ইতিহাস ও দর্শন

ট্যালকট পার্সন্সের Pattern Variable Theory: আধুনিকতা ও উন্নয়ন ভাবনার রাজনীতি 

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৬ জুলাই ১৫ ০৯:৫৮:১২
ট্যালকট পার্সন্সের Pattern Variable Theory: আধুনিকতা ও উন্নয়ন ভাবনার রাজনীতি 

Talcott Parsons বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানী এবং Structural Functionalism ধারার একজন কেন্দ্রীয় চিন্তাবিদ। তাঁর Pattern Variable Theory মূলত Social Action, Social Order এবং Social System ব্যাখ্যা করার বৃহত্তর তাত্ত্বিক প্রচেষ্টার অংশ। প্রথম দৃষ্টিতে এই তত্ত্বকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের একটি নিরপেক্ষ বা objective analytical tool বলে মনে হতে পারে। Parsons-এর মতে, একজন ব্যক্তি যখন কোনো সমাজব্যবস্থার ভেতরে কাজ করেন, তখন তিনি কিছু মৌলিক মূল্যবোধভিত্তিক পছন্দের মুখোমুখি হন। এই পছন্দগুলোই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের আচরণগত ধরনকে প্রভাবিত করে।

তবে Pattern Variable Theory-কে কেবল একটি নিরপেক্ষ সমাজতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এই তত্ত্ব Second World War-পরবর্তী এবং Cold War-কালীন বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত হয়। তখন American sociology আধুনিকায়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় উন্নয়ন এবং liberal-capitalist Western society-এর শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। Parsons-এর এই ধারণা অনেক সময় “modern” Western societies এবং “traditional” non-Western societies-এর মধ্যে তুলনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে Pattern Variable Theory বৃহত্তর Modernization Theory এবং development discourse-এর অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে United States ও Western Europe-কে মানবসভ্যতার অগ্রসরতম রূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর Asia, Africa ও Latin America-এর সমাজগুলোকে “backward”, “underdeveloped” অথবা “not yet modern” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই আলোচনায় Talcott Parsons-এর Pattern Variable Theory-এর ঐতিহাসিক পটভূমি, মূল যুক্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাসঙ্গিকতা এবং বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীর সমালোচনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ও বৌদ্ধিক পটভূমি

Parsons-এর তত্ত্ব মধ্য-বিংশ শতাব্দীতে বিকশিত হয়। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ The Structure of Social Action (1937), The Social System (1951) এবং পরবর্তী social system ও social evolution বিষয়ক লেখাগুলোতে তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। Parsons এমন একটি general theory নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যার মাধ্যমে বোঝা যাবে কীভাবে সমাজে শৃঙ্খলা তৈরি হয়, ব্যক্তি কীভাবে মূল্যবোধ internalize করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

এই তত্ত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Second World War-এর পর United States একটি global superpower হিসেবে আবির্ভূত হয়। একই সময়ে Cold War বিশ্বকে capitalist এবং socialist bloc-এ বিভক্ত করে। এই সময়ে American social science কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে: কেন কিছু সমাজ আধুনিক ও স্থিতিশীল? কেন কিছু সমাজ দরিদ্র, অস্থিতিশীল, বিপ্লবপ্রবণ বা “traditional”? সদ্য স্বাধীন postcolonial societies-কে কীভাবে development-এর পথে পরিচালিত করা যায়?

এই প্রশ্নগুলোর একটি প্রধান উত্তর ছিল Modernization Theory। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সমাজগুলো tradition থেকে modernity-এর দিকে অগ্রসর হয়। এই অগ্রগতি ঘটে শিল্পায়ন (industrialization), নগরায়ণ (urbanization), ধর্মনিরপেক্ষীকরণ (secularization), আমলাতন্ত্রীকরণ (bureaucratization), গণশিক্ষা (mass education) এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমালোচকেরা দেখান যে Modernization Theory ছিল গভীরভাবে Eurocentric। কারণ এটি Western historical experience-কে উন্নয়নের সর্বজনীন মডেল হিসেবে ধরে নেয় এবং non-Western societies-কে West-এর অসম্পূর্ণ বা পিছিয়ে থাকা সংস্করণ হিসেবে উপস্থাপন করে।

Parsons-এর Pattern Variable Theory এই বৌদ্ধিক আবহের মধ্যেই স্থান পায়। এটি এমন কিছু ধারণাগত বিপরীত জোড়া দেয়, যার মাধ্যমে সমাজকে traditional বা modern হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। যদিও Parsons এগুলোকে analytical categories হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তবুও এগুলোর মধ্যে শক্তিশালী normative implication ছিল। Modern society-কে যুক্ত করা হয় universalism, achievement, specificity, affective neutrality এবং formal institutional order-এর সঙ্গে। অন্যদিকে traditional society-কে যুক্ত করা হয় particularism, ascription, diffuseness, affectivity এবং kinship-based obligation-এর সঙ্গে।

Pattern Variables কী?

Pattern Variables হলো মূল্যবোধভিত্তিক পছন্দ বা value-orientations-এর পাঁচটি জোড়া, যা Parsons-এর মতে Social Action-কে প্রভাবিত করে। এগুলোকে “variables” বলা হয়, কারণ ব্যক্তি বা actor পরিস্থিতি, ভূমিকা, প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এক ধরনের আচরণ বা অন্য ধরনের আচরণ বেছে নিতে পারে।

Parsons পাঁচটি Pattern Variables চিহ্নিত করেন:

১. Affectivity বনাম Affective Neutrality

২. Self-orientation বনাম Collectivity-orientation

৩. Universalism বনাম Particularism

৪. Achievement বনাম Ascription

৫. Specificity বনাম Diffuseness

Parsons এই ধারণাগুলো ব্যবহার করেন বিভিন্ন social relationship এবং institutional arrangement বোঝাতে। যেমন, পারিবারিক সম্পর্ক সাধারণত affective, diffuse, particularistic এবং অনেক ক্ষেত্রে ascriptive। অন্যদিকে একটি bureaucratic office আদর্শভাবে emotionally neutral, specific, universalistic এবং achievement-based হওয়া প্রত্যাশিত।

১. Affectivity বনাম Affective Neutrality

এই variable সামাজিক আচরণে emotion বা আবেগের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে। Affectivity বলতে এমন সম্পর্ককে বোঝায় যেখানে আবেগ প্রকাশ স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাশিত। পরিবার, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা এবং ঘনিষ্ঠ কমিউনিটি সম্পর্ক সাধারণত affective। যেমন মা-সন্তানের সম্পর্ককে আবেগহীন বা neutral হওয়া প্রত্যাশা করা যায় না। এখানে ভালোবাসা, যত্ন, সহানুভূতি, রাগ, অভিমান এবং আবেগীয় সংযুক্তি সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ।

Affective Neutrality বলতে এমন আচরণকে বোঝায় যেখানে ব্যক্তি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ম, দায়িত্ব ও পেশাগত মানদণ্ড অনুযায়ী কাজ করেন। পেশাগত, প্রশাসনিক, আইনগত এবং bureaucratic ভূমিকা সাধারণত affective neutrality দাবি করে। একজন বিচারক, শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা বা পরীক্ষককে ব্যক্তিগত আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং নিয়ম ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রত্যাশা করা হয়।

Parsons-এর মতে modern institutions বেশি মাত্রায় affective neutrality-এর ওপর নির্ভর করে, কারণ bureaucracy এবং professional system নিরপেক্ষতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং rule-based conduct দাবি করে।

২. Self-orientation বনাম Collectivity-orientation

এই variable ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, নাকি বৃহত্তর সামাজিক বা সামষ্টিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তা ব্যাখ্যা করে। Self-orientation বলতে বোঝায় ব্যক্তি নিজের লক্ষ্য, স্বার্থ, লাভ, উন্নতি বা সাফল্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এর মধ্যে career ambition, economic gain, personal achievement বা individual success থাকতে পারে। অন্যদিকে Collectivity-orientation বলতে বোঝায় ব্যক্তি কোনো group, institution, family, community, nation বা society-এর বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যেমন একজন সৈনিক, public servant, community volunteer বা activist ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে collective welfare-কে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

Parsons সরলভাবে বলেননি যে modern society পুরোপুরি স্বার্থপর বা individualistic। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে modern society individual role-কে বৃহত্তর institutional system-এর মধ্যে সংগঠিত করে। তবে সমালোচকেরা বলেন, এই তত্ত্ব liberal-capitalist society-এর rational individual ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং non-Western societies-এর collective বা kinship-based obligation-কে অনেক সময় traditional বা less developed হিসেবে দেখার ঝুঁকি তৈরি করে।

৩. Universalism বনাম Particularism

Universalism বনাম Particularism Parsons-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ Pattern Variables-এর একটি। Universalism বলতে বোঝায় একই নিয়ম, আইন ও মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবার, শ্রেণি, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, অঞ্চল, রাজনৈতিক সংযোগ বা সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে সবাই একই নিয়মের অধীন থাকবে। Modern law, bureaucracy, science এবং formal education আদর্শভাবে universalistic। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি ন্যায্য পরীক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা উচিত। অন্যদিকে Particularism বলতে বোঝায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা, পরিচয়, status, community, patronage বা special relationship-এর ভিত্তিতে মানুষকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা। যেমন যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, আত্মীয়তার কারণে কাউকে চাকরি দেওয়া particularistic আচরণ।

Parsons universalism-কে modernity-এর সঙ্গে যুক্ত করেন, কারণ আধুনিক প্রতিষ্ঠান impersonal rule বা ব্যক্তিনিরপেক্ষ নিয়মের ওপর দাঁড়ায়। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, Western societies নিজেরাও পুরোপুরি universalistic নয়। Race, class, gender, citizenship, colonial history এবং global inequality এখনো সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা প্রাপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই “universalistic West” এবং “particularistic non-West” ধরনের সরল বিভাজন বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

৪. Achievement বনাম Ascription

এই variable ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, তা ব্যাখ্যা করে Achievement বলতে বোঝায় ব্যক্তির status নির্ধারিত হবে তাঁর performance, qualification, skill, effort বা accomplishment-এর ভিত্তিতে। Modern education system, professional recruitment এবং labour market নিজেদের achievement-based বলে দাবি করে।Parsons এর মতে Ascription বলতে বোঝায় ব্যক্তির status নির্ধারিত হচ্ছে birth, family, caste, gender, ethnicity, religion, age, lineage বা inherited position-এর ভিত্তিতে। Traditional societies-কে প্রায়ই ascriptive বলা হয়, কারণ সেখানে social role ও status জন্মগত পরিচয় দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত।

Parsons modern society-কে তুলনামূলকভাবে achievement-oriented হিসেবে দেখেন। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, achievement কখনোই পুরোপুরি individual নয়। একজন ব্যক্তির performance নির্ভর করে family resources, class background, quality of schooling, gender norms, race, geography এবং inherited privilege-এর ওপর। Pierre Bourdieu-এর cultural capital, social capital এবং symbolic power ধারণাগুলো এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যা “merit” বা যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়, তা অনেক সময় unequal access to valued cultural resources-এর ফল। ফলে modern achievement system inequality পুনরুৎপাদন করলেও সেটিকে fair competition হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

৫. Specificity বনাম Diffuseness

এই variable সামাজিক সম্পর্কের scope বা পরিসর ব্যাখ্যা করে। Specificity বলতে বোঝায় সম্পর্কটি একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা, কাজ বা উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যেমন bank officer এবং client-এর সম্পর্ক specific, কারণ এটি মূলত financial service-কেন্দ্রিক। Teacher-student relationship-ও formal sense-এ specific, কারণ এটি মূলত education-কেন্দ্রিক। অন্যদিকে Diffuseness বলতে বোঝায় সম্পর্কটি জীবনের বহু ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত। পরিবার, আত্মীয়তা, গ্রাম ও ঘনিষ্ঠ কমিউনিটি সম্পর্ক diffuse, কারণ এগুলোর মধ্যে emotional, economic, moral, religious এবং social obligation একসঙ্গে কাজ করে।

Parsons modern society-কে specific role-এর সঙ্গে যুক্ত করেন, কারণ modern institution division of labour-এর মাধ্যমে specialized function তৈরি করে। অন্যদিকে traditional society-কে diffuse বলা হয়, কারণ kinship ও community tie জীবনের বহু ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে।

Parsons এর এই তুলনা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, কারণ এটি সমাজকে বোঝার একটি সহজ কাঠামো দেয়। Traditional society-কে কল্পনা করা হয় আবেগনির্ভর, আত্মীয়তাভিত্তিক, hierarchical, particularistic এবং ascriptive হিসেবে। Modern society-কে কল্পনা করা হয় rational, bureaucratic, universalistic, achievement-based এবং specialized হিসেবে।

সমস্যা হলো, এই contrast খুব সহজেই ideological হয়ে উঠতে পারে। এটি এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে Western societies স্বভাবগতভাবেই superior এবং non-Western societies-কে modern হতে হলে West-কে অনুসরণ করতে হবে। এখানেই Parsons-এর theory Modernization Theory এবং Cold War development discourse-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

Cold War প্রেক্ষাপট: Sociology, Modernization এবং American Power

Cold War-এর সময়ে Modernization Theory কেবল academic theory ছিল না; এটি global politics-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। United States চাইত Asia, Africa এবং Latin America-এর newly independent countries যেন socialist বা revolutionary পথের পরিবর্তে capitalist, liberal-democratic পথ অনুসরণ করে। এই সময়ে Sociology, Political Science, Anthropology এবং Development Studies প্রায়ই “traditional” societies কীভাবে modernized হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে Parsons-এর theory modernization বোঝার জন্য একটি cultural এবং institutional vocabulary সরবরাহ করে। এর মাধ্যমে বলা হয়, সমাজকে particularistic, ascriptive, diffuse এবং emotionally embedded relation থেকে universalistic, achievement-oriented, specific এবং affectively neutral institution-এর দিকে অগ্রসর হতে হবে।

এই অবস্থানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ implication আছে।

প্রথমত, এটি Western modernity-কে development-এর model হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। United States এবং Western Europe-এর institutional form-কে social evolution-এর endpoint হিসেবে দেখা হয়।

দ্বিতীয়ত, এটি underdevelopment-এর কারণ প্রধানত non-Western societies-এর ভেতরে খুঁজে পায়। Poverty, corruption, patronage, weak bureaucracy বা low industrialization-কে colonial exploitation, unequal trade, imperialism বা global capitalism-এর পরিবর্তে traditional value-এর ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

তৃতীয়ত, এটি inequality-কে depoliticize করে। যদি poor countries traditional culture-এর কারণে underdeveloped হয়, তাহলে global power relation আড়ালে চলে যায়।

চতুর্থত, এটি development-কে reformist এবং managerial project হিসেবে উপস্থাপন করে। কাজটি হয়ে দাঁড়ায় institution, value, education, bureaucracy এবং economy modernize করা; global structure of domination-কে challenge করা নয়।

Pattern Variable Theory-এর প্রধান সমালোচনা

১. C. Wright Mills: Grand Theory এবং অতিরিক্ত বিমূর্ততা

C. Wright Mills তাঁর The Sociological Imagination (1959) গ্রন্থে Parsons-এর তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। Mills Parsons-এর ধরণের theorizing-কে “Grand Theory” বলে অভিহিত করেন। এর অর্থ হলো এমন এক ধরনের অত্যন্ত বিমূর্ত sociology, যা concrete historical reality এবং everyday social problem থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। Mills-এর মতে sociology-র কাজ হওয়া উচিত personal troubles-কে public issues এবং historical structure-এর সঙ্গে যুক্ত করা, কেবল abstract conceptual system তৈরি করা নয়।

Mills-এর দৃষ্টিতে Pattern Variable Theory অত্যন্ত formal এবং abstract। এটি Social Action শ্রেণিবদ্ধ করে, কিন্তু power, domination, class inequality, war, imperialism বা historical change যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে না। এটি sociology-কে social suffering এবং political conflict-এর critical inquiry না বানিয়ে system maintenance-এর ভাষায় রূপান্তরিত করে।

২. Alvin Gouldner: Value-free Sociology-এর মিথ

Alvin Gouldner তাঁর The Coming Crisis of Western Sociology (1970) গ্রন্থে value-free sociology-এর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর মতে Parsonian sociology আসলে American liberal welfare capitalism এবং তার সময়কার dominant institution-এর assumptions প্রতিফলিত করে। Gouldner দেখাতে চান যে Functionalist Theory সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং এটি অনেক সময় existing power structure-কে social order-এর জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

Pattern Variable Theory-এর ক্ষেত্রে Gouldner-এর critique দেখায় যে এই তত্ত্ব নিছক objective tool নয়। এটি mid-twentieth-century American sociology-এর একটি নির্দিষ্ট historical standpoint বহন করে। এর category-গুলো bureaucratic rationality, achievement, universalism এবং institutional stability-কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, যা modern Western capitalist society-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

৩. Ralf Dahrendorf: Conflict, Coercion এবং Authority

Ralf Dahrendorf Functionalism-এর সমালোচনা করেন, কারণ এটি consensus-কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয় এবং conflict-কে অবমূল্যায়ন করে। তাঁর মতে society কেবল shared value দ্বারা পরিচালিত হয় না; authority, domination, coercion এবং group conflict-ও সমাজকে গঠন করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে Pattern Variable Theory সীমিত, কারণ এটি value-orientation নিয়ে আলোচনা করলেও এই value থেকে কারা সুবিধা পায়, তা যথেষ্টভাবে বিশ্লেষণ করে না। যেমন universalism আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হতে পারে, কিন্তু powerful group institution-কে manipulate করতে পারে। Achievement উদযাপিত হতে পারে, কিন্তু class privilege নির্ধারণ করতে পারে কে achieve করতে পারবে। Dahrendorf-এর প্রশ্ন হবে: Parsons-এর model-এ conflict কোথায়? Power struggle, class relation, institutional domination এবং resistance কোথায়?

৪. Anthony Giddens: Agency, Structure এবং Social Change

Anthony Giddens deterministic এবং overly systemic view of society-এর সমালোচনা করেন। তাঁর Structuration Theory অনুযায়ী structure এবং agency পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত। মানুষ social structure দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজের action-এর মাধ্যমে সেই structure-কে reproduce এবং transform করে।

Parsons-এর theory অনেক সময় actor-কে normative system-এর মধ্যে strongly socialized হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে সমালোচকেরা বলেন, এটি reflexive, creative, resistant এবং transformative human agency-কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। মানুষ কেবল fixed value-orientation-এর মধ্যে পছন্দ করে না; তারা social norm-কে reinterpret, negotiate, resist এবং change করে।

৫. Pierre Bourdieu: Achievement-এর আড়ালে Hidden Inequality

Pierre Bourdieu সরাসরি Parsons-এর Pattern Variable নিয়েই শুধু লিখেননি, কিন্তু তাঁর তত্ত্ব Parsons-এর achievement/ascription distinction-কে গভীরভাবে challenge করে। Bourdieu দেখান যে modern institution, বিশেষত school ও university, cultural capital-এর মাধ্যমে class inequality পুনরুৎপাদন করে। Middle-class ও elite children ভাষার ধরন, confidence, credential, network এবং disposition উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, যা institution “merit” হিসেবে পুরস্কৃত করে।

এর অর্থ হলো তথাকথিত achievement-based modern society-ও hidden way-তে deeply ascriptive হতে পারে। একটি wealthy family-র সন্তান এবং একটি poor rural household-এর সন্তান একই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, কিন্তু তারা সমান resource নিয়ে প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে না। ফলে achievement এমন একটি moral language হয়ে ওঠে, যা inequality-কে legitimate করে।

৬. Immanuel Wallerstein: World-Systems Critique

World-Systems Theory এর মাধ্যমে Immanuel Wallerstein মূলতModernization Theory-কে challenge করেন। তাঁর মতে development এবং underdevelopment আলাদা internal stage নয়; এগুলো capitalist world-system-এর ভেতরে একসঙ্গে উৎপন্ন হয়। Wealthy core countries শক্তিশালী হয়েছে peripheral এবং semi-peripheral region-এর সঙ্গে unequal relationship-এর মাধ্যমে।

এই critique Parsons-modernization assumption-কে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। Parsons-এর framework poor countries-কে developed countries-এর তুলনায় শুধু “behind” হিসেবে দেখার প্রবণতা রাখে। কিন্তু World-Systems perspective থেকে underdevelopment তৈরি হয়েছে colonialism, unequal exchange, dependency এবং global capitalist extraction-এর মাধ্যমে। ফলে development ব্যাখ্যায় কেবল internal cultural transformation যথেষ্ট নয়।

৭. Andre Gunder Frank: The Development of Underdevelopment

Andre Gunder Frank, Dependency Theory-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ, যুক্তি দেন যে underdevelopment কোনো original condition নয়। এটি historical exploitation এবং world capitalist system-এ unequal integration-এর মাধ্যমে তৈরি হয়। Dependency Theory Modernization Theory-এর এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে যে আজকের poor countries কেবল rich countries-এর অনুসৃত পথের একটি আগের stage-এ আছে।

Frank-এর দৃষ্টিতে Parsons-এর framework সমস্যাজনক, কারণ এটি development-কে মূলত internal cultural transformation-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। এটি জিজ্ঞেস করে কোনো society যথেষ্ট universalistic, achievement-oriented বা specific কি না; কিন্তু colonial extraction, imperial trade, multinational capital, debt এবং geopolitical domination-কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

৮. Feminist Critiques: Gender, Family এবং Power

Feminist scholars Functionalism-এর সমালোচনা করেন, কারণ এটি অনেক সময় family-কে idealize করে এবং gender inequality-কে অবহেলা করে। Functionalist theory অনেক ক্ষেত্রে gender role-কে socially necessary হিসেবে দেখেছে, কিন্তু patriarchy, unpaid care work, domestic labour এবং women’s subordination যথেষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেনি।

Pattern Variable Theory-এর ক্ষেত্রে feminist critique কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: কে affective হতে বাধ্য? কে emotional labour করে? কে diffuse family role-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে? কে specific professional role-এ প্রবেশাধিকার পায়? অনেক সমাজে পুরুষদের achievement-based public institution-এ প্রবেশে উৎসাহিত করা হয়, আর নারীদের পরিবারে affective ও diffuse responsibility বহন করতে প্রত্যাশা করা হয়। তাই traditional-modern distinction gendered power relation-কে আড়াল করতে পারে।

৯. Postcolonial Critiques: Eurocentrism এবং Colonial Gaze

Postcolonial scholars যুক্তি দেন যে Parsons-এর theory একটি Eurocentric imagination প্রতিফলিত করে। এটি Western society-কে universal এবং non-Western society-কে particular, traditional ও incomplete হিসেবে উপস্থাপন করে। Category-গুলো দেখতে neutral মনে হলেও এগুলো West এবং rest-এর মধ্যে historical hierarchy বহন করে।

Postcolonial critique কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে: modernity সংজ্ঞায়িত করার authority কার? কেন Western bureaucracy, individual achievement এবং affective neutrality-কে superior ধরা হবে? Non-Western societies কি alternative modernities তৈরি করতে পারে না? Community, kinship, spirituality, solidarity এবং collective life কি backwardness-এর লক্ষণ না হয়ে social strength-এর উৎস হতে পারে না?

এই critique South Asian societies, বিশেষত Bangladesh-এর ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানে modern institution family network, religious value, community obligation, patron-client relation, global capitalism, migration, NGO development এবং postcolonial state formation-এর সঙ্গে একসঙ্গে coexist করে। একটি সরল traditional-modern binary এই জটিলতা ধরতে পারে না।

বাংলাদেশে এর প্রাসঙ্গিকতা

Pattern Variable Theory সতর্কভাবে ব্যবহার করলে বাংলাদেশ-এর মতো সমাজ বোঝার ক্ষেত্রে এখনও কার্যকর হতে পারে। এটি দেখাতে সাহায্য করে কীভাবে modern bureaucratic institution একই সঙ্গে kinship obligation, political patronage, community network, religious morality, market competition এবং global development agenda-এর সঙ্গে coexist করে।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ-এর education system আনুষ্ঠানিকভাবে achievement-কে promote করে। শিক্ষার্থীরা examination দেয়, certificate পায় এবং job-এর জন্য compete করে। কিন্তু quality education-এ access নির্ভর করে class, geography, gender, urban-rural inequality, coaching system, English-language skill এবং family background-এর ওপর। ফলে achievement এবং ascription একসঙ্গে কাজ করে।

একইভাবে bureaucracy আদর্শভাবে universalistic এবং affectively neutral হওয়া উচিত। কিন্তু নাগরিকরা অনেক সময় political connection, informal payment, personal network এবং unequal access to service-এর মাধ্যমে particularism অভিজ্ঞতা করে। এখানে modern এবং traditional orientation মিশ্রভাবে কাজ করে।

বাংলাদেশ-এ family life এখনও diffuse এবং affective, কিন্তু এটিকে সরলভাবে backwardness বলা যায় না। Family এবং community network emotional support, financial assistance, child and elderly care এবং crisis-এর সময় survival strategy প্রদান করে। Purely Western individualistic modernity-এর model এই social resource-গুলো বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে।

তাই বাংলাদেশ এবং অন্যান্য postcolonial society-এর ক্ষেত্রে Parsons-এর theory society-কে backward হিসেবে label করার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং এটি critically ব্যবহার করা উচিত, যাতে বোঝা যায় কীভাবে ভিন্ন value-orientation colonial history, capitalism, state formation, migration, climate vulnerability এবং globalization-এর প্রেক্ষাপটে coexist, conflict এবং change করে।

Pattern Variable Theory-এর শক্তি

সমালোচনা সত্ত্বেও Parsons-এর theory-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ শক্তি আছে।

প্রথমত, এটি social role এবং institution তুলনা করার জন্য একটি clear conceptual language দেয়।

দ্বিতীয়ত, এটি family, market, bureaucracy, religion, education এবং politics-এর আচরণগত পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

তৃতীয়ত, এটি Social Order গঠনে value এবং norm-এর গুরুত্ব তুলে ধরে।

চতুর্থত, এটি দেখায় যে modernization শুধু technology ও economy-এর পরিবর্তন নয়; বরং social relationship, institutional rule এবং cultural expectation-এর পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত।

পঞ্চমত, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য pedagogically useful, কারণ এটি personal এবং impersonal form of social organization-এর পার্থক্য সহজভাবে বোঝাতে সাহায্য করে।

Pattern Variable Theory-এর সীমাবদ্ধতা

এই theory-এর সীমাবদ্ধতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, এটি অত্যন্ত binary। বাস্তব সমাজ কখনোই পুরোপুরি traditional বা পুরোপুরি modern নয়। সমাজে universalism এবং particularism, achievement এবং ascription, affectivity এবং neutrality একসঙ্গে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, এটি society-কে rank করার কাজে ব্যবহৃত হলে Eurocentric হয়ে ওঠে। এতে Western society-কে universal standard হিসেবে দেখার ঝুঁকি থাকে।

তৃতীয়ত, এটি power এবং conflict-কে কম গুরুত্ব দেয়। এটি Social Order-কে বেশি গুরুত্ব দিলেও domination, inequality, resistance এবং social struggle যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে না।

চতুর্থত, এটি colonial এবং global structure-কে যথেষ্টভাবে বিবেচনা করে না। Underdevelopment-কে external exploitation-এর পরিবর্তে internal culture-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থাকে।

পঞ্চমত, এটি meritocracy-কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। Modern society achievement reward করার দাবি করলেও inherited privilege এখনও শক্তিশালী।

ষষ্ঠত, এটি gender, race, class, caste, ethnicity এবং postcolonial identity-কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

সপ্তমত, এটি sociology-কে objective এবং value-free হিসেবে উপস্থাপন করলেও এর category-গুলো একটি নির্দিষ্ট historical এবং ideological context বহন করে।

Talcott Parsons-এর Pattern Variable Theory Structural Functionalist Sociology-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ conceptual tool। এটি ব্যাখ্যা করে কীভাবে Social Action universalism, particularism, achievement, ascription, affectivity, neutrality, specificity এবং diffuseness-এর মতো value-orientation দ্বারা প্রভাবিত হয়। Teaching framework হিসেবে এটি এখনও family, bureaucracy, profession, market এবং community-র পার্থক্য বোঝার জন্য কার্যকর।

তবে theory-টি critical ভাবে পড়া প্রয়োজন। এটি এমন এক সময়ে বিকশিত হয়েছিল, যখন American sociology Cold War modernization thinking-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এর category-গুলো প্রায়ই Western society, বিশেষত United States-কে modern, rational, universalistic এবং achievement-based হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যবহৃত হয়েছে; অন্যদিকে non-Western society-কে traditional, emotional, particularistic এবং ascriptive হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই কারণে theory-টি conservatism, Eurocentrism এবং ideological bias-এর অভিযোগের মুখে পড়ে।

আজ Parsons-কে ব্যবহারের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাঁকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান না করা, আবার অন্ধভাবে গ্রহণও না করা। বরং Pattern Variable Theory-কে একটি historically important framework হিসেবে দেখা উচিত, যা mid-twentieth-century Western sociology-এর analytical power এবং political limitation দুটিই প্রকাশ করে।বাংলাদেশ এবং broader Global South-এর students ও scholars-এর জন্য কাজ হলো Parsons-কে reflexively ব্যবহার করা: institutional change বোঝার জন্য, কিন্তু একই সঙ্গে এই assumption-কে প্রশ্ন করার জন্য যে Western modernity-ই সব সমাজের চূড়ান্ত গন্তব্য।

References

Bourdieu, P. (1984). Distinction: A Social Critique of the Judgement of Taste. Harvard University Press.

Dahrendorf, R. (1959). Class and Class Conflict in Industrial Society. Stanford University Press.

Frank, A. G. (1967). Capitalism and Underdevelopment in Latin America. Monthly Review Press.

Giddens, A. (1976). New Rules of Sociological Method. Hutchinson.

Giddens, A. (1984). The Constitution of Society: Outline of the Theory of Structuration. University of California Press.

Gouldner, A. W. (1970). The Coming Crisis of Western Sociology. Basic Books.

Mills, C. W. (1959). The Sociological Imagination. Oxford University Press.

Parsons, T. (1937). The Structure of Social Action. McGraw-Hill.

Parsons, T. (1951). The Social System. Free Press.

Parsons, T., & Shils, E. A. (Eds.). (1951). Toward a General Theory of Action. Harvard University Press.

Wallerstein, I. (1974). The Modern World-System I: Capitalist Agriculture and the Origins of the European World-Economy in the Sixteenth Century. Academic Press.


ওয়াল্ট রস্টোর আধুনিকীকরণ তত্ত্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৬ জুলাই ১৩ ১২:৫০:০৮
ওয়াল্ট রস্টোর আধুনিকীকরণ তত্ত্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

ওয়াল্ট হুইটম্যান রস্টোর আধুনিকীকরণ তত্ত্ব মূলত একটি শীতলযুদ্ধকালীন উন্নয়ন-দর্শন, যা দাবি করে যে সমাজগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের একটি প্রায়-রৈখিক ধারাবাহিকতা অতিক্রম করে “উচ্চ গণভোগের যুগে” পৌঁছায়। এই তত্ত্বের বৌদ্ধিক ও নীতিগত শক্তি ছিল এর সরলতা: পুঁজি সঞ্চয়, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা-শ্রেণি ও “আধুনিক” মানসিকতা মিললে দরিদ্র দেশগুলোও পশ্চিমা ধাঁচের প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে। কিন্তু এই তত্ত্ব একই সঙ্গে ছিল গভীরভাবে রাজনৈতিক—রস্টোর ১৯৬০ সালের বইয়ের উপশিরোনামই ছিল A Non-Communist Manifesto—অর্থাৎ এটি উন্নয়ন-বিষয়ক একাডেমিক ব্যাখ্যা যেমন, তেমনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক অস্ত্রও ছিল।

তত্ত্বটি উন্নয়নচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেললেও এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী সমালোচনা উঠে আসে। আন্দ্রে গুন্ডার ফ্র্যাঙ্ক, ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন, সামির আমিন ও আর্তুরো এস্কোবার দেখান যে “অনুন্নয়ন” কেবল অভ্যন্তরীণ পশ্চাদপদতার ফল নয়; বরং ঔপনিবেশিক ইতিহাস, বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কোর–পেরিফেরি কাঠামো, অসম বাণিজ্য, জ্ঞানগত ইউরোসেন্ট্রিজম এবং উন্নয়ন-ভাষ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতাই বহু দেশের পথ নির্ধারণ করে। ফলে রস্টোর সর্বজনীন স্টেজ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা বাস্তব বিশ্বের ক্ষমতার অসমতা, ঔপনিবেশিকতা, বৈদেশিক নির্ভরতা, শ্রেণি-সম্পর্ক, লিঙ্গ বৈষম্য এবং পরিবেশগত সীমা পর্যাপ্তভাবে ধরতে পারে না।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে রস্টোর তত্ত্ব আংশিকভাবে ব্যাখ্যামূলক হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনির্ভর পুনর্গঠন, পরে কৃষি-সবুজ বিপ্লব, শ্রমঘন শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী পোশাকখাত, নারীর শ্রম-অংশগ্রহণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, জনসংখ্যা-রূপান্তর ও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষায় লিঙ্গসমতা, আয়ু বৃদ্ধি, বিদ্যুতায়ন ও শিল্প-রপ্তানিতে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দারিদ্র্যের প্রত্যাবর্তন, শ্রম-অনিরাপত্তা, মজুরি-চাপ, নগর-অসমতা, জলবায়ু-ঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষয় দেখায় যে “টেক-অফ” বা “ম্যাচিউরিটি” একরৈখিক বা সামাজিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। এই কারণে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম নীতিপথ হবে রস্টোর বৃদ্ধিমুখী অন্তর্দৃষ্টি, লুইস-ধারার কাঠামোগত রূপান্তর, এন্ডোজেনাস গ্রোথের জ্ঞান-নীতির ওপর জোর, এবং নির্ভরতা/পোস্টকলোনিয়াল সমালোচনার সতর্কতা—এই সবকিছুর একটি সমন্বিত প্রয়োগ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রস্টোর তত্ত্ব বোঝার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনীতি বোঝা অপরিহার্য। ১৯৪৭ সালের মার্শাল প্ল্যান পশ্চিম ইউরোপ পুনর্গঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কূটনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৪৯ সালে ট্রুম্যানের “ফোর পয়েন্ট” ভাষণ “underdeveloped areas”-এ বৈজ্ঞানিক ও শিল্প-অগ্রগতির সুফল পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে উন্নয়নকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের ডিকলোনাইজেশন ঘোষণা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের নৈতিক-রাজনৈতিক ভিত্তি জোরদার করে। এই তিনটি ধারা—পুনর্গঠন, শীতলযুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিকতার অবসান—মিলে “উন্নয়ন”কে একটি বৈশ্বিক কর্মসূচিতে পরিণত করে, এবং রস্টোর মডেল সেই কর্মসূচির অন্যতম প্রভাবশালী ভাষা হয়ে ওঠে।

রস্টোর চিন্তা তাই নিছক অর্থনৈতিক ইতিহাস ছিল না; এটি ছিল “কীভাবে দরিদ্র দেশগুলো কমিউনিজমে না গিয়ে পুঁজিবাদী আধুনিকতায় প্রবেশ করবে”—এই প্রশ্নের উত্তর। এই অর্থে আধুনিকীকরণ তত্ত্ব শীতলযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী উন্নয়ন-মডেল—সোভিয়েত পরিকল্পনা বনাম মার্কিন-সমর্থিত পুঁজিবাদী উন্নয়ন—এর মধ্যে এক বৌদ্ধিক মধ্যস্থতাকারী। পরে বিশ্বব্যাংক, মার্কিন সহায়তা সংস্থা এবং নানা জাতীয় পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় এই বৃদ্ধিকেন্দ্রিক ভাষা ছড়িয়ে পড়ে।

রস্টোর জীবন, রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রধান রচনা

ওয়াল্ট হুইটম্যান রস্টো (১৯১৬–২০০৩) ছিলেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ, অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, MIT-এর অধ্যাপক এবং পরে কেনেডি ও জনসন প্রশাসনের নীতিনির্ধারক; ১৯৬৬–১৯৬৯ সময়ে তিনি লিন্ডন জনসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি OSS-এ কাজ করেন, পরে MIT-তে পড়ান, এবং ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন কঠোর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক সমর্থক হয়ে ওঠেন। এই জীবনপথ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর উন্নয়নধারণা একাডেমিক ও কৌশলগত রাষ্ট্রনীতির সংযোগস্থলে গঠিত।

রস্টোর প্রধান রচনার মধ্যে রয়েছে The Process of Economic Growth (১৯৫২), ১৯৫৯ সালে Economic History Review-এ প্রকাশিত “The Stages of Economic Growth” প্রবন্ধ, এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ১৯৬০ সালের The Stages of Economic Growth: A Non-Communist Manifesto। ১৯৫৯ সালের প্রবন্ধটি ১–১৬ পৃষ্ঠাজুড়ে তাঁর স্টেজ-ভিত্তিক কাঠামোর সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা দেয়; ১৯৬০ সালের বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় “The Five Stages of Growth—A Summary” সাধারণত পৃষ্ঠা ৪–১৬ হিসেবে উদ্ধৃত হয়।

রস্টোর বইয়ের সূচনামূলক প্রশ্নটি ছিল স্মরণীয়: পৃথিবী কি “কমিউনিজমে” যাচ্ছে, না “সচ্ছল উপশহর”-এর দিকে? এই বাক্যবন্ধই দেখায় যে তাঁর উন্নয়ন-ভাবনা ছিল নর্মেটিভ ও আদর্শিক। আবার আরেক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন যে growth stages হচ্ছে “an arbitrary and limited way” of viewing modern history—অর্থাৎ তিনি নিজেও জানতেন যে মডেলটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিরূপ নয়, বরং একটি বিশ্লেষণী রূপরেখা।

রস্টোর তত্ত্ব

রস্টোর তত্ত্বের কেন্দ্রে আছে কয়েকটি শক্তিশালী অনুমান: ইতিহাস সাধারণভাবে রৈখিক অগ্রগতির দিকে যায়; “প্রথাগত” সমাজ থেকে “আধুনিক” সমাজে উত্তরণে সঞ্চয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিক্ষা, বাজার ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ; এবং একবার “টেক-অফ” শুরু হলে প্রবৃদ্ধি আত্ম-প্রণোদিত হয়ে পড়ে। নীতিগতভাবে এর মানে দাঁড়ায়—রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, বন্দর, কৃষি-উৎপাদনশীলতা, উদ্যোক্তা-শ্রেণি, ব্যাংকিং, শিল্পায়ন, বৈদেশিক পুঁজি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রশাসনিক সংস্কারের সমন্বয়ে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।

এই তত্ত্বে সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানও অবান্তর নয়। রস্টো মনে করতেন যে প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত গড়ে ওঠে যখন সমাজে ভবিষ্যৎমুখী বিনিয়োগ-মনোভাব, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানপ্রয়োগ, জাতীয় বাজারের সম্প্রসারণ এবং আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি হয়। তবে তাঁর বিশ্লেষণে ঔপনিবেশিক শোষণ, বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের অসমতা বা বহির্ভরতার বাধা তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত; এখানে “অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি” বেশি গুরুত্বপূর্ণ, “বহিরাগত কাঠামোগত সীমা” কম।

পাঁচটি ধাপ: রস্টো পাঁচটি ধাপের কথা বলেন: (ক) traditional society, (খ) preconditions for take-off, (গ) take-off, (ঘ) drive to maturity, এবং (ঙ) age of high mass consumption। বইটির সারাংশ-অধ্যায় (pp. 4–16) এই ক্রমকে তাঁর বিশ্লেষণের কোর কাঠামো হিসেবে স্থাপন করে। তৃতীয় ধাপ “take-off”-এ বিনিয়োগের হার প্রায় ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের ওপরে উঠতে থাকে—এই সূচকটিই পরবর্তী সাহিত্য্যে রস্টোর সঙ্গে শক্তভাবে যুক্ত হয়।

“Traditional society” ধাপে উৎপাদনশীলতার সীমা কম, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, এবং অর্থনীতি সাধারণত কৃষিনির্ভর। “Preconditions” ধাপে কৃষি ও শিল্পে নতুন উৎপাদনপদ্ধতি, অবকাঠামো, বাণিজ্যিকীকরণ, রাষ্ট্রগঠন এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ তৈরি হয়। “Take-off” হলো সেই মোড়-ফেরানো সময় যখন বিনিয়োগ, উদীয়মান শিল্প, নগরায়ন ও লাভ-আবার-বিনিয়োগের চক্র অর্থনীতিকে আত্মচালিত প্রবৃদ্ধির পথে নেয়। “Drive to maturity” ধাপে প্রযুক্তি অর্থনীতির বিস্তৃত খাতে ছড়িয়ে পড়ে; আর “high mass consumption”-এ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের পর মানুষ টেকসই ভোগ্যপণ্য, সেবা, কল্যাণব্যবস্থা ও মধ্যবিত্ত জীবনধারার দিকে অগ্রসর হয়।

নির্ভরতা, বিশ্ব-ব্যবস্থা ও পোস্টকলোনিয়াল সমালোচনা

রস্টোর বিরুদ্ধে প্রথম বড় আঘাত আসে dependency theory থেকে। এই ধারার মতে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো “অভ্যন্তরীণভাবে অপরিণত” বলে দরিদ্র নয়; বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের এমন এক কাঠামোয় ঢোকানো হয়েছে যেখানে কাঁচামাল, সস্তা শ্রম ও উদ্বৃত্ত পেরিফেরি থেকে কোরে সরে যায়। নির্ভরতাবাদী সাহিত্য রস্টোর এই অনুমানকে প্রত্যাখ্যান করে যে বিশ্ববাজারে অধিক ইন্টিগ্রেশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সকলকে একই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে তুলবে। আন্দ্রে গুন্ডার ফ্র্যাঙ্কের The Development of Underdevelopment (১৯৬৬) এ যুক্তির ক্লাসিক রূপ; পরবর্তী dependency theory-র সারসংক্ষেপেও স্পষ্টভাবে বলা হয় যে এটি modernization theory-র সরাসরি প্রতিক্রিয়া।ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন এই সমালোচনাকে আরও পদ্ধতিগত রূপ দেন। তাঁর world-systems analysis অনুসারে জাতিরাষ্ট্র উন্নয়নের একক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ মঞ্চ নয়; বরং কোর, সেমি-পেরিফেরি ও পেরিফেরি-নির্ভর একটি বিশ্ব-অর্থনীতির অংশ। তিনি modernization theory-র তিনটি বড় দুর্বলতার কথা বলেন: জাতিরাষ্ট্রকেন্দ্রিকতা, সবার জন্য একক বিবর্তনপথের ধারণা, এবং ট্রান্সন্যাশনাল কাঠামোগত বাধা উপেক্ষা করা।

সামির আমিন যুক্তি দেন যে পেরিফেরির অর্থনীতি স্বাধীন নয়; এগুলো মূলত কেন্দ্রীয় পুঁজিবাদী অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী “extraverted” বা বহির্মুখীভাবে গঠিত। তাঁর Unequal Development ও “delinking” ধারণা বলে যে দক্ষিণের দেশগুলো যদি নিজস্ব উন্নয়ন-অগ্রাধিকারের অধীন বিশ্ববাজারকে রাখতে না পারে, তবে “ক্যাচ-আপ” হবে না। অর্থাৎ রস্টোর টেক-অফ তখনই বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে যখন পুঁজি সঞ্চয়ের ফল দেশীয় শিল্প-ক্ষেত্রে নয়, বরং বৈদেশিক নির্ভরতায় আটকে যায়।

আর্তুরো এস্কোবারের পোস্ট-ডেভেলপমেন্ট সমালোচনা আরও মৌলিক। তাঁর মতে “উন্নয়ন” শুধু নীতি নয়, একটি ক্ষমতাশালী জ্ঞান-ভাষ্য, যা তৃতীয় বিশ্বকে সমস্যা হিসেবে নির্মাণ করে এবং পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে স্বাভাবিক করে। এই অর্থে রস্টোর “traditional society” ধারণা কেবল বর্ণনামূলক নয়; এটি জ্ঞানগতভাবে অন্য সমাজকে অভাব, ঘাটতি ও পশ্চাদপদতার ভাষায় সংজ্ঞায়িত করে।

প্রমাণভিত্তিক ও পরিবেশগত আপত্তি

রস্টোর মডেল বাস্তবে সর্বত্র খাটে না। পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু অর্থনীতি দ্রুত শিল্পায়িত হলেও তা কেবল বাজার-স্বয়ংক্রিয়তায় হয়নি; শক্তিশালী রাষ্ট্র, লক্ষ্যভিত্তিক শিল্পনীতি, সুরক্ষা, প্রযুক্তি-আয়ত্ত, রপ্তানি-শৃঙ্খলা ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে কৌশলগত প্রবেশ প্রয়োজন হয়েছে। অন্যদিকে বহু দেশ বিশ্ববাজারে যুক্ত হয়েও “take-off” করতে পারেনি, কারণ ঋণ, পণ্যমূল্য-অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা কাঁচামাল-নির্ভরতা তাদের আটকে রেখেছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে উন্নয়ন একক ধাপ-সিঁড়ি নয়; “অসম ও সম্মিলিত” পথও হতে পারে।

আরও বড় আপত্তি হলো পরিবেশগত সীমা। “Age of high mass consumption” ধারণাটি বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আকর্ষণীয় হলেও একবিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক কার্বন নির্গমন, সম্পদ অপচয় ও জলবায়ু-ঝুঁকির মুখে তা আর নির্দোষ লক্ষ্য নয়। WHO স্পষ্ট বলছে যে জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানি, জীবিকা ও বৈষম্যের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে; ২০৩০–২০৫০ সময়কালে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও তাপ-স্ট্রেসের কারণে অতিরিক্ত ২,৫০,০০০ মৃত্যুর বার্ষিক ঝুঁকি তারা প্রক্ষেপণ করছে। ফলে “উচ্চ গণভোগ” এখন আর নিছক উন্নয়নের চূড়া নয়; বরং প্রশ্ন হলো—কোন ধরনের ভোগ, কার জন্য, এবং কোন পরিবেশগত ব্যয়ে।

রস্টো-পরবর্তী সংশোধিত বা বিকল্প আধুনিকীকরণ

রস্টোর পর উন্নয়নচিন্তা পুরোপুরি “anti-modernization” হয়ে যায়নি; বরং তা বহু দিকে সংশোধিত হয়েছে। নব্য-ধ্রুপদী Solow–Swan মডেল দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কেন্দ্রীয়তা দেখালেও প্রযুক্তিকে বহিরাগত ধরে, ফলে নীতি-পর্যায়ে এর ব্যাখ্যা সীমাবদ্ধ থাকে। এন্ডোজেনাস গ্রোথ তত্ত্ব—বিশেষত পল রোমারের কাজ—জ্ঞান, উদ্ভাবন, non-rival ideas, গবেষণা ও মানবসম্পদকে প্রবৃদ্ধির ভেতরগত চালক হিসেবে পুনর্গঠন করে। এতে রস্টোর “পুঁজি+প্রযুক্তি” যুক্তি নতুন রূপ পায়, কিন্তু তা আর স্রেফ স্টেজ-ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

উন্নয়ন অর্থনীতির structuralist ও dual-economy ধারাও রস্টোকে সংশোধন করে। আর্থার লুইসের “unlimited supplies of labour” মডেল দেখায় কীভাবে উদ্বৃত্ত কৃষিশ্রম শিল্পে স্থানান্তরিত হয়ে রূপান্তর ঘটাতে পারে; অন্যদিকে প্রেবিশ-সিংগার ও structuralist tradition দেখায় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের terms of trade পেরিফেরির বিরুদ্ধে গেলে শুধু স্টেজ-সিঁড়ি ধরে এগোনো যায় না। সেই অর্থে লুইস ও structuralists আধুনিকীকরণকে সম্পূর্ণ বাতিল করেন না; বরং বলেন, বৈশ্বিক বাজার ও খাতভিত্তিক কাঠামো বিশ্লেষণ ছাড়া আধুনিকীকরণ বোঝা অসম্ভব।

প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের diffusion tradition—এভারেট রজার্সের Diffusion of Innovations—আরও একটি সংশোধিত পথ দেখায়। এখানে “আধুনিকতা” কোনো দেশীয় স্টেজের যান্ত্রিক ফল নয়; বরং ধারণা, প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক, early adopters, opinion leaders, communication channels ও social system-এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে উন্নয়ন ব্যাখ্যায় সামাজিক গ্রহণক্ষমতা, আস্থা, প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ক—এগুলোও কেন্দ্রে চলে আসে।

বাংলাদেশে আধুনিকীকরণ-ধারার প্রয়োগ: ১৯৭১-পরবর্তী পরিকল্পনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩–১৯৭৮) মূলত অর্থনৈতিক ন্যায়, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নির্মিত হয়; এতে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ—ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই পরিকল্পনায় কৃষি ও শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, অবকাঠামো পুনর্গঠন, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পর্যায়ে বাংলাদেশের উন্নয়নপথ রস্টোর “preconditions” ও যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্রনির্ভর পুনর্গঠনের একটি মিশ্র রূপ বলে পড়া যায়।

পরবর্তী পরিকল্পনাগুলোতে ধীরে ধীরে বেসরকারিখাত, কৃষি-বাণিজ্যিকীকরণ, গ্রামীণ ঋণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, জুটের বাইরে শিল্পবৈচিত্র্য, টেক্সটাইল, লেদার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অবকাঠামো উন্নয়ন জোর পায়। এই রূপান্তর ১৯৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের বাস্তব উন্নয়ন-রাজনীতিকে আরও রস্টো-ঘেঁষা করে তোলে—অর্থাৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন, শিল্পায়ন ও রপ্তানির ওপর জোর বাড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা “Towards Prosperity for All” শ্লোগান নিয়ে কর্মসংস্থান, SDG-সামঞ্জস্য, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও Vision 2041-এর শিল্পায়ন-লক্ষ্যকে সামনে আনে। পরিকল্পনাটি কর্মসংস্থানকে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং ১১.৬ মিলিয়ন চাকরির টার্গেট স্থির করে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের Country Partnership Framework-ও বাংলাদেশের জন্য বহুমুখীকৃত ও প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারিখাত, নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, আর্থিক খাত সংস্কার ও জলবায়ু-সহনশীলতা জোর দেয়।

বাংলাদেশের সাফল্য: যেখানে রস্টো আংশিকভাবে কার্যকর

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ “one of the poorest countries” থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছে; বিশ্বব্যাংক বলছে মানবউন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন এই অগ্রগতির কেন্দ্রে ছিল। গড় আয়ু ১৯৭২ সালের ৪৬.৫ বছর থেকে ৭০ বছরের ওপরে উঠেছে, প্রায় সব পরিবার বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, স্কুলে লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে, এবং গ্রামীণ নারীদের বিশাল অংশ টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসে যুক্ত হয়েছে; একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার ১৯৭০ সালের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ কমেছে। এই অর্জনগুলো দেখায় যে অবকাঠামো, উৎপাদনশীলতা, নারীর শ্রমসংযুক্তি ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ—রস্টোর ভাষায় preconditions থেকে take-off-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার—কিছু বাস্তব ভিত্তি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির খাতগত কাঠামোও বদলেছে। ১৯৭২ সালে কৃষির অংশ ছিল জিডিপির প্রায় ৫৯.৬ শতাংশ, শিল্প ৬.১ শতাংশ এবং সেবা ৩৪.৩ শতাংশ; ২০২০ সালে কৃষি ১২.৬ শতাংশে নেমে আসে, শিল্প ২৮.৮ শতাংশ এবং সেবা ৫৪.৬ শতাংশে ওঠে। এই structural transformation-কে রস্টোর পরিভাষায় preconditions → take-off → maturity-এর একটি অংশিক রূপান্তর হিসেবে পড়া যায়, যদিও তার গতি ও রূপ ছিল অসম।

সীমাবদ্ধতা: লিঙ্গ, অসমতা, শ্রম ও পরিবেশ

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা রস্টোর মডেলের সীমাও দেখায়। গার্মেন্টস শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ কর্মী কাজ করে, যাদের বেশিরভাগ নারী; এই খাত বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রতীক হলেও নিম্ন মজুরি, অতিরিক্ত ওভারটাইম, শ্রম-অধিকার সংকট ও নিরাপত্তা সমস্যাও বহন করে। ফলে নারীর শ্রম-অংশগ্রহণকে নিছক ক্ষমতায়ন বলা যায় না; এটি একই সঙ্গে সস্তা শ্রমভিত্তিক প্রতিযোগিতারও অংশ।আরও গুরুত্বপূর্ণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে: বিশ্বব্যাংক বলছে গত দশকে গড় ৬ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির পর গত কয়েক বছরে গতি কমেছে, এবং জাতীয় দারিদ্র্য ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫-এ ২১.৪ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি সবসময় স্বয়ংক্রিয় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বয়ে আনে না; ম্যাক্রো-অস্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও যুব কর্মসংস্থানের ঘাটতি “take-off” বয়ানের অন্তরালে জমা হতে পারে।

পরিবেশগত ক্ষেত্রেও রস্টোর “high mass consumption” ধারণা বাংলাদেশের জন্য সমস্যাজনক। বাংলাদেশ জলবায়ু-অতিসংবেদনশীল; বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে Reuters জানায় যে ২০২৪ সালে তাপ-সম্পর্কিত অসুস্থতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ; ২৫ মিলিয়ন কর্মদিবস হারিয়েছে, এবং নারী ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে ছিল। WHO-ও বলছে—তাপপ্রবাহ, বন্যা, খাদ্য-ঝুঁকি, পানিসংকট, মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্য-অবকাঠামোগত দুর্বলতা উন্নয়ন-অর্জনকে উল্টে দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন এখন শুধু growth rate নয়; climate-resilient, health-aware, gender-just growth।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত শিক্ষা

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত পাঁচটি শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, রস্টোর মত প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না; বাংলাদেশে এসব বাস্তব পার্থক্য তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, dependency critique আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্প যদি মূল্যসংযোজন, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং ও শ্রমমান উন্নয়ন না ঘটায়, তবে দেশ “লো-ওয়েজ ট্র্যাপ”-এ আটকে যেতে পারে। তৃতীয়ত, এস্কোবার-ধারার সতর্কতা বলছে—উন্নয়নকে কেবল GDP বা consumption দিয়ে মাপা যাবে না; ক্ষমতা, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যায়ও বিবেচ্য। চতুর্থত, WHO-র ভাষায় জলবায়ু এখন threat multiplier; তাই শিল্পনীতি, নগরনীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা আলাদা খাত নয়। পঞ্চমত, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ “ধাপ পেরোনো”র চেয়ে বেশি নির্ভর করবে জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন, সবুজ অবকাঠামো, দক্ষতা, নারী-নিরাপদ কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, নগর শাসন ও রপ্তানি-বহুমুখীকরণের ওপর।

পরিশেষে বলা যায়, রস্টোর আধুনিকীকরণ তত্ত্বকে না একেবারে বাতিল করা যায়, না সরলভাবে গ্রহণ করা যায়। এর শক্তি হলো—এটি উন্নয়নকে ইতিহাস-সাপেক্ষ পরিবর্তন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদনশীলতার প্রশ্নে সংগঠিত করে; উন্নয়নকে স্রেফ নৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বাস্তব রূপান্তর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে শেখায়। কিন্তু এর দুর্বলতা হলো—এটি ইউরোসেন্ট্রিক, রাজনৈতিক অর্থনীতির দিক থেকে অপর্যাপ্ত, ঔপনিবেশিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতা-অসমতার বিশ্লেষণে সীমিত, এবং পরিবেশগত সীমা সম্পর্কে এখন স্পষ্টতই পুরোনো। বাংলাদেশের জন্য সঠিক পাঠ তাই দ্বিমুখী। একদিকে প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, শিল্পবৈচিত্র্য, নারীর শ্রমসংযুক্তি ও রপ্তানি-ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি—এখানে রস্টো এখনও আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে নীতি-অগ্রাধিকার হতে হবে শ্রমমান, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, নগর-অসমতা, climate adaptation, green industrialization, প্রযুক্তি-উন্নয়ন ও মূল্যসংযোজন। অর্থাৎ বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন-ধাপকে “take-off” নয়, বরং inclusive, resilient, and knowledge-intensive transformation হিসেবে ভাবাই অধিক ফলপ্রসূ।

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

W. W. Rostow, The Stages of Economic Growth: A Non-Communist Manifesto (1960)

W. W. Rostow, “The Stages of Economic Growth,” Economic History Review (1959)

Andre Gunder Frank, The Development of Underdevelopment (1966)

Immanuel Wallerstein, The Modern World-System (1974)

Samir Amin, Unequal Development (1973/1976)

Arturo Escobar, Encountering Development (1995)

WHO, “Climate change” fact sheet (2023)


গিলগামেশ থেকে মিস্ত্রাল: সাহিত্যের হাজার বছরের যাত্রা

২০২৫ ডিসেম্বর ২৬ ১২:৪৭:৪৭
গিলগামেশ থেকে মিস্ত্রাল: সাহিত্যের হাজার বছরের যাত্রা
ছবি: সংগৃহীত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে লিখিত সাহিত্যের সূচনা ঘটে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। বর্তমানে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’কে সাধারণত প্রথম মহৎ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও এর চেয়েও পুরোনো কিছু সংক্ষিপ্ত রচনা টিকে আছে যেমন ‘কেশ মন্দির স্তোত্র’ এবং ‘শুরুপ্পাকের উপদেশ’ তবুও ব্যাপ্তি, দার্শনিক গভীরতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে গিলগামেশ মহাকাব্য মানবসাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য স্থান দখল করে আছে।

এই মহাকাব্য শুধু প্রাচীন সভ্যতার চিন্তাভাবনাই নয়, বরং পরবর্তী বহু সাহিত্যধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বলে গবেষকদের ধারণা। গ্রিক সাহিত্যকর্ম ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’, আলেকজান্ডার রোমান্স সাহিত্য এবং হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্টেও গিলগামেশের প্রভাবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। এসব সাহিত্যকর্ম আজও নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

ইউরোপীয় সাহিত্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো প্রোভেন্সাল সাহিত্য, যা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের প্রোভেন্স অঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যবহৃত অক্সিতাঁ বা প্রোভেন্সাল ভাষায় রচিত। একাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত এই সাহিত্যের স্বর্ণযুগ ছিল, যখন এর কবিতা সৌন্দর্য, শৈল্পিক উৎকর্ষ এবং ভাবের বৈচিত্র্যে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। বিশেষত রাজকীয় প্রেম বা চিভ্যালরিক ভালোবাসার আদর্শ এই সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

প্রোভেন্সাল সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন সম্ভবত দশম শতকের একটি কবিতাংশ। তবে এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বোয়েথিয়াসের ‘অন দ্য কনসোলেশন অব ফিলোসফি’ গ্রন্থের অক্সিতাঁ ভাষায় অনুবাদ। একাদশ শতকের শেষভাগে আকুইটেইনের ডিউক উইলিয়াম নবম প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রোভেন্সাল কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর গান ও স্তবকগুলো প্রেম, অনুশোচনা ও জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে গভীর অনুভূতি প্রকাশ করে।

সমসাময়িক লাতিন ইতিহাসবিদরা জানান, প্রোভেন্সাল কবিতার শুরুর দিকের শিল্পীরা ছিলেন ‘জগলার’ বা ‘জঁগুলার’ শ্রেণির মানুষ—যারা গান, আবৃত্তি ও কসরতের মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দিতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রেণি থেকেই উন্নত রুচির কবি ‘ত্রুবাদুর’-দের উত্থান ঘটে। তারা অভিজাত সমাজের ভাষায় সূক্ষ্ম সাহিত্য রচনা করতেন এবং অনেক সময় নিজেরাও উচ্চবংশীয় অভিজাত ছিলেন।

ত্রুবাদুরদের প্রেমের গান মধ্যযুগীয় প্রোভেন্সাল সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে বিবেচিত। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় রাজনৈতিক বিবাহের কারণে অভিজাত নারীরা প্রণয়প্রার্থী দরবারিদের কবিতা ও গানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। সামাজিক মর্যাদার ব্যবধান থাকায় কবিরা অত্যন্ত সংযত ও মার্জিত ভাষায় ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। এই ‘কোর্টলি লাভ’-এর আদর্শ ইউরোপীয় সাহিত্য ও সামাজিক আচরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

দ্বাদশ শতকে সেরকামঁ, মারকাব্রু, জফ্রে রুদেল, বার্নার দ্য ভঁতাদুর এবং বেরত্রঁ দ্য বোর্নের মতো কবিরা প্রোভেন্সাল কবিতাকে বহুমাত্রিক রূপ দেন। পরবর্তীকালে আরনো দানিয়েল, গিরো দ্য বোর্নেল, পেইর বিদাল ও ফোলকে দ্য মার্সেইসহ বহু কবি ভাষা, ছন্দ ও ভাবের পরীক্ষানিরীক্ষায় এই সাহিত্যধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

তবে ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে আলবিজোয়ান ক্রুসেড প্রোভেন্সাল সাহিত্যের ওপর ভয়াবহ আঘাত হানে। দক্ষিণ ফ্রান্সের বহু অভিজাত পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে ত্রুবাদুরদের পৃষ্ঠপোষকতা বিলুপ্ত হয়। অনেক কবি স্পেন ও ইতালিতে আশ্রয় নেন। ধীরে ধীরে প্রোভেন্সাল ভাষার পরিবর্তে স্থানীয় উপভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে এবং মূল ধারার কবিতা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ত্রুবাদুর কবিতার পাশাপাশি প্রোভেন্সাল সাহিত্যে ‘শঁসোঁ দ্য জেস্ত’, রোমাঞ্চকর উপন্যাস, ‘নোভা’ নামের সংক্ষিপ্ত কাহিনি এবং দীর্ঘ রোমান্সেরও সমৃদ্ধ ধারা ছিল। ‘জিরার দ্য রুশিলোঁ’ কিংবা ‘ফ্লামাঁকা’ নামের দীর্ঘ কবিতাগুলো মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থা, প্রেম ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের জীবন্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে প্রোভেন্সাল সাহিত্য মূলত ধর্মীয় ও নীতিশিক্ষামূলক রচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে ফরাসি বিপ্লবের পর মধ্যযুগীয় এই ঐতিহ্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৮৫৪ সালে ‘ফেলিব্রিজ’ নামের একটি সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা ঘটে, যার লক্ষ্য ছিল অক্সিতাঁ ভাষার পুনর্জাগরণ।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন কবি ফ্রেদেরিক মিস্ত্রাল। তাঁর মহাকাব্যিক কবিতা ‘মিরেইও’ ও ‘কালাঁদো’ প্রোভেন্সাল সাহিত্যের নবজাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। ভাষা ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০৪ সালে তিনি নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।

সূত্র: ব্রিটানিকা


ইতিহাসের কুচক্রী নারী: ঘষেটি বেগম, যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ডেকে এনেছিল বাংলার পতন

২০২৫ নভেম্বর ১৬ ২১:৩১:৩৭
ইতিহাসের কুচক্রী নারী: ঘষেটি বেগম, যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ডেকে এনেছিল বাংলার পতন
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যাদের নাম শুনলেই ভেসে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পেছনে মীর জাফরের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হলেও, পর্দার আড়ালের মূল কুচক্রী হিসেবে যার নাম আসে, তিনি হলেন নবাব আলীবর্দী খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহের-উন-নিসা, যিনি ইতিহাসে 'ঘষেটি বেগম' নামেই কুখ্যাত। তার লাগামহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত বিদ্বেষই পলাশীর যুদ্ধের পথকে প্রশস্ত করেছিল।

ঘষেটি বেগম ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের তিন কন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। আলীবর্দী খান তার তিন কন্যাকেই তার বড় ভাই হাজি আহমেদের তিন পুত্রের সাথে বিবাহ দেন। ঘষেটি বেগমের স্বামী ছিলেন ঢাকার নায়েব-নাজিম নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান। নিঃসন্তান হওয়ায় ঘষেটি বেগম তার ছোট বোনের সন্তান ইকরামউদ্দৌলাকে দত্তক নেন এবং তাকেই বাংলার ভবিষ্যৎ নবাব হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

সিরাজের প্রতি বিদ্বেষ

কিন্তু নবাব আলীবর্দী খান তার সবচেয়ে প্রিয়পাত্র, কনিষ্ঠা কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন। নবাবের এই সিদ্ধান্ত ঘষেটি বেগম কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। অল্প বয়সেই তার দত্তক পুত্র ইকরামউদ্দৌলার মৃত্যু হলে তার নবাব বানানোর স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং তিনি এর জন্য সিরাজউদ্দৌলাকেই দায়ী করতে শুরু করেন। একই সময়ে তার স্বামী নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানেরও মৃত্যু হলে ঘষেটি বেগম আরও বেশি ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।

ষড়যন্ত্রের জাল বোনা

সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য ঘষেটি বেগম মরিয়া হয়ে ওঠেন। তিনি তার সমস্ত ধনসম্পদ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে সিরাজের বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করেন। তিনি মতিঝিলের প্রাসাদে বসে নবাবের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন, যেখানে যোগ দেন মীর জাফর, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠের মতো ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা। তারা সবাই সিরাজের তরুণ নেতৃত্ব ও কঠোর শাসনে অসন্তুষ্ট ছিলেন।

ঘষেটি বেগমই ছিলেন এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি ও অর্থ জোগানদাতা। তিনি জানতেন, শুধু দেশীয় অমাত্যদের দিয়ে এই কাজ হবে না, তাই তিনি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথেও গোপন যোগাযোগ স্থাপন করেন।

পলাশীর পতন ও শেষ পরিণতি

ঘষেটি বেগমের এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রই পলাশীর যুদ্ধের মঞ্চ প্রস্তুত করে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। কিন্তু ঘষেটি বেগমের শেষ রক্ষা হয়নি। মীর জাফর নবাব হওয়ার পর ঘষেটি বেগমকে তার পথের কাঁটা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। মীর জাফর প্রথমে তাকে বন্দী করেন এবং পরে তার পুত্র মীরনের নির্দেশে মুর্শিদাবাদের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাডুবিতে ঘষেটি বেগমকে হত্যা করা হয়।

ঘষেটি বেগম এমন এক ট্র্যাজিক চরিত্র, যিনি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার লোভে নিজের পরিবারের বিরুদ্ধেই শুধু নয়, গোটা বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। তার সেই কুচক্রের আগুনই শেষ পর্যন্ত তাকেও গ্রাস করে, কিন্তু তার আগেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।


যেভাবে ইউরোপের ধ্বংসস্তূপে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হয়ে উঠলো আমেরিকা!

২০২৫ নভেম্বর ১২ ১৮:২৫:০৩
যেভাবে ইউরোপের ধ্বংসস্তূপে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হয়ে উঠলো আমেরিকা!
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ইতিহাসের এক এমন প্রলয়ঙ্করী অধ্যায় যা কেবল লক্ষ লক্ষ প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীর মানচিত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্য। ইউরোপ যখন এই যুদ্ধের আগুনে পুড়ছিল, তখন আটলান্টিকের ওপারে থাকা একটি দেশ সুচতুরভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছিল। সেই দেশটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। একসময়কার দেনাদার এই দেশটিই একটি মাত্র যুদ্ধের ডামাডোলে পরিণত হয় বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে।

যুদ্ধের সূচনা ও আমেরিকার নিরপেক্ষতা

১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্দের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যখন ইউরোপের দুই বৃহৎ শক্তি—মিত্রশক্তি (ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া) এবং কেন্দ্রীয় শক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য)—এক বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন আমেরিকা নিজেদেরকে এই সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ঘোষণা করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের স্লোগানই ছিল, "তিনি আমাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রেখেছেন।"

আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান

আমেরিকা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকলেও, অর্থনৈতিকভাবে তারা এই যুদ্ধকে এক বিশাল ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। যুদ্ধরত ইউরোপীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের, তখন খাদ্যের গুদাম থেকে শুরু করে অস্ত্রের কারখানা—সবকিছুই প্রয়োজন। আমেরিকা হয়ে ওঠে তাদের প্রধান সরবরাহকারী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের কাছে জাহাজ ভর্তি করে অস্ত্র, গোলা-বারুদ, খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। ইউরোপ যখন তার সমস্ত সঞ্চিত সম্পদ দিয়ে এই যুদ্ধের আগুন জ্বালাচ্ছিল, সেই সম্পদগুলোই সরাসরি স্থানান্তরিত হচ্ছিল আমেরিকার কোষাগারে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে, যে আমেরিকা ছিল বিশ্বের অন্যতম ঋণগ্রস্ত দেশ, সেই দেশই পরিণত হয় বিশ্বের বৃহত্তম ঋণদাতা দেশে।

যেভাবে আমেরিকা যুদ্ধে জড়ালো

তবে এই ব্যবসায়িক নিরপেক্ষতা বেশিদিন টেকেনি। জার্মানি যখন 'আনরেস্ট্রিক্টেড সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার' (অবাধ সাবমেরিন যুদ্ধ) ঘোষণা করে, তখন পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। জার্মান সাবমেরিনগুলো আটলান্টিকে মিত্রশক্তির জাহাজগুলোকে নির্বিচারে ডোবাতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল 'লুসিতানিয়া' নামক একটি ব্রিটিশ জাহাজ, যা ডোবানোর ফলে অনেক আমেরিকান নাগরিকও প্রাণ হারান।

কিন্তু আমেরিকার যুদ্ধে যোগদানের চূড়ান্ত কারণটি ছিল 'জিমারম্যান টেলিগ্রাম'। এই গোপন বার্তায় জার্মানি মেক্সিকোকে প্রস্তাব দেয় যে, মেক্সিকো যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে জার্মানি মেক্সিকোকে তার হারানো অঞ্চল (টেক্সাস, অ্যারিজোনা) পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে। এই টেলিগ্রাম ফাঁস হওয়ার পর আমেরিকান জনমত পুরোপুরি জার্মানির বিরুদ্ধে চলে যায়।

যুদ্ধের পরিণতি ও নতুন বিশ্বশক্তি

১৯১৭ সালে আমেরিকা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তাদের তাজা সৈন্য এবং অঢেল সামরিক সরঞ্জাম মিত্রশক্তির বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু ততদিনে ইউরোপ সম্পূর্ণ দেউলিয়া। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শিল্প-কারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত এবং তারা আমেরিকার কাছে বিপুল ঋণে জর্জরিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনের কাছ থেকে বিশ্বের অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কেড়ে নেয় এবং তা পরিয়ে দেয় আমেরিকার মাথায়। ইউরোপের ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবির্ভূত হয় পৃথিবীর নতুন এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে, যে অবস্থান তারা আজও ধরে রেখেছে।


মশলা কিনতে এসে দেশ দখল: যেভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাইভেট আর্মি!

২০২৫ নভেম্বর ০৯ ২১:০২:৪৫
মশলা কিনতে এসে দেশ দখল: যেভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাইভেট আর্মি!
ছবিঃ সত্য নিউজ গ্রাফি

কল্পনা করুন এমন একটি প্রাইভেট কোম্পানির কথা, যা এতটাই শক্তিশালী যে সে তার গ্রাহকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে, দেশ দখল করে ফেলতে পারে এবং এক পর্যায়ে ৪০০ মিলিয়ন মানুষের ওপর রাজত্ব কায়েম করে। এটি কোনো কল্পকাহিনী নয়, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং প্রভাবশালী কোম্পানি—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গল্প।

শুরুটা হয়েছিল শুধু মশলার লোভে

১৬০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর, নিউ ইয়ারের ঠিক আগের রাতে। রানি এলিজাবেথ লন্ডনের একদল ব্যবসায়ীকে 'দ্য গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দ্য ইস্ট ইন্ডিজ' বা সংক্ষেপে 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামে একটি কোম্পানি খোলার অনুমতি দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খুবই সরল—পূর্বের দেশগুলো, বিশেষ করে ভারতবর্ষ ও সাউথ-ইস্ট এশিয়া থেকে মশলা (মরিচ, দারুচিনি, জিরা) কিনে এনে ইউরোপে চড়া দামে বিক্রি করা। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্রিটিশরা ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। এই কোম্পানি ছিল সেই পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি ব্যবসায়িক প্রচেষ্টা মাত্র।

ভাগ্যবশত ভারতবর্ষে আগমন

কোম্পানির প্রথম জাহাজগুলো ইন্দোনেশিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে, কারণ সেখানেই মশলার ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্যে ডাচদের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে ব্রিটিশরা সেখানে ভিড়তে না পেরে বাধ্য হয়েই ভারতবর্ষের দিকে জাহাজ ঘোরায়। কিন্তু ভারতবর্ষে এসে তারা নতুন এক সমস্যায় পড়ে—এখানে ইন্দোনেশিয়ার মতো পর্যাপ্ত মশলা নেই। তখন তারা নতুন পরিকল্পনা করে। তারা বুঝতে পারে, ভারতবর্ষের টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্প বিশ্বমানের। তারা মশলার বদলে টেক্সটাইল বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত নেয়।

মুঘলদের সেই ঐতিহাসিক ভুল

তৎকালীন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে স্যার জেমস নামক এক ব্রিটিশ প্রতিনিধি প্রচুর উপঢৌকন ও ঘুষ নিয়ে হাজির হন। তার উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা করার অনুমতি নেওয়া। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাদের সুরাট, মাদ্রাজ, বোম্বে এবং কলকাতায় অফিস স্থাপনের অনুমতি দেন। শর্ত ছিল, ব্রিটিশরা ব্যবসা করবে এবং আয়ের ওপর মুঘল সাম্রাজ্যকে একটি বড় অঙ্কের ট্যাক্স দেবে। ইতিহাসবিদরা মুঘলদের এই সিদ্ধান্তকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সিদ্ধান্তগুলোর একটি বলে মনে করেন।

ব্যবসা থেকে যেভাবে সেনাবাহিনীতে রূপান্তর

পরের কয়েক দশক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা রমরমা হয়ে ওঠে। তারা শুধু টেক্সটাইলই নয়, ভারতবর্ষেও মশলার সন্ধান পায়। জাহাজ ভরে ভরে সম্পদ ব্রিটেনে যেতে থাকে। কোম্পানি যত ধনী হচ্ছিল, মুঘল সাম্রাজ্যও তত বেশি ট্যাক্স পাচ্ছিল। স্থানীয় মানুষরাও কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ায় সবাই খুশি ছিল। কিন্তু সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা ও মাদ্রাজে ট্যাক্স-মুক্ত বাণিজ্যের এক বিতর্কিত অনুমতি আদায় করে নেয়। এর পেছনেও ছিল প্রচুর ঘুষ। ট্যাক্স মওকুফ পাওয়ায় কোম্পানির মুনাফা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এই সুযোগে কোম্পানি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলে ধীরে ধীরে প্রাইভেট আর্মি বা নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে শুরু করে।

কোম্পানির উত্থান ও ভারতবর্ষের পতন

১৭৫০ সাল আসতে আসতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব সৈন্য সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, যা অনেক মুঘল সম্রাটের সম্মিলিত সেনাবাহিনীর চেয়েও বড় ও শক্তিশালী ছিল। তাদের হাতে ছিল আধুনিক ব্রিটিশ অস্ত্রশস্ত্র। মুঘল শাসকরা যখন বুঝতে পারেন যে তারা 'দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষেছেন', তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা কোম্পানির এই ঔদ্ধত্য মেনে না নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু পলাশীর প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে এবং মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত ও নিহত হন। এরপরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার পুতুল শাসক বসিয়ে আক্ষরিক অর্থেই লুটপাট শুরু করে। আজকের হিসাবে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের সোনা বাংলার কোষাগার থেকে ব্রিটেনে পাচার করা হয়। জনগণের ওপর চাপানো হয় অসহনীয় কর, শুরু হয় জোরপূর্বক নীল চাষ।

দুর্ভিক্ষ ও চূড়ান্ত দখল

এই ভয়াবহ শোষণের ফলে বাংলায় নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষগুলোর একটি (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর), যাতে এক কোটিরও বেশি মানুষ শুধু না খেতে পেয়ে মারা যায়। কোম্পানি এরপর শাহ আলমের সাথে যুদ্ধে জিতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার পূর্ণ দখল নেয়। টিপু সুলতানের মতো যারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন, তাদেরও নির্মমভাবে পরাজিত ও হত্যা করা হয়।

মাত্র দেড়শ বছরের মধ্যে নিছক মশলা কিনতে আসা একটি প্রাইভেট কোম্পানি গোটা ভারতবর্ষের রাজা হয়ে বসে। এটি এমন এক ঘটনা যা যেকোনো কল্পনাকেও হার মানায়। ১৮০০ সাল নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এবং শক্তিশালী কোম্পানিতে পরিণত হয়। এই পুরো দখলদারিত্বে ব্রিটিশ সরকারের গোপন মদদ ও সরাসরি ইন্ধন ছিল, যা ১৭৮৪ সালের 'পিটস ইন্ডিয়া অ্যাক্ট'-এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে একটি জাতির পরাধীনতার কারণ হতে পারে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার সবচেয়ে নির্লজ্জ উদাহরণ।


ধ্বংসস্তূপ থেকে মহাশক্তি: চীনের পুনর্জন্মের বিস্ময়গাঁথা

ইশরাত ওয়ারা
ইশরাত ওয়ারা
ডেস্ক রিপোর্টার
২০২৫ নভেম্বর ০১ ২২:০২:১৯
ধ্বংসস্তূপ থেকে মহাশক্তি: চীনের পুনর্জন্মের বিস্ময়গাঁথা

৭০ বছর আগেও চীনের এই সমুদ্রপথে প্রতিদিন ভেসে থাকত অসংখ্য মানুষের নিথর দেহ। তারা মরিয়া হয়ে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে হংকংয়ের পথে রওনা দিত, একটি ভালো জীবনের আশায়। সেই সময় চীনে মানুষের পেটে দুবেলা খাবার জুটত না, শিক্ষা ছিল একপ্রকার অপরাধ। স্কুলে যেতে হলে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতো। বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছিল সাধারণ মানুষ। কমিউনিজমের কৃত্রিম পরীক্ষাগারে চীন তখন ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই এক সময় এমন এক রূপান্তর ঘটে যে মাত্র ৪০ বছরের ব্যবধানে চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

নেপোলিয়ন এক সময় বলেছিলেন, চীন একটি ঘুমন্ত দৈত্য। যেদিন সে জেগে উঠবে, গোটা পৃথিবী কেঁপে উঠবে। কথাটি আজ সত্য বলে মনে হয়। ভাবুন একবার, যে দেশের জিডিপি এক সময় তানজানিয়া কিংবা কেনিয়ার চেয়েও কম ছিল, সেই দেশের অর্থনীতি আজ ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আজকের সাংহাই, চংকিং বা শেনজেনের মতো শহরগুলো উন্নয়ন ও আধুনিকতার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইউরোপকেও পেছনে ফেলছে। ধারণা করা হয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রকেও অতিক্রম করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে?

কীভাবে চীন এত দ্রুত, এত ব্যাপকভাবে ধনী হয়ে উঠল? চীনের এই জাদুকরী রূপান্তরের পেছনের রহস্য কী? আমাদের দেশে এমন পরিবর্তন কেন ঘটল না? এমনকি জাপানের মতো কর্মঠ জাতিও কেন এই গতিতে অগ্রসর হতে পারেনি? নিশ্চয়ই চীনের হাতে কোনো জাদুর কাঠি ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত ভিশন এবং জাতীয় স্বপ্ন।

১৯৩৭ সালে জাপান চীনের উপর আক্রমণ করে। মাত্র একদিনে দুই লক্ষাধিক চীনা নারী জাপানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত হন, নিহত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যাতে চীনের প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধ শেষে যখন জাপান পরাজিত হয়, তখন চীনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। দীর্ঘ যুদ্ধের ধাক্কায় চীনের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয় এবং মেইনল্যান্ড চীনে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট শাসন। কিন্তু যেই আশায় মানুষ কমিউনিস্টদের সমর্থন করেছিল, সেটিই পরে পরিণত হয় এক দুঃস্বপ্নে।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও জেদং-এর আদর্শ ও নীতিমালা দেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অথচ এই চীনই এক সময় ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। প্রাচীন চীনের সম্পদ ও জ্ঞান এতই বিস্ময়কর ছিল যে, ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায়ও সে সময় চীন ছিল ধনী। বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ আসত চীন থেকে।

চীনের রেশম ছিল বিশ্ববিখ্যাত। সিল্ক রোডের মাধ্যমে তারা পৃথিবীর নানা প্রান্তের সঙ্গে বাণিজ্য চালাত। বিশ্বের প্রথম কম্পাস, বারুদ, কাগজ ও ছাপাখানার উদ্ভাবন হয়েছিল এই চীনেই। সামরিক শক্তিতেও চীন ছিল বলিষ্ঠ, যার সাক্ষ্য আজও বহন করছে দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না। কৃষি ও চিকিৎসাশাস্ত্রেও তারা ছিল অগ্রগামী। চীনের উর্বর মাটিতে কখনো খাদ্যের ঘাটতি পড়েনি। তারাই প্রথম আকুপাংচার ও হারবাল মেডিসিন আবিষ্কার করে, যা আজও সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী ও জ্ঞাননির্ভর এক দেশ কীভাবে একসময় চরম দারিদ্র্য ও হতাশার গভীরে তলিয়ে গেল? ইতিহাসের এই প্রশ্নের উত্তরই বোধহয় আমাদের আজ নতুন করে ভাবতে শেখায় যে একটি জাতি কেবল সম্পদে নয়, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সঠিক দিকনির্দেশনায়ই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে।

শুধু কি জাপানের আগ্রাসন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চীনকে ধ্বংস করেছিল? না, এর পেছনে ছিল আরও গভীর ইতিহাস, যার শিকড় অনেক পুরোনো এবং যেখানে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তির কূটচালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সময়টা ১৭৭৩ সাল। তখন চীনে চিং রাজবংশের শাসন চলছে। এদিকে ভারতে ইতিমধ্যে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছিল, তেমনি তারা চীনের বাজারেও প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু চীনের সম্রাট ইংরেজদের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে নানা রাজনৈতিক চাপের পর সীমিত পরিসরে তাদের ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়। ইংরেজরা চীন থেকে বিপুল পরিমাণে চা আমদানি শুরু করে, কিন্তু বিনিময়ে তারা চীনকে দিতে শুরু করে আফিম, এক ভয়াবহ নেশাদ্রব্য।

চীনের সভ্যতা ধ্বংসের সূচনা হয়েছিল এই আফিম দিয়ে। ভারতে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশাল পরিসরে আফিম চাষ করত এবং সেই আফিম চীনে রপ্তানি করত। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চীনের তরুণ প্রজন্ম আফিমের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। পরিশ্রমী মানুষগুলো কাজ বন্ধ করে সারাদিন নেশায় ডুবে থাকত। উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।

চীনের শাসকরা এই অবস্থা দেখে দেশে আফিম বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু ইংরেজরা তা উপেক্ষা করে গোপনে বিক্রি চালিয়ে যায়, কারণ এই ব্যবসায় তারা প্রচুর লাভ করছিল। এক পর্যায়ে চীনের প্রশাসন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের আফিমের গুদামঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ১৮৩৯ সালে শুরু হয় প্রথম আফিম যুদ্ধ।

যুদ্ধটি টানা চার বছর ধরে চলে এবং শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা জয়লাভ করে। তারা হংকং দখল করে নেয়, চীনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বিশাল অংশের ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। এখান থেকেই শুরু হয় চীনের “শতবর্ষের অপমান” বা সেঞ্চুরি অব হিউমিলিয়েশন।

যখন পশ্চিমা বিশ্বে শিল্পবিপ্লবের জোয়ার বইছে, তখন চীনের উচিত ছিল বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিস্তার করা। কিন্তু আফিম যুদ্ধের পর চীনের শাসকরা ভয় ও সন্দেহে নিজেদের চারপাশে দেয়াল তুলে দেয়। তারা বিদেশি বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে এবং নিজেদের অর্থনীতি বন্ধ করে ফেলে। এর ফলে তারা দ্রুত আধুনিকায়নের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পরবর্তী একশ বছর ধরে চীন ক্রমাগত যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। কখনো রাশিয়া, কখনো জাপান, আবার কখনো যুক্তরাষ্ট্র চীনের ভূখণ্ডে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এইসব যুদ্ধ এবং বিদেশি আগ্রাসনের ফলে চীনের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

অবশেষে আসে ১৯৪৯ সাল। দীর্ঘ যুদ্ধ, আফিম বাণিজ্য, জাপানের দখল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর চীনের সামনে আবার একবার পুনরুত্থানের সুযোগ আসে। মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠে, মনে হয় নতুন এক যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই আশার মুহূর্তেই ক্ষমতায় আসেন এমন একজন নেতা, যার সিদ্ধান্ত চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। তিনি ছিলেন চীনের রাষ্ট্রপতি মাও জেদং।

মাও জেদং চীনের অর্থনীতিকে দ্রুত উন্নতির পথে নিতে কিছু নতুন নীতিমালা প্রবর্তন করেন। এর মধ্যে ছিল গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড এবং কালচারাল রেভলিউশন। বড় জমিদারদের জমি অধিগ্রহণ করে তিনি ছোট চাষিদের মধ্যে ভাগ করে দেন, কিন্তু জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই রাখেন। সরকার নির্ধারণ করত কখন চাষ হবে, কী চাষ হবে এবং কতটা উৎপাদন হবে। কৃষকদের কাজ ছিল শুধু শ্রম দেওয়া। উৎপাদিত ফসলের সবটাই দিতে হতো সরকারের কাছে এবং বিনিময়ে তারা পেত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ।

এই নীতি খুব দ্রুত ব্যর্থ হয়। কৃষকদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না, প্রযুক্তি ছিল পুরোনো এবং উৎপাদনশীলতা ক্রমাগত কমতে থাকে। তারা কঠোর পরিশ্রম করেও দুবেলা আহার জুটাতে পারত না। এরই মধ্যে মাও আরেকটি নীতি চালু করেন, যার নাম ছিল ফোর পেস্ট কন্ট্রোল। তিনি চীনের সব চড়ুই, ইঁদুর, মশা ও মাছি নির্মূল করার আদেশ দেন। মাও তখন চীনে প্রায় ঈশ্বরসম মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাই জনগণ তার নির্দেশ অন্ধভাবে পালন করে। কয়েক বছরের মধ্যে চীনে লক্ষ লক্ষ চড়ুই পাখি মারা পড়ে, ফলে পঙ্গপালের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং তারা ফসলে হানা দেয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে দেশে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যেখানে প্রায় চার কোটি মানুষ প্রাণ হারায়।

মাও শিল্পায়নের দিকেও জোর দেন। গোটা দেশে স্টিল উৎপাদনের লক্ষ্যে বড় বড় ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়, এমনকি সাধারণ মানুষকেও ঘরে স্টিল তৈরি করতে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও দক্ষতার অভাবে সেই স্টিলের গুণমান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের, ফলে এই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়।

১৯৬০-এর দশকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ঋণাত্মক চার শতাংশে। দেশে বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং খাদ্যসংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সাধারণ মানুষ মাওয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির অনেক শীর্ষ নেতা তার নীতির সমালোচনা করেন।

চীনের এই দীর্ঘ পতনের ইতিহাস দেখায়, একটি দেশ কেবল দেশপ্রেম বা শ্রম দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। সঠিক নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্বাধীন চিন্তাশক্তিই পারে একটি জাতিকে পুনর্জন্ম দিতে।

হীরক রাজা একবার বলেছিলেন, “পড়াশোনা করে যে, অনাহারে মরে সে।” মাও জেদংও প্রায় একই বিশ্বাস পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষরা বা বুদ্ধিজীবীরা তার শাসনের জন্য হুমকি। তাই তিনি তাদের দমন করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৬৬ সালে চীনে শুরু হয় কালচারাল রেভলিউশন। মাও ঘোষণা দেন, চীনে নতুন এক বিপ্লব ঘটবে যেখানে পুরনো প্রথা, ধর্ম, জ্ঞান ও সংস্কৃতির স্থান থাকবে না। তখন দেশের সমস্ত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। শহরের শিক্ষিত মানুষদের জোর করে গ্রামে পাঠানো হয় যাতে তারা মাঠে কাজ করে কৃষকদের কাছ থেকে শেখে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হয়। কেউ যদি পড়াশোনা করতে চাইত, তবে তাকে কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হতো।

এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল একটাই। যে কেউ মাও-এর চিন্তার বিপরীতে কথা বলবে, তাকে রাষ্ট্রবিরোধী ঘোষণা করা হবে। সেই সময় শিক্ষিত মানুষদের মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। সমাজে ভয়, অরাজকতা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকে এসে চীনের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিল্প ও বাণিজ্য কার্যত থেমে যায়। দেশের অর্থনীতি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে তখন চীনের রাস্তায় মোটরগাড়ি প্রায় দেখা যেত না। যার কাছে একটি সাইকেল ছিল, তাকেই ধনী মনে করা হতো।

মানুষ তখন চরম দারিদ্র্য ও হতাশার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিল। তাদের জীবনে কোনো স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল না। অন্যদিকে, পাশেই ছিল হংকং, যা তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। হংকং-এ জীবনযাত্রা ছিল বহু গুণ উন্নত। সেখানে কাজের সুযোগ বেশি ছিল, বেতন অনেক বেশি ছিল এবং মানুষ অন্তত দুবেলা খেতে পারত। তাই হংকং চীনের মানুষের কাছে এক স্বপ্নরাজ্য হয়ে ওঠে।

এই সময় সেনজেন প্রদেশের প্রায় সাত লাখ মানুষ সমুদ্র পেরিয়ে হংকং যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ পৌঁছাতে পারে। কেউ কেউ ফিরে আসে, আর বাকিদের অনেকেই সমুদ্রের ঢেউয়ে প্রাণ হারায়। সেই উপকূল আজও পরিচিত “কোভ অফ কর্পস” নামে, যার অর্থ মৃতদেহের উপসাগর।

এই সময় কেউ ভাবতেও পারত না যে চীন কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তখন চীনের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে কাজ করছিলেন এক খাটো মানুষ, যার উচ্চতা ছিল মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। তার নাম দেং জিয়াওপিং। কেউ তখন জানত না যে এই মানুষটিই একদিন চীনকে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করবেন।

দেং জিয়াওপিং একসময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। কিন্তু মাও জেদং-এর সমালোচনা করার কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং রাজধানী বেইজিং থেকে দূরে এক গ্রামে নির্বাসিত করা হয়। সেখানে তিনি তিন বছর কৃষিকাজ করেন।

১৯৭৬ সালে মাও জেদং-এর মৃত্যুর পর দেং জিয়াওপিং-এর ভাগ্য পরিবর্তন হয়। তার সমর্থকেরা তাকে রাজধানীতে ফিরিয়ে আনে। তখন চীনের মানুষের একটাই লক্ষ্য ছিল, কীভাবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যায়।

দেং জিয়াওপিং-এর আদর্শ ছিল মাও-এর চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাও চেয়েছিলেন জনগণ তাকে ঈশ্বরের মতো মানুক এবং তার প্রতিটি কথা যেন চূড়ান্ত সত্য বলে গণ্য হয়। তিনি বিপ্লব ও কঠোর নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু দেং ছিলেন বাস্তববাদী এবং প্রগতিশীল। তিনি কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তিনি মনে করতেন উন্নতি ও সমৃদ্ধিই একটি দেশের আসল লক্ষ্য।

মাও-এর মৃত্যুর পর দেং-এর সামনে বড় বাধা ছিল সেই সব নেতারা, যারা এখনও মাও-এর পুরনো আদর্শে বিশ্বাস করতেন। একই সময়ে মাও-এর স্ত্রী জিয়াং ছিং ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন এবং গ্রেফতার হন।

দেং জিয়াওপিং কখনো চীনের রাষ্ট্রপতি বা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হননি, তবুও তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, চীনের উন্নতির জন্য শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

১৯৭৭ সালে তিনি বেইজিংয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আহ্বান করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পার্টির রক্ষণশীল নেতারা, যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় খোলার বিরোধিতা করছিলেন। তখন দেং জিয়াওপিং একটি ঐতিহাসিক কথা বলেন যা চীনের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। তিনি বলেন, “বিড়াল সাদা না কালো সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ না সে ইঁদুর ধরতে পারে।” অর্থাৎ দেশের উন্নতির জন্য কোনো নীতি কার্যকর হলে সেটা কে তৈরি করেছে বা কোন মতবাদ থেকে এসেছে তা বিবেচ্য নয়। মূল কথা হলো, তা কাজ করছে কি না।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি স্পষ্ট করে দেন যে বাস্তবতা-নির্ভর নীতি গ্রহণই হবে চীনের অগ্রগতির মূলমন্ত্র। তিনি মাও-এর সময় বন্ধ করে দেওয়া স্কুল ও কলেজগুলো পুনরায় খুলে দেন। আবার শুরু হয় ভর্তি পরীক্ষা।

১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে বড় পরিসরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ থেকে ৩৮ বছর বয়সী প্রায় ৫৭ লক্ষ মানুষ এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ পাস করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই পরীক্ষাই ছিল চীনের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন চীনের পুনর্জাগরণের ইতিহাস।

চীনের অর্থনীতিকে নতুন পথে নেওয়ার পরবর্তী ধাপে দেং জিয়াওপিং তিরিশ জনের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেন। দলটি ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের নানা দেশে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছে তারা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইউরোপের ব্যাপক অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত হয়। দেশে তাদের দীর্ঘদিন বলা হয়েছিল যে পুঁজিবাদ শ্রমিকশ্রেণিকে শোষণ করে এবং সমাজকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বাস্তব পর্যবেক্ষণে তারা দেখতে পায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো কার্যকর নীতি, উচ্চ দক্ষতা ও আধুনিক অবকাঠামোর মাধ্যমে বহুগুণ এগিয়ে গেছে।

চীনা প্রতিনিধি দল ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে উন্নয়নের পথরেখা নিয়ে ধারণা নেয়। ইউরোপীয় দেশগুলোও চীনকে সহায়তায় আগ্রহ দেখায়, কারণ বিশাল বাজার হিসাবে চীন তাদের জন্য সম্ভাবনাময় ছিল। এ সময় দেং জিয়াওপিং নিজেও সিঙ্গাপুর ও জাপান সফর করেন। জাপানে তিনি ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার গতির ট্রেন, রোবোটিক্স ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পের আধুনিকতা, এবং নাগরিক জীবনের উচ্চমান দেখে অভিভূত হন। সিঙ্গাপুর ও জাপানের রাস্তা, কারখানা, বসতবাড়ি এবং জীবনযাত্রা তিনি ভিডিও করে দেশে এনে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। জাপানে সাধারণ শ্রমিকের ঘরেও টেলিভিশন ও ফ্রিজ আছে, উন্নত কৃষিযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, এইসব দৃশ্য দেখে চীনের মানুষ নতুন করে আশা পেতে শুরু করে। দেং বুঝতেন যে দীর্ঘদিনের ভুল নীতিতে মানুষ স্বপ্ন দেখা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। তাই জাতির মনে আশাবাদ সঞ্চার করা ছিল তার প্রথম লক্ষ্য।

তবে ভেতরে ভেতরে অনেকে পরিবর্তন মানতে রাজি ছিলেন না। তাদের ধারণা ছিল, ইউরোপ বা জাপানের মতো উন্নয়ন মডেল গ্রহণ করলে বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির দুই শতাধিক সদস্যকে বেইজিংয়ে ডাকা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দেং জিয়াওপিং। সেখানেই প্রথম তিনি অর্থনীতি উন্মুক্ত করার প্রস্তাব তুলে ধরেন। আফিম যুদ্ধের পর থেকে চীন কার্যত বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করে রেখেছিল। দেং বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রসর না হলে সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।

দেং ভালোভাবেই বুঝতেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশীদার বানানো জরুরি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও চীনকে সোভিয়েত প্রভাববলয় থেকে দূরে টানতে আগ্রহী ছিল। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো পিপলস রিপাবলিক অব চায়নাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। সে বছরই দেং ওয়াশিংটনে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে বৈঠক করেন। শীতল যুদ্ধের দ্বিপাক্ষিক সন্দেহ সত্ত্বেও এই কূটনৈতিক অগ্রগতি ছিল ঐতিহাসিক।

আমেরিকা সফর শেষে দেং চীনের দক্ষিণে যান। হংকংয়ের লাগোয়া মৃতপ্রায় শিল্পকেন্দ্র গুয়াংজৌ ও তার আশপাশে তিনি পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা হাতে নেন। সেখানে তার ঘনিষ্ঠ চিন্তাধারার নেতা শি ঝোংসুনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেন। সরকার তহবিল দিতে পারবে না, তবে নীতিগত বাধা কমিয়ে উদ্যোগপতিদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। হংকংয়ের নিকটবর্তী শহর শেনজেনকে বেছে নেওয়া হয় অগ্রাধিকারে। হংকংয়ে তৎকালীন নির্মাণ জোয়ারে স্টিলের চাহিদা আকাশছোঁয়া ছিল, কিন্তু উচ্চ মজুরি ও অবকাঠামো ব্যয়ের কারণে সেখানেই উৎপাদন লাভজনক ছিল না। শেনজেনে তুলনামূলক কম মজুরি এবং অতি স্বল্প দূরত্বের সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় উদ্যোগীরা হংকংয়ের বিনিয়োগ আনেন, জাহাজ ভাঙা থেকে প্রাপ্ত স্ক্র্যাপ দিয়ে স্টিল উৎপাদন শুরু করেন এবং তা সমুদ্রপথে দ্রুত হংকংয়ে পাঠান। এটাই ছিল চীনে বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম সার্থক গল্প।

এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শেনজেনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। পরে মডেলটি অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় প্রসারিত করা হয়। করছাড়, শুল্কসহ নানা প্রণোদনায় বিদেশি পুঁজি প্রবাহ বাড়তে থাকে। ঝেজিয়াং প্রদেশের ওয়েনঝৌতে তুলনামূলক কম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকায় কয়েক বছরের মধ্যেই লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে সরকার এসব বেসরকারি উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন দিতে শুরু করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দেং সমষ্টিগত মতামত ও দায়িত্ববোধের নীতি চালু করেন। বড় সিদ্ধান্ত আগে আলাপ করতে হবে এবং ভুল হলে যৌথভাবে দায় নিতে হবে।

শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। মাওয়ের আমলে যেখানে স্কুলে পড়তে গেলেও পার্টির অনুমতি লাগত, সেখানে দেং উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দেন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করেন। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে পুনর্গঠন করা হয়। নয় বছর মেয়াদি বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যের মৌলিক শিক্ষা চালু হয়। পরে ধাপে ধাপে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী পাঠানো শুরু হয়। অনেকে স্থায়ীভাবে না ফিরলেও দেং-এর বাস্তববাদী যুক্তি ছিল, দশজনের মধ্যে যদি একজনও ফিরে আসে, দেশের লাভই হবে। ধীরে ধীরে বিদেশফেরত তরুণরা দেশে উদ্যোগ গড়ে তোলে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নতুন গতি আনে।

১৯৯০–এর দশকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় বড় ব্র্যান্ড যখন উৎপাদন সম্প্রসারণের জায়গা খুঁজছিল, চীন তাদের আমন্ত্রণ জানায়। কম মজুরি, বিস্তৃত জমি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধা একত্রে বিদেশি কারখানা স্থাপনে আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি শেখা, সরবরাহ শৃঙ্খলা গঠন এবং মান নিয়ন্ত্রণে চীন দ্রুত দক্ষ হয়ে ওঠে। স্থানীয় উদ্যোগীরাও একই শিল্পশৃঙ্খলে যুক্ত হয়ে ক্রমে নিজস্ব ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে থাকে।

ক্রমশ চীন বিশ্ব উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। গবেষণা ও উন্নয়নে বড় বাজেট বরাদ্দ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের সংযোগ, এবং অবকাঠামোতে অভূতপূর্ব বিনিয়োগের ফলে উচ্চগতির রেল, উন্নত ইলেকট্রনিক্স, ড্রোন ও রোবোটিক্সসহ বহু ক্ষেত্রে তারা আত্মনির্ভরতা অর্জন করে। প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে স্মার্টফোন তৈরির বাজার অংশীদারিত্ব পর্যন্ত বহু খাতে চীনের প্রভাব সুদৃঢ় হয়।

সমান্তরালে দারিদ্র্য হ্রাসে তারা ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখায়। কৃষি সংস্কার, কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং সামাজিক খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ মিলিয়ে কয়েক দশকে শত কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। শিক্ষা খাতে ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতা বিস্তৃত হয় এবং তরুণদের সাক্ষরতার হার প্রায় সার্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে।

উচ্চগতির রেলের উদাহরণটি দেং-এর স্বপ্ন পূরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৮ সালে তিনি জাপানে যে বুলেট ট্রেন দেখেছিলেন, ২০০৮ সালে চীন নিজের মাটিতে উচ্চগতির ট্রেন চালু করে। পরবর্তী দশকে প্রযুক্তি আয়ত্ত করে নিজেরাই নেটওয়ার্ক প্রসারিত করে। আজ দেশের ভেতরে হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ উচ্চগতির রেলপথ জাতীয় সংযোগ ও উৎপাদনশীলতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে দেং জিয়াওপিং-এর পদক্ষেপগুলোর সারকথা ছিল বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেওয়া, উন্মুক্ততার দিকে অগ্রসর হওয়া, শিক্ষা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, এবং নীতিনির্ধারণে সমষ্টিগত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই চীন কয়েক দশকে এক অনুন্নত অর্থনীতি থেকে একটি জটিল, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।


ইতিহাসের পাতায় আজ: ৩০ অক্টোবর - বিজয়, বিপ্লব আর বেদনার দিন

২০২৫ অক্টোবর ৩০ ১০:০১:৩৯
ইতিহাসের পাতায় আজ: ৩০ অক্টোবর - বিজয়, বিপ্লব আর বেদনার দিন
ছবি: সংগৃহীত

আজ ৩০ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় এই দিনটি নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। রাজনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও মানবসভ্যতার বিভিন্ন ক্ষেত্রজুড়ে আজকের দিনে ঘটেছে অসংখ্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এসেছে নতুন প্রভাতের সূচনা, শেষ হয়েছে কোনো যুগের অধ্যায়। চলুন ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি, বিশিষ্টজনদের জন্ম-মৃত্যু ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ।

ঘটনাবলি: রাজনীতি, বিপ্লব ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ধারায় এক ঐতিহাসিক দিন

১৮৬৪ সালের এই দিনে ইউরোপের কূটনৈতিক ইতিহাসে লেখা হয় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অস্ট্রিয়ার সম্রাট ও প্রুশিয়া এবং ডেনমার্কের রাজাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ভিয়েনা চুক্তি, যা ইউরোপের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করে।

১৮৯১ সালে জাপান ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে, প্রাণ হারান তিন হাজারেরও বেশি মানুষ যা সে সময়ের অন্যতম মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

১৯১৮ সালটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরানো এক বছর। এদিন হাঙ্গেরিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়, একইসঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক আত্মসমর্পণ করে এবং অস্ট্রিয়ায়ও বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে যা ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী যুগের পতন ত্বরান্বিত করে।

১৯২০ সালে ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে মাইলফলক সৃষ্টি হয় ‘নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

১৯২২ সালের এই দিনে বেনিতো মুসোলিনি ইতালিতে গঠন করেন ফ্যাসিবাদী মন্ত্রিসভা, যা পরবর্তী দুই দশক ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক কালো অধ্যায় রচনা করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৪৫ সালের এই দিনে ভারত জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে, যা তার স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি পূর্বসূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৫২ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়াটিক সোসাইটি, যা দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ গবেষণায় এখনো এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

এরপর ১৯৫৮ সালে বিখ্যাত পর্বতারোহী স্যার এডমন্ড হিলারি প্রথমবারের মতো দক্ষিণ মেরুতে পদার্পণ করে মানবসাহসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

পরিবেশ ও প্রাণসংরক্ষণ আন্দোলনের ইতিহাসেও এদিনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ১৯৭৩ সালে কেনিয়া হাতি শিকার ও দাঁতের ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা আফ্রিকায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রশংসিত হয়।

১৯৮২ সালে পর্তুগালের আট বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।

১৯৯১ সালে মাদ্রিদে শুরু হয় ইসরাইলি, আরব ও ফিলিস্তিনিদের শান্তি সম্মেলন, যেখানে মার্কিন ও সোভিয়েত প্রেসিডেন্টদের উপস্থিতি বিশ্ব শান্তির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল।

এক বছর পর, ১৯৯২ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চ অবশেষে গ্যালিলিও গ্যালিলির পৃথিবী গোলাকার তত্ত্বকে সত্য বলে স্বীকার করে, যা চার শতাব্দী পুরোনো বৈজ্ঞানিক বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটায়।

২০১১ সালের এই দিনে বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেন নারায়ণগঞ্জের সেলিনা হায়াত আইভী, দেশের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে।

জন্মদিনে স্মরণ: রাজনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ক্রীড়াজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা

আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন বিশ্ব ইতিহাসে ছাপ রেখে যাওয়া অসংখ্য ব্যক্তিত্ব।

১৭৩৫ সালে জন্ম নেন জন অ্যাডামস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি।

১৮৫৩ সালে জন্ম নেন প্রমথনাথ মিত্র, যিনি ভারতীয় বিপ্লবী সংগঠন গঠনের পথিকৃৎ ছিলেন।

১৮৮৭ সালে জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যজগতে হাস্যরস ও সৃজনশীলতার প্রতীক সুকুমার রায়, যিনি আজও শিশুসাহিত্যের অমর আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

১৯০১ সালে জন্ম নেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম দার্শনিক কণ্ঠ।একই বছরে জন্ম নেন সাহিত্যিক ও কবি খান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন।

বিজ্ঞান জগতেও আজকের দিনটি নোবেলজয়ীদের জন্মদিনে পরিপূর্ণ গারহার্ড ডোমাগ, রাগনার গ্রানিট, ড্যানিয়েল নাটান্স, লেল্যান্ড হার্টওয়েল, টেওডর হানসচ প্রমুখ তাঁদের উদ্ভাবনা ও গবেষণায় মানবজীবনের মান উন্নত করেছেন।

১৯৪৬ সালে জন্ম নেন মুক্তিযোদ্ধা ও বীর উত্তম বদিউল আলম, আর ১৯৬০ সালে আলো ছড়ান ফুটবলের কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনা।

আজকের দিনটি স্মরণীয় অনন্যা পাণ্ডে, জুনায়েদ সিদ্দিকী ও অদিতি রাঠোরের জন্মদিন হিসেবেও।

মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা: ইতিহাসের সোনালি অধ্যায় পেরিয়ে যাওয়া মহামানবেরা

১৫০১ সালে প্রয়াত হন উজবেক কবি ও চিন্তানায়ক নাজিমুদ্দিন মির আলিশের নভোই।

১৮৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন সমাজ সংস্কারক ও আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী, যিনি হিন্দুধর্মে নবজাগরণের প্রতীক ছিলেন।

১৯১০ সালে প্রয়াত হন অঁরি দ্যুনঁ, যিনি মানবিকতার প্রতীক রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৭৪ সালে চলে যান সংগীতের কিংবদন্তি বেগম আখতার, যিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে এক অনন্য ধারা সৃষ্টি করেছিলেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ হারায় ১৯৮৫ সালের এই দিনে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীকে।

অন্যদিকে ২০০৬ সালে প্রয়াত হন খ্যাতনামা মার্কিন নৃবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড গার্টস, যার গবেষণা আজও সামাজিক বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করে চলছে।

৩০ অক্টোবর বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দিন যে দিনে জন্ম নিয়েছেন বহু প্রতিভা, শেষ হয়েছে কিংবদন্তিদের পথচলা, এবং ঘটেছে এমন সব ঐতিহাসিক ঘটনা যা মানবসভ্যতার গতিপথকে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধ ও শান্তি, বিজ্ঞান ও শিল্প, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মিলনরেখায় এই দিনটি রয়ে গেছে ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় তারিখ হিসেবে।


ইবন খালদুন: রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাসের এক অবিনশ্বর তাত্ত্বিক

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৫ অক্টোবর ২১ ২৩:২৬:৩২
ইবন খালদুন: রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাসের এক অবিনশ্বর তাত্ত্বিক

ইবন খালদুন (১৩৩২১৪০৬) মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসচিন্তক হিসেবে স্বীকৃত এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসলেখা, অর্থনীতি ও জনসংখ্যাতত্ত্বের পূর্বসূরী মনীষীদের একজন বলে গণ্যকরা হয়। তাঁর সবচেয়ে খ্যাতনামা গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমাহ (প্রোলেগোমেনা বা ভূমিকা), যেখানে তিনি মানব সমাজ ও ইতিহাসের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। এই প্রবন্ধে ইবন খালদুনের রাষ্ট্র, শাসন ও নেতৃত্ব সংক্রান্ত ধারণা, সামাজিক সংহতির তত্ত্ব আসাবিয়্যাহ, ন্যায় ও অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সভ্যতার উদয়-পতনের চক্রতত্ত্ব নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি তাঁর চিন্তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জীবনপ্রবাহ, ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তায় তাঁর প্রভাবও আলোচিত হবে।

জীবনপ্রেক্ষাপট ও ইতিহাসচিন্তার ভূমিকা

ইবন খালদুন ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে তিউনিসিয়ার অভিজাত আন্দালুসীয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসের বিভিন্ন দরবারে কূটনীতি ও প্রশাসনিক কাজে দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি অতিবাহিত করেন, যা তাঁকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেয়। রাজদরবারের কলহ, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার এই যুগে নানা ওঠানামার পর, অবশেষে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে আলজেরিয়ার একটি দূরবর্তী দুর্গে আশ্রয় নেন। সেখানেই ১৩৭৭ সালে মাত্র কয়েক মাসে তিনি রচনা করেন তাঁর অমর গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমাহ, যা মূলত বিশ্বইতিহাসের ভূমিকাস্বরূপ একটি বিশদ সমাজদর্শন ও ইতিহাসতত্ত্বের গ্রন্থ। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ব্যাপক পাণ্ডিত্য অর্জনের পর, ইবন খালদুন ইতিহাস অধ্যয়নে নতুন দৃষ্টিকোণ নিয়ে আসেন: তিনি ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরংসমাজের “উদ্ভব, বিকাশ ও পতনের কারণ ও প্রক্রিয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। ইতিহাসের বিশ্লেষণে যুক্তিবোধ ও সমালোচনামূলক চিন্তার প্রয়োগে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পূর্ববর্তী ঐতিহাসিকরা বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে অন্ধভাবে মেনে নিলেও, ইবন খালদুন প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পিছনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গতিবিদ্যা অন্বেষণের চেষ্টা করেন। তিনি নিজেই এই নতুন জ্ঞানের শাখাটিকে ‘ইলমুল-উমরান’ বা সমাজ-সভ্যতার বিজ্ঞান নামে অভিহিত করেছেন, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের প্রারম্ভিক রূপ বলে ধরা হয়। ফলস্বরূপ, আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থটি শুধুই ঐতিহাসিক বিবরণ না হয়ে জ্ঞানেরবিভিন্ন শাখার এক সমন্বিত বিশ্লেষণধর্মী রচনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি এই গ্রন্থটিকে “সময়ের নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা” বলে অভিহিত করেছেন।

রাষ্ট্র, শাসন ও নেতৃত্ব ভাবনা

ইবন খালদুনের মতে মানবসমাজের টিকে থাকা ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অপরিহার্য। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি কেন্দ্রীয় শাসক শক্তির দরকার হয়, কেননা রাষ্ট্র ব্যতিরেকে মানুষ পরস্পরের উপর অত্যাচার (জুলুম) করতে পারে; তবে রাষ্ট্র নিজেই বলপ্রয়োগের দ্বারা কিছু মাত্রায় অত্যাচার সংঘটিত করে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অনিবার্য হলেও, রাষ্ট্রশক্তি যেন নিজেই অত্যাচারী হয়ে না ওঠে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। শাসকের প্রধান দায়িত্ব হলো সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা রোধ করা। ইবন খালদুন রাষ্ট্রকে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখেছেন: জীবিকার তাগিদে ও বিপদ থেকে রক্ষার জন্য মানুষ সমাজবদ্ধ হয় এবং একজন নেতা নির্বাচন করে যার কর্তৃত্বে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিতহয়। একজন দক্ষ শাসককে ন্যায়পরায়ণ হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞানী, দূরদর্শী ও নীতিবান হতে হবে বলে তিনি মনে করেন। শাসনের শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের অন্যতম কর্তা সাধারণত তার অনুসারীদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে ন্যায়সঙ্গত শাসন চালায় এবং প্রজাদের সন্তুষ্ট রাখে। পরে ক্রমান্বয়ে রাজ্য বিস্তার ও সংহত করার পর্যায়ে শাসক তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ক্ষমতার অংশীদার করে এবং আগের সমান অধিকারভোগী অনুগামীদের প্রভাব কমিয়ে নিজ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। তবে সময়ের সাথে সাথে একচ্ছত্র ক্ষমতা ও বিলাসিতার মোহে শাসকগোষ্ঠী স্বৈরাচারী ও স্বার্থান্ধ হয়ে পড়ে। ইবন খালদুন লক্ষ করেন যে শাসকগোষ্ঠীর এই অধঃপতনকালে তারা ন্যায়বিচার থেকে সরে গিয়ে কর ও শোষণ বাড়িয়ে তোলে, প্রশাসনে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেখা দেয় এবং জনগণ উৎপাদনে আগ্রহ হারায়। এসবের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নতুন কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী কর্তৃক উৎখাত হয়। সুতরাং ইবন খালদুনের রাষ্ট্রচিন্তায় ন্যায়, সংহতি ও দক্ষ নেতৃত্বের গুরুত্ব সর্বাধিক। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের কাজ হলো নিজে যেটুকু অত্যাচার না করে পারাযায় তা পরিহার করে সমস্ত ধরনের অন্যায়-বিচার দমন করা এবং প্রজাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিয়ে উৎপাদনমুখী সমাজ গড়ে তোলা।

নেতৃত্বের প্রসঙ্গে ইবন খালদুন বিশেষভাবে সামাজিক সংহতির ভূমিকা লক্ষ্য করেছেন। শক্তিশালী নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং গোত্র বা গোষ্ঠীর সমর্থন দ্বারা বলীয়ান হয়। তিনি দেখতে পান, কোনো নেতা যদি তার গোষ্ঠীর পূর্ণ আসাবিয়্যাহ (একাত্মতা) অর্জন করতে পারেন, তবে সেই ঐক্যবদ্ধ গোষ্ঠীকে নিয়ে তিনি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান শাসন উচ্ছেদে সমর্থ হন। আবার নেতৃত্বের অবক্ষয়ে সেই আসাবিয়্যাহ দুর্বল হয়ে যায় এবং নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। ইবন খালদুনের দৃষ্টিতে সত্যিকার নেতা তিনিই, যিনি নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বোচ্চ সংহতি বজায় রেখে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

সামাজিক সংহতির তত্ত্ব: আসাবিয়্যাহ

ইবন খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘আসাবিয়্যাহ’ (আরবি: عصبية) ধারণাটি, যার অর্থ সামাজিক সংহতি বা দলীয় একাত্মতা। আল-মুকাদ্দিমাহ-তে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে আসাবিয়্যাহ হলো সেই “গোষ্ঠীগত সংহতি”, যা মূলত আত্মীয়তা ও গোত্রীয় বন্ধনের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় এবং যার জোরে একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে শক্তি অর্জন করে। সাধারণত বেদুইন বা গোত্রীয় জীবনে আত্মরক্ষার তাগিদে ও পরিবেশগত কঠোরতার কারণে আসাবিয়্যাহ প্রবল হয়, এবং ধর্মীয় আদর্শ এটি আরও তীব্রতর ও ব্যাপক করতে পারে। ইবন খালদুন দেখিয়েছেন, এই সামাজিক সংহতির বলেই কোনো কোনো যাযাবর বা গোত্রীয় গোষ্ঠী অসাধারণ সামরিক শক্তিনিয়ে সংগঠিত সমাজকে জয় করে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। আসাবিয়্যাহ শক্তিশালী থাকাকালীনই একটি নবাগত শাসকগোষ্ঠী উদীয়মান সভ্যতার সূচনা করে। Toynbee সহ বিভিন্ন মনীষী আসাবিয়্যাহকে রাষ্ট্র ওসমাজ গঠনের প্রাথমিক চালিকা শক্তি বলে বর্ণনা করেছেন।

ইবন খালদুন বলেন, কোনো নতুন রাজবংশের শুরুর দিকে এর আসাবিয়্যাহ সর্বোচ্চ মাত্রায় থাকে এবং সেটিই তাদের সাফল্যের ভিত্তি। তবে শহুরে জীবনযাপন ও আরাম-আয়েশে মগ্ন হয়ে পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে ক্রমশ এই সংহতি ক্ষয় পেতে থাকে। শাসক ও জনগণ বিলাসিতা, স্বার্থচিন্তা ও ভাগ্যোজ্জ্বল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তাদের মধ্যে পূর্বের কঠোরতা ও যুদ্ধক্ষমতা হ্রাস পায়। আসাবিয়্যাহ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই রাজ্যের পতন ঘনিয়ে আসে এবং কোনো নতুন, তুলনামূলকভাবে উজ্জীবিত ও সংঘবদ্ধ “বর্বর” (নবাগত গোত্র বা বাহিনী) দল তাদেরকে পরাস্ত করে নতুন রাজবংশ স্থাপন করে। এইভাবে আসাবিয়্যাহকে কেন্দ্র করে রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের উদয়-পতনের একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া ইবন খালদুন উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, “আসাবিয়্যাহ হল রাষ্ট্রের বিকাশের চালিকাশক্তি ও মৌল ভিত্তি; আসাবিয়্যাহ দুর্বল হলেই রাষ্ট্রের অবক্ষয় অনিবার্য”। ইতিহাসে বারবার দেখা যায় যে কোনো একটি রাজবংশ তিন-চার প্রজন্ম পর (প্রায় একশো থেকে একশ বিশ বছর) আসাবিয়্যাহ-ক্ষয়ের দরুন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং নবতর শক্তি তার স্থলাভিষিক্ত হয়।

ন্যায় ও নীতির প্রশ্ন

ইবন খালদুনের রাজনৈতিক দর্শনে ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল যে রাষ্ট্রের উন্নতি সরাসরি ন্যায়বিচারের উপর নির্ভরশীল, আর অত্যাচার ও অন্যায় সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। আল-মুকাদ্দিমাহ-তে তিনি পারস্যের রাজা বাহরামের আমলের একটি উপকথার উল্লেখ করেন, যেখানে এক জ্ঞানী পণ্ডিত রাজাকে সতর্ক করে বলেন যে রাজ্যের অব্যবস্থাপনা ও নির্যাতনের ফলে প্রজাবৃন্দ চাষাবাদ छोड़ গ্রাম ত্যাগ করছে, ফলে কর আদায় কমে যাচ্ছে এবং পুরো রাজ্য ধ্বংসের মুখে। রাজা যখন প্রশ্ন করেন এ অবস্থার কারণ কী, পণ্ডিত ব্যাখ্যা করেন: শাসক ঈশ্বরপ্রদত্ত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে জমির মালিকদের থেকে জমি কেড়ে নিজের অনুগত অকর্মাদের দিয়েছেন, যারা সে জমি পতিত রেখেছে। যে কজন প্রকৃত কৃষক রয়ে গেছে, তারা দ্বিগুণ করের বোঝা বইতে না পেরে দেশান্তরী হয়েছে। ফলশ্রুতিতে কৃষি উৎপাদন পতন হয়েছে, রাজস্ব সংকুচিত হওয়ায় সৈন্য ও প্রজারা দুর্দশাগ্রস্ত, এবং শত্রুরা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। এই কাহিনীর শিক্ষা হলো: “অন্যায় সভ্যতাকে ধ্বংস করে” প্রজাদের অধিকার হরণের মাধ্যমে শাসক নিজের রাজ্যের ভিত্তিটাই নষ্ট করে ফেলে। ইবন খালদুন স্পষ্ট করে বলেন যে শুধু অর্থ-সম্পদ জবরদখল করাই নয়, অন্যায়করভাবে কর আদায়, অথবা মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকারও যদি হরণ করা হয়, তবুও তা অন্যায় হিসেবে গণ্য হবে এবং এর পরিণামে সামগ্রিক সভ্যতা ধ্বংসমুখী হবে।

সুতরাং ন্যায়পরায়ণ শাসনই রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের চাবিকাঠি। শাসককে তাই এমন নীতিতে চলতে হবে যাতে জনগণের সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষা পায় এবং উৎপাদনের পরিবেশ বজায় থাকে। ইবন খালদুন উল্লেখ করেন, শাসকের উচিত আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে জনগণ নির্ভয়ে চাষাবাদ, বাণিজ্য ও শিল্পে মনোনিবেশ করতে পারে। তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ন্যায়বিচারের সরাসরি সংযোগ দেখিয়েছেন: যেখানে বিচার ও সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত, সেখানে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, যেসব রাষ্ট্র অন্যায় শাসন চালায়, সেখানে জনগণের উদ্যম নষ্ট হয় এবং রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

অর্থনৈতিক চিন্তা

ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে আলোচনার ফাঁকে ইবন খালদুন অর্থনীতি সম্পর্কেও চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি মানবসমাজের সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে উৎপাদনশীলতা ও বিভাগীয় শ্রম (division of labor) এর ভূমিকাকে চিহ্নিত করেন। আল-মুকাদ্দিমাহ-তে ইবন খালদুন জোর দিয়ে বলেন: “সভ্যতা ও এর কল্যাণ, একই সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে উৎপাদনশীলতা ও মানুষের নিজ স্বার্থে উদ্যমী প্রচেষ্টার উপর”।অর্থাৎ মানুষ স্বীয় কল্যাণ ও মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম ও উদ্ভাবনে প্রবৃত্ত হলে সমাজে সামগ্রিক সমৃদ্ধি আসে। শ্রমের বিভাগ ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে তিনি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল বলে চিহ্নিত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একা একজন মানুষ নিজের খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় গম উৎপাদন করতে পারেন না; কিন্তু কয়েকজন কৃষক, কারিগর ও শ্রমিক যদি মিলিত হয়ে লোহারের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে চাষ, ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহ করেন, তবে তাঁদের সমবেত শ্রম নিজ নিজ চাহিদার বহু গুণ বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এভাবে শ্রমবিভাগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা মানবজাতিকে উদ্বৃত্ত উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নত জীবনযাত্রার পথ দেখায়, যা আধুনিক অর্থনীতিতে মৌলিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অ্যাডাম স্মিথের অনেক আগে ইবন খালদুন শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ও মূল্য সৃষ্টিতে ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। আধুনিক অর্থনীতির Labor Theory of Value-এরও প্রাথমিক ধারণা ইবন খালদুনের লেখায় পাওয়া যায়; জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইব্রাহিম ওওয়েসের মতে, মূল্যতত্ত্বে শ্রমের ভূমিকা বিষয়ে ইবন খালদুন আদম স্মিথেরও অনেক পূর্বে তত্ত্বের বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর মতে "মানবশ্রমই সকল আয়ের উৎস এবং পুঁজি সঞ্চয়ের মূলে রয়েছে" কোনো পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রমই তার মূল্য সৃষ্টि করে, এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রেও শ্রমের অবদান ব্যতিরেকে মূল্য সংযোজন সম্ভব নয় (Rosenthal, 1958,vol. II, p.272)

কর ও রাজস্ব সম্পর্কে ইবন খালদুনের অন্তর্দৃষ্টি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং পরবর্তীকালে বহুল প্রশংসিত হয়েছে। তিনি লক্ষ্য করেন যে রাজবংশের সূচনাপর্বে শাসকগোষ্ঠী কম কর আরোপের মাধ্যমেও বেশি রাজস্ব পায়, কারণ জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উৎপাদন ও বাণিজ্যে সক্রিয় থাকে। বিপরীতে, রাজ্যের পতনকালে শাসকরা রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে অত্যধিক কর আরোপ করে, কিন্তু তার ফলে উৎপাদন নিরুৎসাহিত হয়ে সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বরং কমে যায়। এই পর্যবেক্ষণটি আধুনিক অর্থনীতিতে লাফার বক্ররেখা (Laffer Curve) তত্ত্বের সমান্তরাল হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান তাঁর কর নীতির পক্ষে ইবন খালদুনের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন: রাজবংশের শুরুতে স্বল্প করেও রাজস্ব বৃদ্ধি পায়, আর শেষে অধিক করেও রাজস্ব হ্রাস পায়। অর্থাৎ ইবন খালদুন করনীতিতে এমন ভারসাম্যের পক্ষপাতী ছিলেন যেখানে করহার খুব বেশি না হয়ে এমন পর্যায়ে থাকে যাতে জনগণ উৎপাদনে উৎসাহী থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রও বেশি রাজস্ব পায়।

ইবন খালদুন বাজারের চাহিদা-যোগান সম্পর্কেও প্রাচীনপন্থী ধারণা থেকে অগ্রসর চিন্তা করেছেন। তিনি সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে জনসংখ্যা ও চাহিদার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করতেন, অত্যধিক সরকারি হস্তক্ষেপ ও আমলাতন্ত্র অর্থনীতির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে; রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা ব্যবসায়ীদের মতো বাস্তব জগতের প্রেরণা ও জ্ঞান রাখেন না, তাই কর-নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে অর্থনৈতিক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত করলে সমাজের অবনতি ঘটে। রাষ্ট্রের ভূমিকা তাই হওয়া উচিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ন্যায্য পরিবেশ সৃষ্টি করা, সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত জড়ানো নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, শাসকদের উচিত দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করা কারণ অনেকসময় দারিদ্র্য ব্যক্তিগত অপচয় নয়, বরং বাহ্যিক কারণসৃষ্ট; সরকার সঠিক নীতির মাধ্যমে জনগণকে উৎপাদন ও উন্নয়নে উদ্দীপিত করতে পারে।

মুদ্রা ও বিনিময় বিষয়ে ইবন খালদুন স্বল্প কথায় হলেও গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন। তিনি ইসলামী অর্থব্যবস্থায় স্বর্ণ ও রূপার বাস্তবিক মানের মুদ্রাকে আদর্শ মাপকাঠি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন এবং মুদ্রার ওজন ও খাঁটি মান বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি স্থিতিশীল মুদ্রা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যা বাণিজ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা আনে।

সভ্যতার উদয়-পতনের চক্রতত্ত্ব

ইবন খালদুনের ইতিহাসচিন্তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দিক হলো সভ্যতার উত্থান-পতনের চক্রাকার তত্ত্ব। ইতিহাসের নানা উদাহরণ বিশ্লেষণ করে তিনি একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন শনাক্ত করেন, যেখানে একদল শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী (প্রায়শই গোত্রীয় “বেদুইন” যাযাবর) একটি দুর্বল হয়ে পড়া সভ্যতাকে জয় করে নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। নতুন শাসকগোষ্ঠী শুরুর যুগে কঠোর পরিশ্রমী, সাহসী ও উচ্চ-আসাবিয়া-সম্পন্ন থাকে, ফলে তাদের শাসনে রাজ্য বিস্তার লাভ করে এবং এক সমৃদ্ধ সভ্যতার বিকাশ হয়। এই পর্যায়কে ইবন খালদুন সভ্যতার বিকাশধারা বা স্বর্ণযুগ বলতে পারেন, যখন শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা ইত্যাদিতে উন্নতি সাধিত হয়। কিন্তু সভ্যতার শীর্ষবিন্দু অতিক্রম করার পরই অবক্ষয় শুরু হয় শাসক ও জনগণ ভোগ-বিলাসে মগ্ন হয়ে পূর্বপুরুষদের কঠোর গুণাবলি হারাতে থাকে, আসাবিয়্যাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, সৈনিকেরা শিথিল ও নরম হয়ে যায় এবং প্রশাসনে ব্যয়বহুলতা ও অদক্ষতা বাড়ে। এর ফলশ্রুতিতে ক্রমশ রাজ্য পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে এবং কোনো নবীন “বর্বর” দল (নতুন উদ্যমী যাযাবর বা প্রতিবেশী শক্তি) এই দুর্বল সভ্যতাকে আক্রমণ করে জয়ী হয়। এরপর তাদের দ্বারা আবার একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইবন খালদুন ঐতিহাসিকভাবে হিসাব করে দেখান যে সাধারণত তিন থেকে চার প্রজন্ম সময়ই একটি রাজবংশের উত্থান থেকে পতন সম্পন্ন হতে যথেষ্ট এবং এই সময়কাল প্রায় ১২০ বছর বলে তিনি অনুমান করেছেন।

এই চক্রতত্ত্ব থেকে ইবন খালদুন বোঝাতে চেয়েছেন যে সভ্যতার উত্থান-পতন কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে সামাজিক সংহতি, ন্যায়নীতি ও মানবস্বভাবজনিত কারণ রয়েছে। প্রতিটি যুগে একদল উদ্যমী মানুষ কঠোরপরিশ্রম, সংহতি ও নেতৃত্বের গুণে নতুন সভ্যতার সূচনা করে; কিন্তু সমৃদ্ধি এসে গেলে আত্মতুষ্টি, বিলাসিতা ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটে, যা সেই সভ্যতার ভিত দুর্বল করে দেয় এবং অবশেষে তার পতন ঘটে। অবশ্য ইবন খালদুন নিজেই স্বীকার করেছেন যে তাঁর যুগের প্রেক্ষাপটে এই চক্রতত্ত্ব প্রযোজ্য হলেও আধুনিককালে সমাজের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে। আজকের জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরাসরি যাযাবর বনাম নগরবাসীর দ্বন্দ্ব না থাকলেও, জাতীয় সংহতি (আসাবিয়্যাহ-এর আধুনিক রূপ) রাষ্ট্রশক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়ে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো শিক্ষাব্যবস্থা, প্রচারমাধ্যম ও জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ দিয়ে নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সংহতি সৃষ্টিতে সচেষ্ট থাকে, যা ইবন খালদুনের ধারণার প্রাসঙ্গিকতাকে এখনও বজায় রেখেছে।

আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তায় প্রভাব

ইবন খালদুনের চিন্তার ব্যাপকতার কারণে তাঁকে অনেকেই আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসতত্ত্ব, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক মনে করেন। অগাস্ত কোঁৎ, কার্ল মার্ক্স, ম্যাকিয়াভেলি, ভিকো, এমনকি অ্যাডাম স্মিথ প্রমুখ ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের ভাবনার সঙ্গে ইবন খালদুনের মিল খুঁজে পাওয়া যায় বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। যদিও সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ নেই, তথাপি অনেক আধুনিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাইবন খালদুন কয়েক শতাব্দী আগেই উপস্থাপন করেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে খ্যাত অগাস্ত কোঁতের আগেই ইবন খালদুন মানবসমাজের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থনীতিতে আদম স্মিথের আগে মূল্য ও শ্রম নিয়ে মত দিয়েছেন। রাষ্ট্রচিন্তায় ম্যাকিয়াভেলির আগে ক্ষমতা ও নীতির বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ করেছেন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ টয়েনবি ও ফরাসি ভূগোলবিদ ইভ লাকোস্ত সহ অনেকেই ইবন খালদুনকে ইতিহাস ও সমাজচিন্তায় অনন্য প্রতিভা হিসেবে তুলে ধরেছেন। টয়েনবি যেমন আল-মুকাদ্দিমাহ-কে ঐ 분야의সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ বলেছেন, তেমনি সমাজবিজ্ঞানী আর্নেস্ট গেলনার ইবন খালদুনের দেয়া রাষ্ট্রের সংজ্ঞাকে রাজনৈতিক চিন্তাধারায় শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা বলে প্রশংসা করেছেন। আধুনিক অর্থনীতিবিদ আর্থার লাফার স্বীকার করেছেন যে কর-রাজস্ব সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত লাফার বক্ররেখা ধারণার পূর্বেই ইবন খালদুন একই যুক্তি প্রদান করেছিলেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান ইবন খালদুনকে “একজন চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী দার্শনিক, যিনি মূলত আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞানের ধারণাগুলো প্রায় সবই উদ্ভাবন করে গেছেন”বলে উল্লেখ করেছেন। এসব মূল্যায়ন ইবন খালদুনের চিন্তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবকেই নির্দেশ করে।

ইবন খালদুনের চিন্তা মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের মাঝেও নবজাগরণ সৃষ্টি করেছে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদরা তাঁর তত্ত্ব ব্যবহার করে নিজেদের সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ব্যাখ্যাকরেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের পণ্ডিতরা তাঁর কাজকে পুনরায় আবিষ্কার করে মূল্যায়ন করেন। আজকের সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতির পাঠ্যক্রমেও ইবন খালদুনের অবদান আলোচনা করাহয়। তিউনিশিয়া, তুরস্ক সহ নানা দেশে তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরস্কার প্রবর্তিত হয়েছে, যা তাঁর চিন্তার চলমান প্রাসঙ্গিকতারই স্বীকৃতি। উদাহরণস্বরূপ, ইস্তানবুলে প্রতিষ্ঠিত ইবন হালদুন বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিভাষিক শিক্ষা ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় নিবেদিত, যার মাধ্যমে এই মনীষীর চিন্তার ধারা বিকাশের চেষ্টা হচ্ছে।

ইবন খালদুন ছিলেন মধ্যযুগে এক ব্যতিক্রমী মেধাবী চিন্তাবিদ, যিনি ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে সমন্বিত করে মানবসভ্যতার একটি সর্বাঙ্গীন তত্ত্ব নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সমন্বয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের কার্যকারণ সম্পর্ক উদঘাটন করেছেন। সামাজিক সংহতি, ন্যায়পরায়ণ শাসন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সভ্যতার উত্থান-পতনের যে চিত্র তিনি এঁকেছেন, তা কালের পরীক্ষায় বহুাংশে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ইতিহাসের পর্যায়ক্রমিক ধারা, জনগণের সংহতি ও নেতৃত্বের ভূমিকা, এবং অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফল সম্পর্কে তাঁর গভীরঅন্তর্দৃষ্টি আজও গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য শিক্ষণীয়। ইবন খালদুনের চিন্তাধারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় সমাজেই আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাঁকে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক তাত্ত্বিক হিসাবে গণ্য করা হয়। তাঁর অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দেখিয়েছে যে ইতিহাস শুধু রাজাদের কাহিনি নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া যেখানে সামাজিক শক্তি, অর্থনীতি ও রাজনীতি পরস্পর সংশ্লিষ্ট। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে বহু তত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও ইবন খালদুনের ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি অনন্য, যা অতীতকে বোঝার চাবিকাঠি হিসেবে ও ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হিসেবে অমলিন হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:

Gibb, H. A. R. (1933). The Islamic background of Ibn Khaldūn’s political theory. Bulletin of the School of Oriental and African Studies, University of London, 7(1), 2331. https://doi.org/10.1017/S0041977X00105361

Ibn Khaldūn. (1958). The Muqaddimah: An Introduction to History (F. Rosenthal, Trans.; 3 vols.). Princeton University Press. (Original work completed 1377).

Issawi, C. (2025). Ibn Khaldūn. In Encyclopeadia Britannica. Retrieved September 20, 2025, from https://www.britannica.com/biography/Ibn-Khaldun

Krugman, P. (2006, May 7). Ibn Khaldun and the wealth of nations. The New York Times. (Discusses Khaldun’s influence on economics and social science).

Lacoste, Y. (1984). Ibn Khaldun: The Birth of History and the Past of the Third World (D. Macey, Trans.). Verso.

Oweiss, I. M. (2017). Ibn Khaldun: The father of economics. In Ibn Khaldun: An Arab philosophy of history. Georgetown University. (Original work published 1988).

Qadir, M. A. (1941). The social and political ideas of Ibn Khaldun. The Indian Journal of Political Science, 3(2), 102118.

Sidani, Y. M. (2008). Ibn Khaldun of North Africa: An AD 1377 theory of leadership. Journal of Management History, 14(1), 7386. https://doi.org/10.1108/17511340810845499

Spengler, J. J. (1964). Economic thought of Ibn Khaldun. Comparative Studies in Society and History, 6(3), 268306. https://doi.org/10.1017/S0010417500003548

Toynbee, A. J. (1956). A Study of History (Vol. 1, Rev. ed.). Oxford University Press. (See pp. 322324 on Ibn Khaldun).


ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ১৬৪৮: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৫ অক্টোবর ১১ ১৮:৪৫:৫১
ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ১৬৪৮: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান
জেরার্ড টারবর্ক (Gerard Terborch)-এর তেলচিত্র “দ্য সোয়্যারিং অফ দ্য ওথ অফ র‍্যাটিফিকেশন অফ দ্য ট্রিটি অব মিউনস্টার” ১৬৪৮ — যেখানে চিত্রিত হয়েছে ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তির স্বাক্ষর ও অনুমোদনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। শতাব্দীজুড়ে ধর্ম ও রাজনীতির অগ্নিগর্ভ সংঘাত, রাজকীয় আধিপত্য ও পোপের ঐশ্বরিক কর্তৃত্বে ক্লান্ত ইউরোপ এই চুক্তির মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেযেখানে রাষ্ট্র হবে ধর্মের নয়, বরং ভূখণ্ড, সার্বভৌম ক্ষমতা ও নাগরিকদের স্বার্থের প্রতিফলন। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই শান্তি শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতির দলিল ছিল না; এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সার্বভৌমত্বের নীতি, এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যৌক্তিক কাঠামোর ভিত্তি।

ওয়েস্টফালিয়া ইউরোপকে শিখিয়েছিল যে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পরস্পরের সীমান্ত স্বীকার করা যুদ্ধের চেয়ে অধিক টেকসই। এখানেই জন্ম নেয় আধুনিক nation-state-এর ধারণাযেখানে রাজা নয়, রাষ্ট্রই হবে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। এই চুক্তি রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতার সূচনা ঘটায়, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির বহুপাক্ষিক ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, এবং রাষ্ট্রসমূহের সমমর্যাদার আদর্শকে প্রতিষ্ঠিতকরে।

আজ, সাড়ে তিন শতাব্দী পরেও, যখন বৈশ্বিক রাজনীতি আবারও সার্বভৌমত্ব, মানবিক হস্তক্ষেপ, ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে লড়াই করছেতখন ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়: স্থায়ী শান্তি কখনো আরোপিত হয় না, এটি অর্জিত হয় সংলাপ, সমঝোতা ও পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে।

পটভূমি: ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ত্রিশ বছরের যুদ্ধ (Thirty Years’ War) ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসের এক গভীর ও বিধ্বংসী সংঘাত, যা প্রথমে ধর্মীয় বিভেদের পরিণতি হিসেবে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ইউরোপের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি পুনর্গঠনের দিকে গড়ায়। এই যুদ্ধ মূলত পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমিতে সংঘটিত হয়, যেখানে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট শক্তির মধ্যে বিরোধ ইউরোপজুড়ে এক মহাবিপর্যয়ের সূচনা করে।

১৫৫৫ সালের Peace of Augsburg বা অগসবার্গের শান্তি চুক্তিতে “Cuiusregio, eiusreligioনীতির মাধ্যমে প্রতিটি রাজাকে তার রাজ্যের ধর্ম নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যালভিনবাদের প্রসার এই সমঝোতাকে অচল করে তোলে। পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফের্দিনান্দ (Ferdinand II) ১৬১৯ সালে ক্ষমতায় এসে সাম্রাজ্যে পুনরায় ক্যাথলিক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করলে ধর্মীয় উত্তেজনা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

১৬১৮ সালে বোহেমিয়ার রাজধানী প্রাগে ঘটে ঐতিহাসিক Defenestration of Prague ঘটনা, যেখানে সম্রাটের প্রতিনিধিদের জানালা দিয়ে নিক্ষেপ করা হয়যা বিদ্রোহের সূচনাবিন্দু হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। প্রাগের সেই ঘটনাই পরিণত হয় এক সর্বাত্মক বিদ্রোহে। বোহেমিয়ার প্রোটেস্ট্যান্ট রাজারা সম্রাটের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়, এবং দ্রুতই যুদ্ধের আগুন ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমে এই যুদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিল ধর্মীয় দ্বন্দ্বেবোহেমিয়া ও তার মিত্ররা প্রোটেস্ট্যান্ট পক্ষে, আর হ্যাবসবার্গ শাসিত অস্ট্রিয়া, স্পেন ও পোল্যান্ড ছিল ক্যাথলিক সমর্থনে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গেসংঘাতটি আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপব্যাপী ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।

যুদ্ধটি সাধারণত চারটি পর্যায়ে বিভক্ত: বোহেমিয়ান, ডেনিশ, সুইডিশ ও ফরাসি পর্যায়।

  • বোহেমিয়ান পর্যায় (১৬১৮১৬২৫): প্রাথমিক ধর্মীয় সংঘর্ষ ও বোহেমিয়ার বিদ্রোহ দমন।
  • ডেনিশ পর্যায় (১৬২৫১৬২৯): ডেনমার্ক প্রোটেস্ট্যান্টদের সহায়তায় যুদ্ধে অংশ নেয়, তবে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়।
  • সুইডিশ পর্যায় (১৬৩০১৬৩৫): সুইডেনের রাজা গুস্তাভাস অ্যাডলফাসের নেতৃত্বে প্রোটেস্ট্যান্ট বাহিনী সাময়িকভাবে প্রাধান্য অর্জন করে।
  • ফরাসি পর্যায় (১৬৩৫১৬৪৮): রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য ক্যাথলিক ফ্রান্স প্রোটেস্ট্যান্টদের পাশে দাঁড়িয়ে হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়, যা যুদ্ধের চরিত্রকে পুরোপুরি ধর্মীয় সীমানার বাইরে নিয়ে যায়।

এভাবে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ ক্রমে ধর্মীয় আদর্শের সংঘাত থেকে পরিণত হয় ইউরোপের রাজনৈতিক আধিপত্যের যুদ্ধে। বিশেষত ফ্রান্সের কার্ডিনাল রিশেলিয়ুর কূটনৈতিক নীতি ছিল হ্যাবসবার্গদের ক্ষমতা দুর্বল করাযা শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল অকল্পনীয়। আনুমানিক ৮০ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে, দুর্ভিক্ষে ও মহামারিতে মারা যায়। বিশেষত জার্মানির বহু অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়ে, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, এবং সামাজিককাঠামো সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই যুদ্ধ মধ্যযুগীয় ইউরোপের অবসান ও আধুনিক ইউরোপের সূচনালগ্ন হিসেবে গণ্য হয়।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের বিভীষিকা সহ্য করার পর সব পক্ষ অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শান্তির পথে এগোতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৬৪৮ সালে জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের ওয়েস্টফালিয়া (Westphalia) অঞ্চলের মুনস্টার ও অসনাব্রুকে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসখ্যাত “পিস অব ওয়েস্টফালিয়া” (Peace of Westphalia)যা ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন সূচনা চিহ্নিত করে।

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি: বৈশিষ্ট্য, শর্তাবলী ও আলোচনার কাঠামো

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি (Peace of Westphalia) শুধু ইউরোপে ত্রিশ বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধের অবসান ঘটায়নি, এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের ধারণার ভিত্তিও স্থাপন করে। এই শান্তিচুক্তি ছিল একক কোনো চুক্তি নয়বরং ১৬৪৪ থেকে ১৬৪৮ সালের মধ্যে জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় ওয়েস্টফালিয়া অঞ্চলের মিউনস্টার ও অসনাব্রুক শহরে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার ফল।

এই আলোচনায় অংশ নেয় পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট তৃতীয় ফের্দিনান্দ, স্পেনের রাজা চতুর্থ ফেলিপে, ফ্রান্স, সুইডেন, ডাচ প্রজাতন্ত্র, অসংখ্য জার্মান প্রিন্স ও রাজ্যসহ প্রায় ১০৯টি প্রতিনিধিদলযা ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্মেলনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, পোল্যান্ড এবং অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্য এতে অংশ নেয়নি।

চুক্তির মূল কাঠামো গঠিত হয় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নথি থেকে

১. মিউনস্টার চুক্তি (Peace of Münster): জানুয়ারি ১৬৪৮ সালে স্পেন ও ডাচ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে,

২. ফ্রান্স ও পবিত্র রোমান সম্রাটের মধ্যে চুক্তি (Treaty of Münster, October 1648), এবং

৩. সুইডেন ও সম্রাটের মধ্যে চুক্তি (Treaty of Osnabrück, October 1648)

এই তিনটি নথি মিলে ইউরোপের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে। নিচে চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও শর্তাবলী তুলে ধরা হলো।

১. যুদ্ধের অবসান ও শান্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় সৃষ্টি করে। এটি শুধু ত্রিশ বছরের যুদ্ধ (১৬১৮১৬৪৮) নয়, বরং স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে চলা আশি বছরের যুদ্ধের (১৫৬৮১৬৪৮) সমাপ্তিও ঘোষণা করে।চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে ডাচ প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয়যা ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন স্বাধীন শক্তির উত্থান ঘটায়। এই সার্বিক যুদ্ধবিরতি ইউরোপকে বহু বছরের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেয় এবং শান্তি ও পুনর্গঠনের পথে ফিরিয়ে আনে।

২. সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তির অন্যতম ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত রাজ্য ও প্রিন্সগণ তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা (sovereignty) লাভ করেন। তারা সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে বা বিদেশি শক্তির সঙ্গে চুক্তি করতে পারেতবে শর্ত থাকে যে, এই চুক্তি যেন সম্রাট বা সাম্রাজ্যের ক্ষতি না করে।

ফলে প্রায় ৩০০টি স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত জার্মান সাম্রাজ্য কার্যত একটি ঢিলেঢালা রাজনৈতিক কনফেডারেশনে পরিণত হয়। সম্রাটের ক্ষমতা নামমাত্র পর্যায়ে নেমে আসে এবং সাম্রাজ্যের সংসদ (Diet) কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারায়। এটি ইউরোপে কেন্দ্রীয় রাজতন্ত্রের পতন এবং আঞ্চলিক রাজ্যশক্তির উত্থানের সূচনা করে।এই ধারণা থেকেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি—“এক দেশ, এক সরকার, এক ভূখণ্ড”—প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি।

৩. ধর্মীয় সমঝোতা ও সহাবস্থান

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা ও স্থায়ী সমাধান।১৫৫৫ সালের Peace of Augsburg পুনর্বহাল করে শুধু ক্যাথলিক ও লুথেরান নয়, ক্যালভিনবাদীদেরও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে প্রথমবারের মতো তিনটি খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ক্যাথলিক, লুথারান ও ক্যালভিনিস্টসমঅধিকারভুক্ত ধর্মীয় শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।প্রত্যেক রাজ্যকে তার শাসকের ধর্ম অনুযায়ী রাষ্ট্রধর্ম নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়, তবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ব্যক্তিগত উপাসনা ও সীমিত জনসম্মুখে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়।এছাড়া ধর্মীয় সম্পত্তির বিরোধ মীমাংসার জন্য ১৬২৪ সালকে “স্ট্যান্ডার্ড ইয়ার” ধরা হয়যে বছরের মালিকানার অবস্থা চূড়ান্ত ধরা হবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিলযদি কোনো রাজপাল তার ধর্ম পরিবর্তন করেন, তবে তিনি তার রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব হারাবেন।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, রোমান পোপের এই চুক্তির বিরুদ্ধে কোনো ভেটো বা আপত্তির অধিকার বাতিল ঘোষণা করা হয়, ফলে জার্মান রাজনীতিতে চার্চের প্রভাব কার্যত শেষ হয়ে যায়।

৪. ভূখণ্ড পুনর্বণ্টন ও শক্তির ভারসাম্য

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পুনর্গঠন ঘটায়।ফ্রান্স লাভ করে আলজাস অঞ্চলসহ মেট্‌জ, তুল ও ভারদ্যাঁ প্রদেশগুলোর ওপর সার্বভৌম অধিকার। এর ফলে রাইন নদীর পশ্চিম তীরে ফ্রান্সের শক্তিশালী সীমান্তরেখা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে তার ইউরোপীয় প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখে। সুইডেন পায় পশ্চিম পোমেরানিয়া, উইসমার, ব্রেমেন ও ভারডেন অঞ্চল। এর মাধ্যমে সুইডেন বল্টিক সাগর ও উত্তর জার্মান নদীগুলোর মোহনায় কৌশলগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং উত্তর ইউরোপের শক্তিশালী সামুদ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ব্র্যান্ডেনবার্গ লাভ করে পূর্ব পোমেরানিয়া, আর বাভারিয়া ধরে রাখে উপ-প্যালাটিনেট অঞ্চল। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, নেদারল্যান্ডস (ডাচ প্রজাতন্ত্র) ও সুইস কনফেডারেশন-কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

চিত্র: ১৬৪৮ সালের ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পর ইউরোপ – ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তির ফলে সুইডেন ও ফ্রান্সের ভূখণ্ড বৃদ্ধি (নীল ও সবুজ রঙে), ব্র্যান্ডেনবার্গ ও বাভারিয়ার প্রাপ্ত এলাকা এবং নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের স্বাধীনতার স্বীকৃতি লক্ষ্যণীয়।

এই ভূখণ্ডগত পুনর্বণ্টন ইউরোপে নতুন শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় কূটনীতির মূল নীতি হয়ে দাঁড়ায়।

৫. সাধারণ ক্ষমা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার

শান্তিচুক্তিতে যুদ্ধকালীন সব অপরাধ ও সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) ঘোষণা করা হয়।যে সকল অভিজাত বা গির্জা ১৬১৮ সালের আগে সম্পত্তির মালিক ছিল, তাদের অধিকাংশকেই সেই সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি কার্যকর রাখার নিশ্চয়তা হিসেবে ফ্রান্স ও সুইডেনকে গ্যারান্টার রাষ্ট্র হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যদি কেউ চুক্তি ভঙ্গ করে, তারা হস্তক্ষেপের অধিকার পাবে।এছাড়া রাইন নদীতে মুক্ত নৌচলাচলের নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা অপসারণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়যা যুদ্ধোত্তর ইউরোপে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের পথ প্রশস্ত করে।

৬. ওয়েস্টফালিয়ান ব্যবস্থা ও আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি শুধু একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়এটি আধুনিক বিশ্বরাজনীতির জন্মলগ্ন।এই চুক্তি থেকেই উদ্ভূত হয় “Westphalian System”—যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার ভূখণ্ড ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণ সার্বভৌম ধরা হয়, এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের অ-হস্তক্ষেপ নীতি (Non-intervention principle) প্রতিষ্ঠিত হয়।আধুনিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় সীমারেখা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ধারণা এই চুক্তি থেকেই বিকশিত হয়। পোপের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ভেঙে গিয়ে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ কূটনীতির যুগ শুরুহয়, যা পরবর্তী কালে Treaty of Utrecht (1713) থেকে Congress of Vienna (1815)-এর পথ তৈরি করে।

ইউরোপীয় ইতিহাসে ওয়েস্টফালিয়ার ফলাফল: সার্বভৌম রাষ্ট্রের উত্থান ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে পদক্ষেপ

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। এটি ছিল এমন এক মাইলফলক, যার মাধ্যমে ইউরোপ ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় ধর্মনির্ভরসাম্রাজ্যব্যবস্থা থেকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। ধর্মীয় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মুক্ত হয়ে ইউরোপ নতুন করে রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও শাসনের সম্পর্ক পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।

১. সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণার উদ্ভব

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তিসার্বভৌমত্বের (Sovereignty) ধারণার প্রতিষ্ঠা। ত্রিশ বছরের যুদ্ধের আগে ইউরোপে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য, যেখানে সম্রাট ধর্মীয় কর্তৃত্বের ছায়ায় রাজ্যগুলোকে শাসন করতেন। কিন্তু ওয়েস্টফালিয়া সেই কাঠামো ভেঙে দেয় এবং প্রতিটি রাজ্যকে তার ভূখণ্ডে পূর্ণ ও স্বতন্ত্র সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করে।

সম্রাটের কর্তৃত্ব নামমাত্র পর্যায়ে নেমে আসে, এবং জার্মান অঞ্চলের প্রায় ৩০০টি রাজ্য নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। প্রতিটি রাজ্যের শাসক এখন নিজের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী; অন্য কোনো সম্রাট, পোপ বা বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ সেখানে অবৈধ। ফলে, ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটেআর কোনো সর্বজনীন “খ্রিষ্টীয় সম্রাট” বা “দিব্য ক্ষমতাসম্পন্ন রাজা” সমগ্র ইউরোপের শাসক নন, বরং প্রত্যেক রাজ্যই নিজ ভূখণ্ডে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত।

এই পরিবর্তন জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্য বিলম্বিত করলেও, ইউরোপে বিকেন্দ্রীকরণ ও রাজ্যভিত্তিক শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করে। এর ফলে ব্র্যান্ডেনবার্গ-প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, বাভারিয়া প্রভৃতি আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ত্বরান্বিত হয়, যা পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্য নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

২. ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও সহনশীলতার সূচনা

ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সূচনাই ছিল ধর্মীয় দ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু এই যুদ্ধের সমাপ্তি ওয়েস্টফালিয়ার মাধ্যমে ধর্মের পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও কূটনীতিকে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ক্যাথলিক, লুথেরান ও ক্যালভিনিস্টএই তিন খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়কে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে সমঅধিকার প্রদান করা হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত উপাসনার অধিকারএবং সীমিত জনসম্মুখে ধর্মচর্চার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ধর্মের প্রশ্নে সহনশীলতার এই নীতি ইউরোপীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে, যেখানে সহাবস্থান ও পারস্পরিক স্বীকৃতি সংঘাতের পরিবর্তে শান্তির ভিত্তি গঠন করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, রোমের পোপ বা অন্য কোনো ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ইউরোপীয় রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে আর ভেটো বা হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ঘটে। এর ফলে রাজনীতি ক্রমে বা ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) চেতনার ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হতে থাকে।রাষ্ট্রপরিচয় এখন আর কোনো ধর্মীয় মতের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি নির্ধারিত হতে থাকে ভূখণ্ড, নাগরিকত্ব ও শাসনের আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। এই নতুন চেতনা পরবর্তীকালে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

৩. ইউরোপে রাজনৈতিক বাস্তববাদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নীতি

ওয়েস্টফালিয়ার পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে Realpolitik বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বাস্তববাদ প্রাধান্য লাভ করে। এখন থেকে যুদ্ধ বা জোট আর ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) ও রাষ্ট্রীয়স্বার্থ রক্ষার কৌশলগত প্রয়োজনে নির্ধারিত হতে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, ওয়েস্টফালিয়ার পর ইউরোপে সংঘটিত বড় যুদ্ধসমূহযেমন স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ (17011714), সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (17561763) এবং নেপোলিয়নিক যুদ্ধসমূহ (17991815)মূলত রাজন্যবর্গের ভূখণ্ড বিস্তার, বাণিজ্যিক আধিপত্য ও কূটনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়েছিল, ধর্মীয় অনুপ্রেরণার কোনো ভূমিকা সেখানে ছিল না।

এই পরিবর্তন ইউরোপে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাস্তববাদী কূটনীতির যুগ শুরু করে। রাষ্ট্রগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সামরিক ও কূটনৈতিক জোট গঠন করেযা আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্যতত্ত্বের (Balance of Power Theory) ভিত্তি।

৪. জাতিরাষ্ট্রের উত্থান ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র (Nation-State) ধারণার জন্ম দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই চুক্তিই প্রথম ইউরোপে নাগরিক, ভূখণ্ড ও শাসনব্যবস্থাকে একই কাঠামোর অধীনে সংহত করে।

এখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা সেই রাষ্ট্রের আইন ও শাসনের অধীনস্থকোনো বহিরাগত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর শাসন করতে পারবে না। এই ধারণাই আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু: রাষ্ট্র একটি স্বাধীন, সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সার্বভৌম একক।

এই কাঠামো পরবর্তীকালে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই-এর অধীনে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র (Absolute Monarchy) প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একক আধিপত্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, প্রতিটি রাষ্ট্র এখন নিজেকে স্বাধীন ও সমমর্যাদার রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে ইউরোপ এক বহুধা শক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রভাব: আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইন

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে। এটি শুধু ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটায়নি, বরং রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ মধ্যযুগীয় ধর্মনির্ভর সাম্রাজ্যব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়।

ওয়েস্টফালিয়ার পর ইউরোপের মানচিত্র স্থায়ী সীমানা ও সার্বভৌম কর্তৃত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ডে পূর্ণ ক্ষমতা অর্জন করে এবং অন্য রাষ্ট্র বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকে। এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় “ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব” (Westphalian Sovereignty) যার তিনটি মূল নীতি হলো: রাষ্ট্রের সমমর্যাদা, সীমান্তের অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপপরবর্তীকালে এই নীতিগুলোই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ভিত্তি হয়। জাতিসংঘের অনুচ্ছেদ ২(৭)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, “যে সকল বিষয় কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অধিকারভুক্ত, সেসব বিষয়ে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করবে না।”

ওয়েস্টফালিয়া আধুনিক বহুপাক্ষিক কূটনীতির সূচনাও ঘটায়। ইতিহাসে প্রথমবার বিভিন্ন রাষ্ট্র একত্রে বসে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করে। এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সংঘাত কেবল শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেও স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব। এই মডেলই পরবর্তীতে ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস, ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি এবং ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে ওঠে

চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোও গঠন করে। রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা, সীমান্তের অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপ নীতি এখন থেকে রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ইউরোপে “ক্ষমতার ভারসাম্য” (Balance of Power) নীতি জনপ্রিয় হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল কোনো এক রাষ্ট্র যেন অতিশক্তিশালী হয়ে ইউরোপে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। এই ধারণাই পরবর্তীতে “সমষ্টিগত নিরাপত্তা” (Collective Security) ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।

ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মাধ্যমে ওয়েস্টফালিয়ান নীতিগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতা-পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রগুলিও এই কাঠামো গ্রহণ করে। আজও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌল ভিত্তি হিসেবে সার্বভৌমত্ব, সীমান্তের শ্রদ্ধা ও অ-হস্তক্ষেপ নীতি বহাল আছে।

বিশ্ব ইতিহাসে প্রভাব: উপনিবেশবাদী শক্তির পালাবদল ও আধুনিক কূটনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি

ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি কেবল ইউরোপীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং বিশ্ব ইতিহাসেও এর প্রভাব গভীরভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। ১৬৪৮ সালে যখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ইউরোপের চারটি শক্তিধর রাষ্ট্রস্পেন, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস এবং ইংল্যান্ড/ফ্রান্সবিশ্বের নানা প্রান্তে নিজেদের উপনিবেশ বিস্তারে ব্যস্ত ছিল। ইউরোপে ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সমাপ্তি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক ধরনের স্বস্তি বয়ে আনে, যা তাদেরকে বৈশ্বিক উপনিবেশ স্থাপনে পুনরায় মনোযোগী হতে সহায়তা করে। এই শান্তির মধ্য দিয়ে ইউরোপে যে সাময়িক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক বিস্তারের প্রাথমিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।

স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘস্থায়ী আশি বছরের যুদ্ধের অবসান এবং ডাচ প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃতি নেদারল্যান্ডসকে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেয়। তারা ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি স্থানে তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে দেয়। অপরদিকে ফ্রান্স ইউরোপে নিজের অবস্থান মজবুত করে উপনিবেশ স্থাপনের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে১৬৪৮ সালেই ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস ক্যারিবীয় দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ভাগ করে নেয়। ইংল্যান্ডও ইউরোপীয় সংঘাতের ভারসাম্য বদলে যাওয়াকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দেয়, যা পরবর্তীকালে তার বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে।

ওয়েস্টফালিয়ার পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে বাইরের জগতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হয়। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কাঠামো, প্রশাসনিক নীতি ও চুক্তিনির্ভর সীমান্ত ধারণা ধীরে ধীরে ইউরোপের বাইরে বিস্তার লাভ করে। উপনিবেশ স্থাপন ও বিভাজনের সময় (যেমন ১৮৮৪৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে আফ্রিকার সীমারেখা নির্ধারণে) ইউরোপীয় শক্তিগুলো ওয়েস্টফালিয়ান মডেল অনুসরণ করে। উপনিবেশিক শাসন শেষে স্বাধীন হওয়া দেশগুলিও এই কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন করে সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে ওয়েস্টফালিয়ার পর একটি বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠিত হয়, যেখানে পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলই নির্দিষ্ট সীমানা ও সার্বভৌমত্বের আওতায় আসে।

যদিও সমালোচকেরা মনে করেন, এই নীতিমালা ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হলেও তা জোরপূর্বক বিশ্বব্যাপী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রায় প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র এই ওয়েস্টফালিয়ান কাঠামোর অংশে পরিণত হয়যা বিশ্ব রাজনীতির অভিন্ন ভাষা হিসেবে সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

সমসাময়িক প্রতিফলন: ২১শ শতকে ওয়েস্টফালিয়ার তাৎপর্য ও সার্বভৌমত্ব বনাম হস্তক্ষেপের বিতর্ক

একবিংশ শতকে এসেও ওয়েস্টফালিয়ার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতে অটুট। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা এখনো সার্বভৌম রাষ্ট্রব্যবস্থার নীতিকেই ভিত্তি ধরে পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রই স্বাধীন ও সমমর্যাদাপূর্ণ; কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। প্রায় চার শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই নীতিই আজও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

তবে আধুনিক যুগে এই সার্বভৌমত্ব নানা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মানবাধিকার, গণহত্যা প্রতিরোধ বা মানবিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে অনেক সময় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ দেখা যায়যেমন কসোভো (১৯৯৯), লিবিয়া (২০১১) বা সিরিয়া সংকটের সময় পশ্চিমা জোটের সামরিক পদক্ষেপ। এতে সার্বভৌমত্ব বনাম মানবিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব সামনে আসে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী, বিশ্ব বাণিজ্য বা সাইবার নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক সমস্যা একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, ফলে রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংস্থা বা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো এখন আংশিক সার্বভৌমত্ব ভাগাভাগির নীতিতে পরিচালিতযা ওয়েস্টফালিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। জাতিসংঘও শান্তিরক্ষা ও মানবিক ম্যান্ডেটের মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করে, যা ওয়েস্টফালিয়ার কঠোর নীতির পরিপন্থী হলেও বৈশ্বিক শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

অতএব, আজকের পৃথিবীতে ওয়েস্টফালিয়ার ধারণা একই সঙ্গে প্রেরণাদায়ক ও বিতর্কিত। একদিকে এটি আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি, অন্যদিকে বৈশ্বিক সহযোগিতার যুগে এটি আংশিকভাবে পুনর্ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তবুও, জাতিসংঘের কাঠামো থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থার আইনি সংজ্ঞা পর্যন্তসবখানেই ওয়েস্টফালিয়ার ছায়া বর্তমান। এটি শুধু অতীতের এক শান্তিচুক্তি নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার মূলে প্রোথিত এক চিরন্তন নীতি।

প্রধান তথ্যসূত্র:

Bély, L. (2013). The Peace of Westphalia: A European and Global Turning Point? Oxford University Press.

Britannica. (n.d.). Peace of Westphalia. In Encyclopædia Britannica. Retrieved October 11, 2025, from https://www.britannica.com/event/Peace-of-Westphalia.

Boundless. (n.d.). The Peace of Westphalia. In Boundless World History (Western Civilization). Lumen Learning. (Original work published 2016).

Cobban, H. (2021, May 8). 1648: Peace of Westphalia sets inter-state rules for >370 years. (Etc.). Just World News. https://justworldnews.org/2021/05/08/1648-peace-of-westphalia-sets-inter-state-rules-for-370-years-etc

Croxton, D. (1999). The Peace of Westphalia of 1648 and the origins of sovereignty. The International History Review, 21(3), 569591. https://doi.org/10.1080/07075332.1999.9640869

Gross, L. (1948). The Peace of Westphalia, 16481948. The American Journal of International Law, 42(1), 2041. https://doi.org/10.2307/2193560

History.com Editors. (2025, August 26). Thirty Years’ War. History. https://www.history.com/articles/thirty-years-war.

Lumen Learning (2023). “The Thirty Years’ War and the Peace of Westphalia.

Osiander, A. (2001). Sovereignty, international relations, and the Westphalian myth. International Organization, 55(2), 251287. https://doi.org/10.1162/00208180151140577

Parker, Geoffrey. Europe in Crisis: 15981648. Oxford University Press, 2001.

Philpott, D. (2001). Revolutions in sovereignty: How ideas shaped modern international relations. Princeton University Press.

Teschke, B. (2003). The myth of 1648: Class, geopolitics, and the making of modern international relations. Verso.

Wilson, P. H. (2009). Europe’s tragedy: A history of the Thirty Years War. Allen Lane.

Wedgwood, C. V. (2016). The Thirty Years War. New York Review Books. (Original work published 1938)

পাঠকের মতামত: