সম্পাদকীয়
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ডিজিটাল অসভ্যতা: গণতান্ত্রিক সংহতি রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ
-1.jpg)
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে এই স্বাধীনতার চর্চা যখন অন্যের সম্মানহানি, সুসংগঠিত মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে যে কুরুচিপূর্ণ প্রোপাগান্ডা চলছে, তা সুস্থ সমাজ কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত। বিশেষ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে লক্ষ্য করে চালানো কুৎসিত ও কদর্য সাইবার আক্রমণগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক ও ডিজিটাল সংস্কৃতি এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত সংকটে নিমজ্জিত। বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত কুৎসা রটানো কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধ।
বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এই ধরণের অপপ্রচার কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয় বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত 'ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার' বা তথ্যযুদ্ধ। বর্তমানে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ডিসইনফরমেশন (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা) এবং মিস-ইনফরমেশন (ভুল তথ্য) এর এক বিশাল জাল বিছানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমান একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যারিস্টার এবং পেশাগত জীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা একজন নারী। অথচ তাকে লক্ষ্য করে বিকৃত ফটো কার্ড বা অশ্লীল পোস্ট তৈরি করে তা হাজার হাজার বট আইডির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বট আইডিগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দ্বারা পরিচালিত প্রোফাইল যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করে। প্রযুক্তি পরিভাষায় একে বলা হয় 'Coordinated Inauthentic Behavior' (CIB)। যখন কোনো গোষ্ঠী পর্দার আড়াল থেকে বা প্রকাশ্য সমর্থনের মাধ্যমে এই ধরণের নোংরামিকে উৎসাহিত করে, তখন তা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হেয় করে না বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধূলিসাৎ করে দেয়। অন্যদিক থেকে দেখলে, একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যারিস্টার কন্যা যখন সাইবার বুলিং এর শিকার হন তখন দেশের একজন সাধারণ নারী কতটা অসহায় সেটিও ফুটে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তারা বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল স্পেসে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও জাতীয় সংহতি রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির 'নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট' (NetzDG) একটি যুগান্তকারী উদাহরণ। এই আইন অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বাধ্য থাকে যেন তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) বা ভুয়া তথ্য সরিয়ে ফেলে। অমান্য করলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বিশাল অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' (DSA) ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর দায়বদ্ধতা আরোপ করেছে। সিঙ্গাপুরও তাদের 'POFMA' (Protection from Online Falsehoods and Manipulation Act) আইনের মাধ্যমে অনলাইনে মিথ্যে তথ্য প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোর অভাব স্পষ্ট যা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হবে না বরং প্রকৃত অপরাধী, গুজব রটনাকারী এবং পেইড সাইবার ট্রলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।
ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনেও এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার গভীর ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে অস্থিরতা বিরাজ করে তাকে বৈধতা দিতে অনেক সময় অনলাইনে পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করা হয়। একটি ছোট ঘটনাকে বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে কীভাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ফটো কার্ড এবং এডিট করা অডিও ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্তে চরমপন্থা ও অসহিষ্ণুতা দানা বাঁধছে। যারা এসব অপপ্রচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে তারা মূলত তরুণদের মগজ ধোলাই করে সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে বিভক্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।
এই সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ এখন রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে সাইবার স্পেসে 'ফেইক নিউজ ফ্যাক্টরি' পরিচালনা করতে বেশি আগ্রহী। এরা পেশাদার গ্রাফিক ডিজাইনার এবং কন্টেন্ট রাইটার নিয়োগ করে প্রতিপক্ষ নেতার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি করে। তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে যে ধরণের ফটো কার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় তা কোনো সাধারণ নাগরিকের কাজ হতে পারে না। এগুলো স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডা মেশিনের ফসল। যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি এই ধরণের অসভ্যতাকে তাদের অঘোষিত কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে তখন সাধারণ কর্মীরা একে তাদের দলীয় কর্তব্য মনে করতে শুরু করে। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম পতন যা সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষাবাদ করছে।
এমতাবস্থায় প্রোপাগান্ডা, ভুয়া তথ্য প্রচার, সাইবার বুলিং ও সংগঠিত অনলাইন হয়রানির বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা অপব্যাখ্যার সুযোগ না থাকে। অনলাইন স্পেসে সংঘটিত অপরাধকে "ভার্চুয়াল" বলে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই; এর সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাস্তব এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত বট আইডি ও সমন্বিত অপপ্রচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে সেগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে এবং যারা এসব পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কেবল আইনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না বরং ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনগুলো যেন কেবল মুক্তচিন্তা বা সরকারের সমালোচনাকারীদের মুখ বন্ধ করতে ব্যবহৃত না হয়। বরং এর প্রয়োগ হতে হবে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে যারা বট আইডি ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়, নারীদের সাইবার বুলিং করে এবং উস্কানিমূলক মিথ্যা তথ্য প্রচার করে। বট নেটওয়ার্ক এবং সমন্বিত অপপ্রচার শনাক্ত করতে দেশের সাইবার ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর স্থানীয় অফিস বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে।
পরিশেষে গণতন্ত্রের নামে অসভ্যতা বা অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সমালোচনা অবশ্যই গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল এবং শিষ্টাচারসম্মত। ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতির ময়দানে টেনে এনে কদর্য আক্রমণ করা কোনোভাবেই বীরত্ব নয় বরং তা রাজনৈতিক ও নৈতিক হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ। ডিজিটাল স্পেস আজ আমাদের বাস্তব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই এখানে যদি শৃঙ্খলা না থাকে তবে তার প্রভাব সরাসরি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় পড়বে। একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা কি যুক্তি, তথ্য ও সম্মানের সংস্কৃতিতে ফিরব নাকি ডিজিটাল অসভ্যতা ও প্রোপাগান্ডার অন্ধকারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিলীন করে দেব। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো সত্য বলার সাহস রাখা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। মিথ্যার বেসাতি করে অন্যের চরিত্রহনন করা নয়। এই সত্যটি অনুধাবন করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ ও সচেতন নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব।
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের দূরদর্শী পরিকল্পনা!

শহিদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক দৃশ্যমান গতিপথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্জন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—আমরা একটি ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করি। তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কি বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত?
আধুনিক প্রকৌশল বিশ্লেষণ বলছে, সঠিকভাবে পরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকম্পে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। কারণ এগুলো মাটির স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নড়ে, ফলে উঁচু ভবনের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কম থাকে। উন্নত বিশ্বে নির্মিত আধুনিক বাঙ্কারগুলোতে শক-অ্যাবজরবিং ডিজাইন, শক্তিশালী রিইনফোর্সড কাঠামো, নিরাপদ বায়ুচলাচল, বিকল্প বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে। এগুলো কেবল আশ্রয়স্থল নয়, বরং সংকটকালে কার্যকর কমান্ড সেন্টার হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সঙ্গে নিরাপদ টানেল সংযুক্ত থাকার নজির রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তর, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য। ইতিহাস থেকেও দেখা যায়, রাজা-সম্রাটদের সময়েও গোপন সুরঙ্গ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল—যা আধুনিক যুগে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বঙ্গভবন, জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপনা নয়—এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। একটি বড় দুর্যোগে যদি একসঙ্গে বহু নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তা কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এক্ষেত্রে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হতে পারে—কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সঙ্গে আধুনিক ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ। এসব অবকাঠামো এমনভাবে ডিজাইন করা যেতে পারে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। বিকল্প প্রবেশ ও নির্গমন পথ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা—বিশেষ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি—অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য উন্নত জলরোধী প্রযুক্তি, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাম্পিং সিস্টেম এবং বন্যা-সহনশীল নকশা অপরিহার্য। পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি প্রকৌশল দক্ষতার একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে এটি কেবল একটি ধারণা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
সমাজের কিছু অংশ হয়তো এই ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরঞ্জিত মনে করতে পারে। তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব যে প্রজন্মের হাতে, তারা একটি উন্নত ও নিরাপদ বাংলাদেশ চায়। দূরদর্শী নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো ভবিষ্যতের প্রয়োজন আজই উপলব্ধি করা এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া।
এই উদ্যোগ কোনো পালানোর পথ নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে টিকে থাকার প্রস্তুতি। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সময়ের প্রয়োজনে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে—যা প্রমাণ করে এটি একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর ধারণা।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে নিরাপত্তা অবকাঠামোতেও একই দূরদর্শিতা প্রদর্শনের। এটি কেবল বর্তমানের জন্য নয়—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের বিনিয়োগ।উন্নয়নের পাশাপাশি সুরক্ষা—এই ভারসাম্যই হতে পারে টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের মূল ভিত্তি। এখন প্রশ্ন একটাই: বাংলাদেশ কি সেই দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত?
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিইআন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক,লেখক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক,চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।
জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ লাইন ভাঙার ডিজিটাল সমাধান—একটি স্মার্ট নীতিমালার প্রস্তাব

শহিদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
বিশিষ্ট লেখক: ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি—পেট্রোল ও অকটেন সংকট, যা শুধু অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও কঠিন করে তুলছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা। মিরপুর থেকে একটি গাড়ি তেল নিয়ে আবার সেগুনবাগিচায় গিয়ে পুনরায় লাইনে দাঁড়াচ্ছে—এ যেন এক অপ্রতিরোধ্য বিশৃঙ্খলা। এই অতিরিক্ত মজুত প্রবণতাই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তবসম্মত সমাধান। প্রস্তাব করা হচ্ছে—একটি জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়াতে সক্ষম।
সমস্যার মূল চিত্র
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক গাড়ি একদিনে একাধিক পাম্প থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মিরপুর থেকে ২০ লিটার তেল নেওয়ার পর একই গাড়ি সেগুনবাগিচা গিয়ে আবার তেল নিচ্ছে। এই পুনরাবৃত্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকদের বঞ্চিত করছে।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল সমাধান
এই সংকট নিরসনে একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যা Bangladesh Road Transport Authority-এর ডাটাবেসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এই সিস্টেমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হতে পারে:
• প্রতিটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী জ্বালানি ক্রয়ের তথ্য রেকর্ড হবে।
• একটি গাড়ি দিনে একবারের বেশি জ্বালানি কিনতে পারবে না।
• একবার তেল কেনার পর সেদিন দেশের অন্য কোনো পাম্প থেকে পুনরায় জ্বালানি নেওয়া যাবে না।
• পাম্পগুলোতে রিয়েল-টাইম যাচাইকরণ ব্যবস্থা থাকবে, যাতে প্রতারণা বা পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়।
শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শুধুমাত্র সেইসব গাড়িকেই জ্বালানি দেওয়া হবে, যাদের কাগজপত্র সম্পূর্ণ হালনাগাদ। যেমন:
• ফিটনেস সার্টিফিকেট
• ট্যাক্স টোকেন
• রেজিস্ট্রেশন আপডেট
যেসব গাড়ির কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, তারা এই সুবিধা পাবে না। ফলে মালিকরা বাধ্য হবেন নিয়ম মেনে চলতে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াবে।
অর্থনৈতিক সুফল
এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবে
1. রাজস্ব বৃদ্ধি: ট্যাক্স ও ফিটনেস নবায়ন বাড়বে।
2. জ্বালানির সুষম বণ্টন: অতিরিক্ত মজুত কমবে।
3. কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ: অবৈধ বিক্রয় হ্রাস পাবে।
4. সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়: দীর্ঘ লাইনের অবসান ঘটবে।
সামাজিক প্রভাব
এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। মানুষ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে না। কর্মজীবী মানুষ, জরুরি সেবা প্রদানকারী এবং সাধারণ নাগরিক সবাই উপকৃত হবে।
বাস্তবায়নের পথ
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি Bangladesh Road Transport Authority, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং আইটি বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে সারা দেশে এটি চালু করা যেতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একটি সাময়িক সমস্যা, কিন্তু এর সমাধান হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই। একটি স্মার্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে আমরা শুধু এই সংকট মোকাবিলা করতেই পারি না, বরং একটি আধুনিক, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং রাজস্বসমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব—এখন প্রয়োজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
আমরা কি আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি?

মো. আরিফুজ্জামান
সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পিরোজপুর
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের সামনে একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। “সবার আগে বাংলাদেশ” এই স্লোগানকে সামনে রেখে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের অভিজ্ঞতার পর জনগণের বড় একটি অংশ এখন একটি পুনর্গঠিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সরকারের কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি মৌলিক খাত: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতির শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে সেই জাতির মেরুদণ্ড কার্যত ভেঙে পড়ে। তখন তৈরি হয় মেধাহীন প্রজন্ম এবং দুর্বল মানবসম্পদ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে বহু শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।
এই বাস্তবতা থেকেই রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব হিসেবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখায় শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২৪ নম্বর দফায় শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এখানে দুটি ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা। আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমাজ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে এই দুটি ধারণার সমন্বয় অপরিহার্য। প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। এটি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে এবং বেকারত্ব কমাতে সহায়তা করে। অন্যদিকে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা নাগরিকদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং যুক্তিবাদী মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এই দুই ধরনের শিক্ষার সমন্বয় অপরিহার্য। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করে। একই সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং সমাজে উৎপাদনশীল কর্মশক্তি তৈরি করে। ফলে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্র গঠনের প্রধান ভিত্তি।
৩১ দফার শিক্ষা রূপরেখায় আরও বলা হয়েছে যে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা হবে। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ক্রীড়া উন্নয়ন, জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধের কথাও বলা হয়েছে।
এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি মৌলিক পরিবর্তনের পথে যেতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে একটি দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনক্ষম সমাজ।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক সমাজের মধ্যে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি একজন সম্ভাবনাময় ও সক্রিয় শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন অভিজ্ঞ ও সক্ষম ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, শিক্ষা সংস্কার একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা এই খাতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নে যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সমাধান গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু উদ্বেগও সামনে আসছে, যা উপেক্ষা করা যায় না।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের অধীন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে সরকারঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বসেছেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক দখলদারত্ব তৈরি হয়েছে। এর ফলাফল ছিল শিক্ষা খাতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণ এবং ব্যাপক দুর্নীতি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এসব পদে না থাকার একটি নীতিগত অবস্থানও নেওয়া হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তকে দেশের শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের বড় একটি অংশ স্বাগত জানিয়েছিল। কারণ এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। একই সঙ্গে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়াও চালু করা হয়েছিল, যা স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যদি এই ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এখানেই প্রশ্নটি সামনে আসে: আমরা কি আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি?
রাষ্ট্র মেরামতের যে অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তবে সেই সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রীর প্রতি শিক্ষক সমাজের আস্থা রয়েছে। তাই আশা করা যায়, শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নে তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না যা শিক্ষা খাতকে আবার রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে ঠেলে দেয়। বরং প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা অপরিহার্য। কারণ শিক্ষা কেবল একটি প্রশাসনিক খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল ভিত্তি।
তাই আজকের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: আমরা কি সত্যিই একটি নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যাচ্ছি, নাকি অজান্তেই আবার সেই পুরনো ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
ইরান যুদ্ধ, পরিচয়ের রাজনীতি এবং বৈশ্বিক সংকটের নতুন সমীকরণ

মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেবল সামরিক পরিভাষায় ব্যাখ্যা করলে তার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ধরা পড়ে না। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার সংঘর্ষ নয়; বরং পরিচয়, আদর্শ, ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের লড়াই। ইরানকে বোঝার জন্য তাই তার সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার রাষ্ট্রচেতনা, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আদর্শিক কাঠামো। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গভীর প্রশ্ন: ইরান নিজেকে কীভাবে দেখে, এবং বিশ্ব তাকে কীভাবে দেখতে চায়।
ইরানিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আইডেন্টিটি। রাষ্ট্রের ভেতরে রয়েছে বহু জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য—পার্সিয়ান, আজারি, কুর্দি, বালুচি, আরবসহ নানা সম্প্রদায়। শিয়া মুসলিম সমাজের মধ্যেও রয়েছে মতাদর্শিক ভিন্নতা। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে যে পরিচয়টি সবার আগে সামনে আসে, তা হলো পারস্য সভ্যতার ধারাবাহিকতা। এই পরিচয় আধুনিক জাতীয়তাবাদের চেয়েও গভীর; এটি হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যিক অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার।
ইরানের জাতীয় চেতনায় পরাজয়ের স্মৃতির চেয়ে প্রতিরোধ ও পুনরুত্থানের বয়ান অধিক প্রভাবশালী। আরব বিজয়, মঙ্গোল আক্রমণ, ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—প্রতিটি অধ্যায় তারা টিকে থাকার সংগ্রাম হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো বর্তমান সংঘাতে তাদের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করছে। ফলে বাইরের চাপ যত বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ সংহতিও তত শক্তিশালী হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন। হযরত আলী রাঃ, ইমাম হাসান রাঃ ও ইমাম হোসেন রাঃ-এর আদর্শ তাদের নৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক চেতনাকে প্রভাবিত করে। কারবালার ঘটনা তাদের কাছে কেবল ইতিহাস নয়; এটি ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতীক। শাহাদাত এখানে কেবল ধর্মীয় ধারণা নয়, বরং জাতি ও বিশ্বাস রক্ষার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের চূড়ান্ত রূপ।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-কে ঘিরে আবেগ ও রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর শাহাদাত নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা অনেকের মতে জাতিকে আরও আবেগপ্রবণ ও সংঘবদ্ধ করেছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জীবিত নেতৃত্বের চেয়ে শহীদের বয়ান দীর্ঘমেয়াদে অধিক শক্তিশালী সামাজিক সমাবেশ ঘটায়। ইরানে এই প্রতীকী রাজনীতি রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধকে নৈতিক বৈধতা দিচ্ছে।
বর্তমান সংঘাতে ইরান এমন দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে অথবা যারা Abraham Accords-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এর মাধ্যমে তেহরানের কৌশলগত বার্তা স্পষ্ট: তারা এই সংঘাতকে সীমিত আঞ্চলিক বিরোধ নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে।
ইরানের ধারণা, হারানোর চেয়ে প্রমাণ করার বিষয় এখানে বড়। তাদের কৌশল “ডিটারেন্স বাই পানিশমেন্ট”—অর্থাৎ প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে যুদ্ধের ব্যথা অনুভব করানো। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাপের মুখে পড়বে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থাপত্য পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি হবে। এই কৌশল সরাসরি সামরিক বিজয়ের চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে এখনো কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এই অস্ত্রভাণ্ডারের একটি বড় অংশ ভূগর্ভস্থ টানেল, পাহাড়ি স্থাপনা ও সুরক্ষিত ঘাঁটিতে সংরক্ষিত। বহু বছর ধরে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিয়ে তারা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
শুধুমাত্র এয়ার স্ট্রাইক দিয়ে এই সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন। স্থলাভিযান ছাড়া সিদ্ধান্তমূলক ফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু ইরানের পর্বতময় ভূখণ্ড, বিস্তৃত এলাকা ও সুসংগঠিত সামরিক প্রস্তুতি বিবেচনায় এমন অভিযান যে কোনো শক্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ফলে সরাসরি স্থল অভিযান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হবে।
এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকান প্রভাব ও নিরাপত্তা স্থাপত্য গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে আরব দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু যদি সেই ঘাঁটিগুলোই আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে নিরাপত্তা কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এর ফলশ্রুতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার রাজনৈতিক ঝুঁকিকে দ্রুত মূল্যায়ন করে। অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগ হ্রাস, মুদ্রা চাপে পতন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে এমন সম্ভাবনা কম, কিন্তু তারা কৌশলগতভাবে ইরানকে সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে চাপে রাখা তাদের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। জ্বালানি বাণিজ্য, সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে তারা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। ফলে ইরানে পশ্চিমাপন্থী রেজিম পরিবর্তন সহজ হবে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের সম্ভাবনাই বেশি।
এই সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল সংকট ও ঋণচাপের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও স্বল্পোন্নত অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, বাজেট ঘাটতি বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করবে। সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য তার পরিচয়, আদর্শ ও কৌশলগত হিসাবকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এটি কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; বরং শক্তির কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মুহূর্ত। ইরান তার পারস্য পরিচয় ও শিয়া আদর্শকে অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিরাপত্তা ও প্রভাবের প্রশ্নে অবস্থান নিয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলো কৌশলগত সুযোগ খুঁজছে।
পরিস্থিতি জটিল ও অনিশ্চিত। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, অস্ত্র দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, কিন্তু পরিচয় ও আদর্শকে দমন করা যায় না।
আমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করি। কারণ এই সংঘাত কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে অস্থিরতা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন।
বন্ধকী কূটনীতির দেশে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির স্বপ্ন

আলিফ ইফতেখার
গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট (বিইআই)
দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। সম্প্রতি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান যখন বললেন, "আমরা জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যেতে চাই" তখন রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার দিক থেকে বক্তব্যটি হয়তো অনুমানযোগ্যই ছিল। কিন্তু কূটনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এটি একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ। কারণ অতীতের আয়না দিয়ে ভবিষ্যৎ দেখা যায় না! বিশেষত যখন সেই অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে ব্যবধান কেবল সময়ের নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির প্রশংসা করার যথেষ্ট কারণ আছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাঁক পরিবর্তনকারী অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাজনৈতিকভাবে এক বিপর্যস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি মূলত 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়' এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও এর মূল প্রাণ ছিল 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' এবং 'জাতীয় স্বার্থ রক্ষা'।

১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তিনি এক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল সময়ে কোনো পরাশক্তির অন্ধ অনুসারী না হয়ে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম সব ব্লকের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করা ছিল তাঁর সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর থেকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি যে একমুখী নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারসাম্য আনাই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় প্রেক্ষাপট। এই সময়ে ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন তথা ফারাক্কা বাঁধ ইস্যু এবং সীমান্ত সমস্যা নিয়ে চরম টানাপোড়েন চলছিল। অন্যদিকে, অনেক মুসলিম দেশ তখনও বাংলাদেশকে পাকিস্তানের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখত এবং পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এমন একটি জটিল সময়ে জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে ফারাক্কা ইস্যুটি উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের দ্বার উন্মোচন করেন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জাপানকে হারিয়ে অস্থায়ী আসন জেতা ছিল সেই কূটনৈতিক দূরদর্শিতারই ফসল। সার্কের ধারণার বীজ বপনেও তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। কিন্তু প্রশ্নটি হলো যে সেই নীতি কি এখন হুবহু প্রযোজ্য? উত্তর হলো: না! জিয়াউর রহমানের সময় বিশ্ব ছিল দুই মেরুতে বিভক্ত। ভারসাম্য রাখার কাজটি ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ কারণ দুটি পরাশক্তির প্রত্যেকেই চাইত বাংলাদেশ তার শিবিরে থাকুক। সেই টানাটানিতে বাংলাদেশের হাতে একটি স্বাভাবিক দরকষাকষির সুযোগ ছিল। আজকের বিশ্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। একমেরু যুগ শেষ হয়ে বিশ্ব এখন বহুমেরু বা 'মাল্টিপোলার' কাঠামোর দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। চীন এখন আর কেবল একটি বড় দেশ নয় সে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, যার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা কার্যত একটি নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আবার নিজের ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। ভারত এখন আর শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, সে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর নেতৃত্বের দাবিদার এবং কোয়াড-এর অংশীদার। এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশকে যদি কেউ ১৯৭৫-৮১ সালের মানচিত্র দিয়ে পথ চলতে বলেন, তাহলে সেটি কেবল অকার্যকর নয় বরং কিছুক্ষেত্রে বিপজ্জনকও।
বিশ্বে ভারসাম্যের দাবি আরও কঠিন, কারণ এখন প্রতিটি শক্তিকেন্দ্র অনেক বেশি শর্ত আরোপ করে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতায় ঢাকার ওপর চাপ আসছে উভয় দিক থেকে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগে সতর্ক থাকুক। চীন চায় বাংলাদেশ তার কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগাক। ভারত চায় তার নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকুক। এই তিন দিক থেকে আসা টানে 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' নীতিটি এখনও সর্বজন গ্রহণযোগ্য কারণ বাংলাদেশ কোনো দেশের সাথে শত্রুতা পোষণ করার বিলাসিতা বা ঝুঁকি নিতে পারে না।এটি অবাস্তব। তবে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কোন মাঠের কৌশল নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জেতার আগে ও পরে "সবার আগে বাংলাদেশ" নীতির কথা বলেছেন। কথাটি শুনতে সুন্দর এবং রাজনৈতিকভাবে হয়তো কার্যকরও। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতিতে স্লোগান আর কৌশল এক জিনিস নয়। "বাংলাদেশ প্রথম" নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে যা দরকার, তার তালিকাটি দীর্ঘ। দরকার একটি শক্তিশালী, দলনিরপেক্ষ ও পেশাদার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দরকার থিংকট্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিবিড় সংযোগ যাকে কূটনীতির ভাষায় আমরা বলে থাকি 'ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসি'। আজকের বাস্তবতায় এর কতটুকু আছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর দীর্ঘদিন ধরে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের শিকার ও সেটি সকল সরকারের সময় থেকেই চলমান। দূতাবাসগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব কতটুকু নিশ্চিত সেটি একটি বিষয়। থিংকট্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রকৃত প্রভাব প্রশ্নবিদ্ধ! এই ভিত্তি না গড়ে কেবল "জিয়ার নীতিতে ফিরে যাব" বললে সেটি একটি প্রতীকী অঙ্গীকার হয়ে থাকবে, কার্যকর কৌশল হবে না। সব কিছুর মূলে যেটি দরকার সেটি হলো পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য, যাতে এক, সরকার বদলালে পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিও বদলে না যায়। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীরের একটি মন্তব্য এই আলোচনার কেন্দ্রে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন বাংলাদেশের কূটনীতির বড় সমস্যা বাইরে নয়, ভেতরে। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ নয় এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা নির্ণয়ও বটে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ ৫৪ বছরে মাত্র দুইবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক সংস্কার করেছে ১৯৮২ ও ১৯৯৫ সালে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন নিয়মিতভাবে তাদের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি পর্যালোচনা করে। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে এবং সরকার ও বেসরকারি অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের দীর্ঘস্থায়ী অভাব বাংলাদেশের বৈদেশিক কার্যক্রমকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে রেখেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার আরও একটি উদ্বেগজনক ও কম আলোচিত মাত্রা আছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের সমালোচনা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না। এটিকে হয়ে যায় কূটনৈতিক দ্বৈততা।
বাস্তবতাটি অনেকটা এইরকম যে সরকার যখন কোনো দেশের সঙ্গে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট হয়, তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একটি অংশ সেই দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ও অপ্রকাশিত সখ্যতা গড়ে তোলে। অনেকগুলো উদ্দেশ্যের মাঝে একটি উদ্দেশ্য সম্ভবত থাকে সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগকে দুর্বল করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফায়দা তোলা। বাহ্যত এটিকে মতপার্থক্য বলে দেখানো হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি নীরব বিশ্বাসঘাতকতা যা সরকারি দল ও বিরোধীদল ক্রমান্বয়ে এদেশে করে আসছে।
এর ক্ষতিও বহুমাত্রিক। বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের প্রতিশ্রুতিকে আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না। প্রতিপক্ষ শক্তিগুলো এই বিভেদকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করে। দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক কৌশল তৈরি অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ প্রতিটি সরকার পরিবর্তনে পররাষ্ট্রনীতিও পুনর্লিখিত হয়। জিয়াউর রহমানের সময়ে এই বিভেদ এতটা তীব্র ছিল না এবং বিদেশি শক্তির এটি ব্যবহার করার সুযোগও ছিল সীমিত। তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক সংযুক্তির এই যুগে সেই সুযোগ এখন উন্মুক্ত এবং অনেক বেশি কার্যকর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, নতুন সরকার জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যেতে চায় যে নীতির মূল ছিল কোনো পরাশক্তির অনুসারী না হওয়া, পূর্ব বা পশ্চিম কোনো ব্লকে নয়, বরং সবার সঙ্গে সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। এই বক্তব্য যখন শোনা যাচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে সামনে আসে যে নতুন সরকার যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছে, সেই মঞ্চের মেঝে কি আদৌ তার নিজের?
নির্বাচনের মাত্র অল্প কয়দিন আগে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে যায়। চুক্তির খসড়া গোপন রাখতে আগেই নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট সই করা হয়েছিল। অর্থাৎ, জনগণকে না জানিয়ে কেবল বাস্তবায়নের দায়টি পরের সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে চুক্তিটি সম্পন্ন করা হয়েছে। চুক্তির শর্তগুলো পড়লে স্পষ্ট হয়, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয় এটি একটি ভূরাজনৈতিক শপথপত্র। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো 'নন-মার্কেট ইকোনমি'র সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না। এটি চীন, রাশিয়াসহ একাধিক দেশের দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। শর্ত ভঙ্গ হলে যুক্তরাষ্টি পারস্পরিক শুল্ক পুনর্বহাল করতে পারবে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তাই সরাসরি বলেছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান "সবার আগে" নয় বরং সবার পেছনে! এখন খলিলুর রহমানের বক্তব্যের পাশে এই চুক্তিটি রেখে দেখা যেতে পারে। একদিকে সরকার বলছে জিয়ার আদর্শে ফিরবে। কোনো ব্লকে নয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোবে। অন্যদিকে উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া একটি চুক্তি বলছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলে হয়তো শাস্তি আসবে। জিয়াউর রহমান স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন, কোনো ব্লকের চাপে তা ছাড়েননি। সরকার সেই জিয়ার নীতির কথা বলছে, কিন্তু হাতে পেয়েছে এমন একটি দলিল যা সেই নীতির ঠিক বিপরীত।
এখানেই প্রশ্নটি কেবল কূটনৈতিক থাকে না, রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। এই চুক্তি কি সত্যিই কোনো অর্থনৈতিক সুবিধার বিবেচনায় হয়েছিল? নাকি এটি সেই কূটনৈতিক দ্বৈততার একটি চরম ও স্পষ্ট রূপ যেখানে ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্তে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির হাত ও পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে? চুক্তির সময়কাল, গোপনীয়তার শর্ত এবং দায় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল এই তিনটি একসঙ্গে দেখলে উত্তরটি অনুমানের জায়গায় থাকে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি সত্যিই জিয়ার নীতিতে ফিরতে চান, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত এই চুক্তির পূর্ণ পর্যালোচনা এবং সংসদে প্রকাশ্য বিতর্ক! কারণ যে নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে যে চুক্তি উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে এই দুটো একসঙ্গে টেকে না।
ধরা যাক, সংসদে চুক্তিটি বাতিলের প্রস্তাব উঠল। পরিণতি সবার জানা যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক পুনর্বহাল করবে। কিন্তু এখানেই থামবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর চাপ আসবে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর মনোভাব বদলাবে। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রশ্নটি আর কূটনৈতিক থাকবে না, হয়ে উঠবে অস্তিত্বের। এটি এমন এক শিকল যে শিকলের শিকড় আমাদের অর্থনীতির একমাত্রিকতায়। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে, এবং সেই পোশাকের সিংহভাগ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। অর্থাৎ যে দেশ বা জোট আমাদের রপ্তানির দরজা নিয়ন্ত্রণ করে, সে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দরজাও কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাস্তবতায় "ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি"র কথা বলা যায় বক্তৃতামঞ্চে বাস্তবের কূটনৈতিক টেবিলে নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও গভীর একটি সংকটের আখ্যান।
এখানেই জিয়াউর রহমানের সময়ের সঙ্গে আজকের সবচেয়ে নীরব কিন্তু সবচেয়ে গভীর পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। জিয়া ভারসাম্য রাখতে পেরেছিলেন কারণ তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো একক বাজারের এতটা মুখাপেক্ষী ছিল না। তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন, কারণ সেই সম্পর্ক ছিন্ন করলে পশ্চিম তাঁকে যেভাবে শাস্তি দিতে পারত, তার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। আজকের বাংলাদেশ সেই সুবিধার জায়গায় নেই। কারণ আমরা গত তিন দশকে পোশাক খাতের সাফল্যের আড়ালে একটি চরম বিপজ্জনক একমাত্রিকতা তৈরি করেছি যা এখন আমাদের কূটনৈতিক গলায় ফাঁস হয়ে বসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে একে বলেছেন "মাদার অফ অল ডিলস"। এই চুক্তির আওতায় ভারতের টেক্সটাইল, পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে ঠিক সেই পণ্যগুলো, যেগুলো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের সরাসরি প্রতিযোগী।

এই একটি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য যা করতে পারে, তা কোনো যুদ্ধ বা অবরোধও পারে না। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে সেই সুবিধা ধীরে ধীরে কমবে। আর সে কারণেই বোধকরি সরকার এই উত্তরণ পিছিয়ে দেবার কথা ভাবছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত ইউরোপে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে যাচ্ছে, অনেক বড় উৎপাদনসক্ষমতা ও অনেক বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে, সেটি আর কেবল পররাষ্ট্রনীতির নয়, এটি জাতীয় অস্তিত্বের। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি আমাদের পূর্বমুখী কূটনীতির হাত বেঁধে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত-ইইউ চুক্তি আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সমীকরণ মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে। আর মাঝখানে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী স্লোগান নিয়ে, একটিমাত্র একমাত্রিক অর্থনীতি নিয়ে, যার পোশাক খাতের উপর অতিনির্ভরতা এখন জাতীয় দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে!
তাহলে পররাষ্ট্রনীতিতে আসলে কী দরকার? শুধু অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য কি যথেষ্ট? একদমই নয়। ঐকমত্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু ঐকমত্য একটি শক্ত শর্ত মাত্র, কোনভাবেই সমাধান নয়। কারণ একটি দুর্বল অর্থনীতির পিঠে বসে শক্তিশালী কূটনীতি করার চেষ্টা অনেকটা বালির উপর প্রাসাদ গড়ার কল্পনার মতো হয়ে যায়। আসল সমাধান হলো একটি সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মহাপরিকল্পনা, যেখানে পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, শিল্প এবং অর্থ মন্ত্রণালয় একটি অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করবে।
সেই পরিকল্পনার তিনটি স্তম্ভ হওয়া দরকার। প্রথমত, রপ্তানি বাজারের জরুরি বৈচিত্র্যায়ন। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো একটি বাজার বন্ধ হলে পুরো অর্থনীতি ধসে না পড়ে। দ্বিতীয়ত, পোশাকের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও সফটওয়্যারে রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে নয়তো ভারত-ইইউ চুক্তির ধাক্কা সামলানো সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু ঋণনির্ভরতা থেকে বের করে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পারস্পরিক বাজার সম্পর্কে রূপান্তর করতে হবে।কূটনৈতিক স্বাধীনতা সম্ভবত কোনো ঘোষণাপত্রে লেখা থাকে না, এটি অর্জিত হয় বিকল্পের শক্তি থেকে। যে দেশ নিজের অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারে না, সে দেশ পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতাও কোনভাবেই অর্জন করতে পারে না।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ও তাঁর মূলনীতি যা ছিল স্বাধীনচেতা, ভারসাম্যপূর্ণ, বাংলাদেশকেন্দ্রিক কূটনীতি তা এখনও প্রাসঙ্গিক। তা একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের চেতনাকেও ধারণ করে কিন্তু সেই মূলনীতি বাস্তবায়িত করতে হবে ২০২৬ সালের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, ১৯৭৮ সালের মানচিত্রে নয়।আজকের সরকার যদি সত্যিই জিয়াউর রহমানের পথে হাঁটতে চায়, তাহলে শুধু তাঁর কূটনৈতিক দর্শন নয়, তাঁর সেই অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার স্বপ্নটিকেও ধারণ করতে হবে। তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে সত্যিকারের সম্মান জানাতে হলে তাঁর নীতির হুবহু অনুকরণ করে কোন লাভ নেই, তাঁর মতো করে নিজের সময়ের, বর্তমানের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। জিয়াউর রহমান তাঁর সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলেন সাহস ও বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে। তাঁরই পুত্র আজকের প্রধানমন্ত্রী সেই সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় কিভাবে দেবেন তা সময় বলে দেবে।
লেখক- -আলিফ ইফতেখার, গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট (বিইআই)
বয়ান বদলের রাজনীতি: বিএনপির নতুন কমিউনিকেশন স্থাপত্য ও আগামীর শাসনচিন্তা

আসিফ বিন আলী
শিক্ষক ও স্বাধীন সাংবাদিক
স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনের ছাত্র হিসেবে রাজনৈতিক যোগাযোগ আমাকে সবসময় তাত্ত্বিক কৌতূহল আর বাস্তব পর্যবেক্ষণের এক দ্বৈত জায়গায় দাঁড় করায়। নির্বাচনকালীন প্রচারণা আমার কাছে শুধু পোস্টার, মিছিল বা টকশো নয়; এটি একটি সুসংগঠিত বার্তা-ব্যবস্থার প্রয়োগক্ষেত্র। এবারের নির্বাচনে আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি কীভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি নিজেদের প্রচারণা নির্মাণ করেছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সৃজনশীলতা দেখিয়েছে। কিন্তু নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিএনপির প্রচারণায় যে নাটকীয় রূপান্তর ঘটল, তা বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে। এটি কেবল ভিজ্যুয়াল বা ভাষার পরিবর্তন নয়; বরং একটি গভীর কৌশলগত পুনর্গঠন।
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে চারটি মৌলিক প্রশ্ন জরুরি: কে করছে, কী করছে, কীভাবে করছে এবং কেন করছে। এই ফ্রেমে বিএনপির প্রচারণাকে বিশ্লেষণ করলে একটি সমন্বিত কমিউনিকেশন আর্কিটেকচার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, মুখপাত্রের অবস্থানকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। শান্ত, সংযত কিন্তু দৃঢ় ভাষার একজন স্পোকসপারসন হিসেবে মাহদী আমিনের আবির্ভাব দলীয় বার্তার টোনালিটি পাল্টে দেয়। একই সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন ড. জিয়া হায়দার। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বার্তা নির্মাণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এপোলো। কেন্দ্র, তৃণমূল ও ডিজিটাল স্তরে এই ত্রিস্তরীয় সমন্বয় একটি কাঠামোগত পরিণতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল সংক্ষিপ্ত ভিডিও কনটেন্টের ধারাবাহিকতা। এক মিনিট থেকে দেড় মিনিটের ক্লিপ, স্পষ্ট বার্তা, নিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং ধারাবাহিক ন্যারেটিভ নির্মাণ। অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারি, এই কনটেন্টগুলোর পেছনে কাজ করছেন ড. সাইমুম পারভেজ। তাঁকে আমি পূর্বে চিনতাম গবেষক হিসেবে, র্যাডিকালাইজেশন ও রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ক গবেষণায় তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে স্বীকৃত। নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় তাঁর অবদান তাঁকে একজন বিশ্লেষণী মস্তিষ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেই মানুষ যখন সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের ময়দানে নেমে আসেন এবং সৃজনশীলভাবে ন্যারেটিভ নির্মাণ করেন, তখন সেটি নিছক ক্যাম্পেইন নয়; এটি জ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ।
এই ভিডিওগুলোর কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। ধর্মীয় বিভ্রান্তি ভাঙতে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা, “ফ্যামিলি কার্ড” ধারণাকে সাধারণ ভাষায় উপস্থাপন, জুলাইয়ের আহত এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে এক আবেগীয় ধারায় যুক্ত করা। এগুলো কেবল ইমোশনাল কনটেন্ট নয়; এগুলো ন্যারেটিভ শিফটের প্রয়াস। একটি দলকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে বের করে আক্রমণাত্মক কিন্তু সংযত বয়ানে স্থানান্তর করা হয়েছে। কমিউনিকেশনের ভাষায় এটি রিফ্রেমিং। বিরোধীদের নির্ধারিত প্রশ্নে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে, নিজস্ব প্রশ্ন ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণত উচ্চকণ্ঠ, সংঘাতমুখর এবং প্রতিক্রিয়াশীল ভাষা প্রাধান্য পায়। বিশ্লেষণী, সংযত এবং তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত ব্যক্তিদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অতীতে আওয়ামী লীগের মধ্যে গওহর রিজভির মতো কিছু নীতিনির্ধারণী বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি ছিল, কিন্তু সেই ধারাটি ক্রমে দুর্বল হয়েছে। বিএনপির সাম্প্রতিক কমিউনিকেশন কাঠামো দেখে মনে হয়েছে, তারা হয়তো একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরি করার চেষ্টা করছে যেখানে গবেষক ও টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন।
তবে নির্বাচন জেতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা দুটি ভিন্ন প্রকল্প। ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক যোগাযোগের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হবে। এতদিন বিরোধী অবস্থানে থাকায় সিভিল সোসাইটি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং একাডেমিকদের একটি অংশ বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই পরিসরের বড় অংশ সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করবেন, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দলকে এমন এক যোগাযোগনীতি গ্রহণ করতে হবে যা সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে, নীতিগত সংলাপের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানেই একাডেমিকভাবে প্রশিক্ষিত, নীতি-বিশ্লেষণে দক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গুড গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠী বা মাঠের সংগঠকদের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। প্রয়োজন হবে জ্ঞানভিত্তিক নীতি-প্রস্তুতি এবং যুক্তিনির্ভর যোগাযোগ। বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি বলপ্রয়োগ বা ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে টেকসই হবে না। এটি টিকবে নীতির স্বচ্ছতা, যুক্তির দৃঢ়তা এবং সহমর্মিতার ওপর।
বিএনপি এই নির্বাচনে যে ট্যালেন্ট ও দক্ষতাকে ব্যবহার করেছে, ক্ষমতায় গেলে সেই দক্ষতাকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, সেটিই হবে তাদের শাসনদক্ষতার পরীক্ষা। কমিউনিকেশন টিমকে যদি কেবল নির্বাচনকালীন যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে অর্জিত ন্যারেটিভ সুবিধা দ্রুত ক্ষয় হবে। কিন্তু যদি তাদের নীতি-প্রণয়ন, জনসম্পৃক্ততা এবং সংকট-ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে জায়গা দেওয়া হয়, তবে এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত দল টিকে থাকে স্লোগানে নয়, টিকে থাকে কাঠামোগত সক্ষমতায়। নীরবে যারা চিন্তা, গবেষণা এবং কৌশল দিয়ে রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ করেন, তারাই দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির রূপ নির্ধারণ করেন। বিএনপির সামনে এখন সুযোগ রয়েছে একটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সজ্জিত, সংযত কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার। তারা সেই পথ বেছে নেবে কিনা, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শাসনচিত্র।
২০০৮–এর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন: গণতন্ত্রের গুণগত মানের এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা

মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ আগামীকাল বৃহস্পতিবার বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পরিপক্বতার মাপকাঠি, নাগরিক চেতনার আয়না এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের পর এই নির্বাচন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরীক্ষা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি গণতন্ত্রকে কেবল ভোটের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি এটিকে সামাজিক সংহতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারব?
২০০৮ সালের পর এই প্রথম দেশ একটি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে অংশগ্রহণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক আমাদের রাজনৈতিক পরিসরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, এবারের নির্বাচন তা অতিক্রম করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের প্রাণ; কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি সহিংসতা, অবিশ্বাস এবং প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করে।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো একই দিনে দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য, অন্যটি গণভোটের জন্য। এই দ্বৈত প্রক্রিয়া একদিকে নাগরিক অংশগ্রহণকে বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে নির্বাচনটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক দক্ষতারও পরীক্ষা।
গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে নয়; বরং অংশগ্রহণের বিস্তৃতিতে। একটি কম্পিটিটিভ ইলেকশনের প্রধান শর্ত হলো ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। ভোটার উপস্থিতি যত বেশি, নির্বাচনের সামাজিক বৈধতা তত দৃঢ় হয়। ২০০৮–এর পর যে বিতর্ক আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিভক্ত রেখেছে, এবারের নির্বাচন তা নিরসনের সুযোগ এনে দিয়েছে।
কিন্তু অংশগ্রহণ কেবল ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; এটি আস্থার প্রশ্ন। ভোটার যদি মনে করেন তার ভোট নিরাপদ, গণনা স্বচ্ছ এবং ফলাফল সম্মানিত হবে, তবেই তিনি অংশ নেবেন। এই আস্থা তৈরি করা রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
বিশেষত তরুণ ভোটারদের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুবসমাজ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই শক্তি কি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হবে, নাকি তা কেবল আবেগের বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ থাকবে?
একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজন একটি উচ্চাভিলাষী প্রশাসনিক উদ্যোগ। দুটি ব্যালট মানে ভোটারকে দুইবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভোটকর্মীদের দ্বিগুণ সতর্ক থাকতে হবে এবং কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বাড়তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। দীর্ঘ সারি, ধীরগতির ভোটগ্রহণ বা ব্যালট বিভ্রান্তি সহজেই উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়ের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা এবং ভোটারদের দ্রুত ও নির্বিঘ্নে ভোট প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করা। ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং বুথ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যবেক্ষণ ও আপত্তি জানানো গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু তা যেন প্রক্রিয়াকে অচল করে না দেয়। নির্বাচন একটি ফলাফল নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটি যদি সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ হয়, তবে ফলাফল নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কমে যায়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে উত্তেজনা স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তেজনা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেটিই রাজনৈতিক পরিণততার প্রমাণ। ভোটকেন্দ্রে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের ধৈর্য ধারণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা অপরিহার্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব দ্রুত ছড়ায়। একটি ভুল তথ্য মুহূর্তে সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো কর্মীদের সংযত রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি। বিজয়ী ও বিজিতদের আচরণই নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি দুর্বল করবে। পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমরা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। মতাদর্শিক বিভাজন সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে ঐক্যের একটি মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কাদা ছোড়াছুড়ি, তীব্র ভাষা ও সমালোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেমে যায়, রাষ্ট্র শুরু হয়।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কেবল প্রাণহানি বা সম্পদ নষ্ট করে না; এটি অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। তাই সংযম, সংলাপ এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কর্মসংস্থান সংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সরকারকে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামাজিক সমর্থন দেয়। অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ নীতি বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান তখন অধিক গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে প্রতিটি নীতিই রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে যায়।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু একটি পরিণত গণতন্ত্রে বিরোধী দল শত্রু নয়; তারা বিকল্প মতের প্রতিনিধিত্ব করে। ক্ষমতার পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; প্রতিহিংসা নয়। ধৈর্য, ভালোবাসা, মহানুভবতা ও ক্ষমা—এই শব্দগুলো আবেগঘন শোনাতে পারে, কিন্তু এগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বাস্তব উপাদান। দীর্ঘমেয়াদে যে রাজনীতি সংযম ও সহনশীলতার চর্চা করে, তারাই টিকে থাকে।
আগামীকাল আমরা কেবল ভোট দেব না; আমরা আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রের পরীক্ষা দেব। ২০০৮–এর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এবং একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—এই যুগপৎ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে।
শত মতবিরোধ সত্ত্বেও মনে রাখতে হবে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বিজয়ী যদি বিনয়ী হন এবং পরাজিত যদি উদার হন, তবে এই নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের পুনর্গঠনের মাইলফলক। গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আচরণে, ভাষায় এবং পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি উত্তেজনার পথ বেছে নেব, নাকি পরিণত গণতন্ত্রের?
আসুন, হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে হাতে হাত রেখে আগামীর একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে যাই। ইতিহাস আমাদের দেখছে; ভবিষ্যৎ আমাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
-লেখক মো. অহিদুজ্জামান ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। ইমেইল:[email protected]
আইনের রক্ষক পুলিশ কেন ভয়ের প্রতীকে পরিণত হয়?

রাকিবুল ইসলাম
সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার্থী গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
গতকাল ঢাকার যমুনা এলাকা ও শাহবাগে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি দিনের সহিংস ঘটনার বিবরণ নয়; বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি পুরোনো ও গভীর সংকটকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সেখানে পুলিশের লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী জাবেরসহ বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
কিন্তু এই ঘটনার বিবরণে সীমাবদ্ধ থাকলে আমরা মূল প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাব। প্রশ্নটি আরও গভীর এবং আরও অস্বস্তিকর—বাংলাদেশে কেন আন্দোলন হলেই পুলিশ এমন মাত্রায় বলপ্রয়োগে যায়?
এই দেশে সরকার বদলায়, ক্ষমতার ভাষ্য বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান পাল্টায়। কিন্তু রাজপথে নাগরিক প্রতিবাদ দমনের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার একটি ভয়ংকর ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নাগরিকের প্রতিবাদ মানেই যেন পুলিশের চোখে ‘শত্রু’ হয়ে ওঠা। এটি কেবল দুঃখজনক বাস্তবতা নয়; এটি সংবিধান, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিককে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার দিয়েছে। পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব সেই অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, পুলিশ সেই ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার একটি নগ্ন ও কঠোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি উঠে আসে—এই নিষ্ঠুরতা কি কয়েকজন সদস্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল, নাকি এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ?
পুলিশ সদস্যরাও এই সমাজেরই অংশ। তাঁদেরও পরিবার আছে, জীবন আছে, ঝুঁকি আছে। কিন্তু এই বাস্তবতা কোনোভাবেই অকারণ বলপ্রয়োগ, অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর নৈতিক বৈধতা দিতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যদি আইনই ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ধরনের ঘটনার পর খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা স্বচ্ছ তদন্ত, দায় নির্ধারণ বা দৃশ্যমান শাস্তির নজির দেখি। অধিকাংশ সময় ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায়, কিংবা “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়েছি” এই পরিচিত ও দায়সারা বিবৃতিতেই সব প্রশ্নের ইতি টানা হয়। এর ফলে পুলিশের ভেতরে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না; বরং এক ধরনের দায়মুক্তির নিশ্চয়তা আরও পোক্ত হয়।
এখানে রাষ্ট্রের দায় দ্বিমুখী। একদিকে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে পুলিশ কোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। অন্যদিকে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং কঠোর ও কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্দোলন মানেই শত্রুতা—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না এলে পরিস্থিতির কোনো টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আন্দোলন একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র যদি প্রতিটি আন্দোলনকে শক্তি দিয়ে দমন করতে চায়, তাহলে সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের নাগরিকদের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভয়ের মাধ্যমে শাসন কখনোই টেকসই হয় না—ইতিহাস তার বহু প্রমাণ দিয়েছে।
যমুনা ও শাহবাগের ঘটনাগুলো আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রশ্নটি শুধু ‘কে গুলি করল’ তা নয়; প্রশ্নটি হলো—‘কেন বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়?’ এই প্রশ্নের সৎ, নিরপেক্ষ ও সাহসী উত্তর না খুঁজলে আজ যে লাঠিচার্জ অন্যের ওপর হচ্ছে, কাল সেটি যে কার ওপর পড়বে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের হয়, তাহলে পুলিশের প্রধান অস্ত্র লাঠি বা গুলি নয়—আইন, সংবেদনশীলতা এবং জবাবদিহিই হওয়া উচিত তার মূল ভিত্তি।
-লেখক রাকিবুল ইসলাম গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী
আবেগ নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা: জামায়াতের নারী শ্রমনীতি কেন আত্মঘাতী

মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মজীবী মায়েদের জন্য একটি আপাতদৃষ্টিতে মানবিক ও কল্যাণমূলক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নারীদের কর্মঘণ্টা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে, কিন্তু তাদের মজুরি কমবে না। বরং বাকি অংশ সরকার বহন করবে। অর্থাৎ একজন নারী প্রতিটি সন্তানের জন্য প্রায় আড়াই বছর অর্ধেক সময় কাজ করেও পূর্ণ বেতন পাবেন। শুনতে এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, এমনকি সহানুভূতিশীলও মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা অর্থনীতি আবেগ দিয়ে নয়, কাঠামোগত বাস্তবতা ও উৎপাদন সম্পর্ক বোঝার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়। এই প্রস্তাব সেই বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটাই মূল প্রশ্ন।
এই প্রস্তাবের বাস্তবতা বোঝার জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দিয়েই আলোচনা শুরু করা যুক্তিযুক্ত। কারণ এই খাতেই দেশের নারী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় অংশ যুক্ত। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ৯০ শতাংশেরও বেশি নারী। একই সঙ্গে এটিই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এবং সামগ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
বাংলাদেশ বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে মূলত একটি কাঠামোগত কারণে: স্বল্প শ্রমমূল্য। এই শিল্পে কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পোশাক রপ্তানি সম্ভব হয় মূলত শ্রমের উপবৃত্ত মূল্য, অর্থাৎ surplus value of labour-এর মাধ্যমে। সহজ ভাষায় বললে, শ্রমিক যে পরিমাণ মূল্য উৎপাদন করে, তার পুরোটা মজুরি হিসেবে দেওয়া হয় না; একটি বড় অংশ মালিকের হাতে উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যায়।
বিষয়টি সংখ্যায় বোঝা যাক। ধরুন, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রতি ঘণ্টার প্রকৃত উৎপাদনমূল্য ২০০ টাকা। অর্থাৎ দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করলে তার দৈনিক উৎপাদনমূল্য দাঁড়ায় ১৬০০ টাকা এবং মাসে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে তাকে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো মজুরি। অর্থাৎ প্রায় ৩৬ হাজার টাকা মালিকের কাছে উদ্বৃত্ত হিসেবে থেকে যায়। এই উদ্বৃত্তের কারণেই বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার কিংবা ভিয়েতনামের তুলনায় কম দামে পোশাক রপ্তানি করতে সক্ষম হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি কর্মঘণ্টা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয় এবং মজুরি ভাগ করে সরকার ৬ হাজার ও মালিক ৬ হাজার টাকা দেয়, তাহলে কী হবে। প্রথমত, একজন শ্রমিকের ক্ষেত্রে মালিকের সরাসরি উৎপাদন ক্ষতি হবে প্রায় ১৮ হাজার টাকার সমপরিমাণ। কারণ অর্ধেক সময় কাজ মানে অর্ধেক উৎপাদন। অথচ বাজারে তাকে একই সময়ের মধ্যে একই পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করতে হবে।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু এখানেই শেষ নয়। অর্ধেক কর্মঘণ্টা মানে সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় ধস। গার্মেন্টস শিল্প আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত। এখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতারা অপেক্ষা করে না। তারা বিকল্প দেশ খোঁজে। একবার কোনো দেশ সরবরাহে অনিয়মিত হয়ে পড়লে সেই বাজার পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
আরেকটি মৌলিক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মূলত এসেম্বলি লাইন পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। এখানে উৎপাদন একটি সমন্বিত শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন শ্রমিক অনুপস্থিত থাকলেও পুরো চেইন ব্যাহত হয়। ধরুন, ৫০০ শ্রমিকের একটি কারখানায় মাত্র ১০ জন শ্রমিক অর্ধেক সময় কাজ করল। এর প্রভাব পড়বে পুরো ৫০০ জনের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় পুরো ব্যাচের ডেলিভারি ঝুঁকিতে পড়বে। কোনো মালিকই এমন অনিশ্চয়তা নিতে চাইবে না।
এই বাস্তবতা থেকে একটি অনিবার্য সিদ্ধান্ত আসে: মালিকরা ধীরে ধীরে নারী শ্রমিক নিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে। বিশেষ করে যাদের সন্তান আছে বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি বলে বিবেচিত হবে। ফলাফল হিসেবে এই নীতির উদ্দেশ্য যেখানে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া, বাস্তবে সেখানে নারীরাই শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়বে।
এখানে একটি বড় বিভ্রান্তি কাজ করছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে, সরকার এই বাড়তি মজুরি বহন করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন অর্থ দিয়ে। বাংলাদেশের বাজেট কাঠামো ইতোমধ্যেই উচ্চ ভর্তুকি, ঋণনির্ভরতা ও রাজস্ব ঘাটতিতে জর্জরিত। লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি সরকার বহন করলে বছরে অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকার বোঝা তৈরি হবে। সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে। কর বাড়িয়ে? ভর্তুকি কেটে? নাকি আরও বিদেশি ঋণ নিয়ে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র কোনো উৎপাদন না করে দীর্ঘমেয়াদে মজুরি ভর্তুকি দিতে পারে না। এটি করলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যয় সংকুচিত হবে। অর্থাৎ এক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও বড় সমস্যার জন্ম দেওয়া হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই প্রস্তাবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। পুরুষ শ্রমিকরা এত কম মজুরিতে কাজ করতে আগ্রহী নয়। নারী শ্রমিকরা যদি ধীরে ধীরে শিল্প থেকে বাদ পড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশ তার প্রতিযোগিতামূলক শ্রম সুবিধা হারাবে। ফলস্বরূপ বাজার চলে যাবে ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য দেশে। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস কার্যত অচল হয়ে পড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতির ওপর। একটি ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খাবে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, এমন একটি অবাস্তব ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী প্রস্তাব কীভাবে একটি বড় রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে জায়গা পায়। এর উত্তর সম্ভবত রাজনৈতিক পপুলিজম। আবেগঘন স্লোগান, নৈতিকতার মোড়ক ও বাস্তবতা-বিবর্জিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো নৈতিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি একটি জটিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা ও শিশুযত্ন সুবিধা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে শিল্পের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। যেমন, কার্যকর ডে-কেয়ার, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধির পথ তৈরি করা। কর্মঘণ্টা অর্ধেক করে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর দাঁড় করানো কোনো টেকসই সমাধান নয়।
নীতিনির্ধারণ আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝার ভিত্তিতেই করতে হয়। অন্যথায়, ভালো উদ্দেশ্যের নামে নেওয়া সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সমাজ ও অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।
পাঠকের মতামত:
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ডিজিটাল অসভ্যতা: গণতান্ত্রিক সংহতি রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ
- ৮০ কিমি বেগে আসছে তীব্র ঝড়! ৬ অঞ্চলের নদীবন্দরে ২ নম্বর সংকেত
- ভোগান্তি এড়াতে জেনে নিন: রবিবারের ঢাকার বন্ধ মার্কেটের তালিকা
- সোনার বাজারে খুশির আমেজ; বাজুসের নতুন মূল্যে বড় ছাড়
- ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি
- ফেসবুক পেজ নিয়ে ডাকসু ভিপি ও ছাত্রদল নেতার পাল্টাপাল্টি তোপ: উত্তাল ঢাবি
- হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে বন্দুক হামলা: অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
- যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত: ইরানি প্রেসিডেন্ট
- কুমিল্লায় মহাসড়কের পাশে কাস্টমস কর্মকর্তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার
- সিলেট চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাংলা নববর্ষ উৎযাপন প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
- ব্রাহ্মণপাড়ায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল উৎপাদন
- কাউন্সিলর সৈয়দ ফিরোজ গনি : জনসেবায় দুই দশকের বেশি সময়ের নিবেদিত পথচলা
- শিক্ষামন্ত্রীকে সারজিস আলমের খোঁচা
- বিশ্ববাজারে সোনার দামে অস্থিরতা: ৫ সপ্তাহ পর সাপ্তাহিক দরে বড় পতন
- পরের বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু হোক এখনই! চট্টগ্রামের মাঠে সোধির বড় পরামর্শ
- ভালোবাসার ঘর বাঁধা হলো না লিমন-বৃষ্টির: ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে
- ইরান ইস্যুতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজোট ইউরোপ
- খুদে শিক্ষার্থীর জন্য ‘মিড-ডে মিল’ আনছে সরকার
- ফ্যাসিবাদের পথে আ.লীগ হতে পারবে না বিএনপি: শফিকুর রহমান
- মার্কিন অর্থনীতি ধসের মুখে? বিনিয়োগকারীদের পালানোর পরামর্শ ইরানের
- যুদ্ধ কি আরও ছড়াচ্ছে? ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আবার রকেট হামলা
- মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী ঘোষণা
- টাকা ছাপিয়ে আর স্বস্তি নয়! মূল্যস্ফীতি রুখতে অর্থমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান
- গরমে নীরব ঘাতক হিট স্ট্রোক, জানুন সতর্কতা
- ঢাকার যে ১১ পাম্পে বাধ্যতামূলক হচ্ছে ফুয়েল পাস
- জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার নতুন যুগে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
- টাকার মান কি বাড়ল না কমল? দেখে নিন আজকের সর্বশেষ মুদ্রার রেট
- তীব্র দাবদাহে সুস্থ থাকার মহৌষধ: কী খাবেন আর কী এড়িয়ে চলবেন?
- ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য বন্ধ হলো আমেরিকার দুয়ার: তালিকায় বাংলাদেশও
- জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়ন হবেই: প্রধানমন্ত্রী
- যুক্তরাষ্ট্রে মেধাবী ছাত্র লিমনের করুণ পরিণতি! এখনো নিখোঁজ নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি
- স্বর্ণের দামে বড় ধস! এক ধাক্কায় অনেকটা কমল স্বর্ণ ও রুপার দাম
- ৩০ হাজার ইরানি হাজির অপেক্ষায় সৌদি আরব: সম্পর্কের নয়া অধ্যায়
- সকালে খালি পেটে মেথি পানি: আপনার শরীরের জন্য কেন এটি অমৃত?
- ভাড়া বাড়ানো হয়নি, সাথে ‘সমন্বয়’ করা হয়েছে: সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
- প্রয়োজনে সংসদ ও রাজপথ একাকার হবে! সরকারকে নাহিদ ইসলামের চরম হুঁশিয়ারি
- কবে শেষ হবে লোডশেডিং? সুখবর দিলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী!
- একই শহরে ইরান ও আমেরিকার শীর্ষ প্রতিনিধিরা! ইসলামাবাদে কি তবে শান্তি চুক্তি?
- মাঝ সমুদ্রে নৌযান উড়িয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্র! ট্রাম্পের নির্দেশে রক্তক্ষয়ী অভিযান
- শনিবার ঢাকার যেসব মার্কেট ও দর্শনীয় স্থান বন্ধ থাকবে
- যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত পূরণ হয় এমন প্রস্তাব পাঠাচ্ছে ইরান: ট্রাম্প
- বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচসহ আজকের ক্রীড়া সূচি
- তাপপ্রবাহের মধ্যেই ঝড়-বৃষ্টির নতুন সতর্কতা
- আজ ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে যা জানাল ইরান
- আজ নামাজের সময়সূচি দেখে নিন
- দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলে জ্বালানি তেলের দাম: বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
- "মিত্রদের" জন্য হরমুজে ফি মওকুফ, মধ্যপ্রাচ্যে আরো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ: কী বার্তা দিচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র?
- ত্বক ও চুলে অ্যালোভেরার অবিশ্বাস্য উপকারিতা
- কেন জুমায় সূরা কাহফ পড়তে বলা হয়েছে
- সব রেকর্ড চুরমার: স্বর্ণের দাম বাড়াল বাজুস, আজকের রেট জেনে নিন
- ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বিপাকে স্বর্ণের বাজার! বাড়ছে দুশ্চিন্তা
- কালিগঞ্জ ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়! আদালতের নির্দেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি
- স্বপ্ন না কি দুঃস্বপ্ন? সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এক ভরি স্বর্ণ
- সোনার সাথে রুপার দামেও আগুন! আজ থেকে কার্যকর নতুন দর
- রেকর্ড দামের পর অবশেষে স্বস্তি: সোনার ভরিতে বড় ছাড় দিল বাজুস
- ২১ এপ্রিল: শেয়ারবাজার লাভে থাকা শীর্ষ ১০ শেয়ার
- পৃথিবী: প্রাণ, পানি আর রহস্যের গল্প
- ২০ এপ্রিল: শেয়ারবাজার লাভে থাকা শীর্ষ ১০ শেয়ার
- ২১ এপ্রিল: আজকের শেয়ারবাজার বিশ্লেষণ
- যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নতুন শর্ত
- ধান-চালের নতুন দাম ঘোষণা সরকারের
- বিশ্ববাজারে কমছে তেলের দাম
- আজ নামাজের সময়সূচি দেখে নিন
- ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য বন্ধ হলো আমেরিকার দুয়ার: তালিকায় বাংলাদেশও



.jpg)


