মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সোমবার বিকেলে আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেননি তিনি। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক পথে সংকটের সমাধান হলে নতুন যুদ্ধ এড়ানো এবং বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি নয়, বরং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় যোগাযোগ চলছে। আলোচনার ফল কী হবে, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত একটি বড় সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য সময় চাওয়ার পর তিনি হামলা থেকে সরে আসেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা নিরসন এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করাই আলোচনার প্রধান লক্ষ্য।
সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতারি কর্মকর্তারা সামরিক সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে উপসাগরীয় মিত্রদের অবস্থান পুরোপুরি এক নয়। সৌদি আরব ও কাতার সংযমের পক্ষে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু কর্মকর্তা ইরানের ওপর আরও কঠোর চাপ প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাত ও জাহাজে হামলার কারণে সেখানে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, প্রণালির সব নৌপথ কোনো ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকুক। অন্যদিকে ইরান প্রণালির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় নিজেদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় রাখার দাবি করছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্য ব্যবস্থায় ওমানের দিকের একটি নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। তেহরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ট্রাম্পের কিছু দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চললেও সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। এর আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল করা এবং বৃহত্তর শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নৌ চলাচলের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে সেই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে উভয় পক্ষ আবারও সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ে।
সম্ভাব্য নতুন আলোচনায় হরমুজের পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যেকোনো সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বন্ধ করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। তবে তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং নিজেদের বেসামরিক পারমাণবিক অধিকার পরিত্যাগ করবে না।
-রফিক