেখান থেকে গ্রহাণু-আকারের বস্তু, এবং শেষে সংঘর্ষ ও সংযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর মতো গ্রহ তৈরি হয়।

শুরুর পৃথিবী ছিল অনেক বেশি উত্তপ্ত। গ্রহ গঠনের সময় সংঘর্ষ, রেডিওঅ্যাকটিভ ক্ষয় এবং ভেতরের ধাতব পদার্থ নিচে ডুবে গিয়ে কোর গঠন করার ফলে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয়। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে মঙ্গলের আকারের একটি বস্তু পৃথিবীতে আঘাত করে, আর সেই সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষ থেকেই চাঁদের জন্ম হয়।

পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্ক

চাঁদ শুধু রাতের সৌন্দর্য নয়; পৃথিবীর ইতিহাসে তার ভূমিকা অসাধারণ। চাঁদের মহাকর্ষ সমুদ্রজোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করে, পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীরে ধীরে কমায়, আর অক্ষের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর ঘূর্ণন আজ ২৪ ঘণ্টার কাছাকাছি হলেও প্রাচীন পৃথিবীতে দিন আরও ছোট ছিল। জোয়ার-ভাটার প্রভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন দীর্ঘ হয়েছে, আর চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

প্রাচীন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, পানি ও ভূত্বকের উত্থান

প্রথম দিকে পৃথিবীতে এখনকার মতো বায়ুমণ্ডল ছিল না। আগ্নেয়গিরির গ্যাস নির্গমন এবং অভ্যন্তরীণ পদার্থের বহিঃপ্রবাহের মাধ্যমে প্রাথমিক বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়। পানিও খুব প্রাচীনকালেই পৃথিবীতে উপস্থিত ছিল বলে ধারণা পাওয়া যায়। ৪.৩ বিলিয়ন বছরেরও আগে তরল পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে কিছু প্রাচীন জিরকন কণার বিশ্লেষণ থেকে। এর মানে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে পানি ধারণের সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

পৃথিবী কেন এখনো বাসযোগ্য

পৃথিবীর বাসযোগ্যতার পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং বহু প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম ভারসাম্য কাজ করছে। সঠিক দূরত্ব, তরল পানি, কার্বনচক্র, প্লেট টেকটোনিক্স, উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল, চৌম্বক ক্ষেত্র, মাঝারি মহাকর্ষ, এবং জীবমণ্ডলের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া মিলেই এই বাসযোগ্যতা বজায় রেখেছে। একদিকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি গ্রিনহাউস প্রভাব তৈরি করে তাপ ধরে রাখে, অন্যদিকে সমুদ্র, শিলা, জীব ও বায়ুমণ্ডল একসঙ্গে কাজ করে জলবায়ুকে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত হতে দেয় না।

পৃথিবীর জলবায়ু স্থির নয়

যদিও পৃথিবী জীবনোপযোগী, এর জলবায়ু কখনোই পুরোপুরি স্থির ছিল না। অতীতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, গ্রহাণুর আঘাত, কক্ষপথের পরিবর্তন, অক্ষের দোলন, বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাসের ওঠানামা—সব মিলিয়ে কখনো বরফযুগ, কখনো উষ্ণ যুগ এসেছে। বর্তমানে মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও বনধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার চরমতা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ছে।

পৃথিবীর ভবিষ্যৎও চিরস্থায়ী নয়

পৃথিবী আজ বাসযোগ্য হলেও এটি চিরকাল এমন থাকবে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দূর ভবিষ্যতে সূর্যের উজ্জ্বলতা বাড়তে থাকলে পৃথিবীর জলবায়ু আরও উষ্ণ হতে পারে। কোটি কোটি বছরের স্কেলে এই পরিবর্তন এতটাই গভীর হতে পারে যে তরল পানি টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। অর্থাৎ পৃথিবীর বর্তমান বাসযোগ্য অবস্থা মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে এক বিশেষ জানালা, যা চিরন্তন নয়।

কেন পৃথিবী অধ্যয়ন এত গুরুত্বপূর্ণ

পৃথিবীকে বোঝা মানে শুধু নিজের গ্রহকে জানা নয়; বরং পুরো গ্রহবিজ্ঞান, জলবায়ুবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিবর্তনকে বোঝা। পৃথিবীর গঠন, বায়ুমণ্ডল, চৌম্বক ক্ষেত্র, পানি, জীবমণ্ডল ও প্লেট টেকটোনিক্স আমাদের দেখায় কীভাবে একটি গ্রহ গতিশীল, বিবর্তনশীল এবং প্রাণবান হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আমাদের সতর্কও করে যে, এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হলে পরিবেশ কত দ্রুত বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, পৃথিবী শুধু আমাদের বাসস্থান নয়; এটি মহাবিশ্বে জটিলতা, বিবর্তন এবং জীবনের এক বিরল উদাহরণ। এর ভেতরে আছে উত্তপ্ত ধাতব কেন্দ্র, ওপরের দিকে আছে চলমান শিলাস্তর, চারপাশে আছে সুরক্ষাকারী বায়ুমণ্ডল, আর পৃষ্ঠে আছে পানি, বন, মরুভূমি, বরফ, পর্বত ও জীবনের অসংখ্য রূপ। এই সবকিছুর মিলিত রূপই পৃথিবীকে করেছে আমাদের জানা মহাবিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান গ্রহ।

সূত্র: ব্রিটানিকা


এক ক্লিকেই ভ্যানিশ হবে শর্টস ফিড: ইউটিউবের ধামাকা আপডেট!

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১৮ ১২:২৮:০৯
এক ক্লিকেই ভ্যানিশ হবে শর্টস ফিড: ইউটিউবের ধামাকা আপডেট!
ছবি : সংগৃহীত

ইউটিউব প্রেমীদের জন্য এক বড় সুখবর! দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ইউটিউব তাদের প্ল্যাটফর্মে এমন একটি ফিচার যুক্ত করেছে, যার মাধ্যমে আপনি চাইলে আপনার ফিড থেকে শর্ট-ভিডিও বা 'শর্টস' (Shorts) পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারবেন। নতুন এই আপডেটে 'শর্টস ফিড লিমিট' (Shorts Feed Limit) সরাসরি ০ মিনিটে সেট করার সুবিধা চালু হয়েছে। এর ফলে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করার সময় অযথা শর্টস স্ক্রল করে সময় নষ্ট হওয়ার ভয় আর থাকবে না।

প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট এনগ্যাজেট-এর তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবরে এই ফিচারটি সীমিত পরিসরে চালু করা হলেও তখন সর্বনিম্ন সময়সীমা ছিল ১৫ মিনিট। অর্থাৎ ১৫ মিনিট দেখার পর ব্যবহারকারীকে বিরতি নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিত ইউটিউব। কিন্তু এবার ব্যবহারকারীদের ফিডব্যাক মাথায় রেখে ইউটিউব সরাসরি '০ মিনিট' অপশনটি যুক্ত করেছে। শুরুতে এটি শুধুমাত্র 'প্যারেন্টাল কন্ট্রোল' বা অভিভাবকদের জন্য থাকলেও, এখন এটি বিশ্বের সকল সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

তবে ইউটিউব একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে, এই সেটিংস অন করলে আপনার শর্টস ফিডে অটোমেটিক স্ক্রলিং বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সার্চ রেজাল্ট বা নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্কে ক্লিক করলে ব্যক্তি বিশেষে কিছু শর্টস স্ক্রিনে দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অ্যাপে ‘স্ক্রোলিং ইজ পজড’ (Scrolling is paused) লেখা একটি নোটিফিকেশন দেখতে পাবেন।

যেভাবে বন্ধ করবেন ইউটিউব শর্টস

আপনার সময় বাঁচাতে এবং শর্টস থেকে দূরে থাকতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন

১. আপনার মোবাইলের YouTube অ্যাপটি ওপেন করুন।

২. Settings (সেটিংস) অপশনে যান।

৩. সেখান থেকে Time Management (টাইম ম্যানেজমেন্ট) সিলেক্ট করুন।

৪. এবার Daily Limit থেকে Shorts Feed Limit অপশনে ক্লিক করুন।

৫. এখানে ড্রপডাউন মেনু থেকে ০ মিনিট (0 Minutes) সিলেক্ট করে দিন।

এ ছাড়াও আপনি চাইলে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা পর্যন্ত আপনার প্রতিদিনের শর্টস দেখার সময়সীমা নিজের পছন্দমতো নির্ধারণ করে নিতে পারবেন।

সূত্র: এনগ্যাজেট


শুক্র গ্রহ: সৌরজগতের সবচেয়ে রহস্যময় উজ্জ্বল গ্রহ

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১৮ ১২:১৪:৩৫
শুক্র গ্রহ: সৌরজগতের সবচেয়ে রহস্যময় উজ্জ্বল গ্রহ
ছবি: সংগৃহীত

সৌরজগতের দ্বিতীয় গ্রহ শুক্র বহু শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র। আকাশে সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্যাস্তের পরে যখন এটি দেখা দেয়, তখন অন্য সব গ্রহের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল বলে সহজেই নজর কাড়ে। এতটাই দীপ্তিমান যে প্রাচীন সভ্যতাগুলো এটিকে কখনও সকালের তারা, কখনও সন্ধ্যার তারা হিসেবে আলাদা নামেও চিনত। ব্যাবিলনীয়রা একে দেবী ইশতারের সঙ্গে মিলিয়েছিল, গ্রিকরা সকালের আকাশে দেখলে এক নাম, সন্ধ্যার আকাশে দেখলে আরেক নাম ব্যবহার করত। পরে রোমান প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসের নাম থেকেই এর আধুনিক নামের প্রচলন হয়।

শুক্রকে দীর্ঘদিন “পৃথিবীর যমজ” বলা হয়েছে। কারণ আকার, ভর, ঘনত্ব এবং অভ্যন্তরীণ গঠনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সঙ্গে খুবই মিল রাখে। কিন্তু আধুনিক মহাকাশযান, রাডার পর্যবেক্ষণ এবং বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, বাহ্যিক মিল থাকলেও বাস্তবে শুক্র পৃথিবীর সম্পূর্ণ বিপরীত এক জগৎ। এটি অস্বাভাবিক গরম, অত্যন্ত চাপপূর্ণ, শুষ্ক, বিষাক্ত এবং বসবাসের জন্য প্রায় অকল্পনীয় রকম প্রতিকূল।

কেন শুক্রকে এত উজ্জ্বল দেখা যায়

শুক্র পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের কাছে, তাই এটি সবসময় সূর্যের কাছাকাছি আকাশেই অবস্থান করে। এর মানে, গভীর রাতের আকাশে শুক্রকে দেখা যায় না। শুধু ভোরের আগে বা সন্ধ্যার কিছু পর এটি দেখা যায়। কিন্তু সে সময় এটিই হয়ে ওঠে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ। এর কারণ শুধু সূর্যের কাছাকাছি হওয়া নয়, বরং এর ঘন মেঘস্তর সূর্যের আলোয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রতিফলিত করে। ফলে শুক্র দূর থেকে যেন হলুদাভ সাদা এক দীপ্তিমান মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে।

আকারে পৃথিবীর কাছাকাছি, কিন্তু পরিবেশে ভয়ংকর

শুক্রের গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,০৫১.৮ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর প্রায় ৯৫ শতাংশ। এর ভর পৃথিবীর প্রায় ৮১.৫ শতাংশ। ঘনত্বও পৃথিবীর কাছাকাছি। এ কারণে বহু বিজ্ঞানী মনে করেন, শুক্র ও পৃথিবী সম্ভবত একই ধরনের শিলা ও ধাতব উপাদান থেকে গঠিত হয়েছিল। পৃষ্ঠীয় মহাকর্ষও পৃথিবীর কাছাকাছি, অর্থাৎ কোনো মানুষ যদি শুক্রের মাটিতে দাঁড়াতে পারত, তবে সে পৃথিবীর ওজনের প্রায় ৯০ শতাংশের মতো ওজন অনুভব করত।

কিন্তু এই সাদৃশ্য এখানেই শেষ। শুক্রের বায়ুমণ্ডল মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইডে ভরা, যার পরিমাণ ৯৬ শতাংশেরও বেশি। সঙ্গে আছে নাইট্রোজেন, সালফার ডাই-অক্সাইড, অল্প জলীয়বাষ্প এবং আরও কিছু গ্যাসের চিহ্ন। পৃষ্ঠে বায়ুচাপ পৃথিবীর প্রায় ৯৫ গুণ। অর্থাৎ পৃথিবীর সমুদ্রের প্রায় ১ কিলোমিটার গভীরে যে চাপ পাওয়া যায়, শুক্রের পৃষ্ঠে সেই ধরনের চাপ স্বাভাবিক।

শুক্রে তাপমাত্রা এত বেশি কেন

শুক্রের গড় পৃষ্ঠতল তাপমাত্রা প্রায় ৭৩৭ কেলভিন, অর্থাৎ প্রায় ৪৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি এতটাই বেশি যে সীসা বা দস্তার মতো ধাতুও সেখানে গলে যেতে পারে। মজার বিষয় হলো, শুক্র সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ নয়, তবু সৌরজগতের সবচেয়ে গরম গ্রহ। এর কারণ হলো ভয়াবহ গ্রিনহাউস প্রভাব।

শুক্রের ঘন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল এবং পুরু মেঘস্তর সূর্যের আলোকে ভেতরে ঢুকতে দিলেও তাপকে সহজে বাইরে বের হতে দেয় না। ফলে তাপ আটকে থেকে নিচের বায়ুমণ্ডল ও পৃষ্ঠকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করে। পৃথিবীতে গ্রিনহাউস গ্যাস জলবায়ুকে প্রভাবিত করে, কিন্তু শুক্রে এই প্রক্রিয়া এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুক্রের অধ্যয়ন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও বড় শিক্ষা দিতে পারে।

মেঘ আছে, কিন্তু সেগুলো জীবনের নয়, অ্যাসিডের

শুক্রকে টেলিস্কোপে দেখলে মসৃণ, উজ্জ্বল ও প্রায় বৈশিষ্ট্যহীন মনে হয়। কারণ এর পুরো গ্রহটি পুরু মেঘে ঢাকা। এই মেঘ সাধারণ জলকণার নয়, বরং বেশিরভাগই ঘন সালফিউরিক অ্যাসিডের ক্ষুদ্র কণায় গঠিত। মেঘস্তর প্রায় ৪৮ কিলোমিটার থেকে ৬৮ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। আরও ওপরে ও নিচেও আছে কুয়াশার স্তর।

এই মেঘগুলো স্থির নয়। অতিবেগুনি আলোতে এগুলোতে গাঢ় দাগ, সর্পিল নকশা এবং বিশাল ভি-আকৃতির ব্যান্ড দেখা যায়। শুক্রের মেঘস্তর মাত্র চার দিনে পুরো গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে ফেলে, যদিও গ্রহটির নিজস্ব ঘূর্ণন অত্যন্ত ধীর। এ ঘটনাকে বলা হয় “সুপাররোটেশন”, যা এখনো গ্রহবিজ্ঞানের বড় রহস্যগুলোর একটি।

শুক্রে দিন আর বছর, দুটোই অদ্ভুত

শুক্রের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ঘূর্ণন। অধিকাংশ গ্রহ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে, কিন্তু শুক্র ঘোরে উল্টো দিকে। অর্থাৎ যদি কেউ শুক্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে সূর্য দেখতে পারত, তবে সে সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উঠতে এবং পূর্ব দিকে অস্ত যেতে দেখত।

আরও অদ্ভুত হলো, শুক্র নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘুরতে সময় নেয় প্রায় ২৪৩ পৃথিবী দিন, কিন্তু সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ২২৪.৭ পৃথিবী দিন। অর্থাৎ শুক্রে একটি নাক্ষত্রিক দিন তার এক বছরের চেয়েও বড়। তবে সৌরদিনের হিসাবে সূর্যোদয় থেকে পরের সূর্যোদয় পর্যন্ত সময় হয় প্রায় ১১৬.৮ পৃথিবী দিন।

বুধের মতো নয়, শুক্রে ঋতুও প্রায় নেই

শুক্রের অক্ষ ঝুঁকে আছে খুব সামান্য, প্রায় ৩ ডিগ্রি। ফলে পৃথিবীর মতো উল্লেখযোগ্য ঋতু পরিবর্তন সেখানে ঘটে না। অর্থাৎ গ্রীষ্ম, শীত, বসন্ত বা শরৎের মতো মৌসুমি রূপান্তর শুক্রে প্রায় অনুপস্থিত।

শুক্রে কোনো চাঁদ নেই

শুক্রের কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। পৃথিবীর মতো বড় চাঁদও নেই, আবার মঙ্গলের মতো ছোট উপগ্রহও নেই। সৌরজগতের বড় গ্রহগুলোর মধ্যে শুক্র ও বুধই একমাত্র যাদের কোনো পরিচিত চাঁদ নেই।

শুক্রের পৃষ্ঠতল: আগ্নেয়গিরি, সমভূমি ও বিকৃত ভূখণ্ড

শুক্রের পৃষ্ঠ দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে ছিল, কারণ ঘন মেঘস্তর দৃশ্যমান আলোকে বাধা দেয়। পরে রাডার মানচিত্রায়ন, বিশেষ করে ম্যাগেলান মহাকাশযানের তথ্য থেকে বোঝা যায়, এর পৃষ্ঠ অনেকাংশে আগ্নেয়গিরির লাভায় গঠিত বিশাল সমতলভূমি দিয়ে ঢাকা। কোথাও কোথাও আছে বিশাল উচ্চভূমি, পর্বতশ্রেণি, রিফট, করোনা, টেসেরা এবং ঢালু আগ্নেয়গিরি।

উত্তর গোলার্ধে ইশতার টেরা এবং নিরক্ষরেখার কাছে আফ্রোদিতি টেরা নামে মহাদেশ-আকৃতির দুই বিশাল উচ্চভূমি রয়েছে। ইশতার টেরার মধ্যে লাক্ষ্মী প্ল্যানাম নামে একটি উচ্চ মালভূমি আছে, যাকে কেউ কেউ পৃথিবীর তিব্বত মালভূমির সঙ্গে তুলনা করেন। এর পূর্ব পাশে রয়েছে ম্যাক্সওয়েল মন্টেস, যা শুক্রের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশ্রেণি।

শুক্রের বহু স্থানে আগ্নেয়গিরির প্রমাণও স্পষ্ট। ঢালু আগ্নেয়গিরি, লাভার দীর্ঘ সর্পিল খাল, ক্যালডেরা, ‘প্যানকেক ডোম’ নামে অদ্ভুত গোলাকার আগ্নেয়গঠন সবই সেখানে পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুক্র অতীতে ব্যাপক আগ্নেয় ক্রিয়ায় সক্রিয় ছিল, এবং সম্ভবত এখনও কোথাও কোথাও আগ্নেয়গিরি সক্রিয় রয়েছে।

সক্রিয় আগ্নেয়গিরির ইঙ্গিতও মিলেছে

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Venus Express মিশন এবং পরবর্তী গবেষণায় শুক্রে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। বায়ুমণ্ডলে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের হঠাৎ বৃদ্ধি, কিছু অঞ্চলে তাপীয় পরিবর্তন এবং ১৯৯১ সালের রাডার চিত্র তুলনা করে ২০২৩ সালে শনাক্ত কিছু পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে যে, শুক্র এখনও ভূতাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি মৃত নয়।

শুক্রে টেকটোনিক ক্রিয়া আছে, কিন্তু পৃথিবীর মতো প্লেট টেকটোনিক্স নেই

পৃথিবীর ভূত্বকে প্লেট টেকটোনিক্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুক্রে এখনো সেই ধরনের প্লেট টেকটোনিক্সের স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। সেখানে ভূমির বিকৃতি, রিফট, পর্বতবেল্ট, করোনা এবং টেসেরা থাকলেও সেগুলো প্রধানত উল্লম্বভাবে ম্যান্টলের ওঠানামা, উত্তোলন ও নিমজ্জনের প্রভাব বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুক্রের উচ্চ তাপমাত্রা তার লিথোস্ফিয়ারকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, পৃথিবীর মতো সাবডাকশন প্রক্রিয়া সহজে গড়ে ওঠেনি।

তবে শুক্রের পৃষ্ঠে গহ্বরের বণ্টন দেখে অনেকে ধারণা করেন, তুলনামূলক অল্প সময় আগে পুরো গ্রহ জুড়ে বড় ধরনের “resurfacing” বা নতুন করে পৃষ্ঠ গঠন হয়েছে। অর্থাৎ অনেক পুরোনো ভূখণ্ড একসময় লাভা ও ভূতাত্ত্বিক ক্রিয়ায় ঢাকা পড়ে নতুন চেহারা পেয়েছে।

শুক্রে উল্কাপাতের চিহ্নও আছে, কিন্তু ছোট গর্ত নেই কেন

শুক্রের পৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে তৈরি বহু গহ্বর আছে। কিন্তু ছোট আকারের গহ্বর প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ শুক্রের অত্যন্ত ঘন বায়ুমণ্ডল ছোট উল্কাখণ্ডকে পৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই ভেঙে ফেলে বা পুড়িয়ে দেয়। ফলে কেবল তুলনামূলক বড় উল্কাপিণ্ডই মাটিতে আঘাত করতে পারে। এ কারণে শুক্রের ছোট ক্রেটারের সংখ্যা খুব কম।

শুক্রে চৌম্বক ক্ষেত্র নেই বললেই চলে

পৃথিবীর মতো শুক্রের নিজস্ব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র নেই। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কয়েকটি সম্ভাবনার কথা বলেন: খুব ধীর ঘূর্ণন, কোরে যথেষ্ট গতিশীল তরল প্রবাহের অনুপস্থিতি, অথবা কোরের ভিন্ন অবস্থা। ফলে সূর্যবায়ুর সঙ্গে শুক্রের বায়ুমণ্ডলের সরাসরি মিথস্ক্রিয়া বেশি হয়।

এই মিথস্ক্রিয়ার কারণে শুক্র ধীরে ধীরে তার উপরের বায়ুমণ্ডল থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন হারিয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, শুক্রে একসময় বেশি পানি থাকতে পারে, কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি বায়ুমণ্ডল ক্ষয়ের প্রক্রিয়ায় তা হারিয়ে গেছে।

শুক্রে কি একসময় পানি ছিল

শুক্র বর্তমানে শুষ্ক, দহনজ্বলা, জলহীন এক গ্রহ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সবসময় কি এমনই ছিল? কিছু বৈজ্ঞানিক মডেল ইঙ্গিত দেয় যে, অতীতে শুক্রে তরল পানি থাকতে পারে। যদি তা সত্যি হয়, তবে পরবর্তীতে অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস প্রভাব, বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন এবং সৌরবায়ুর কারণে সেই পানি উবে গিয়ে মহাকাশে হারিয়ে গেছে। এ প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর এখনও মেলেনি, তবে এটাই শুক্র গবেষণার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।

শুক্র গবেষণায় মহাকাশযানের দীর্ঘ ইতিহাস

শুক্র ছিল অন্য কোনো গ্রহের মধ্যে প্রথম যাকে কাছ থেকে মহাকাশযান পর্যবেক্ষণ করে। ১৯৬২ সালে Mariner 2 প্রথম সফলভাবে শুক্রের পাশ দিয়ে উড়ে তথ্য পাঠায়। পরে Mariner 5, Mariner 10, Pioneer Venus, সোভিয়েত Venera মিশন, Vega মিশন, Galileo, Magellan, Cassini, Venus Express এবং Akatsuki শুক্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়িয়েছে।

বিশেষভাবে সোভিয়েত Venera মিশনগুলো প্রথম শুক্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে ছবি পাঠায়। ১৯৮২ সালে Venera 13 যে রঙিন ছবি পাঠিয়েছিল, তাতে দেখা যায় পাথুরে, সমতল, হলুদ-কমলা আলোয় ভরা এক ভিন্ন জগৎ। অন্যদিকে Magellan মিশন পুরো গ্রহের প্রায় ৯৮ শতাংশ পৃষ্ঠ উচ্চ রেজোলিউশনে রাডারে মানচিত্রায়ন করে শুক্র গবেষণায় বিপ্লব ঘটায়।

সামনে আসছে নতুন মিশন

শুক্র নিয়ে আগ্রহ আবারও দ্রুত বাড়ছে। আগামী দশকগুলোতে একাধিক নতুন মিশন পরিকল্পিত। ভারতের শুক্রযান, নাসার DAVINCI ও VERITAS, ইউরোপের EnVision মিশন, এমনকি ভবিষ্যতে শুক্রের ওপরের বায়ুমণ্ডলে মানুষের জন্য এয়ারশিপ-ভিত্তিক অনুসন্ধান ধারণাও আলোচনা হচ্ছে। কারণ, প্রায় ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় শুক্রের বায়ুমণ্ডলে চাপ ও তাপমাত্রা পৃথিবীর কাছাকাছি, যা গবেষণার জন্য আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।

কেন শুক্র গবেষণা এত গুরুত্বপূর্ণ

শুক্রকে শুধু একটি গ্রহ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ, জলবায়ু বিপর্যয় এবং গ্রহের বিবর্তন বোঝার এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। একই ধরনের আকার ও উপাদান থেকে গঠিত দুটি গ্রহ কীভাবে এত ভিন্ন পথে গেল, সেই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের গভীরভাবে ভাবায়। পৃথিবী যদি কখনও অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস প্রভাবের দিকে এগোয়, তবে শুক্র তার ভয়াবহ উদাহরণ।

সব মিলিয়ে শুক্র একদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের তুলনামূলক বড় গ্রহ, অন্যদিকে সবচেয়ে প্রতিকূল এবং রহস্যময় শিলা গ্রহগুলোর একটি। এর উজ্জ্বল মুখচ্ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে আগুনঝরা পৃষ্ঠ, অ্যাসিডের মেঘ, দমবন্ধ করা চাপ, ধীর উল্টো ঘূর্ণন এবং এক হারিয়ে যাওয়া সম্ভাব্য অতীতের গল্প। তাই শুক্রকে যত বেশি জানা যাবে, ততই বোঝা যাবে শুধু আরেকটি গ্রহ নয়, বরং আমাদের নিজের পৃথিবীকেও।

সূত্র: ব্রিটানিকা


বুধ গ্রহ: ছোট হলেও বিস্ময়ে ভরা এক জগৎ

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১৭ ১৮:২৫:৪৩
বুধ গ্রহ: ছোট হলেও বিস্ময়ে ভরা এক জগৎ
ছবি: সংগৃহীত

সৌরজগতের সবচেয়ে ভেতরের গ্রহ বুধকে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এক রহস্যময় জগত হিসেবে দেখেছেন। সূর্যের এত কাছাকাছি অবস্থান, আকারে তুলনামূলক ছোট হওয়া এবং আকাশে খুব অল্প সময়ের জন্য দৃশ্যমান থাকার কারণে এই গ্রহকে খালি চোখে দেখা সবসময়ই কঠিন ছিল। সূর্যোদয়ের ঠিক আগে বা সূর্যাস্তের পর স্বল্প সময়ের জন্য এটি দেখা গেলেও পূর্ণ অন্ধকার আকাশে বুধ কখনও স্পষ্টভাবে ধরা দেয় না। এ কারণেই হাজার হাজার বছর ধরে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও বুধ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান দীর্ঘকাল অসম্পূর্ণ ছিল।

ইতিহাস বলছে, সুমেরীয় সভ্যতার সময়েও বুধকে মানুষ চিনত। প্রাচীন গ্রিকরা ভোরের আকাশে দেখা গেলে একে ‘অ্যাপোলো’ আর সন্ধ্যায় দেখা গেলে ‘হার্মিস’ বলত। পরে রোমানদের দেবদূত ‘মারকারি’-এর নামেই এর আধুনিক নাম হয় ‘Mercury’। আকাশে অন্য গ্রহগুলোর তুলনায় দ্রুত সরে যেতে দেখা যেত বলেই সম্ভবত এই নামকরণ। এমনকি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথিকৃৎ নিকোলাস কোপার্নিকাসও জীবদ্দশায় বুধকে নিজের চোখে দেখতে না পারার আফসোস করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে।

আকারে ছোট, কিন্তু বৈশিষ্ট্যে চরম

বুধের গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ২,৪৩৯.৭ কিলোমিটার। এটি সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম প্রধান গ্রহ, এমনকি বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কিছু উপগ্রহের চেয়েও ছোট। কিন্তু ছোট হলেও বুধের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। এর বিশাল লৌহসমৃদ্ধ কেন্দ্র বা কোর গ্রহটির মোট আয়তনের বড় অংশ দখল করে আছে। এই কোরই বুধকে অস্বাভাবিকভাবে ঘন করেছে। পৃথিবীর চেয়েও কম ভর নিয়ে এত বেশি ঘনত্বের গ্রহ হওয়া বুধকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

বুধের মোট ভরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রয়েছে এর ধাতব কোরে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর বাইরের পাথুরে আবরণ তুলনামূলকভাবে খুব পাতলা। ফলে বুধকে প্রায় একটি বিশাল লোহার গোলক বললেও ভুল হবে না, যার ওপর কেবল অল্প একটি পাথুরে স্তর রয়েছে।

সূর্যের খুব কাছে বলেই সবচেয়ে অদ্ভুত

বুধের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে লাগে মাত্র ৮৭.৯৭ পৃথিবী দিন। অর্থাৎ সৌরজগতের সব গ্রহের মধ্যে এর বছর সবচেয়ে ছোট। কিন্তু মজার বিষয় হলো, নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘুরতে বুধের লাগে প্রায় ৫৮.৬ পৃথিবী দিন। এর মানে, বুধে একটি দিন এবং একটি বছরের সম্পর্ক পৃথিবীর মতো নয়। বুধের একটি সৌরদিন প্রায় ১৭৫.৯ পৃথিবী দিনের সমান। সহজভাবে বললে, বুধে সূর্যোদয় থেকে পরের সূর্যোদয় পর্যন্ত সময় পৃথিবীর প্রায় ছয় মাসের সমান।

এর কক্ষপথও অত্যন্ত উপবৃত্তাকার বা দীর্ঘবৃত্তাকার। ফলে কখনও এটি সূর্যের খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনও তুলনামূলক দূরে সরে যায়। সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকলে বুধের আকাশে সূর্য অনেক বড় ও উজ্জ্বল দেখায়। কিছু অবস্থানে এমনও দেখা যায় যে, বুধের আকাশে সূর্য যেন সাময়িকভাবে দিক পাল্টে ফিরে যাচ্ছে। এই বিরল দৃশ্য সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহে এভাবে দেখা যায় না।

বুধের তাপমাত্রা: দিনে অগ্নিকুণ্ড, রাতে বরফশীতল

বুধের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো এর চরম তাপমাত্রা পার্থক্য। দিনের বেলায় সূর্যের তীব্র তাপে পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৭০০ কেলভিন বা ৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। আবার দীর্ঘ রাতের শেষে তা নেমে যেতে পারে প্রায় ৯০ কেলভিন বা মাইনাস ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। অর্থাৎ একই গ্রহে এমন তাপমাত্রা ওঠানামা হয়, যা সৌরজগতের ভেতরের শিলা গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চরম।

এই বিশাল তাপমাত্রা পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো, বুধের কোনো ঘন বায়ুমণ্ডল নেই যা তাপ ধরে রাখতে পারে। ফলে দিনের তাপ দ্রুত মহাশূন্যে হারিয়ে যায় এবং রাত হয়ে ওঠে ভয়ংকর ঠান্ডা।

বায়ুমণ্ডল নেই, তবু একেবারেই শূন্য নয়

বুধের ঘন বায়ুমণ্ডল নেই, তবে একেবারে কিছুই নেই এমন নয়। এর চারপাশে অত্যন্ত পাতলা একধরনের গ্যাসীয় আবরণ রয়েছে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘এক্সোস্ফিয়ার’ বলেন। এতে হিলিয়াম, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ কিছু পরমাণু পাওয়া গেছে। এগুলোর বেশিরভাগই আসে সৌর বায়ুর প্রভাব, উল্কাপিণ্ডের আঘাত অথবা পৃষ্ঠ থেকে কণিকা ছিটকে উঠে যাওয়ার ফলে।

বিশেষভাবে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি কাড়ে, কারণ এগুলো দূরবীন থেকেও ধরা যায়। এই পাতলা গ্যাসস্তর বুধের চারপাশে অনেকটা ধূমকেতুর লেজের মতো আচরণ করে।

সূর্যের এত কাছে, তবু বুধে আছে বরফ

শোনার পর অবিশ্বাস্য মনে হলেও বুধের মেরু অঞ্চলের কিছু গভীর গহ্বরে জলীয় বরফের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যেসব গহ্বরের তলদেশে কখনও সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে কোটি কোটি বছর ধরে বরফ জমে থাকতে পারে। মহাকাশযান Messenger নিশ্চিত করেছে যে, এসব অন্ধকার গহ্বরে বরফের স্তর আছে এবং তার ওপর কালচে জৈব পদার্থের মতো একটি আবরণও রয়েছে। এই আবরণ বরফকে দ্রুত উবে যাওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা করে।

এই আবিষ্কার বুধ সম্পর্কে মানুষের ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। একসময় ভাবা হতো সূর্যের এত কাছে কোনো গ্রহে বরফ থাকা অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সঠিক ভূপ্রকৃতি থাকলে চরম উষ্ণ জগতেও স্থায়ী ছায়া বরফকে ধরে রাখতে পারে।

বুধের চৌম্বক ক্ষেত্র: ছোট গ্রহ, বড় বিস্ময়

বুধের আরেকটি বড় বিস্ময় হলো এর নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র। এই চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর তুলনায় অনেক দুর্বল হলেও এটি বাস্তব এবং সক্রিয়। এত ছোট ও ধীরগতিতে ঘূর্ণনশীল একটি গ্রহে এমন চৌম্বক ক্ষেত্র থাকবে, বিজ্ঞানীরা আগে তা খুব বেশি আশা করেননি। ধারণা করা হয়, বুধের তরল বাইরের কোরে বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থের চলাচলের কারণেই এই ক্ষেত্র তৈরি হয়।

Messenger মহাকাশযানের তথ্য দেখিয়েছে, বুধের চৌম্বক ক্ষেত্র মোটামুটি দ্বিমেরু প্রকৃতির, অর্থাৎ পৃথিবীর ক্ষেত্রের মতোই একটি উত্তর ও দক্ষিণ মেরু ধরনের গঠন আছে। এর ফলে সূর্য থেকে আসা চার্জিত কণার সঙ্গে বুধের এক ধরনের ক্ষুদ্র ম্যাগনেটোস্ফিয়ার তৈরি হয়।

পৃষ্ঠতল দেখতে চাঁদের মতো, কিন্তু ভেতরে আলাদা গল্প

প্রথম দেখায় বুধের পৃষ্ঠতল অনেকটা চাঁদের মতো মনে হয়। অসংখ্য গহ্বর, আঘাতের চিহ্ন, ফাটল আর সমতল অঞ্চল নিয়ে এর চেহারা রুক্ষ ও ক্ষতবিক্ষত। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এটি কেবল চাঁদের অনুকরণ নয়। বুধের পৃষ্ঠে বিশাল ভাঁজ, খাড়া ঢালু দাগ এবং লম্বা ‘lobate scarps’ রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে গ্রহটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভেতরের অংশ ঠান্ডা হয়ে ছোট হতে থাকায় বাইরের ভূত্বকে ভাঁজ পড়ে এই দাগগুলো তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই প্রক্রিয়ায় বুধের ব্যাস কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত কমে গেছে। অর্থাৎ বুধ এখনও ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হচ্ছে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Caloris Basin: বুধের দানবীয় আঘাতচিহ্ন

বুধের সবচেয়ে বিখ্যাত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হলো Caloris Basin, যা একটি বিশাল আঘাতজনিত অববাহিকা। এর ব্যাস প্রায় ১,৫৫০ কিলোমিটার। একে ঘিরে আছে পাহাড়ি বলয়, ভাঙা-চোরা ভূমি, রেডিয়াল ফাটল এবং তুলনামূলক মসৃণ সমভূমি। ধারণা করা হয়, সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাসে এক বিশাল উল্কাপিণ্ডের আঘাতে এই অববাহিকা তৈরি হয়েছিল।

এর বিপরীত পাশে পাওয়া গেছে অদ্ভুত বিকৃত ভূভাগ, যা সম্ভবত ওই বিশাল আঘাতের ভূকম্পীয় তরঙ্গ গ্রহের অন্য পাশে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে তৈরি হয়েছিল। এটি দেখায়, বুধ কেবল আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়নি, সেই আঘাত তার পুরো ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিয়েছে।

বুধকে জানা কেন এত কঠিন ছিল

সূর্যের এত কাছাকাছি থাকায় পৃথিবী থেকে বুধকে দেখা সবসময়ই কঠিন। এটি কখনও সূর্য থেকে খুব বেশি কৌণিক দূরত্বে সরে যায় না। ফলে দিগন্তের কাছে, ঘন বায়ুমণ্ডলের স্তর ভেদ করে, গোধূলি বা প্রভাতের অল্প সময়েই বুধকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এমনকি হাবল টেলিস্কোপের মতো মহাকাশ দূরবীনও সূর্যের খুব কাছে তাকানোর সীমাবদ্ধতার কারণে সহজে বুধ পর্যবেক্ষণ করতে পারে না।

মহাকাশযান পাঠানোও সহজ ছিল না। সূর্যের তীব্র মহাকর্ষের কারণে কোনো মহাকাশযানকে বুধের কক্ষপথে ঢোকাতে বিপুল জ্বালানি ও জটিল গতিপথ পরিকল্পনা দরকার হয়। এ কারণেই বুধে অভিযান ইতিহাসে তুলনামূলক কম।

Mariner 10 থেকে Messenger: বুধ গবেষণায় বড় অগ্রগতি

বুধে প্রথম পৌঁছানো মহাকাশযান ছিল Mariner 10, যা ১৯৭৪-৭৫ সালে গ্রহটির তিনটি ফ্লাইবাই করে। এটি বুধের প্রায় ৪৫ শতাংশ পৃষ্ঠের ছবি তুলেছিল এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্বের মতো চমকপ্রদ তথ্য দেয়।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে Messenger মিশনে। ২০০৪ সালে উৎক্ষেপণের পর এটি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ফ্লাইবাই করে এবং ২০১১ সালে বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করে। পুরো পৃষ্ঠ মানচিত্রায়ন, রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ, মেরু অঞ্চলের বরফ শনাক্তকরণ এবং অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে Messenger বুধ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বিপুলভাবে বাড়িয়ে দেয়। ২০১৫ সালে জ্বালানি শেষ হয়ে এটি বুধের পৃষ্ঠে আঘাত করে মিশন শেষ করে।

BepiColombo: নতুন যুগের অপেক্ষা

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং জাপানের মহাকাশ সংস্থার যৌথ মিশন BepiColombo বুধ গবেষণার নতুন অধ্যায়। ২০১৮ সালে উৎক্ষেপিত এই মহাকাশযান ২০২৫ সালে বুধে পৌঁছে কক্ষপথে কাজ শুরু করার কথা। এতে দুটি অরবিটার রয়েছে, একটি গ্রহের পৃষ্ঠ ও গঠন নিয়ে কাজ করবে, অন্যটি বুধের চৌম্বক ক্ষেত্র ও ম্যাগনেটোস্ফিয়ার পর্যবেক্ষণ করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই মিশন বুধের উৎপত্তি, কোরের প্রকৃতি, ভূতত্ত্ব এবং সৌর বায়ুর সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে আরও গভীর তথ্য দেবে।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ প্রমাণে বুধের ভূমিকা

বুধের গুরুত্ব শুধু গ্রহ হিসেবে নয়, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসেও বিশাল। এর কক্ষপথে সূক্ষ্ম এক অস্বাভাবিক অগ্রগতি বা precession বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছিল। নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে এর বেশিরভাগ ব্যাখ্যা করা গেলেও সামান্য অংশ ব্যাখ্যাতীত ছিল। ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন দেখান যে, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই অসামঞ্জস্য পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে। এভাবেই বুধের কক্ষপথ আইনস্টাইনের তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে

Messenger অনেক প্রশ্নের উত্তর দিলেও বুধকে ঘিরে এখনো বহু রহস্য অমীমাংসিত। গ্রহটি ঠিক কীভাবে এত বিশাল ধাতব কোর পেল, কেন এর পৃষ্ঠে এত বেশি সালফার, কীভাবে এর ভেতর এখনো আংশিক গলিত থাকতে পারে, আর কতদিন ধরে এর সংকোচন চলছে এসব প্রশ্ন এখনও গবেষণার বিষয়।

সব মিলিয়ে, বুধ শুধু সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ নয়, এটি সৌরজগতের সবচেয়ে চরম, জটিল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ জগতগুলোর একটি। আগুনের কাছাকাছি থেকেও বরফ ধারণ করা, ছোট হয়েও চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা, আর প্রাচীন ক্ষত বয়ে নিয়েও আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে যাওয়া এসব কারণেই বুধকে বলা যায় রহস্যে মোড়া এক অবিশ্বাস্য গ্রহ।

সূত্র: ব্রিটানিকা


পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে ‘বিশৃঙ্খলার দেবতা’! মহাকাশে টানটান উত্তেজনা

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১৬ ১৯:৩১:৫৯
পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে ‘বিশৃঙ্খলার দেবতা’! মহাকাশে টানটান উত্তেজনা
ছবি : সংগৃহীত

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক রোমাঞ্চকর ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। ‘গড অব ক্যাওস’ বা বিশৃঙ্খলার দেবতা নামে পরিচিত বিশাল এক গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে, যা আগামী তিন বছরের মধ্যে আমাদের গ্রহের অত্যন্ত কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে।

আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রাচীন মিসরীয় দেবতার নামানুসারে ‘অ্যাপোফিস’ রাখা এই গ্রহাণুটি নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। নাসা নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল অ্যাপোফিস পৃথিবীর মাত্র ২০ হাজার মাইল দূর দিয়ে চলে যাবে, যা মহাকাশে থাকা অনেক কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের দূরত্বের চেয়েও কম।

সাধারণত অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে প্রায় ২২ হাজার মাইল দূরে অবস্থান করে, সেখানে অ্যাপোফিসের ২০ হাজার মাইল দূরত্বে চলে আসা বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিরল পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

যদিও অ্যাপোফিসকে ‘সম্ভাব্য বিপজ্জনক’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, তবে নাসা আশ্বস্ত করেছে যে ২০২৯ সালের এই যাত্রায় পৃথিবীর সাথে এর সংঘর্ষের কোনো ঝুঁকি নেই। দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য বিশ্লেষণের পর নাসা জানিয়েছে, অন্তত আগামী ১০০ বছরেও এই গ্রহাণুটি পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি একটি নজিরবিহীন সুযোগ যার মাধ্যমে গ্রহাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন, গতিপথ এবং মহাজাগতিক বস্তুর আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষের জন্য সবথেকে বড় সুখবর হলো, ২০২৯ সালের সেই রাতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পূর্ব গোলার্ধের মানুষ কোনো টেলিস্কোপ ছাড়াই খালি চোখে এই গ্রহাণুটি দেখতে পাবেন। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই ঘটনাটি কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য এক বিরল ও শিহরণ জাগানিয়া অভিজ্ঞতা হিসেবেও গণ্য হচ্ছে।

সূত্র: সিবিএস নিউজ


এক হাজার বছর আগের বিস্ফোরণ আজও কাঁপিয়ে দিচ্ছে মহাশূন্য

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১৪ ২০:২২:৪৫
এক হাজার বছর আগের বিস্ফোরণ আজও কাঁপিয়ে দিচ্ছে মহাশূন্য
ছবি : সংগৃহীত

মহাকাশ যে আসলে স্থির কোনো ক্যানভাস নয়, বরং নিরন্তর পরিবর্তনশীল এক রণক্ষেত্র—নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ তা আবারও প্রমাণ করল। প্রায় এক হাজার বছর আগে ঘটা এক প্রলয়ংকরী নক্ষত্র বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ ‘ক্র্যাব নীহারিকা’ আজও মহাশূন্যে অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। হাবলের গত ২৫ বছরের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই নীহারিকাটি কেবল বড়ই হচ্ছে না, বরং প্রতিনিয়ত বদলে ফেলছে নিজের অবয়ব।

ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির তথ্যমতে, ১০৫৪ সালে একটি বিশাল তারার মৃত্যুর মাধ্যমে এই নীহারিকাটির জন্ম হয়। সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে টানা কয়েক সপ্তাহ এটি দিনের বেলাতেও খালি চোখে দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে পৃথিবী থেকে প্রায় ৬,৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নীহারিকাটির ভেতরের গ্যাস ও ধূলিকণা ঘণ্টায় প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন মাইল বেগে বাইরের দিকে ছুটে চলছে। বিজ্ঞানীদের মতে, নীহারিকার কেন্দ্রে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী ও দ্রুত ঘূর্ণায়মান ‘পালসার’ থেকে আসা প্রচণ্ড শক্তিই চারপাশের গ্যাসকে এভাবে ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

গবেষক উইলিয়াম ব্লেয়ারের মতে, আকাশের স্থির রূপটি আসলে একটি বিভ্রম; হাবলের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে মহাকাশ প্রতি মুহূর্তে নড়ছে এবং বাড়ছে। এই গবেষণাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া নীহারিকা কীভাবে সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়, তা এখন মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালেই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এই অবিরাম বিস্তার আমাদের মহাবিশ্বের গতিশীল প্রকৃতির এক জীবন্ত দলিল।

/আশিক


নাসায় একের পর এক বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যু: কেউ বারান্দায় খুন, কেউ নিখোঁজ!

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১২ ২১:৪৫:১৯
নাসায় একের পর এক বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যু: কেউ বারান্দায় খুন, কেউ নিখোঁজ!
ছবি : সংগৃহীত

নাসা এবং পারমাণবিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের একের পর এক রহস্যময় মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির (JPL) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাইকেল হিকসের মৃত্যু এই রহস্যের তালিকায় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।

হিকস নাসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিশন যেমন—ডার্ট এবং নিয়ার আর্থ অ্যাস্টেরয়েড ট্র্যাকিং-এর সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তাঁর মৃত্যু হলেও এখন পর্যন্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করাটা জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।

রহস্যের জাল আরও ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায় তাঁর সহকর্মী ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ডও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মারা যান। এখানেই শেষ নয়, লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে ফিউশন শক্তি গবেষক এবং ক্যানসার গবেষকদের নিখোঁজ ও নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো কোনো একটি অদৃশ্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এমনকি জেপিএলের সাবেক পরিচালক মোনিকা রেজার নিখোঁজ হওয়া এবং জ্যোতিঃপদার্থবিদ কার্ল গ্রিলমেয়ারের নিজ বাড়ির বারান্দায় খুন হওয়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও ভাবিয়ে তুলছে।

এফবিআইয়ের সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ক্রিস সুয়েকার এই ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেহেতু এই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি এবং মহাকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে কাজ করছিলেন, তাই বিদেশি কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এতজন মেধাবী বিজ্ঞানীর প্রস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: ডেইলি মেইল


যুক্তরাষ্ট্রে ওপেনএআই সিইওর বাসায় হামলা

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১১ ২০:৫৯:৩৯
যুক্তরাষ্ট্রে ওপেনএআই সিইওর বাসায় হামলা
ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের বাসভবনে মলোটভ ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার ঘটা এই হামলায় অল্টম্যানের বাড়ির গেটে আগুন ধরে যায়। এর মাত্র এক ঘণ্টা পর হামলাকারী যুবক ওপেনএআই-এর সদর দপ্তরে গিয়েও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

২০ বছর বয়সী ওই যুবক কেন এই হামলা চালিয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। এই ঘটনায় কেউ আহত না হলেও অল্টম্যান ও তাঁর কোম্পানির নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্যাম অল্টম্যান এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছেন, তাঁর কোম্পানিকে নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ এবং সমালোচনামূলক নিবন্ধের কয়েক দিনের মাথায় এই হামলা চালানো হলো। ধারণা করা হচ্ছে, ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এর একটি প্রতিবেদন যেখানে ওপেনএআই-এর পেন্টাগন চুক্তি এবং নিরাপত্তা ঘাটতির সমালোচনা করা হয়েছিল, সেটিই হামলাকারীকে উসকে দিয়ে থাকতে পারে।

অল্টম্যান স্বীকার করেছেন যে তিনি আগে এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু এখন নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে ভাবছেন। তিনি এআই নিয়ে মানুষের যৌক্তিক আশঙ্কার কথা স্বীকার করে সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ প্রযুক্তির আহ্বান জানান।

বর্তমানে ওপেনএআই একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগনের সঙ্গে ৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির কারণে কোম্পানিটি তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছে, যেখানে অভিযোগ উঠেছে যে তাদের প্রযুক্তি গোপন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে।

এছাড়া ইলন মাস্কও অল্টম্যানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন, যেখানে তিনি অল্টম্যানকে পদ থেকে সরানোর দাবি তুলেছেন।

এর আগে পেন্টাগন চুক্তির প্রতিবাদে ওপেনএআই অফিসের সামনে কর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন এবং ‘স্টপ এআই’ নামক সংগঠন অফিসের গেট অবরোধ করেছিল। সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা নিয়ে কোম্পানিটি এখন ত্রিমুখী চাপের মুখে।

সূত্র: আরটি


সাবধান! ফোনের এই অ্যাপগুলো এখনই মুছে ফেলুন, না হলে সব শেষ

প্রযুক্তি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৬ এপ্রিল ১১ ১২:৫৬:০৫
সাবধান! ফোনের এই অ্যাপগুলো এখনই মুছে ফেলুন, না হলে সব শেষ
ছবি : সংগৃহীত

স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও অসাবধানতাবশত ভুল অ্যাপ ইনস্টল করা ডেকে আনতে পারে চরম বিপদ। গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে থাকা সব অ্যাপই যে নিরাপদ, এমন ধারণা ভুল। সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জনপ্রিয় অ্যাপের মধ্যে ক্ষতিকর ম্যালওয়্যারের উপস্থিতি পেয়েছেন, যা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে। হ্যাকাররা অনেক সময় আসল অ্যাপের আদলে নকল বা ক্লোন অ্যাপ তৈরি করে ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে চেনা কঠিন।

বিপজ্জনক অ্যাপগুলোর তালিকায় শুরুতেই রয়েছে বেশ কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং টিকটক ক্লোন অ্যাপ। যেমন, একটি নির্দিষ্ট ক্রিপ্টো অ্যাপ ইতিমধ্যে ১০ হাজারেরও বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে, যা আসলে ব্যবহারকারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য তৈরি। এছাড়া টিকটকের নকল সংস্করণগুলো আপনার অনলাইন লেনদেন ও ব্যাংকিং তথ্য হ্যাক করার ক্ষমতা রাখে।

তালিকায় আরও আছে হোয়াটসঅ্যাপ স্টিকার মেকার, আর্ট ফিল্টার এবং জিপিএস লোকেশন ফাইন্ডার। এই অ্যাপগুলো আপনার ফোনের গ্যালারি, লোকেশন এবং কন্টাক্ট লিস্টের ওপর নজরদারি চালিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য পাচার করে দেয়। এমনকি 'আর্ট গার্লস ওয়ালপেপার এইচডি' এবং 'স্মার্ট কিউআর ক্রিয়েটর'-এর মতো সাধারণ মনে হওয়া অ্যাপগুলোও এখন ম্যালওয়্যার ছড়ানোর অন্যতম মাধ্যম।

বিপদ এড়াতে নতুন কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার আগে অবশ্যই সেটির ডেভেলপারের নাম, ইউজার রিভিউ এবং ডাউনলোডের সংখ্যা দেখে নেওয়া উচিত। কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার সময় যদি সেটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোনের অডিও, ভিডিও, ক্যামেরা বা লোকেশনের পারমিশন চায়, তবে সতর্ক হতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই তালিকার কোনো অ্যাপ যদি আপনার ফোনে থাকে, তবে দেরি না করে সেগুলো এখনই আনইনস্টল করুন এবং ফোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ভালো মানের অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবহার করুন।

/আশিক

পাঠকের মতামত: