আগামী মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়েই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ঘিরে জনমনে যেমন স্বস্তি আছে, তেমনি অনেকে এই সরকারের বিদায়কেও স্বাগত জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার একটি অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শুরুতে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে দায়িত্ব নেয় এই সরকার। বহু মানুষ আশা করেছিলেন, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। দুর্নীতি কমবে, প্রতিহিংসার রাজনীতি থামবে, অর্থনীতিতে গতি আসবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল সাধারণ মানুষের।
কিন্তু গত ১৮ মাসে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে সমালোচকরা মনে করেন। তাঁদের দাবি, সরকার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি; বরং রাজনৈতিক বিভাজন বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ড. ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অর্থপাচার ও শ্রম আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন মামলা দ্রুত প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি হওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার বাস্তবতায় এসব সিদ্ধান্ত জনমনে প্রশ্ন তোলে।
এই সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ বকেয়া কর মওকুফ এবং ভবিষ্যৎ আয় করমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকে সরকারের অংশীদারি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হয়। অনুমোদন পায় ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’। গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের মাধ্যমে শ্রমবাজারে কার্যক্রম বাড়ানো হয় এবং গ্রামীণ টেলিকম ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি পায়। ৭০০ কোটি টাকার সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গ্রামীণ ট্রাস্টে হস্তান্তর নিয়েও বিতর্ক হয়। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার বা প্রতিযোগিতা ছাড়াই এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।
সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হয়নি বলে সমালোচনা আছে। উপদেষ্টাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের শেষ সময়ে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনাসহ কয়েকটি চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্ত করে চুক্তি করা হয়েছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দেশ ত্যাগ করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১৮ মাসে মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা ও মানবাধিকার সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। একই সময়ে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি, হেফাজতে মৃত্যু এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
সরকারের সময়জুড়ে বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মাজারে হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। নারীদের ওপর সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনাও আলোচনায় ছিল। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এক অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস নিজেই নারীদের ওপর হামলাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে সমালোচকদের মতে, কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
ঢালাও হত্যা মামলা ও বিভিন্ন পেশাজীবীকে আসামি করার অভিযোগও ছিল আলোচনায়। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
অর্থনীতিতেও চাপ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়ায়। টানা আট মাস মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পিপিআরসি বলছে, দারিদ্র্য ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে ২০২৫ নাগাদ খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে মোট ঋণের ৩৩ শতাংশের বেশি হয়েছে।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগে অনাগ্রহ বেসরকারি খাতকে চাপে ফেলে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, শিক্ষক নিগ্রহ ও ক্লাস বন্ধ থাকার ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে—ভিসা জটিলতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকেরা।
ক্রীড়াক্ষেত্রে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উগ্রবাদীদের হুমকিতে অনুষ্ঠান বাতিল ও শিল্পী হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে।
গণমাধ্যমের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় ড. ইউনূস বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে একটি পরিবার এবং সমালোচনার সুযোগ থাকবে। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে সেই পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জুলাই আন্দোলনের পর সৃষ্ট সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি বলেও অনেকে মনে করেন। নতুন সরকারের সামনে তাই প্রত্যাশা—রাজনৈতিক স্থিতি, আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা।
/আশিক