Banner

বিশেষ প্রতিবেদন

জামায়াতে ইসলামী: অতীতের ছায়া ছাপিয়ে কি নতুন শুরু সম্ভব?

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ নভেম্বর ১৬ ২১:১১:০৮
জামায়াতে ইসলামী: অতীতের ছায়া ছাপিয়ে কি নতুন শুরু সম্ভব?

লাহোর প্রস্তাব, পাকিস্তান আন্দোলন, ভারত ভাগ, তারপর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির এক জটিল অধ্যায়ের নাম জামায়াতে ইসলামী। দলটি কখনো পাকিস্তান রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধী, কখনো সেই পাকিস্তানেরই শরিক, আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত। স্বাধীন বাংলাদেশের ভেতরেও নিষেধাজ্ঞা, পুনরুত্থান, জোট রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধের বিচার, সাম্প্রতিক নিষিদ্ধ ঘোষণা, সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ নেই। আজকের আলোচনায় তাই গোড়া থেকে বর্তমান পর্যন্ত জামায়াতের রাজনৈতিক চিন্তা, কৌশল, অর্জন, ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ অনুসন্ধান।

লাহোর প্রস্তাব, রাষ্ট্রধারণার জন্ম এবং পাকিস্তান আন্দোলনের ভূমিকা

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে রাষ্ট্র গঠনের একটি প্রস্তাব পেশ করলেন। তার সেই প্রস্তাবকে হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত পত্রপত্রিকাগুলো প্রচার করতে লাগল পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে। কিন্তু সেই প্রস্তাবে কোথাও পাকিস্তান নামটির উল্লেখ ছিল না। এমনকি মুসলিম লীগের মুখপাত্রদেরও এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না।

হিন্দু মহলের ধারাবাহিক প্রচারণার ফলেই মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাঝে রাষ্ট্রধারণার স্পষ্ট বোধ তৈরি হতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪১ সালের ১৫ই এপ্রিল মাদ্রাজ অধিবেশনে তথাকথিত পাকিস্তান প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের শাসনতন্ত্রে মূল নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে জোরালো হতে থাকে পাকিস্তান আন্দোলন। অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনও প্রবল হয়ে উঠছিল। ইতিহাসের এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে মুসলিম রাজনীতির আরেকটি নতুন ধারার উদ্ভব ঘটে, যেখান থেকে পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী আত্মপ্রকাশ করে।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, মুসলিম লীগ এবং মতাদর্শিক বিভক্তি

যখন পাকিস্তান আন্দোলন জোরালো হচ্ছিল, সেই সময় উপমহাদেশে মুসলিমদের বড় দুটো রাজনৈতিক শিবির ছিল মুসলিম লীগ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। পাকিস্তান প্রশ্নে এই দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট মতানৈক্য দেখা দেয়। মুসলিম লীগ ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে, আর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ছিল ভারতের অখণ্ডতার পক্ষে।

জমিয়তের চিন্তা ছিল, ইতিপূর্বেই ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের বিস্তৃত ইতিহাস রয়েছে, ভবিষ্যতের অখণ্ড ভারতেও মুসলিমরাই শাসন ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে। তাদের কাছে ভূখণ্ড অখণ্ড রাখা এবং তার ভেতরেই মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ছিল বেশি যৌক্তিক। কিন্তু মুসলিম লীগের চোখে রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের ভিত্তিতে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে মুসলিম নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের পথ খুঁজছিল।

তৎকালীন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র ছিল ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকা, যেই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। জমিয়তের সাথে মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে তিনি ধীরে ধীরে সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে সরে যান এবং পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা লাভ করে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ।

জামায়াতে ইসলামী হিন্দের জন্ম ও পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান

১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ৭৫ জন সদস্যের উপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী ঘোষণার পর মওদুদী জামাতের আমির হিসেবে মনোনীত হন। সেখান থেকেই শুরু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আদর্শিক যাত্রা।

সে সময় থেকেই তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করতে থাকেন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে দাবি করেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করা মুসলিম লীগ, জিন্না, এরা কেউই খাঁটি মুসলিম নন। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও পক্ষে ছিল না। প্রশ্ন জাগে, তাহলে জামাত তথা মওদুদীর উদ্দেশ্য কী ছিল?

মওদুদী সম্পর্কে একটি বিষয় আগে জানা দরকার। যৌবনে ভারতের মার্ক্সবাদী নেতা আব্দুস সাত্তার খায়রীর বিশেষ অনুরাগী ছিলেন তিনি, আবার ছিলেন সিদ্ধহস্ত লেখক। মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তার আগ্রহ ছিল ব্যাপক। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মাসিক ‘তরজমানুল কোরআন’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি নিজের মতবাদ প্রচার শুরু করেন। এই পত্রিকার ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় মওদুদী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে লেখেন, পাকিস্তান নামক কোন রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা আহাম্মুকের বেহেশত এবং মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র হবে।

এই ধরনের লেখালেখি ও প্রচারণার ফলে মুসলিম লীগ সমর্থকরা জামাতকে ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের দালাল বলে মনে করতে শুরু করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, এবং পরিহাসের বিষয় হচ্ছে সেই পাকিস্তানেরই মাটিতে গিয়ে ঠাঁই নিতে হয় পাকিস্তানবিরোধী জামায়াতে ইসলামী হিন্দের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীকে।

পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী: গ্রেপ্তার, দাঙ্গা ও মৃত্যুদণ্ডাদেশ

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জামায়াতে ইসলামী হিন্দ ও জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় সংগঠনটি। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমির হন মওলানা মওদুদী, আর জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমির হন আবুল লাইস ইসলাহী নাদভী।

পাকিস্তানে গিয়ে মওদুদী ইসলামী সংবিধান ও ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য জোরালো প্রচারণা শুরু করেন। এই কারণে পাকিস্তান সরকার জননিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেপ্তার করে। একই বছরে পাকিস্তানি জামায়াতে ইসলামী পূর্ব পাকিস্তান শাখা খোলে। এরই মধ্যে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতায় সংগঠনটির শক্তি ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৫০ সালে মওদুদীকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করে আইন পাশ করার দাবিতে আবারো আন্দোলন শুরু করে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান। মওদুদী পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং পাকিস্তান সরকারকে আহমদীয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। সে সময় জামায়াতের কিছু সমর্থক লাহোরে আহমদীদের উপর হামলা চালায়, এর জের ধরে শুরু হয় দাঙ্গা। সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে দাঙ্গা দমে গেলেও, এই সহিংসতায় প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ভারত–পাকিস্তান বিভাজনের পর কোনও একক দাঙ্গায় এত মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা এটি প্রথম।

ঘটনার পর মওলানা মওদুদীকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করে। বিচারে তাকে দাঙ্গার মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মুসলিম দেশের মধ্যস্থতায় তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৫৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা ‘ছাত্র সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এখন ইসলামী ছাত্রশিবির নামে পরিচিত।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ: স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিরোধিতা ও নিষেধাজ্ঞা

জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পর্ক এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী জামাত ১৯৭১ এ এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়। অনেকের বিশ্লেষণে ধরা হয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতার যে ঐতিহাসিক ভুল তারা মনে করেছিল, তার কাফফারা দিতেই একাত্তরে জামায়াত শুধু বাংলাদেশের বিরোধিতাই করেনি, বরং স্বাধীনতা আন্দোলন রুখে দিতে শান্তি কমিটি গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে।

জামায়াতের প্রেসক্রিপশন অনুসারেই তাদের ছাত্র উইং ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়েই রাজাকার, আল বদর ও আলশামস বাহিনী গঠিত হয়। এমনকি স্বাধীনতা-উত্তর সময়েও পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জামায়াত নানা কার্যক্রম পরিচালিত করে, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে গোলাম আজম লন্ডনে গিয়ে পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করেন।

কিন্তু পাকিস্তানের বিরোধিতার মতো বাংলাদেশের বিরোধিতাও শেষ পর্যন্ত অকার্যকর প্রমাণিত হয়। যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন জামায়াত নেতারা পালিয়ে যান সেই পাকিস্তানেই, যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা তারা একসময় করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জামাতসহ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সকল দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের বিরোধিতা ও গণহত্যায় সহায়তার জন্য ১৯৭৩ সালে যে ৩৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়, তার অন্যতম ছিলেন গোলাম আজম। তবু প্রহসনের মতো কিছুদিন পরই গোলাম আজমকেও মওদুদীর মতো সেই রাষ্ট্রেই ফিরতে হয়, যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি এবং তার দল কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের পুনরুত্থান, জোটরাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার। রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করেন, যা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেছিল। এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে জামাত সমমনোভাবাপন্ন ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৪ আগস্ট ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ (আইডিএল) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে। আইডিএলের ছায়ায় জামাতের নেতা–কর্মীরা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র নীতি ইসলামী দলগুলোর জন্য, বিশেষ করে জামায়াতের জন্য, সাপে বর হয়ে আসে। ফলস্বরূপ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ছয়টি আসন জিতে নেয়, যা জামাতের শক্তি ও মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও জাতীয় পার্টির উত্থান ঘটে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জামায়াতও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন লাভ করে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দিয়ে ১৭টি আসন ও দুটো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পায়। যদিও ১৯৯৬ ও ২০০৮ এর নির্বাচনে যথাক্রমে মাত্র ৩টি ও ২টি আসন পায় তথাপিবাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত এক বড় ফ্যাক্টরে পরিণত হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলে, কিছুদিন পর থেকেই যুদ্ধপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বিচার কতটা প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্য নিয়ে আর কতটা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই ওঠে। কারণ সেই বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জামায়াতকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার আওয়ামী লীগের নীলনকশা অনেকটা বাস্তবায়িত হয়ে যায় বলে বিশ্লেষণ রয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগ সরাসরি জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ না করে দলটিকে নানা উপায়ে ব্যবহার করারও চেষ্টা করেছে বলে এক ধরনের মত প্রচলিত আছে। তবু আসল সত্য এই যে, এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জামায়াত কোনোভাবে টিকে আছে, এটাকেই অনেকে তাদের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে তুলে ধরেন। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ তাদের কমই হয়েছে, প্রশ্ন থাকে কেন?

বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও জামায়াতের সীমাবদ্ধতা

উপমহাদেশের ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামী অন্যতম প্রাচীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। তথাপি রাজনীতির এই দীর্ঘ সময়ে দলটির আহামরি কোনও অর্জন নেই। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতের মতন সুসংগঠিত ইসলামী দল কেন একবারের জন্যও এককভাবে ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেনি, কিংবা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি যেতে পারেনি, তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ ভক্তিপ্রবণ হলেও বিশ্বাসের দিক থেকে তুলনামূলক উদার। এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বাস্তবতার পাশাপাশি সুফি ঐতিহ্য মানুষের ধর্মীয় আবেগকে নরম ও আধ্যাত্মিক রেখেছে। ধর্মের র‍্যাডিকাল ব্যাখ্যা কখনোই এই অঞ্চলের মানুষের মূল চরিত্র গড়ে দিতে পারেনি। যার ফলে জামায়াত কিংবা জামায়াতের মত রেডিক্যাল মতাদর্শের দল কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, জামায়াতসহ অনেক ইসলামী দল সেই অর্থে ‘গণমানুষের অংশ’ হয়ে উঠতে পারেনি। এজন্য আমরা দেখি ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ সালের মতো জনজাগরণের সময়ও গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে তারা অবস্থান নিয়েছে। এ ধরনের অবস্থান তাদের প্রতি বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর আস্থা গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, ইসলামপন্থীদের মধ্যে শতধা বিভক্তিও এই ব্যর্থতার বড় কারণ। সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক জনগণের মনে ইসলাম ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব আছে, কিন্তু বাস্তবে ইসলামপন্থী রাজনীতি নানা দল এবং উপদলে বিভক্ত। এতে জামায়াতের সম্ভাব্য ভোটব্যাংক ছড়িয়ে–ছিটিয়ে গেছে।

দেওবন্দী, সুফি, ওয়াহাবি: আকিদাগত দ্বন্দ্ব এবং জামায়াতের অবস্থান

বাংলাদেশ মূলত সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। সুন্নিদের মধ্যে দেওবন্দী, সুফিবাদী ধারা এবং ওয়াহাবি মতাদর্শ একটি ডমিনেন্ট উপগোষ্ঠী হিসেবে বিদ্যমান। জামায়াতে ইসলামীর ধর্মীয় আকিদা মধ্যপ্রাচ্যের ওয়াহাবিজম দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত, আর রাজনৈতিক দিক থেকে জামায়াত ইসলাম মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের মতাদর্শধারী। তাদের এই মতাদর্শিক কাঠামোর সাথে প্রচলিত সুন্নি ও দেওবন্দী ধারার দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট। অনেক সময় একদল অন্যদলকে কাফের বা ভণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।

এছাড়াও সুফিদের মাধ্যমে ইসলাম আসা এই ভূখণ্ডে সুফিজম বা মিস্টিসিজমের প্রভাবও লক্ষণীয়। যাদেরকে জামাত অনেকটা প্রকাশ্যেই ‘বেদাতি’ হিসেবে গণ্য করে। ফলে ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল জনগোষ্ঠীও নানাভাবে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই মতবিরোধের ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে। জমিয়ত তথা দেওবন্দী সিলসিলার আলেমগণ, বিশেষ করে হুসাইন আহমদ মাদানীর সাথে সায়েদ আবুল আলা মওদুদীর মতানৈক্য এবং সেখান থেকে উদ্ভূত দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই জামায়াতে ইসলামীর জন্ম। মওদুদীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, মুসলমানদের জাতীয়তা বা পরিচয় দেশ বা স্থানের সাথে নয়, বরং বিশ্বাসের সাথে যুক্ত। অপরদিকে ওলামায়ে দেওবন্দের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, জাতীয়তা দেশ এবং ভূখণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত।

তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন, কওমে আদ এবং কওমে সামুদের মত কওমগুলোর পরিচয়ও স্থান এবং দেশের সাথে জড়িত, আল্লাহ পবিত্র কোরআনেও তাদেরকে কওম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওলামায়ে দেওবন্দের সাথে জামায়াতের আরেকটি মৌলিক মতবিরোধ ছিল সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে সব সাহাবী ঈমান, আমল, আদর্শ – সব ক্ষেত্রে সত্যের মাপকাঠি, কিন্তু মওদুদী তার ‘মিয়ারে হক’ বইতে সাহাবায়ে কেরামকে সেই অর্থে হকের একমাত্র মাপকাঠি নন বলে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

তার ‘খেলাফত ও মলিকিয়াত’ এবং ‘রাসায়েল মাসায়েল’ বইয়ে উটের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ ইত্যাদি প্রসঙ্গে আমিরে মুয়াবিয়া সহ কিছু সাহাবীর প্রসঙ্গে তাঁর কিছু সমালোচনামূলক মন্তব্যকে দেওবন্দী আলেমরা সাহাবাবিরোধী মনোভাব হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, যারা সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনায় লিপ্ত থাকে, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ভেতর অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে না। এই আকিদাগত মতপার্থক্য থেকে রাজনৈতিক মতবিরোধ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। হোসাইন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বে তৎকালীন ওলামায়ে দেওবন্দ মওদুদীকে ‘গোমরাহ’ বলে ফতোয়া দেন বলে প্রচলিত। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের কওমী আলেম ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ – দুই ধারার মধ্যেও এই দ্বন্দ্ব এখনো কমবেশি বিদ্যমান।

জামায়াত কি ইসলামী দল, নাকি রাজনৈতিক ব্র্যান্ড?

এই প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই আছে: জামায়াতে ইসলামী কি আসলেই ইসলামী দল, নাকি ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল হিসেবে অভিনয় করছে? অনেক বিশ্লেষকের মতে, ধর্মের কথা বলা হলেও মূলত ভারতের কমিউনিজমবিরোধী শক্তি হিসেবেই একটি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল, ব্রিটিশ শাসকরাও তখন তাদের কিছুটা আনুকূল্য দিয়েছিল বলে ধারণা প্রচলিত।

মওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামকে বাংলাদেশের অনেক ইসলামপন্থী দল ইসলামী দল হিসেবে গ্রহণ করে না। অনেক কওমী ঘরানার ও পীরপন্থী দলগুলো জামাতকে ‘গোমরাহ’ মনে করে। অন্যদিকে জামাতের ভেতরের অনুরাগীরা নিজেদেরকে একটি আদর্শ ইসলামী আন্দোলনের বাহক হিসেবে দেখেন।

নিষেধাজ্ঞা, টিকে থাকা এবং সাম্প্রতিক পুনর্নিষেধাজ্ঞা

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত অন্তত চার দফায় জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮ ও ১৯৬৪ সালে, আর বাংলাদেশে ১৯৭২ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে মোট দুইবার নিষিদ্ধ হয় দলটি। তারপরও সংগঠনটি আন্ডারগ্রাউন্ড বা বিকল্প প্ল্যাটফর্মে থেকে সাংগঠনিক উপস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

জামাত দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে, নিষেধাজ্ঞা, দমন–পীড়ন সত্ত্বেও টিকে থাকা – এটাই তাদের রাজনৈতিক সফলতা। সমালোচকদের মতে, এটি টিকে থাকা হলেও গণআকাঙ্ক্ষার মূলধারায় প্রবেশ করতে না পারার এক দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাসও বটে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: ইসলামী ঐক্যের কথা, জেনারেশন জেড এবং ‘হিন্দু শাখা’ বিতর্ক

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের মধ্যে জামাতের সাথে মতাদর্শিক বিবাদ থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার কিছু প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে। কিছুদিন আগে ইসলামী দলগুলোর কিছু নেতা–কর্মীকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখান থেকে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তথা চরমোনাই পীরও এক পর্যায়ে জামাতের সঙ্গে ঐক্যের সম্ভাবনার কথা ইঙ্গিত করেছেন, যদিও ইতিহাস বলে, ইসলামপন্থী দলগুলো ইতিপূর্বেও একাধিকবার ঐক্যের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা জেনারেশন জেড বা জেনজি প্রজন্মের বড় অংশের মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে বিরূপ বা অন্তত মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যুদ্ধাপরাধের ইস্যু, ৭১-এর ভূমিকা, নারী ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে জামাতের ভাবমূর্তি – সব মিলিয়ে তরুণদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়নি।

তারপরও এখন পর্যন্ত জামাতের নেতৃস্থানীয়রা তুলনামূলক ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। জামাত যদি তাদের ঐতিহাসিক ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে তারা এযাবতকালের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে – এমন সম্ভাবনার কথাও অনেকে বলছেন। তবে জামাত শক্তিশালী হলেই দেশে সরাসরি শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হবে – এমন ধারণা করারও সুযোগ নেই। কারণ ইতিপূর্বে বিএনপির সঙ্গে দুটো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ১৮ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সরকারে থেকেও ইসলামের প্রশ্নে তারা কার্যত উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনেনি।

২৬ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডি টপিক হিসেবে দেখা যায়, রংপুরে জামাতের ‘হিন্দু শাখা’র কমিটি গঠন করা হয়েছে। জামাত দেশি–বিদেশি পরিমণ্ডলে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে তারা কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠন নয়, বরং ‘মডারেট ইসলাম’-এর ধারক। ঐতিহাসিক এসব দিক পর্যালোচনা করলে অনেকে মনে করছেন, জামাতকে ইসলামী দলের চেয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

ইতিহাসের ভার, বর্তমানের হিসাব, ভবিষ্যতের প্রশ্ন

উপমহাদেশের এক বিরল রাজনৈতিক অর্গানাইজেশন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী একই সঙ্গে পাকিস্তানবিরোধী, পাকিস্তানের শরিক, স্বাধীনতা–বিরোধী এবং আবারও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে চাওয়া এক সংগঠন। লাহোর প্রস্তাব থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ – এই দীর্ঘ পথচলায় তাদের আদর্শ, অবস্থান, কৌশল বহুবার বদলেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জনগণের ঐতিহাসিক চরিত্র, ইসলামপন্থীদের ভেতরের বিভক্তি, আকিদাগত দ্বন্দ্ব, এবং যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন – সব কিছু মিলিয়ে জামাত কখনোই এই দেশে মূলধারার সর্বজনগ্রাহ্য শক্তি হতে পারেনি। তবু তারা টিকে আছে, এবং আবারও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রশ্ন রয়ে যায়, আগামী দিনে কি জামায়াতে ইসলামী নিজেদের অতীতের ছায়া থেকে সত্যিই বেরিয়ে আসতে পারবে? নাকি ইতিহাসের ভারই শেষ পর্যন্ত তাদের সম্ভাবনাকে বারবার থামিয়ে দেবে? এই উত্তর সময়ই দেবে।

-সালেহিন


আয়ের দৌড়ে শীর্ষ নেতাদের পেছনে ফেললেন নুর, হলফনামায় নতুন চমক

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ২১:৪৮:২৭
আয়ের দৌড়ে শীর্ষ নেতাদের পেছনে ফেললেন নুর, হলফনামায় নতুন চমক
ছবি: কোলাজ ইত্তেফাক

বাংলাদেশের রাজনীতির উদীয়মান মুখ এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বার্ষিক আয়ের হিসাবে দেশের অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে লড়াই করতে যাওয়া নুরের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁর বর্তমান বার্ষিক আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা। এই আয়ের অঙ্ক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের ঘোষিত আয়ের চেয়েও অনেক বেশি।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নুরের আয়ের প্রধান উৎস হলো ব্যবসা, যেখান থেকে তিনি বছরে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৬ টাকা আয় করেন। এছাড়া অন্যান্য খাত থেকে তাঁর ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬২২ টাকা আয় আসে। বিপরীতে তারেক রহমানের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা এবং ডা. শফিকুর রহমানের আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তবে বার্ষিক আয়ে এগিয়ে থাকলেও মোট সম্পদের হিসাবে নুর অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। নুরের মোট সম্পদ ৯০ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪১ টাকা দেখানো হলেও তারেক রহমানের সম্পদ রয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকার কাছাকাছি।

নুরুল হক নুরের সম্পদের খতিয়ানে উল্লেখ রয়েছে, তাঁর কাছে নগদ ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ২১৭ টাকা এবং ব্যাংকে প্রায় ৩ লাখ টাকা জমা আছে। পৈতৃক সূত্রে তিনি ৫৫ লাখ ৮০ হাজার ৩১১ টাকার আমানত লাভ করেছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে তাঁর নামে ৮২ ডেসিমেল এবং তাঁর স্ত্রী মারিয়া আক্তারের নামে ৩ একর কৃষিজমি রয়েছে। পেশায় শিক্ষিকা মারিয়া আক্তারের বার্ষিক আয় ১ লাখ ৯১ হাজার ৮৮০ টাকা। নুরের বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে ৬টি মামলা চলমান রয়েছে এবং এর আগে তিনি ৮টি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

জোটগত সমঝোতার কারণে নুরের নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি, যার ফলে নুরের জয়ের পথ অনেকটা সুগম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সেখানে সাবেক বিএনপি নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র হিসেবে এবং নুরেরই দলের শহিদুল ইসলাম ফাহিম মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় লড়াই হবে ত্রিমুখী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের আগে নুরের এমন উচ্চ আয়ের তথ্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।


ঠাকুরগাঁওয়ে ফখরুলের সম্পদের পাহাড়? হলফনামায় মিলল বড় তথ্য

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১৯:১৩:৫৮
ঠাকুরগাঁওয়ে ফখরুলের সম্পদের পাহাড়? হলফনামায় মিলল বড় তথ্য
ছবি : সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২৯ ডিসেম্বর (সোমবার) তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা দাখিল করা হয়েছে, তাতে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৫ টাকা। এছাড়া হলফনামায় তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৩ টাকা।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, মির্জা ফখরুলের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৫ একর কৃষি জমি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া ঢাকার পূর্বাচলে তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৫ কাঠা জমি, যার আনুমানিক মূল্য ৮৫ লাখ ৪ হাজার টাকা। ভবন ও আবাসিক সম্পদের তালিকায় রয়েছে ঢাকায় ১৯৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (মূল্য ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা) এবং ৪ শতাংশ জমি। তাঁর স্ত্রীর নামেও ঠাকুরগাঁওয়ে অকৃষি জমি এবং পৈতৃক বাড়ি রয়েছে, যার সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকার উপরে।

অস্থাবর সম্পদের বর্ণনায় দেখা যায়, মির্জা ফখরুলের হাতে নগদ ১ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ১১৬ টাকা রয়েছে এবং তাঁর স্ত্রীর কাছে রয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩০ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে জমা রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এছাড়া তাঁর ২টি ব্যক্তিগত গাড়ি, ১০ ভরি সোনা এবং ৫ লাখ টাকার আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে। আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষি, ব্যবসা (হুরমত আলী মার্কেটের শেয়ার), ইজাব গ্রুপের পরামর্শক সম্মানী এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের সম্মানী ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হলফনামার অন্যতম আলোচিত অংশ হলো তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা। মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মোট ৫০টি মামলা হয়েছিল। তবে এর বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক এবং বর্তমানে আদালতের নির্দেশে স্থগিত, প্রত্যাহার বা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে এসব মামলার কোনোটিই তাঁর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নয় বলে তিনি হলফনামায় অঙ্গীকার করেছেন।


খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে হাসিনা মুক্তি পাবেন না: নজরুল

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১৮:৫৭:৫৪
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে হাসিনা মুক্তি পাবেন না: নজরুল
জানাজার আগে খালেদা জিয়ার জীবনের নানা ঘটনার বর্ণনা দেন নজরুল ইসলাম খান। বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার আগে সমবেত লাখো মানুষের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, “দেশনেত্রীকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনও মুক্তি পাবেন না।” বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজার আগে তিনি বেগম জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং কারাজীবনে তাঁর ওপর হওয়া অমানবিক আচরণের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, দেশবাসী সাক্ষী—খালেদা জিয়া হেঁটে কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু নির্জন কারাগারে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তিনি চরম অসুস্থ হয়ে বের হয়েছিলেন।

নজরুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বাড়ি থেকে উৎখাত করেছিলেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা কেবল প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য দেশনেত্রীকে তাঁর শহীদ স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, যারা খালেদা জিয়াকে গৃহহীন করেছে, তারা আজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেকে রান্না করা খাবার পর্যন্ত খেতে পারেনি। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে আজ কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত।

বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কথা তুলে ধরে নজরুল ইসলাম খান জানান, তিনি খুব পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন এবং ফুলের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে তাঁর অনিবার্য যোগদানের ইতিহাস বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে ৯ বছরের স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, খালেদা জিয়াকে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ আপসে বাধ্য করতে পারেনি। তিনি সবসময় বলতেন, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই।’ তাঁর এই অটল দেশপ্রেম এবং অনমনীয়তার কারণেই তিনি আজ ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রইলেন। জানাজায় উপস্থিত লাখো মানুষ এই সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং হাত তুলে মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।


কেন তিনি ‘আপসহীন’? খালেদা জিয়ার জীবনের অজানা অধ্যায়

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১৮:২৮:০৬
কেন তিনি ‘আপসহীন’? খালেদা জিয়ার জীবনের অজানা অধ্যায়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়াকে আলাদা করে চেনা যায় তাঁর অটল সিদ্ধান্তের দৃঢ়তায়। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যখন বিএনপি এক টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে ১৯৮৪ সালে দলের হাল ধরেন তিনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের আসল পরীক্ষা শুরু হয় স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের আমলে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যেখানে অন্য দলগুলো অংশ নিয়েছিল, সেখানে খালেদা জিয়া একচুলও নতি স্বীকার করেননি। তাঁর সেই আপসহীন অবস্থানই ১৯৯১ সালে তাঁকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসায়।

খালেদা জিয়ার জীবনে ‘আপসহীন’ অভিধাটি কেবল একটি তকমা নয়, বরং এটি তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা কার্যকর করার চেষ্টা চলছিল, তখন খালেদা জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য ব্যাপক চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিদেশে তাঁর কোনো জায়গা নেই। এই অনমনীয় মনোভাবের কারণেই তৎকালীন সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ কারাবাস ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করলেও তিনি কখনো ক্ষমতার লোভে আদর্শ বিসর্জন দেননি।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাঁর ওপর পাহাড়সম চাপ ছিল। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা হওয়ার আগে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে বিরোধীরা রটিয়েছিল যে তিনি আর ফিরবেন না। কিন্তু সব রটনা ভুল প্রমাণ করে তিনি দেশে ফেরেন এবং আইনি লড়াই ও কারাবরণ বেছে নেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার অধীনে অংশ না নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সরকারের বৈধতা দেওয়ার চেয়ে গণতান্ত্রিক দাবিতে অনড় থাকা তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘খালেদা’ বইয়ে যথার্থই লিখেছেন যে, খালেদা জিয়ার রাজনীতি একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয়ভাবে অনেক চড়া মূল্য দিতে হলেও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পূর্ণ মুক্তি পেলেও তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রমাণ করে—সব আপস রাজনৈতিক লাভ আনে না, আর সব অনমনীয়তাও পরাজয় নয়। তাঁর জীবন ও রাজনীতি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল এক অপরাজেয় শক্তির প্রতীক হয়ে থাকবে।


জনসেবা ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস রেখে গেলেন তিনি

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১৮:১৯:১০
জনসেবা ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস রেখে গেলেন তিনি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে এক আবেগঘন ও স্মৃতিবিজড়িত বার্তা দিয়েছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তাঁর মাকে ‘এক মমতাময়ী মা’ এবং ‘দেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তারেক রহমান লিখেছেন যে, বেগম জিয়ার কাছে তাঁর নিজের পরিবারের চেয়েও এই দেশ এবং দেশের মানুষ ছিল অনেক বড় সত্তা ও অস্তিত্ব।

ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া আজীবন স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। চরম একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তার মাঝে থেকেও তিনি অদম্য সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে টিকে ছিলেন। তারেক রহমানের মতে, মা হিসেবে তিনি ছিলেন পরিবারের অভিভাবক আর দেশনেত্রী হিসেবে ছিলেন জাতির পথপ্রদর্শক। এমন একজন আলোকবর্তিকাকে হারিয়ে আজ পুরো দেশ শোকাহত।

তারেক রহমান তাঁর পোস্টে আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের স্বার্থে খালেদা জিয়া স্বামী হারিয়েছেন এবং আদরের সন্তানকেও হারিয়েছেন। নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে তিনি রেখে গেছেন জনসেবা আর ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি যেভাবে দেশপ্রেম সঞ্চার করেছিলেন, তা তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য শক্তির উৎস হয়ে থাকবে বলে তিনি জানান।

পোস্টের শেষ অংশে তারেক রহমান দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁর মায়ের প্রতি সাধারণ মানুষের এই অকৃত্রিম আবেগ, ভালোবাসা আর বিশ্বজুড়ে যে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে, তার জন্য তিনি ও তাঁর পরিবার চিরকৃতজ্ঞ। তিনি দেশবাসীকে তাঁর মায়ের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। এই শোকাবহ সময়ে তারেক রহমানের এমন সহজ অথচ গভীর বার্তায় নেতাকর্মীদের মাঝে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।


কত টাকার মালিক হাসনাত? সম্পদের হিসাব প্রকাশ

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১৩:০৭:৪৮
কত টাকার মালিক হাসনাত? সম্পদের হিসাব প্রকাশ
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা–৪ (দেবিদ্বার) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা সোমবার দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলামের কাছে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেন।

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, হাসনাত আব্দুল্লাহর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ এবং বার্ষিক আয়ের সমন্বয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি তাঁর নামে ব্যাংকে জমাকৃত সোনার মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা, যা সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ।

হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে তাঁর ঘোষিত বার্ষিক আয় ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। পেশাগত পরিচয়ে তিনি নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে হলফনামায় জানানো হয়েছে, তাঁর কোনো কৃষিজমি নেই এবং তিনি কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী নন।

ব্যক্তিগত সম্পদের খতিয়ান অনুযায়ী, তাঁর মালিকানায় রয়েছে আনুমানিক ১ লাখ টাকার আসবাবপত্র এবং ৬৫ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী। এ ছাড়া তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকৃত মূলধনের পরিমাণও দেখানো হয়েছে ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা।

হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা বা অভিযোগ বিচারাধীন নেই। একই সঙ্গে তাঁর পিতা-মাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানের নামে কোনো ব্যাংক ঋণ বা আর্থিক দায় নেই বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্ত্রীকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হলফনামায়।

-রাফসান


জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন: মানিক মিয়ার পথে বেগম জিয়া

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১২:০৩:৪৪
জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন: মানিক মিয়ার পথে বেগম জিয়া
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার রাজপথ এখন এক ঐতিহাসিক শোকযাত্রার সাক্ষী। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী জাতীয় পতাকায় মোড়ানো গাড়িটি বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ০৪ মিনিটে তাঁর ছেলে তারেক রহমানের গুলশানের ১৯২ নম্বর বাসভবন থেকে জানাজার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। কড়া পুলিশ ও বিজিবি পাহারায় এই গাড়িবহরটি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে, যেখানে আজ বাদ জোহর দুপুর ২টায় তাঁর শেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এই শোকাবহ যাত্রাটিতে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও শরিক হয়েছেন। গাড়িবহরে থাকা একটি বিশেষ লাল-সবুজ বাসে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা জাইমা রহমান। এছাড়া প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর পরিবার এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যরাও এই বহরে রয়েছেন। এর আগে সকাল সোয়া ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত গুলশানের এই বাসভবনে আত্মীয়-স্বজন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা বরেণ্য এই নেত্রীকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা সম্পন্ন করার জন্য ইতিমধ্যেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে শুরু করে খেজুরবাগান ও বিজয় সরণি পর্যন্ত এলাকায় বিজিবির ২৭ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কয়েক লাখ মুসল্লি ইতিমধ্যেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জড়ো হয়েছেন। জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে।


শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য তারেক রহমানের বাসায় নেতাকর্মীদের ভিড়

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩১ ১১:০৯:৩৫
শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য তারেক রহমানের বাসায় নেতাকর্মীদের ভিড়
ছবি : সংগৃহীত

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় এক বিশেষ পরিবর্তন দেখা গেছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করার পর প্রাথমিকভাবে তাঁর দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে মরদেহবাহী গাড়িটি গুলশানে তাঁর ছেলে তারেক রহমানের ১৯২ নম্বর বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল সোয়া ৯টার দিকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি কড়া পুলিশ পাহারায় এই বাসভবনে প্রবেশ করে।

তারেক রহমানের গুলশানের এই বাসভবনেই এখন দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ, ঘনিষ্ঠ স্বজন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা বরেণ্য এই নেত্রীকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। এর আগে সকাল ৯টার কিছুক্ষণ আগে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হাসপাতাল থেকে গুলশান পর্যন্ত পুরোটা পথ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ পাহারায় মরদেহবাহী গাড়ি বহর নিয়ে আসা হয়। ভোর থেকেই এভারকেয়ার ও গুলশান এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ করা গেছে।

গুলশানের বাসায় সীমিত পরিসরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেগম জিয়ার মরদেহ জানাজার জন্য জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে বাদ জোহর দুপুর ২টায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, যাতে ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। প্রিয় নেত্রীকে শেষবার দেখার জন্য মঙ্গলবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা লঞ্চ, ট্রেন ও বাসে করে ঢাকার পথে রওনা হয়েছেন। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।


এবার এনসিপি প্রার্থী ডা. মিতুকে হত্যার হুমকি

রাজনীতি ডেস্ক . সত্য নিউজ
২০২৫ ডিসেম্বর ৩০ ২০:১০:১১
এবার এনসিপি প্রার্থী ডা. মিতুকে হত্যার হুমকি
ছবি : সংগৃহীত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের নির্বাচনী লড়াই শুরুর আগেই উত্তাপ ছড়িয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী এবং দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি জানান যে, একটি বিশেষ বিদেশি নম্বর থেকে তাঁকে পুড়িয়ে ও কুপিয়ে মারার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ডা. মিতু তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে, তিনি জোটের হয়ে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে বানোয়াট গল্প বানিয়ে চরিত্র হরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “জোটের খবর আওয়ামী লীগের পুচ্ছে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবে আমি ভয় পাচ্ছি না এবং বিচলিতও নই।” তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আগামীতে তাঁর বিরুদ্ধে এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও বা আপত্তিকর ছবি তৈরি করে অপপ্রচার চালানো হতে পারে। তাঁর স্বামীও বিষয়টি নিয়ে তাঁকে সতর্ক করেছেন বলে তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন।

এই হুমকির ঘটনায় ঝালকাঠির রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একজন নারী প্রার্থীর নিরাপত্তা ও সাইবার বুলিংয়ের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ডা. মিতু তাঁর অনুসারীদের বিচলিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে তিনি এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবেন।

এ বিষয়ে রাজাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বিষয়টি তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত ডা. মাহমুদা মিতু বা তাঁর পক্ষ থেকে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। ওসি আরও যোগ করেন যে, অভিযোগ পেলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পাঠকের মতামত:

ব্যক্তিগত দায় বনাম প্রাতিষ্ঠানিক দায়: দায়মুক্তির এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ঘটনা কাগজে পড়লে প্রথমে মনে হয় এটা যেন কোনো যুদ্ধের খবর। এক তরুণকে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে হাত–পা প্রায়... বিস্তারিত