বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই দেশে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। একসময় রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন ডেঙ্গুর বিস্তার দ্রুত জেলা শহর ও পৌর এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে অন্তত ১৪টি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা আগামী দুই মাসে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন। জুন মাসেই শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৯০৭ জন, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক সংক্রমণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার মূল সময় এখনও বাকি থাকায় জুলাই ও আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, বর্তমানে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। তাঁর মতে, এসব এলাকা ধীরে ধীরে এডিস মশার নতুন হটস্পটে পরিণত হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে জেলা ও পৌরসভাগুলোর অধিকাংশের কাছে পর্যাপ্ত বাজেট, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আক্রান্তের প্রায় ৭৭ শতাংশই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে (১,৭৩৫ জন)। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ (১,২০১ জন), ঢাকার বাইরের ঢাকা বিভাগ (৭৯৮ জন), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (৯৩১ জন) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (৫৪৯ জন)।
জেলাভিত্তিক সংক্রমণের দিক থেকেও উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী এবং চট্টগ্রাম ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় বর্ষাকালে জমে থাকা পানি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ ট্যাবলেট ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কীটতত্ত্ববিদের ঘাটতি। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে মাত্র একটি—ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন পূর্ণকালীন কীটতত্ত্ববিদ রয়েছেন। বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে এ ধরনের কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। এছাড়া জেলা পর্যায়ের বহু অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিভাগীয় কার্যালয় ও সদর দপ্তরসহ অনুমোদিত ৩৩টি কীটতত্ত্ববিদ পদের মধ্যে অন্তত ১৮টি এখনও শূন্য। ফলে মশার প্রজাতি শনাক্ত, প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ, কীটনাশকের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ধারণে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কার্যকর প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিত্যক্ত টায়ার ও প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, বর্ষার মূল মৌসুম এখনো বাকি। তাই এখনই কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বৈজ্ঞানিক মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
-রফিক