মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ক্রমেই জ্বালানি অবকাঠামোকেন্দ্রিক এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে ইরান সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে যে ভবিষ্যতে তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা হলে আর কোনো ধরনের সংযম দেখানো হবে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, সাম্প্রতিক পাল্টা হামলায় ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতার কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করেছে এবং এই সংযম ছিল কেবল উত্তেজনা কমানোর আন্তর্জাতিক আহ্বানের প্রতি সম্মান জানানো।
তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো আবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে তেহরান ‘শূন্য সংযম’ নীতি অনুসরণ করবে। এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংকেত হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র, যা দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটিতে ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলা সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে।
এরই ধারাবাহিকতায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানি হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই কমপ্লেক্সটি বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। হামলার ফলে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা তৈরি করেছে।
কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন, এই হামলার ফলে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তিনি আরও জানান, দুটি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইডস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে প্রতিবছর প্রায় ১২.৮ মিলিয়ন টন উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
আল-কাবি এই ঘটনাকে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বিশেষ করে রমজান মাসে একটি মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে এমন হামলা গোটা অঞ্চলের জন্য গভীর হতাশার কারণ। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, যেকোনো পরিস্থিতিতেই তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোকে সংঘাতের বাইরে রাখা উচিত।
এদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। তিনি দাবি করেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের সামরিক শিল্পভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দেশটির কমান্ড কাঠামোকে বিশৃঙ্খল করে তুলছে।
তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলাটি ইসরাইল এককভাবে পরিচালনা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে আপাতত জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা থেকে বিরত রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পুনরায় হামলা না চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তার এই অবস্থান আসে যখন উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের মহাসচিবও মন্তব্য করেছেন, এই হামলাগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন একটি পূর্ণাঙ্গ “জ্বালানি যুদ্ধ” পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।