টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর আগেই আইসিসি এবং ক্রিকেটারদের বৈশ্বিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ) এক বড় ধরনের আইনি ও নীতিগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে ডব্লিউসিএ-র কড়া সমালোচনার মুখে পড়া আইসিসি এবার নতুন করে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সত্তার অধিকার ও অংশগ্রহণের শর্তাবলি নিয়ে নতুন বির্তকের জন্ম দিয়েছে।
ইএসপিএন-ক্রিকইনফোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডব্লিউসিএ-র দাবি অনুযায়ী ২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য আইসিসি খেলোয়াড়দের কাছে যেসব শর্তাবলি পাঠিয়েছে, তা ২০২৪ সালে দুই পক্ষের সই করা চুক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। খেলোয়াড়দের সংগঠনের মতে, আইসিসির প্রস্তাবিত এই নতুন শর্তগুলো অত্যন্ত ‘শোষণমূলক’। ডব্লিউসিএ এ বিষয়ে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে আইসিসি পাল্টা জবাবে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ওই চুক্তিটি ছিল কেবল আটটি নির্দিষ্ট ক্রিকেট বোর্ডের (এনজিবি) জন্য এবং বিশ্বকাপের বাকি দেশগুলো এই চুক্তির আওতায় পড়বে না।
আইসিসি যে আটটি বোর্ডের কথা উল্লেখ করছে, সেগুলো হলো—অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ড। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ভারতে গিয়ে খেলতে রাজি না হওয়ায় এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই এবং সেই শূন্য স্থানে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদিকে বিশ্বকাপের বাকি ১২টি দেশের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ওমান ও আরব আমিরাতের বোর্ডগুলো ডব্লিউসিএ-কে স্বীকৃতি দেয় না। ফলে সেসব দেশের খেলোয়াড়েরা এই সংগঠনের সদস্য নন। অন্যদিকে ইতালি, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, নামিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার খেলোয়াড় সংগঠন থাকলেও গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তারা আইসিসি থেকে কোনো শর্তাবলি পায়নি। ডব্লিউসিএ-র আশঙ্কা, তাদের কাছেও সেই বিতর্কিত ও শোষণমূলক শর্তগুলোই পাঠানো হবে।
ডব্লিউসিএ-র জোরালো দাবি হচ্ছে, ২০২৪ সালের চুক্তিটি ছিল সংগঠনের সব সদস্যের জন্য, তারা বিশ্বকাপে খেলুক বা না খেলুক। আইনিভাবে এই চুক্তি সবার জন্যই কার্যকর হওয়া উচিত। গত ১৫ জানুয়ারি খেলোয়াড়দের পাঠানো এক মেমোতে ডব্লিউসিএ-র প্রধান নির্বাহী টম মোফাট আটটি ক্ষেত্রে গুরুতর অসংগতির কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যমে উপস্থিতি, ড্রেসিংরুমে ঢোকার অনুমতি, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার, বাণিজ্যিক লাইসেন্স এবং আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি।
মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলোয়াড়দের সম্মতির অধিকার। আগের চুক্তিতে বলা হয়েছিল, সব বিষয়ে খেলোয়াড়েরা নিজেরা বা সংগঠনের মাধ্যমে দর-কষাকষি করতে পারবেন। কিন্তু আইসিসির নতুন শর্ত অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের আলাদা কোনো সম্মতির প্রয়োজন নেই এবং বোর্ড যা বলবে তা-ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, খেলোয়াড়দের ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইসিসির নতুন শর্তে বলা হয়েছে, যেকোনো তৃতীয় পক্ষকে খেলোয়াড়েরা তাঁদের ছবি ব্যবহারের লাইসেন্স দিতে বাধ্য থাকবেন। এমনকি এক দলের তিনজনের ছবি ব্যবহার করে আইসিসির কোনো বাণিজ্যিক পার্টনার নিজেদের পণ্যের প্রচারও করতে পারবে। অথচ ২০২৪ সালের চুক্তিতে এই বিষয়টি ছিল অনেক বেশি সীমাবদ্ধ এবং ডব্লিউসিএ-র সঙ্গে আলোচনার ওপর নির্ভরশীল।
এছাড়াও খেলোয়াড়দের বায়োলজিক্যাল বা ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইসিসি এই তথ্যের মালিকানা নিজেদের কাছে রাখতে চায়, যাতে তারা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে তা বাণিজ্যিক কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ডব্লিউসিএ বলছে, তথ্যের মালিক একান্তই খেলোয়াড় নিজে এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া এটি কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। সব থেকে অদ্ভুত ও বিতর্কিত শর্তটি হলো, খেলোয়াড়রা যদি বিশ্বকাপে অংশ নেন, তবে ধরে নেওয়া হবে তিনি আইসিসির সব শর্ত মেনে নিয়েছেন—তাতে তিনি চুক্তিতে সই করুন আর নাই করুন। ডব্লিউসিএ এই ‘জোর করে চাপিয়ে দেওয়া’ পদ্ধতির ঘোর বিরোধী।
টম মোফাট সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন যে, আইসিসি ও সদস্য বোর্ডগুলো মিলে খেলোয়াড়দের প্রাপ্য সুরক্ষাগুলো সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে এবং তারা খেলোয়াড়দের ‘মালিক’ হতে চাইছে। তিনি মনে করেন, যেসব খেলোয়াড় অপেক্ষাকৃত কম বেতন পান বা অপেশাদার, তাঁদেরই এই চুক্তির মাধ্যমে শোষণের লক্ষ্য বানানো হয়েছে। মোফাট পরিষ্কার করেছেন যে, ডব্লিউসিএ বিশ্বকাপ পণ্ড করতে চায় না। তবে তিনি উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, আইসিসির এই শর্তগুলো খেলোয়াড়দের অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে, বিশেষ করে যাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল তাঁদের ওপর ভিন্ন শর্ত চাপিয়ে দেওয়াটা খুবই দুঃখজনক। অনেক খেলোয়াড়ের জন্য আইসিসি ইভেন্টই আয়ের প্রধান উৎস। উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহে পাঠানো ডব্লিউসিএ-র পরবর্তী চিঠির জবাব আইসিসি এখনো দেয়নি। এ বিষয়ে আইসিসির মন্তব্য জানতে ক্রিকইনফোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।