সৌদি রাজতন্ত্রের অজানা অধ্যায়: ক্ষমতার জন্য বাবা ও ভাইদের ছাড় দিলেন না মোহাম্মদ বিন সালমান

প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর সৌদি আরবের সিংহাসনে বসেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতার এই পালাবদল মোটেই সহজ ছিল না। এটি ছিল নাটকীয় সিদ্ধান্ত আর অপ্রত্যাশিত উত্থানের এক নতুন অধ্যায়।
শুরুতে বাদশাহ সালমান ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে তার ৬৯ বছর বয়সী সৎভাই মুকরিন বিন আবদুল আজিজের নাম ঘোষণা করেন। কিন্তু মাত্র তিন মাস পরেই তিনি হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বদল করেন। মুকরিনকে সরিয়ে তার স্থানে নিয়ে আসেন নিজের ভাইপো ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে। পাশাপাশি ২৯ বছরের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।
প্রায় ৯ বছর আগে যখন একের পর এক এসব ঘটনা ঘটছিল, সে সময় মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম সৌদি আরবের রাজনীতিতে কেউ শোনেননি। তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতেনও না কেউ।
অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন নায়েফের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল মার্কিন প্রশাসন। তিনি প্রতিরক্ষা বিষয়ে এফবিআইয়ের (যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো) কোর্স করেছিলেন। নিয়েছিলেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে সন্ত্রাস দমন কৌশলের প্রশিক্ষণও; কিন্তু ২০০৯ সালের আগস্টে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। ওই হামলার জন্য সে সময় দায়ী করা হয়েছিল আল-কায়েদাকে।
সৌদি বাদশাহর ‘দ্বাররক্ষক’
মোহাম্মদ বিন সালমান এমবিএস নামে বহুল পরিচিত। লেখক ডেভিড বি ওটাওয়ে তাঁর বইয়ে মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি (মোহাম্মদ বিন সালমান) বাদশাহর গেট কিপার (দ্বাররক্ষক) হওয়ার জন্য নিজের পদকে ব্যবহার করতে শুরু করেন।’ উদ্দেশ্য ছিল, বাবাকে নজরে রাখা।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্রুতই মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর বাবাকে পরিবার ও বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে আলাদা করে ফেলেন। এমনকি এ-ও বলা হয় যে বাদশাহকে তাঁর স্ত্রী, মানে এমবিএসের মায়ের সঙ্গেও দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়।
লেখক বেন হাবার্ড তাঁর বই ‘দ্য রাইজ টু পাওয়ার, মোহাম্মদ বিন সালমান’-এ উল্লেখ করেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও তাঁর দুই রক্ষী বাদশাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য লিফটে উঠেছিলেন। দোতলায় লিফটের দরজা খুলতেই বাদশাহর সৈন্যরা এগিয়ে গিয়ে নায়েফের রক্ষীদের অস্ত্র ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেন।’
ডেভিড বি ওটাওয়ের বইয়ে দাবি করা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমান কার্যত তাঁর মা এবং দুই বোনকে গৃহবন্দী করেন এবং বাবাকে এ সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পেতে দেননি। বাদশাহ নিজের স্ত্রীর কথা জিজ্ঞাসা করলেই বলা হতো চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে তাঁকে।
ইয়েমেন আক্রমণ
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দ্রুতই নিজের প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তাঁর তত্ত্বাবধানে সে বছরের ২৬ মার্চ (২০১৫ সাল) হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানাকে মুক্ত করতে হামলা চালায় সৌদি বিমানবাহিনী।
মোহাম্মদ বিন সালমান ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন। ইংরেজি পড়ার চেয়ে ওয়াকিটকিতে প্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি আগ্রহ ছিল তাঁর।—রশিদ সেকাই, সৌদি যুবরাজের ইংরেজি শিক্ষক
ওটাওয়ে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রাথমিকভাবে সৌদি জনগণ ওই হামলার প্রশংসা করেছিলেন। ভেবেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের সম্প্রসারণবাদী প্রবণতার বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছে তাঁদের দেশ।’
‘কিন্তু কিছুদিন পর এ হামলা বাদশাহ, মোহাম্মদ বিন সালমান ও সৌদি আরবের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটিকে মোহাম্মদ বিন সালমানের পররাষ্ট্রনীতির গাফিলতি হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে।’
মোহাম্মদ বিন নায়েফকে আটক
কাছাকাছি সময়েই তৎকালীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অপসারণ করে ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স করার সিদ্ধান্ত নেন বাদশাহ সালমান।
পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিকে ২০১৫ সালের ২০ জুন রাতে রাজপরিবারের একাধিক সদস্য পবিত্র মক্কায় জড়ো হন। সেই রাতে, রাজনৈতিক ও সুরক্ষাবিষয়ক কাউন্সিলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, যার সভাপতিত্ব করার কথা ছিল মোহাম্মদ বিন নায়েফের; কিন্তু বৈঠক শুরুর কিছুক্ষণ আগেই তিনি একটি বার্তা পান। সেখানে বলা হয়েছিল, বাদশাহ সালমান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান।
বলা হয়, সৌদি আরবে অন্তত ১০ হাজার প্রিন্স রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তাঁদের সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন ভাতা ৮০০ ডলার এবং সর্বোচ্চ পৌনে ৩ লাখ ডলার। ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করার পরই এ ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তড়িঘড়ি হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে বাদশাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য সাফা মহলে পৌঁছান বিন নায়েফ। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই দেহরক্ষী।
লেখক বেন হাবার্ড তাঁর বই ‘দ্য রাইজ টু পাওয়ার, মোহাম্মদ বিন সালমান’-এ উল্লেখ করেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও তাঁর দুই রক্ষী বাদশাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য লিফটে উঠেছিলেন। দোতলায় লিফটের দরজা খুলতেই বাদশাহর সৈন্যরা এগিয়ে গিয়ে নায়েফের রক্ষীদের অস্ত্র ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেন।’
‘পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় নায়েফকে। তিনি চলে যেতে উদ্যত হলে, বাধা দেওয়া হয় এবং ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু তাঁদের কথা শুনতে নারাজ ছিলেন বিন নায়েফ।’
নায়েফের পদত্যাগ
ওই রাতেই বিন নায়েফকে গৃহবন্দী করা হয় এবং রয়্যাল কোর্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়্যাল কাউন্সিলের সদস্যদের ডেকে জানতে চান, তাঁরা মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ বানানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমত কি না।
কাউন্সিলের ৩৪ সদস্যের মধ্যে ৩১ জন সমর্থন জানান। তাঁদের ফোনকল রেকর্ড করা হয় এবং মোহাম্মদ বিন নায়েফকে জানানো হয়, তাঁর কতজন আত্মীয় বাদশাহর এ সিদ্ধান্তে সমর্থন করেছেন।
মোহাম্মদ বিন সালমান তখনো ক্রাউন প্রিন্স হননি। রিয়াদে একটি মূল্যবান জমির ওপর নজর পড়ে তাঁর বাবার; কিন্তু জমির মালিক সেটি বিক্রি করতে চাইছিলেন না। এ নিয়ে চাপ দিতে একজন বিচারকের কাছে যান মোহাম্মদ বিন সালমান। বিচারকও এ নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন মোহাম্মদ বিন সালমান বিচারকের টেবিলে রিভলবারের একটি বুলেট রাখেন। ইঙ্গিত ছিল, বিচারক তাঁর কথা না মানলে হয়তো তাঁকে গুলি করা হবে।—রিচার্ড লেসি, সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস পর্যবেক্ষক
বেন হাবার্ড তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘বিন নায়েফ ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। কিন্তু সে রাতে তাঁকে ওষুধ দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত পরদিন সকালে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য তৈরি হয়ে যান।’ তাঁকে পাশের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাদশাহ সালমান ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা ক্যামেরাসহ হাজির ছিলেন।
বিন নায়েফকে অভ্যর্থনা জানান বাদশাহ এবং তাঁর হাতে চুম্বন করেন। নায়েফ খুব নিচু স্বরে সালমানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাঁদের এই সাক্ষাতের ভিডিও সৌদি টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে সময় বারবার সম্প্রচার করা হয়।
‘এরপর মোহাম্মদ বিন নায়েফ কক্ষ থেকে বেরোনোর পর অবাক হয়ে দেখেন যে তাঁর রক্ষীরা সেখানে নেই। জেদ্দায় নিজের প্রাসাদে পৌঁছানোর পর তাঁকে সেখানে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।’
বিন নায়েফের নীরবতা
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রশ্নের জবাবে রয়্যাল কোর্টের একজন মুখপাত্র অবশ্য ওই রাত সম্পর্কে ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়েছিল রয়্যাল কাউন্সিল। রয়্যাল কোর্ট আরও জানায়, তাঁকে বরখাস্ত করার কারণগুলো গোপন রাখা হয়েছে এবং সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সৌদি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মরফিন ও কোকেনে আসক্ত থাকার কারণে বিন নায়েফকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাদশাহ।
ওই বছরের শেষের দিকে বিন নায়েফের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাঁর প্রতি এমন আচরণ নিয়ে মোহাম্মদ বিন নায়েফ অবশ্য প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ বিন সালমানের পোস্টার সৌদি আরবের সর্বত্র দেখা যায়। তিনি সৌদি রাজপরিবারের অন্যতম যুবরাজ, যিনি বিদেশে পড়াশোনা করেননি। তিনি কখনোই সৌদি সেনাবাহিনী বা বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। রিয়াদের রয়্যাল অ্যান্ড সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি।
মোহাম্মদ বিন সালমানের ইংরেজি শিক্ষক রশিদ সেকাই বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমান ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন। ইংরেজি পড়ার চেয়ে ওয়াকিটকিতে প্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি আগ্রহ ছিল তাঁর।’
স্নাতক হওয়ার পর ২০০৭ সালে সারা বিনতে মাশুরকে বিয়ে করেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এই যুগলের চারটি সন্তান রয়েছে।
পিয়ানোতে ধ্রুপদি সুর
মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাঁকে নিজের বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।
বইয়ে সে প্রসঙ্গে বেন হাবার্ড লিখেছেন, পুরো সন্ধ্যাটাই কেরির সঙ্গে কথা বলে কাটান মোহাম্মদ বিন সালমান। সে সময় বিন সালমানের চোখ পড়ে সেখানে রাখা পিয়ানোর ওপর।
জন কেরি বিন সালমানের কাছ থেকে জানতে চান, ‘আপনি পিয়ানো বাজাতে জানেন? পিয়ানোতে ধ্রুপদি সুর বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দেন মোহাম্মদ বিন সালমান।’
‘ঘরে উপস্থিত সবাই অবাক হয়েছিলেন। যেহেতু ‘‘ওয়াহাবি ঘরানার’’ মানুষেরা সংগীত অপছন্দ করে, ফলে জন কেরি আশা করেননি যে মোহাম্মদ বিন সালমান পিয়ানো বাজাবেন।’
বিচারকের টেবিলে বুলেট
শুরু থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের ঝোঁক ছিল বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার দিকে।
সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস পর্যবেক্ষক রিচার্ড লেসি লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমান তখনো ক্রাউন প্রিন্স হননি। রিয়াদে একটি মূল্যবান জমির ওপর নজর পড়ে তাঁর বাবার। কিন্তু জমির মালিক সেটি বিক্রি করতে চাইছিলেন না।’
‘এ নিয়ে চাপ দিতে একজন বিচারকের কাছে যান মোহাম্মদ বিন সালমান। বিচারকও এ নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন মোহাম্মদ বিন সালমান বিচারকের টেবিলে রিভলবারের একটি বুলেট রাখেন। ইঙ্গিত ছিল, বিচারক তাঁর কথা না মানলে হয়তো তাঁকে গুলি করা হবে।’
যুবরাজের এহেন আচরণ সম্পর্কে বাদশাহ আবদুল্লাহর কাছে অভিযোগ করেন বিচারক। এ খবর কখনো অস্বীকার করেননি সালমান। এরপর ২০১১ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ যখন মোহাম্মদ বিন সালমানের বাবাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন, তখন শর্ত দিয়েছিলেন যে এমবিএস যেন কখনোই মন্ত্রণালয়ের ভবনে প্রবেশ না করে।
নারীদের গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা
মোহাম্মদ বিন সালমানের বাবা যখন সৌদি আরবের বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৯ বছর। শোনা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই আলঝেইমারে ভুগছিলেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
সৌদি আরবের যুবক ও নারীদের মন জয় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন বিন সালমান। তিনি ২০১৮ সালে নারীদের জন্য প্রচলিত ড্রেস কোড (পোশাকবিধি) শিথিল করে বলেছিলেন, প্রকাশ্যে নারীদের ‘আবায়া’ পরার দরকার নেই।
সেই বছরই নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা নিজেরাই কাজে বা কেনাকাটার জন্য গাড়ি চালিয়ে যেতে পারেন। এ জন্য সঙ্গে পুরুষ অভিভাবক রাখার প্রয়োজন নেই।
লেখক মার্ক থম্পসন তাঁর ‘বিয়িং ইয়ং, মেল অ্যান্ড সৌদি’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিক কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, নারীদের স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য নয়।’ তাঁর মতে, ‘নারীরা পুরুষের অনুমতি ছাড়াই যাতে কাজ করতে ও উপার্জন করা অর্থ ব্যয় করতে পারেন, সে কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হয় এ পদক্ষেপ।’
‘শুরা’র সমাপ্তি
সৌদি আরববিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে ‘শুরা’ ও জ্যেষ্ঠ প্রিন্সদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঐতিহ্যে বিরাম টেনেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ‘শুরা’ বলতে পরামর্শমূলক পরিষদকে বোঝায়। এর বদলে নিজেকে এক ও একমাত্র শাসক হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
নিজের সিদ্ধান্ত ও রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা সমালোচনা যে বিন সালমান বরদাস্ত করবেন না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
চেজ ফ্রিম্যান ১৯৯০-এর দশকের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মতে, ‘সৌদি রাজপরিবারের ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো শুরার ধারণার প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা।’
বিলাসবহুল সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণ
ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার আগেও দামি সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণের জন্য পরিচিত ছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ৪৪০ ফুট লম্বা বিলাসবহুল ইয়ট কিনতে ৫০ কোটি ডলার খরচ করেছিলেন। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে লেওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম কেনার জন্য ৪৫ কোটি ডলার খরচ করেন।
সমালোচনা এড়াতে বিন সালমান প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ওই বিখ্যাত চিত্রকর্ম আবুধাবির জাদুঘরে দিয়ে দেবেন; কিন্তু তেমনটা হয়নি। এর কিছুদিন পরই তাঁর বিলাসবহুল নৌযান ‘সেরিন’-এ দেখা যায় ওই চিত্রকর্ম।
একের পর এক গ্রেপ্তার, হারিরির পদত্যাগ
বলা হয়, সৌদি আরবে অন্তত ১০ হাজার প্রিন্স রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তাঁদের সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন ভাতা ৮০০ ডলার এবং সর্বোচ্চ পৌনে ৩ লাখ ডলার।
ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করার পরই এ ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর মোহাম্মদ বিন সালমান সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগে প্রিন্স, ব্যবসায়ী ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা মিলিয়ে ৩৮০ জনকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন।
বেন হাবার্ড লিখেছেন, ‘তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ১১ জন প্রিন্স ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আদিল ফিকিয়া এবং অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আবদুল আজিজও ছিলেন।’
‘তাঁদের সবার মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পাঁচ তারকা রিটজ-কার্লটন হোটেলে নিয়ে গিয়ে গৃহবন্দী করা হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা অর্থ সরকারকে ফেরত দেওয়ার পর তাঁদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁরা মোট ১০০ কোটি ডলার জরিমানাও দেন।’
একই ভাবে সৌদি আরব সফরে যাওয়া লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে বিন সালমানের বিরুদ্ধে। সে সময় ওই অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়।
বেন হাবার্ড লিখেছেন, ‘আল-হারিরি মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে দেখা করতে এলে তাঁকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর গাড়িবহরে থাকা ব্যক্তিদের বাইরে থাকতে বলা হয়। ওই কক্ষেই হারিরিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়।’
‘আল-হারিরি লেবাননের পতাকার পাশে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ঘোষণা করেন এবং একটা বিবৃতি পাঠ করেন। সে বিবৃতি বিশ্বজুড়ে টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল।’
আল-হারিরিকে বলতে শোনা যায়, তাঁর পদত্যাগ লেবাননকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করে তুলবে। এই বিবৃতি পাঠের সময় তিনি বেশ কয়েকবার থামেন এবং এমন একটা ইঙ্গিত দেন যে ওই বিবৃতি তিনি নিজে লেখেননি।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ‘হারিরি যদি পদত্যাগই করতে চাইতেন, তবে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন পদত্যাগ করলেন?’
এর কয়েকদিন পর আল-হারিরি দেশে ফেরেন এবং তাঁর সেই পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এই অদ্ভুত ঘটনার নেপথ্যের কাহিনি অবশ্য কখনোই জানা যায়নি।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৮ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি সরকার ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ২ হাজার ৩০৫ জনকে আটক করেছে, যাঁদের মধ্যে ২৫১ জন তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁদের কখনো বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি।
শুধু তা-ই নয়, নিউইয়র্কভিত্তিক ‘কমিটি ফর দ্য প্রটেকশন অব জার্নালিস্ট’ও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সৌদি আরবে ২৬ জন সাংবাদিক বন্দী রয়েছেন। এ সংখ্যা চীন ও তুরস্কের পর বিশ্বে সর্বোচ্চ। আবার ২০১৯ সালে এক হাজার সৌদি নাগরিকের ওপর ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
জামাল খাসোগি হত্যা মামলা
মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর ব্যাপার ছিল, যখন তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে গিয়ে এমবিএসের অন্যতম সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাসোগি খুন হন।
খাসোগি আরব নিউজ ও আল-ওয়াতানের মতো সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন। সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ বিন সালমান এক বছর ধরে ওই হত্যার দায় অস্বীকার করেন।
ডেভিড বি ওটাওয়ে লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ বিন সালমানের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর তত্ত্বাবধানে এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে সিআইএ এ সিদ্ধান্তে আসে যে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ স্বয়ং যুবরাজই দিয়েছিলেন।’
‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) মোহাম্মদ বিন সালমানের একটা পুরোনো রেকর্ডিং খুঁজে পায়, যেখানে সৌদি আরবে না ফিরলে খাসোগিকে গুলি করার কথা বলেছিলেন তিনি।’
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক নোরা ডোনেল যুবরাজকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন?’
জবাবে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, ‘একেবারেই না। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। কিন্তু সৌদি আরবের নেতা হিসেবে আমি এর সম্পূর্ণ দায় নিচ্ছি। বিশেষত, যখন অপরাধীরা সৌদি সরকারের হয়ে কাজ করছিল।’
এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের এক আদালত সাংবাদিক খাসোগিকে হত্যার দায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে ২৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে ২০২০ সালের ২০ মে প্রয়াত সাংবাদিকের পুত্র সালেহ খাসোগি তাঁর বাবার হত্যাকারীদের ক্ষমা করে দেন।
ডিজিটাল স্বাক্ষরের পর এবার মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে ইরানি প্রতিনিধিদল
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সুইজারল্যান্ড সফরে যাচ্ছে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই সফরের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, "এই যাত্রার মূল লক্ষ্য হলো অপর পক্ষের (যুক্তরাষ্ট্র) প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করা।" অতীতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এবার চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে ইরান তার দাবির বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।
বাঘাই আরও জানান, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী প্রতিনিধিদলটির গতকালই সুইজারল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল। তবে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় সেই মুহূর্তের বৈঠকটির প্রয়োজনীয়তা আর ছিল না। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে মূল আলোচনা শুরু করার আগে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাস্তবায়ন করা জরুরি, যা বর্তমানে দৃশ্যমান নয়। এই সফরের মাধ্যমে ইরান অপর পক্ষকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেবে এবং তারা কীভাবে এগুলো কার্যকর করতে চায় সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করবে। চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে চূড়ান্ত সমঝোতার পথে এগোনো কঠিন হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান।
/আশিক
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা ইরানের, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জেরে চরম উত্তেজনা
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি জরুরি বিবৃতিতে সামরিক কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসন মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া দ্বিপাক্ষিক শান্তি চুক্তির চরম লঙ্ঘন। আর এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দাঁতভাঙা জবাব দিতেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-পথটি অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরানি সামরিক কমান্ড তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, "হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করা হলো। এটি শত্রুপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।" একই সাথে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ না হলে এবং শত্রুপক্ষ তাদের বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হলে আগামীতে আরও কঠোর ও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তেহরানের দাবি, লেবাননের সার্বভৌমত্বের ওপর ইসরায়েলের এই নগ্ন হামলা মূলত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হওয়া সাম্প্রতিক সমঝোতার মূল চেতনার পরিপন্থী। ইরান স্পষ্ট করে বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মদদে কিংবা তাদের নীরব সম্মতি ও সবুজ সংকেত পেয়েই ইসরায়েল এই বেপরোয়া হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এর দায় যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে। ওল্ড ওয়ার্ল্ডের জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
/আশিক
ইরানকে ট্রাম্পের ৬০ দিনের আলটিমেটাম, চুক্তি না হলে ‘অসুখকর’ পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চূড়ান্ত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরানকে নতুন করে আরও ৬০ দিনের কঠোর সময়সীমা (আলটিমেটাম) বেঁধে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে একটি স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে ওয়াশিংটন এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেবে, যা তেহরানের জন্য মোটেও সুখকর বা স্বস্তিদায়ক হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি।
মার্কিন অঙ্গরাজ্য মেরিল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটি ‘জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ’-এ কাতারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া একটি অত্যাধুনিক বিমান উন্মোচনের বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম সামা টিভিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের এই চাঞ্চল্যকর সতর্কবার্তার তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
বক্তব্যের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষপাতি। তবে ইরান যদি এই সুযোগের সঠিক ব্যবহার না করে এবং কূটনৈতিক আলোচনা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানকে সরাসরি সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, “আসন্ন ৬০ দিনের মধ্যে আমাদের অবশ্যই একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায়, আমরা এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হব—যা তাদের (তেহরানের) জন্য মোটেও ভালো লাগবে না।” তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়ানো এই সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি কিছুটা আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। ট্রাম্প মনে করেন, দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত হয়তো সেই চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যাবে না।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই প্রাথমিক সমঝোতাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা কারিগরি পর্যায়ের (Technical Level) গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুই দেশের মধ্যে এই সংবেদনশীল ও কারিগরি আলোচনার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কঠোর ও পরোক্ষ সামরিক হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে চাপ ও অস্থিরতা তৈরি করল।
/আশিক
তিব্বতে চীনের মেগা বাঁধ, নতুন দুশ্চিন্তায় ভারত
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে চীন। অরুণাচল প্রদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিশাল প্রকল্পকে ঘিরে ভারতজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার জলনিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের নির্মাণাধীন মেডোগ হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা হবে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট, যা বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়বে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন শুধু জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে চায় না, বরং গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর নিজেদের কৌশলগত প্রভাবও আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের এই পদক্ষেপের জবাবে ভারত অরুণাচল প্রদেশের আপার সিয়াং ও সিয়াং জেলায় ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (এসইউএমপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ জোরদার করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এনএইচপির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি রুপির সমান।
তবে দুই দেশের প্রকল্পের অগ্রগতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যেখানে চীনের মেডোগ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, সেখানে ভারতের প্রকল্প এখনও সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি নির্মাণ-পূর্ব কার্যক্রমও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি।
ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতে প্রবেশের পর ‘সিয়াং’ নামে পরিচিত হয় এবং পরে ব্রহ্মপুত্র নদে পরিণত হয়। এই নদী অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের লাখো মানুষের কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে নদীর প্রবাহে যেকোনো পরিবর্তন বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, উজানে এত বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাব কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের সব ধরনের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। লোকসভায় দেওয়া লিখিত জবাবে সরকার জানিয়েছে, নিম্ন অববাহিকার মানুষের জীবন, সম্পদ ও জীবিকা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, তথ্য বিনিময় এবং আগাম পরামর্শের বিষয়ে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। তবে এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
-রাফসান
ইরান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে পরাজিত ট্রাম্প: নিউইয়র্ক টাইমস
দীর্ঘ প্রায় চার মাসের সংঘাতের পর অবশেষে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধবিরতির এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর আড়ালে নতুন কিছু কৌশলগত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই পরিবর্তন আনেনি, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকেও নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই তিনটি ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। ফলে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সমালোচকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তাদের ভাষ্য, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছিল যে, ইরানকে শর্তহীন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হবে। একই সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছিল।
তবে যুদ্ধ শেষে দেখা যাচ্ছে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও টিকে আছে এবং দেশটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের পূর্বঘোষিত লক্ষ্যগুলোর বাস্তবতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু কঠোর শর্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক বিশ্লেষক এটিকে পূর্ণ বিজয়ের পরিবর্তে একটি আপসনির্ভর সমঝোতা হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনের দুই মাসের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে। অনেকেই মনে করছেন, আলোচনা শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির কাছাকাছি কোনো কাঠামোয় পৌঁছাতে পারে।
এ বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ ট্রাম্প ২০১৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা সেই চুক্তি বাতিল করেছিলেন। তখন তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল চুক্তিগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এখন সামরিক সংঘাতের পর প্রায় একই ধরনের সমঝোতার পথে হাঁটতে হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাকে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এটিকে নতুন কোনো অর্জন বলা যাবে না। বরং এটি যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র।
সংঘাতের সময় ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় তেহরানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চার মাসের সংঘাতে ইরানের সামরিক স্থাপনা, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে রাজনৈতিকভাবে দেশটি ভেঙে পড়েনি। বরং অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, যুদ্ধ শেষে ইরান নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এখনও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তারপরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দর-কষাকষির সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে তেহরান।
একই সঙ্গে ইরান দেখিয়েছে, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও তারা দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে। এটিও দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যকারিতা ও বৈশ্বিক প্রভাব নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের পরও ওয়াশিংটন প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে বিশ্বের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও এখন যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সামরিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা নীতিতেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর অনেক আগ থেকেই ইরান বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংকটে ভুগছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ইসরায়েলের অভিযানে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ইরানপন্থি শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত কাঠামোও চাপে পড়ে। একই সময়ে অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা দেশটির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবুও সংঘাত শেষে ইরান আবারও আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ফিরে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে।
যদি ভবিষ্যতে ইরান আবারও এই নৌপথ বন্ধ করার হুমকি দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটিই এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের জন্য কঠোর বার্তা দিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে কঠোর অবস্থানের কথা জানাল পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, ভবিষ্যতে ভারত যদি কোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে ইসলামাবাদ আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। পাকিস্তানি গণমাধ্যম সামা টিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খাজা আসিফ ভারতের সাম্প্রতিক নীতিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ভারতের যে কৌশলগত ব্যর্থতা দেখা গেছে, তা দেশটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা হয়ে থাকবে। তার ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা ভারত বহু বছর ধরে স্মরণে রাখতে বাধ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
খাজা আসিফ আফগানিস্তান প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তার অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় কিছু ভারত-সমর্থিত গোষ্ঠী পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এসব কার্যক্রম মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, সেখানে যেসব বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তা পাকিস্তানি বা কাশ্মীরি জনগণের স্বাভাবিক অবস্থান নয়; বরং ভারতের কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন বলেই মনে হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত কিছু ব্যক্তি এবং ভারত-সমর্থিত গোষ্ঠী এসব কর্মকাণ্ডে আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দিচ্ছে। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি।
পানি ইস্যুতেও কড়া অবস্থান নিয়েছে ইসলামাবাদ। খাজা আসিফ বলেন, সম্ভাব্য ‘পানি আগ্রাসন’ মোকাবিলায় সরকার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, পাকিস্তানের পানিসম্পদ রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তার ভাষায়, পাকিস্তানের এক ফোঁটা পানিও অন্য কাউকে নিতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান চুক্তির আলোকে দেশটির পানির অধিকার রক্ষা করা হবে।
-রফিক
যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত মানবে না ইরান: খামেনি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও নিজেদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসছে না ইরান। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওয়াশিংটনের উত্থাপিত সব অতিরিক্ত দাবি তারা মেনে নেবে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ অবস্থান তুলে ধরেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম মোজতবা খামেনি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও তা কখনোই প্রতিপক্ষের সব শর্ত নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করার সমতুল্য নয়।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে খামেনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত বা সরাসরি বৈঠকের পথ খোলা থাকলেও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত স্বার্থ কোনোভাবেই আপসের বিষয় নয়।
তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আলোচক দলের একাধিক আশ্বাসের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে তার কিছু ভিন্নমত ছিল, তারপরও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
খামেনি বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রতিরোধ ফ্রন্টের অধিকার রক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির কারণেই তিনি আলোচনার সুযোগ দিয়েছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দেশের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে পাঠানো হবে না। তবে আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ করার (ডাইলিউশন) বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান কিছু কারিগরি সমাধানে আগ্রহী হলেও দেশের ভেতরে থাকা কৌশলগত সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তেহরান আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে কোনো ধরনের মৌলিক ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি।
চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে চার মাস ধরে চলা সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালিতে সার্ভিস ফি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ একাধিক জটিল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র: প্রেস টিভি/ দ্য জেরুজালেম পোস্ট/রয়টার্স
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতকে সতর্ক করল পাকিস্তান
ভারত পানি ইস্যুকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার সতর্ক করে বলেছেন, পানির মতো মৌলিক সম্পদকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সিন্ধু পানি চুক্তি অনুসরণ করা ভারতের বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। পাকিস্তানের জনগণের ন্যায্য পানির অধিকার খর্ব করার যেকোনো উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী এবং নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ইসহাক দার অভিযোগ করেন, ভারত একতরফাভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থীভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি সংশ্লিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার ভাষায়, এই চুক্তির মধ্যেই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শান্তিপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, যা উপেক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামাবাদ সবসময় আলোচনাকেন্দ্রিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দ্বিপক্ষীয় যেকোনো সমস্যা কূটনৈতিক সংলাপ ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে ইসহাক দার বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম পাকিস্তান। তাই পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
তিনি দাবি করেন, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের পদক্ষেপ খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং মানবিক পরিস্থিতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা আজকের বিশ্বে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা অপরিহার্য।
ভারতের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, সিন্ধু নদী অববাহিকায় জলাধার সম্প্রসারণ এবং পানি সরিয়ে নেওয়ার কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসহাক দার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, পানি কখনোই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, চাপ প্রয়োগ কিংবা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এটি কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
-রাফসান
কোন চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প
মাত্র ১৫ সপ্তাহ আগেও ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। সে সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবে না ওয়াশিংটন। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত সমঝোতা স্মারকের তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি কোনো আত্মসমর্পণের দলিল নয়; বরং এতে ইরানের জন্য বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো তেল রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে চাপে থাকা ইরান নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিল, তার মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তবে বর্তমান চুক্তিতে এসব লক্ষ্যের অনেকগুলোই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে।
ট্রাম্প অবশ্য চুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। তার দাবি, এই সমঝোতার মাধ্যমে অন্তত আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিনি এটিকে ভবিষ্যৎ সংঘাত এড়ানোর একটি কার্যকর পদক্ষেপ বলেও বর্ণনা করেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার রাজনীতি ও কঠোর দর-কষাকষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া ট্রাম্পের কাছ থেকে এমন নমনীয় অবস্থান অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে।
চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি নিয়েও ভবিষ্যৎ আলোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে ইরানের জব্দ বা স্থগিত থাকা কিছু সম্পদ ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এটি কোনো বিনা শর্তের সুবিধা নয়; বরং ইরানের ইতিবাচক আচরণ ও চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
তবে সমালোচকদের মতে, এই ছাড় অনেকাংশে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে মিল রয়েছে। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সেই চুক্তির অন্যতম কঠোর সমালোচক ছিলেন ট্রাম্প নিজেই।
এদিকে রিপাবলিকান পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং ইসরায়েলের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলে ইতোমধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে লেবাননকে ঘিরে নতুন শর্তাবলি ইসরায়েলের জন্য নতুন কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছিল। তার মতে, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারত।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে যেতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছিল।
অন্যদিকে ট্রাম্প একদিকে ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হতে না দেওয়ার কথা বললেও, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন। তিনি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ৬০ দিনের নির্ধারিত সময়ের পরও আলোচনা চলতে পারে।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
-রফিক
পাঠকের মতামত:
- সুইডেনের ইসাক নাকি ডাচ প্রাচীর ভ্যান ডাইক? বিশ্বকাপে আজ দুই লিভারপুল তারকার দ্বৈরথ
- ডিজিটাল স্বাক্ষরের পর এবার মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে ইরানি প্রতিনিধিদল
- অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটারের নির্মাণকাজ শুরু
- ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, জ্লাতানের চোখে এবার বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার অন্য দল!
- হিজাব ছাড়া গান গাওয়ার অপরাধ: ইরানি গায়িকাসহ ৯ জনকে ৭৪ দোররা মারার নির্দেশ
- ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর ও বেইজিং—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেগা সফরে যা কিছু থাকছে
- প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে রাখা ৩ ইউনিয়নের নাম বদলের নির্দেশ সরকারের
- অবসরের ১১ বছর পর ফুটবল মাঠে ফিরছেন কিংবদন্তি রোনালদিনহো
- আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের প্রস্তুতি নিন, খুলনার সমাবেশ থেকে জামায়াত আমিরের ডাক
- নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত হিসাব: কার বেতন কত বাড়ছে দেখে নিন (১ম-২০তম গ্রেড)
- হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা ইরানের, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জেরে চরম উত্তেজনা
- শীর্ষে থেকেও অস্বস্তিতে ব্রাজিল, শেষ ম্যাচের আগে মেলেনি দ্বিতীয় পর্বের টিকিট
- গোল্ডকাপ ফুটবলের ফাইনালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, খুদেদের সাথে ওড়ালেন জাতীয় পতাকা
- ইরানকে ট্রাম্পের ৬০ দিনের আলটিমেটাম, চুক্তি না হলে ‘অসুখকর’ পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
- উত্তরাঞ্চলের ৪ জেলায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্যার সতর্কতা
- আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ‘মাফিয়া পার্টি’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- তিব্বতে চীনের মেগা বাঁধ, নতুন দুশ্চিন্তায় ভারত
- ইরান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে পরাজিত ট্রাম্প: নিউইয়র্ক টাইমস
- ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬: টিভি ও মোবাইলে দেখার উপায়
- আনচেলত্তির সুখবর, যেদিন ফিরছেন ব্রাজিলের তারকা নেইমার
- ২০ জুনের নামাজের সময় প্রকাশ, দেখে নিন এখনই
- ভারতের জন্য কঠোর বার্তা দিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
- আবার কমল স্বর্ণের দাম, জেনে নিন আজকের নতুন দাম
- আষাঢ়ের শুরুতেই দেশজুড়ে বৃষ্টির দাপট, ঢাকার আকাশ মেঘলা
- শনিবার ঢাকার যেসব মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ থাকবে
- কসাইবাড়ী-আজমপুর-আবদুল্লাহপুরে বড় প্রকল্পের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- রিঙ্গিত ও রিয়ালের বাজারে সুখবর, একনজরে আজকের মুদ্রার রেট
- মাঠের লড়াইয়ে এবার জায়ান্টদের পরীক্ষা: নেদারল্যান্ডস-জার্মানি ও জাপানের নকআউটের লক্ষ্য
- বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাম্বা ঝড়, নকআউটে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, মরক্কোর জয়
- শিলিগুড়ি করিডর ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তাপ: তিস্তা, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বাস্তবতা
- পাঠ্যক্রমে ফুটবল-ক্রিকেট যুক্ত হচ্ছে, বড় বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
- সরকারি কর্মচারীদের জন্য যেসব সুবিধা বাড়ানো হয়েছে
- রঙিন খাবার কেন শরীরের জন্য জরুরি
- যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত মানবে না ইরান: খামেনি
- জুমার দিনের ৫ বিশেষ আমল, যা বদলে দিতে পারে জীবন
- সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতকে সতর্ক করল পাকিস্তান
- বড় ধাক্কা শেষে কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে যত
- ইরাক ম্যাচের আগে নতুন পরিকল্পনায় ফ্রান্স
- কোন চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প
- বের হওয়ার আগে দেখে নিন আজ কোথায় মার্কেট বন্ধ
- স্বর্ণবাজারে নতুন রেকর্ড, বেড়েছে সব ক্যারেটের সোনার দাম
- সূর্যোদয়-সূর্যাস্তসহ আজকের পূর্ণ নামাজের সময়সূচি
- ইরান চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
- ১৩ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, নদীবন্দরে সংকেত
- আজ টিভিতে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়াসহ যত খেলা
- চুক্তিতে লাভবান ইরান, ধাক্কায় নেতানিয়াহু সরকার
- নর্থহ্যাম্পটনের মেয়র কর্তৃক ‘অনুপ্রেরণাদায়ক’ কমিউনিটি লিডার সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠিত
- হাইকোর্টে জামিন পেলেও কারাগারেই থাকতে হচ্ছে সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সুমনকে
- ঋণখেলাপিদের সংসদ মন্তব্য নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের তুমুল বিতর্ক
- সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত রেকর্ড বৃদ্ধি, তথ্য দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- আজকের খেলার সূচি: বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে ওভাল টেস্ট
- পাকিস্তান-ভিয়েতনামের মত সৌরবিদ্যুতে বড় বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ?
- সিঙ্গাপুর কিংবা কানাডা নয় ‘বেটার বাংলাদেশ’ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী
- দুই দিনেই আবার বাড়ল সোনার দাম, জানুন আজকের নতুন দর
- দুবাইয়ে আটক বেনজীর, মিলেছে তিন দেশের পাসপোর্ট!
- ১৭ জুন ২০২৬: শেয়ারবাজারের দরপতনের শীর্ষ ১০ শেয়ার
- ‘এটা শান্তি নয়, আত্মসমর্পণ’—ট্রাম্পকে নিশানা
- ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে থাকছে যেসব ৯ বড় শর্ত
- সুইডেন থেকে স্পেন, আজ জমজমাট বিশ্বকাপ সূচি
- ১৬ জুন ২০২৬: শেয়ারবাজারে লাভে থাকা শীর্ষ ১০ শেয়ার
- ১৮ জুন ২০২৬: আজকের শেয়ারবাজারের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
- ১৫ জুন ২০২৬: আজকের শেয়ারবাজারের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
- ১৮ জুন ২০২৬: শেয়ারবাজারে লাভে থাকা শীর্ষ ১০ শেয়ার
- দিল্লিতে আড়াই ঘণ্টা আটকে থেকে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
- অবসরভাতা প্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য সুখবর








