মতামত

বিশ্ববিদ্যালয় সংকট, বাজেট বৈষম্য ও শিক্ষায় ন্যায্যতার দাবি

শামসুল আরেফীন
শামসুল আরেফীন
শিক্ষক ও রাজনৈতিক গবেষক
২০২৫ জুন ১৯ ২১:৩৪:০৩

গত কয়েকদিন ধরে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জিএসটিইউ) শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন, ছাত্র সংসদ চালু এবং শিক্ষা পরিবেশ উন্নয়ন—এসব দাবির পেছনে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শর্তসমূহ। এসব দাবি নতুন নয়; বরং এ দাবিগুলো পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আদৌ “বিশ্ববিদ্যালয়” বলা যায় কি না, সে প্রশ্ন তোলা যুক্তিসঙ্গত।

দুঃখজনকভাবে, গত দেড় দশকে দেশে বহু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে এবং উন্নয়ন সংস্থার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, ভাড়াকৃত ভবনে চলছে পাঠদান। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই, আর নিয়োগপ্রক্রিয়া দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির কারণে গুণগত শিক্ষা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম, ল্যাব ও আবাসন সংকটসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাবজনিত নানাবিধ সমস্যায় ভুগছে।

এই কাঠামোগত সংকট শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। গত ১৫ বছরে ২০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিছুটা ফিরে আসায় ভবিষ্যতে আরও আন্দোলন হওয়াও স্বাভাবিক। এসব দাবিকে উপেক্ষা করা যাবে না, যদি না আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন এবং উন্নয়নের জন্য একটি সুসমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করি।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো তেমন কোনো পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ইন্টারিম সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার কার্যক্রম এখন পর্যন্ত উপাচার্য পরিবর্তন এবং আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ১৩,২২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। গবেষণায় বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা—যা কার্যত প্রহসনের শামিল। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফয়েজ দাবি করেছেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার অর্থ ব্যয় করতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গবেষণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে যেসব কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা কাজ করে—যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, টিচিং লোড, ল্যাব ও রিসোর্স ঘাটতি—সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধান দেওয়ার দায়িত্ব কার?

বাজেট বণ্টনেও বৈষম্য প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জিএসটিইউ এবার ইউজিসি থেকে মাত্র ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা পেয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৪ কোটি টাকা কম। অথচ শুধু বেতন খাতেই প্রয়োজন ৩০ কোটি টাকা। তাহলে ক্লাস, গবেষণা বা আবাসনের বাজেট আসবে কোথা থেকে? বাজেট কমানোর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, গত বছরের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। যদি এই যুক্তি সঠিকও হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো—কেন সেই প্রশাসনিক ব্যর্থতার বোঝা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাঁধে চাপানো হবে?

এই বাজেট সংকটের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে অনেকের মতে, বিগত সরকারের সময়ে গোপালগঞ্জ বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় এখন উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয়—এটি একটি জাতীয় সম্পদ। সেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসে। আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাবে বাজেট নির্ধারিত হলে, তাতে সার্বজনীনতার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বৈষম্য বাড়ে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর “কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই”—এই প্রশ্ন ঘিরে শিক্ষক নেটওয়ার্ক, সেমিনার ও আলোচনায় বহু প্রস্তাব উঠে এসেছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের দাবি বারবার উঠলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন, এবং উপাচার্য নিয়োগে এখনও দলীয় পছন্দের ছাপ দেখা যাচ্ছে; নিয়োগের প্রক্রিয়া ও মানদণ্ডও অস্পষ্টই রয়ে গেছে।

এছাড়া ছাত্র সংসদ এখনও চালু হয়নি। নিরাপদ ও নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক দুটি হত্যাকাণ্ড আবারও সহিংসতার আতঙ্ককে সামনে এনেছে। এমনকি বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু উপাচার্যকেও আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছে—যেমন কুয়েট ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা।

তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহাবস্থান এখন চোখে পড়ে, যা আগের শাসনামলে সম্ভব ছিল না। উপাচার্য নিয়োগে প্রথমবারের মতো সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে, যদিও এর কাঠামো নিয়ে সমালোচনার অবকাশ রয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ঘোষণা করেছে। ইউজিসি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি করার অনুমতি দিয়েছে এবং ব্র্যাক ও যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পিএইচডি প্রোগ্রামও চালু হয়েছে—যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

তবুও বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি, ন্যায্য ও কার্যকর পরিকল্পনা কোথায়? এই প্রেক্ষিতে আমার কিছু প্রস্তাব :

  • পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করতে হবে
  • বাজেট বণ্টনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে
  • ছাত্র সংসদ অবিলম্বে চালু করে অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে
  • গবেষণার জন্য সহায়ক পরিবেশ ও পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করতে হবে
  • শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে
  • প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংকট নিরূপণ করে দ্রুত সমাধান দিতে হবে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যেন জাতীয় বা আঞ্চলিক রাজনীতির বলি না হয়। একাডেমিক সুযোগ-সুবিধা থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্থান নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র।

অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়—এটি আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থা, বিশেষত গণতন্ত্র, সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর সতর্ক সংকেত। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন সেই সতর্ক সংকেতেরই বহিঃপ্রকাশ—যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এখনই সময় মৌলিক চাহিদা পূরণ, স্বচ্ছ বাজেট বণ্টন এবং অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করার।

এই প্রেক্ষাপটে, আমাদের অবশ্যই আঞ্চলিক পক্ষপাত, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা পরিহার করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য এবং টেকসই উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং একটি ন্যায্য রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ নির্মাণে আমাদের সবার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় যেন সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠতে পারে জ্ঞান, স্বাধীনতা এবং ন্যায়ের আলোকবর্তিকা—এই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

- লেখক শামসুল আরেফীন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন।


‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’: সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ার শিক্ষা

এম. আরিফুজ্জামান
এম. আরিফুজ্জামান
সিনিয়র শিক্ষক মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর।
২০২৬ জুলাই ০৪ ২৩:০২:৪০
‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’: সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ার শিক্ষা

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে পরিবেশ আর কেবল নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন মানুষের জীবন, জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ এই সংকটের সামনের সারির একটি দেশ। ফলে আমাদের পরিবেশনীতি শুধু প্রকল্পভিত্তিক হলে চলবে না; এটিকে হতে হবে প্রজন্মভিত্তিক, শিক্ষাভিত্তিক এবং সমাজভিত্তিক।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ বা ‘একটি শিশু, একটি গাছ’ কর্মসূচি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি কেবল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং পরিবেশ সচেতনতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ একটি শিশু যখন নিজের হাতে একটি চারা রোপণ করে, সেটির পরিচর্যা করে এবং বছর বছর তার বৃদ্ধি দেখে, তখন পরিবেশ তার কাছে পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় হয়ে থাকে না। পরিবেশ তখন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও আবেগের অংশ হয়ে ওঠে।

গত ২৯ জুন শেরে বাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে পাঁচ কোটি চারা রোপণ করা। এটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহিষ্ণু বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবেও এই কর্মসূচিকে দেখা যায়।

উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গেই মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৯ হাজার ৬২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ হাজার ৯০৭টি বিদ্যালয়, ১ হাজার ৪৪৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ৯ হাজার ২৬৮টি মাদ্রাসা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত লার্নিং অ্যাক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন বা LAISE প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীকে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এককালীন জলবায়ু অনুদান দেওয়ার উদ্যোগও প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এই কর্মসূচির একটি বিশেষভাবে প্রশংসনীয় দিক হলো, আকাশমণির মতো আগ্রাসী বা পরিবেশ-অবান্ধব বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। অতীতে অনেক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে প্রজাতি নির্বাচনে যথেষ্ট সতর্কতা দেখা যায়নি। অথচ কোনো অঞ্চলের পরিবেশ, মাটি, জীববৈচিত্র্য ও পানির ভারসাম্যের সঙ্গে গাছের প্রজাতি গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলে তা শুধু ছায়া বা অক্সিজেন দেবে না; বরং পাখি, কীটপতঙ্গ, ক্ষুদ্র প্রাণী, স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে।

তবে একটি সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণ আর বৃক্ষবৃদ্ধি এক বিষয় নয়। বাংলাদেশে অতীতে বহুবার বড় আকারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হয়েছে, কিন্তু রোপণের পর পরিচর্যার অভাবে অনেক চারা টেকেনি। গণমাধ্যমে ছবি এসেছে, ব্যানার হয়েছে, অনুষ্ঠান হয়েছে, কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা গেছে সেই চারাগুলোর বড় অংশ শুকিয়ে গেছে। তাই ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে কত চারা রোপণ করা হলো তার ওপর নয়; বরং কত গাছ পাঁচ বছর পরও বেঁচে আছে, তা কতটা বড় হলো, শিক্ষার্থী কতটা যুক্ত থাকল এবং প্রতিষ্ঠান কতটা দায়িত্ব নিল, তার ওপর।

এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বৃক্ষরোপণকে একদিনের অনুষ্ঠান না বানিয়ে একে বার্ষিক শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর নামে একটি গাছের দায়িত্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে। শ্রেণিশিক্ষক, স্কাউট, গার্ল গাইড, পরিবেশ ক্লাব বা শিক্ষার্থী সংসদের মাধ্যমে নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গাছের উচ্চতা, পাতা, ফুল, ফল, রোগ, পানি দেওয়ার সময়সূচি এবং পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ছোট পর্যবেক্ষণ নোট রাখতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে বিজ্ঞান শিক্ষা, পরিবেশ শিক্ষা ও নাগরিক শিক্ষার মধ্যে একটি বাস্তব সংযোগ তৈরি হবে।

এই কর্মসূচিকে আরও টেকসই করতে ডিজিটাল মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েব পোর্টাল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রোপণ করা চারার সংখ্যা, প্রজাতি, অবস্থান, ছবি এবং বৃদ্ধির তথ্য নিয়মিত আপডেট করবে। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গাছের ছবি আপলোড করতে পারে। স্থানীয় শিক্ষা অফিস, উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে গাছের বেঁচে থাকার হার, প্রজাতি নির্বাচন এবং পরিচর্যার মান সম্পর্কে বাস্তব তথ্য পাওয়া যাবে।

আরেকটি সৃজনশীল ধারণা হতে পারে জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে বৃক্ষরোপণের সম্পর্ক তৈরি করা। প্রতিটি শিশুর জন্মের সময় পরিবারকে একটি চারা দেওয়া যেতে পারে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা সেই গাছের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে পারে। পরিবার যদি নিজস্ব জমিতে চারা রোপণ করতে না পারে, তবে রাস্তার ধারে, খাস জমিতে, স্কুল প্রাঙ্গণে বা কমিউনিটি স্পেসে সেই গাছের পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে একটি শিশুর বেড়ে ওঠা এবং একটি গাছের বেড়ে ওঠার মধ্যে প্রতীকী ও আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি হবে।

প্রতিবছর স্থানীয়ভাবে ‘শিশু-বৃক্ষ উৎসব’ আয়োজন করা যেতে পারে। যে শিক্ষার্থী বা পরিবার গাছের পরিচর্যায় ভালো করবে, তাদের স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। তবে পুরস্কার শুধু আনুষ্ঠানিক সনদে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীকে বই, শিক্ষা উপকরণ, পরিবেশ ক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ বা স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, কিন্তু সেটি হবে ইতিবাচক ও পরিবেশবান্ধব প্রতিযোগিতা।

এই কর্মসূচিতে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা অপরিহার্য। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি শ্রেণিকক্ষে দেখেছি, শিশুরা তত্ত্বের চেয়ে অভিজ্ঞতা থেকে বেশি শেখে। বইয়ে লেখা থাকে গাছ অক্সিজেন দেয়, পরিবেশ রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য বজায় রাখে। কিন্তু একটি শিশু যখন নিজের হাতে চারা রোপণ করে, গরমে পানি দেয়, শুকিয়ে গেলে কষ্ট পায়, নতুন পাতা গজালে আনন্দ পায়, তখন তার ভেতরে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ জন্মায়। এই দায়িত্ববোধই ভবিষ্যতে তাকে পরিবেশবান্ধব নাগরিকে পরিণত করতে পারে।

তবে সরকারের উচিত কর্মসূচিটিকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সীমাবদ্ধ না রাখা। স্থানীয় সরকার, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, স্কাউট, গার্ল গাইড, এনজিও এবং স্থানীয় নাগরিক সংগঠনকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কোথায় কোন গাছ লাগানো হবে, কোন অঞ্চলে কোন প্রজাতি উপযোগী, কীভাবে পানি দেওয়া হবে, বন্যা বা খরাপ্রবণ এলাকায় কী ধরনের চারা লাগানো হবে, এসব বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দরকার। শুধু আবেগ দিয়ে বৃক্ষরোপণ সফল হয় না; এর জন্য পরিকল্পনা, স্থানীয় জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ ভালো। তবে মনিটরিং যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে। প্রতি বছর গাছের বেঁচে থাকার হার প্রকাশ করা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু ছবি তুলে রিপোর্ট দিলেই হবে না; প্রকৃত অগ্রগতি যাচাই করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান ভালো করবে তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে, আর যে প্রতিষ্ঠান অবহেলা করবে তাকে সহায়তা ও সতর্কতা দুটোই দিতে হবে।

‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি পরিবেশকে শিশুর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক, প্রশাসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, কৃষক, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও নীতিনির্ধারক। তাদের শৈশবেই যদি প্রকৃতির সঙ্গে একটি মমতাময় সম্পর্ক তৈরি করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে।

তাই এই কর্মসূচিকে আমরা শুধু পাঁচ কোটি চারা রোপণের সংখ্যা দিয়ে বিচার করতে চাই না। আমরা দেখতে চাই, এটি কি পাঁচ কোটি শিশুর মননে সবুজ চেতনা রোপণ করতে পারে? এটি কি বিদ্যালয়কে পরিবেশ শিক্ষার জীবন্ত ক্ষেত্র বানাতে পারে? এটি কি স্থানীয় সমাজকে গাছের দায়িত্ব নিতে শেখাতে পারে? এটি কি জলবায়ু সহিষ্ণু বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে?

যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু গাছ লাগানোর প্রকল্প নয়; এটি শিশু, শিক্ষা, প্রকৃতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরির সুযোগ। এই সুযোগকে সফল করতে হলে সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, একটি গাছ ভবিষ্যৎ তৈরি করে।


শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির সীমারেখা

এম. আরিফুজ্জামান
এম. আরিফুজ্জামান
সিনিয়র শিক্ষক মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর।
২০২৬ জুন ২০ ২২:৪৪:৫৪
শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির সীমারেখা

“শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড” কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিদ্যালয়ের সভা, জাতীয় দিবসের বক্তৃতা কিংবা পাঠ্যবইয়ের পাতায় এই কথাটি বারবার ফিরে আসে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড মনে করি? যদি করি, তবে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে আমাদের সামাজিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ এত দুর্বল কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও আমাদের এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষকদের তিরস্কার করছেন। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়, একজন কর্মকর্তা এবং কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে হতে পারে। কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক গভীর। এটি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত শিষ্টাচার এবং রাষ্ট্রীয় আচরণবিধির এক অসংগত বাস্তবতা তুলে ধরে।

প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম থাকলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা ব্যবস্থাপনা কমিটি, কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন। বিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আস্থার প্রতিষ্ঠান। সেখানে প্রশাসনিক অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনা বা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ করা বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই হস্তক্ষেপ কীভাবে হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। প্রশাসনিক জবাবদিহি ও প্রকাশ্য অপমান এক বিষয় নয়। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আর মর্যাদাহানি এক জিনিস নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা আইনানুগভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি ধরতে পারেন, ব্যাখ্যা চাইতে পারেন, তদন্ত করতে পারেন, প্রতিবেদন দিতে পারেন, প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষককে তিরস্কার করা, অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলা বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে শিক্ষকের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, এটি দায়িত্বশীল প্রশাসনিক আচরণ হতে পারে না।

শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয় শুধু পাঠদান করার জায়গা নয়। এটি মূল্যবোধ গঠনের জায়গা। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যসূচির জ্ঞান নেয় না। তারা শেখে আচরণ, ভাষা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাছে শুধু পেশাজীবী নন। তিনি অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। সেই শিক্ষককে যদি শিক্ষার্থীদের সামনে ছোট করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু ওই ব্যক্তি নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষকতার নৈতিক কর্তৃত্ব। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের শিক্ষকের প্রতি সম্মান হারায়, তখন তার শিক্ষাগ্রহণের মনস্তত্ত্বেও পরিবর্তন আসে। শিক্ষক তখন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ালেও তার কথার নৈতিক শক্তি কমে যায়। ভবিষ্যতে সেই শিক্ষকের পক্ষে আত্মমর্যাদা বজায় রেখে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের চোখে শিক্ষক যদি দুর্বল, অপমানিত বা প্রশাসনিক ক্ষমতার সামনে অসহায় হিসেবে প্রতিভাত হন, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের ভিত্তিও দুর্বল হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যক্তি শিক্ষক, একটি বিদ্যালয় বা একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পড়ে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন অনেক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রদর্শনীর রূপ নিচ্ছে। কোনো সমস্যা সমাধানের চেয়ে দৃশ্যমানতা তৈরি করাই যেন অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি বিদ্যালয়ে সমস্যা থাকলে সেটি সমাধানের জন্য প্রশাসনিক পদ্ধতি আছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে ভিডিও ধারণ, প্রচার এবং জনসম্মুখে অপমানের মাধ্যমে পরিচালনা করলে তা জবাবদিহির চেয়ে ‘পাবলিক শো-ম্যানশিপ’-এর কাছাকাছি চলে যায়। প্রশাসনের কাজ জনসমক্ষে কাউকে হেয় করা নয়। প্রশাসনের কাজ হলো ন্যায়সংগত, পেশাদার ও মানবিক উপায়ে সমস্যা সমাধান করা।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। শিক্ষক সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম নেই, অবহেলা নেই, দায়িত্বহীনতা নেই, এমন কথা বলা যাবে না। অনেক জায়গায় পাঠদানের মান, উপস্থিতি, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নথিপত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা বা শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিয়ে বাস্তব সমস্যা আছে। এসব সমস্যা অস্বীকার করলে শিক্ষা খাতের উন্নতি হবে না। কিন্তু ত্রুটি সংশোধনের পদ্ধতি যদি অপমাননির্ভর হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন সংকট তৈরি হবে।

একটি সভ্য প্রশাসনিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো পদ্ধতি, সংযম ও মর্যাদা। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানেন, কখন কড়া হতে হয়, কখন পরামর্শ দিতে হয়, কখন তদন্ত করতে হয়, আর কখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মর্যাদার ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ক্ষমতা প্রদর্শন প্রশাসনিক দক্ষতা নয়। প্রকৃত দক্ষতা হলো এমনভাবে সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করা, যাতে প্রতিষ্ঠানও সঠিক পথে আসে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবিক মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ থাকে।

শিক্ষক ও প্রশাসন, উভয়ই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রশাসন রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়ন করে, আর শিক্ষক তৈরি করেন সেই নাগরিক, যারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এই দুই পক্ষের সম্পর্ক যদি পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও পেশাদারিত্বের ওপর দাঁড়ায়, তবে শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। কিন্তু সম্পর্ক যদি ভয়, দাপট, অপমান ও অবিশ্বাসের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখা।

শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মচারী, স্থানীয় প্রশাসনসহ সব পেশাগত ক্ষেত্রেই জবাবদিহি দরকার। কিন্তু জবাবদিহির ভাষা হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক, অপমানজনক নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রশাসনিক পরিদর্শন বা তদারকির সময় কী ধরনের আচরণবিধি অনুসরণ করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষকদের প্রকাশ্যে তিরস্কার, অপমান বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার সংস্কৃতি বন্ধে নীতিগত অবস্থান জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনকেও আরও কার্যকর করতে হবে। বিদ্যালয়ের সমস্যা যদি আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে তা নিরসনে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হঠাৎ পরিদর্শন, তাৎক্ষণিক ক্ষোভ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে টেকসই শিক্ষা সংস্কার হয় না।

শিক্ষা সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধৈর্যশীল এবং সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো চাই, যেখানে শিক্ষককে অন্ধভাবে ছাড় দেওয়া হবে না, আবার তাকে প্রকাশ্যে অপমানও করা হবে না। আমরা চাই, শিক্ষক তার দায়িত্ব পালন করবেন নিষ্ঠার সঙ্গে। প্রশাসন তার তদারকি করবে পেশাদারিত্বের সঙ্গে। আর শিক্ষার্থী দেখবে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা পরস্পরের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না। তারা আমাদের আচরণ থেকেও শেখে।

আজকের বাংলাদেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। নতুন পাঠক্রম, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষককে মর্যাদাহীন করে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা যাবে না। মানসম্মত শিক্ষা চাইলে প্রথমেই শিক্ষককে মানসিকভাবে নিরাপদ, সামাজিকভাবে সম্মানিত এবং পেশাগতভাবে সক্ষম করতে হবে। ভয় ও অপমানের পরিবেশে শিক্ষক সৃজনশীল হতে পারেন না। তিনি কেবল আত্মরক্ষামূলক হয়ে যান। জাতি গঠনের কাজটি নীরব, দীর্ঘ এবং কঠিন। এই কাজটি করেন শিক্ষকরা। প্রতিদিন, শ্রেণিকক্ষে, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে, অনেক সময় সামাজিক স্বীকৃতির অভাব নিয়েও। তাদের ভুল থাকতে পারে, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, জবাবদিহিও থাকতে হবে। কিন্তু তাদের মর্যাদা ভেঙে দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা সম্ভব নয়।

প্রশাসনিক দায়িত্ব মানে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়। এর অর্থ দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য, সংযম ও পরিপক্বতার পরিচয় দেওয়া। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা মানে কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। এটি শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি রক্ষা করা। কারণ যে সমাজ শিক্ষককে অসম্মান করতে শেখে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত জ্ঞান, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ, তিনটিকেই দুর্বল করে। দিনশেষে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব সামান্য। আমি শিক্ষাদানের উপযুক্ত পরিবেশ চাই। এমন পরিবেশ, যেখানে জবাবদিহি থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু মর্যাদাহানি থাকবে না। ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কিন্তু শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সামনে ছোট করার সংস্কৃতি থাকবে না। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়েই একটি শিক্ষিত, বিবেকবান ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি গঠন সম্ভব।


রামিসা থেকে আবদুল্লাহ: শিশু যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরবতার অবসান হোক

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৬ মে ২২ ২৩:২০:১৯
রামিসা থেকে আবদুল্লাহ: শিশু যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরবতার অবসান হোক

রামিসা, আছিয়া ও আবদুল্লাহ কেবল কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিশুর নাম নয়। তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারগুলোর সামনে এক ভয়াবহ নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সমাজে একটি শিশু তার নিজ ঘরে, প্রতিবেশে, বিদ্যালয়ে, মাদ্রাসায় কিংবা বিশ্বস্ত বলে বিবেচিত মানুষের হেফাজতেও নিরাপদ নয়, সেই সমাজ উন্নয়ন, নৈতিকতা কিংবা সভ্যতার দাবিতে আত্মতৃপ্ত থাকতে পারে না। শিশু যৌন নিপীড়ন এবং এর সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুর ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এগুলো আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহি এবং সামষ্টিক বিবেকের গভীর ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করে।

এই সংকটের মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং আরও ৪৬ জন ধর্ষণচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর অন্তত ১৭ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মধ্যে এসব তথ্য সামনে আসে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর রামিসার শোকাহত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটনাটির গুরুত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়েও প্রতিফলিত করেছে। তবে প্রকৃত পরীক্ষা হলো, এই উদ্বেগ ও সহমর্মিতাকে কত দ্রুত কার্যকর বিচার এবং টেকসই শিশু সুরক্ষা সংস্কারে রূপান্তর করা যায়। এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব, একটি বিপর্যস্ত পরিবার এবং বারবার পরীক্ষার মুখে পড়া বিচারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।

এ ধরনের বর্বর অপরাধের পর মানুষের ক্ষোভ ও কঠোরতম শাস্তির দাবি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমাজের নৈতিক ভিত্তিতেই আঘাত হানে। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কিংবা দলীয় সুবিধা আদায়ের উপকরণে পরিণত করা উচিত নয়। একটি শিশুর যন্ত্রণা কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অস্ত্র হতে পারে না। একইভাবে, অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণাও গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রেফতার কেবল সূচনা। রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই হবে তখনই, যখন তদন্ত পেশাদারভাবে সম্পন্ন হবে, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম এগোবে, ভুক্তভোগী পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশে শিশু যৌন নিপীড়ন নিয়ে কোনো সৎ আলোচনা করতে হলে একটি দীর্ঘদিনের অবহেলিত সত্যকে স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে: ছেলেশিশুরাও নিরাপদ নয়। কন্যাশিশুদের ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি যথার্থভাবেই জনআলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা আজও সামাজিক লজ্জা, নীরবতা এবং পুরুষত্ব সম্পর্কে বিকৃত ধারণার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। একটি ছেলেশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হলে সে কোনোভাবেই কম ক্ষতিগ্রস্ত, কম মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত কিংবা ন্যায়বিচারের কম দাবিদার হয়ে যায় না। তারপরও বহু ছেলেশিশু ভুক্তভোগী হিসেবে অদৃশ্য থেকে যায়, কারণ পরিবার সামাজিক অসম্মানের ভয় পায়, প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করে এবং সমাজ এখনো ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের বিষয়টি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতে অস্বস্তি বোধ করে।

মাদ্রাসা এবং অন্যান্য আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই নীরবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২১ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে মাদ্রাসায় অন্তত ৬২ জন ছেলেশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ৩ জন মারা গিয়েছিল। এসব তথ্যকে ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা দেশের সব মাদ্রাসাকে নির্বিচারে কলঙ্কিত করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। এসব ঘটনা এমন সব প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার পুনরাবৃত্ত ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে শিশুরা পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করতে পারে, শিক্ষক কিংবা জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে এবং নিপীড়নের কথা জানানোর জন্য নিরাপদ ও গোপন কোনো ব্যবস্থা নাও পেতে পারে।

ঢাকার বনশ্রীতে একটি মাদ্রাসার দশ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনা এই চাপা পড়ে থাকা সংকটকে আবারও জনপরিসরে নিয়ে এসেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আবদুল্লাহর মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় একজন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে আরও কয়েকজন শিশুকে ঘিরে অভিযোগের বিষয়ও পুলিশ জানিয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হতে হবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকা একটি শিশুর মৃত্যু এবং তার সঙ্গে এমন গুরুতর অভিযোগের উত্থানই তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানায়।

এখানে বিষয়টি দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার ন্যায্যতার সঙ্গেও বলা প্রয়োজন। মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে কথা বলা ইসলাম, ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। অসংখ্য মাদ্রাসা শিক্ষক আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে জবাবদিহি থেকে দায়মুক্তি দাবি করতে পারে না। ধর্মীয় আবেগকে অভিযোগ গোপন করা কিংবা শিশুদের নীরব রাখতে বাধ্য করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা চলতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে একটি শিশুর নিরাপত্তা সর্বদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংকটের আইনি দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ধর্ষণ-সংক্রান্ত প্রধান আইনি ধারণা মূলত নারী ভুক্তভোগীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ফলে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা ধর্ষণবিষয়ক কেন্দ্রীয় আইনগত কাঠামোর মধ্যে সমতুল্য স্বীকৃতি পায়নি। ২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এতে ছেলেশিশুর ওপর সংঘটিত নির্দিষ্ট যৌন সহিংসতাকে আইনি ভাষায় বলাৎকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় একটি অগ্রগতি, কারণ এর মাধ্যমে স্বীকার করা হয়েছে যে ছেলেশিশুরাও গুরুতর যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারে এবং তাদের জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।

তবে কাগজে আইনি স্বীকৃতি থাকাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে শিশু যৌন নিপীড়ন মোকাবিলায় বাস্তবায়নযোগ্য এবং সত্যিকার অর্থে Gender-inclusive একটি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ছেলেশিশুদের বিষয়ে দায়ের করা অভিযোগকেও কন্যাশিশুদের অভিযোগের মতোই গুরুত্ব, সংবেদনশীলতা এবং আইনি দৃঢ়তার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রসিকিউটর, বিচারক, শিক্ষক এবং মাদ্রাসা প্রশাসকদের এমন প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে সামাজিক অস্বস্তি কিংবা লজ্জার বিষয় হিসেবে ছোট করে না দেখেন। সমাজ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করে বলে কোনো শিশু বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যেতে পারে না।

একই সঙ্গে, ন্যায়বিচারকে আইনের বাইরে প্রতিশোধের সমার্থক করে তোলাও গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম অপরাধের পর তাৎক্ষণিক শাস্তির দাবি গভীর শোক ও ক্ষোভ থেকেই আসে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র তদন্ত, তথ্যপ্রমাণ এবং বিচার ছাড়াই কোনো অভিযুক্তকে শাস্তি দিতে পারে না। Due Process অপরাধীদের প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি আইনভিত্তিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি। তবে Due Process কখনোই অনন্ত বিলম্বের অজুহাত হতে পারে না। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারকে ধারাবাহিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয় এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। তাই রাষ্ট্রকে দ্রুত তদন্ত, যথাযথ আলামত সংরক্ষণ, সময়মতো বিচারিক কার্যক্রম, পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, সাক্ষীর সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে অগ্রাধিকারভিত্তিক শুনানি নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ এর শিকড় আমাদের সামাজিক নীরবতার মধ্যেও প্রোথিত। অপরাধীরা এমন পরিবেশে সুযোগ পায়, যেখানে কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা হয় না, শিশুদের ব্যক্তিগত সীমানা সম্পর্কে শেখানো হয় না এবং অনেক প্রতিষ্ঠান শিশুদের সুরক্ষার বদলে নিজেদের সুনাম রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকে। অনেক শিশু কথা বলে না, কারণ তারা ভয় পায় তাদের বিশ্বাস করা হবে না। অনেক পরিবার নীরব থাকে সামাজিক অসম্মানের আশঙ্কায়। অনেক প্রতিষ্ঠান ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না, কারণ তারা কেলেঙ্কারির ভয় পায়। এই নীরবতা নিরপেক্ষ নয়; এটি নিপীড়কদের টিকে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়।

তাই প্রতিটি মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, এতিমখানা, আবাসিক হোস্টেল, কোচিং সেন্টার, ক্রীড়া একাডেমি এবং ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে কার্যকর Child Safeguarding Policy বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর Child Protection Committee অথবা Sexual Harassment Prevention Cell, গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ পাঠানোর বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন, কারণ সেখানে শিশুরা পরিবার থেকে দূরে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল হয়। কোনো কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গোপন করলে কিংবা শিশুকে ভয় দেখালে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবারের দায়িত্বও কোনোভাবেই রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাবা-মাকে বুঝতে হবে, মেয়ে সন্তান যেমন যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারে, ছেলে সন্তানও ঠিক তেমনি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। সন্তানের হঠাৎ ভয় পাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা প্রকাশ করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে অস্বস্তি অনুভব করার লক্ষণগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে, তাদের শরীরের ওপর অধিকার তাদের নিজের এবং কারও অনুপযুক্ত আচরণের শিকার হলে তা বিশ্বস্ত অভিভাবককে জানাতে হবে। বাবা-মাকে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্তান জানবে যে সে কিছু জানালে তাকে দোষারোপ বা লজ্জিত করা হবে না; বরং তাকে সুরক্ষা দেওয়া হবে। সন্তানের নিরাপত্তার জন্য সতর্ক থাকা অসামাজিকতা নয়; এটি দায়িত্বশীল Parenting।

রামিসা, আছিয়া এবং আবদুল্লাহর জন্য ন্যায়বিচারের অর্থ কেবল অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো, নিপীড়নের শিকার ছেলেশিশুদের ঘিরে থাকা নীরবতা ভাঙা, মাদ্রাসাসহ শিশুদের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা, আইনি সুরক্ষার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং আরেকটি বিপর্যয় ঘটার আগেই সক্রিয় হতে পারে এমন একটি জাতীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি জাতির নৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় সেই জাতি তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে তার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। প্রশ্নটি এখন আর আমরা এসব ঘটনায় কতটা মর্মাহত, তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা সত্যিই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কি না।


কুরবানির চামড়া শিল্প: ন্যায্য মূল্য, বাজার কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন

শ‌হিদুল ইসলাম
শ‌হিদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
২০২৬ মে ১৮ ২০:২৮:০৭
কুরবানির চামড়া শিল্প: ন্যায্য মূল্য, বাজার কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন
লেখক : ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই/ ছবি : শ‌হিদুল ইসলাম

বাংলাদেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবিকা এবং ধর্মীয়-সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো কুরবানি ঈদের চামড়া শিল্প। প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় দেশের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৭০–৮০ শতাংশই সংগ্রহ হয় এই মৌসুমি ব্যবস্থার মাধ্যমে। এটি একদিকে ধর্মীয় দানের অংশ, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, এতিমখানা ও মাদ্রাসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তার উৎস।

তবে দীর্ঘদিন ধরে এই খাত কাঠামোগত দুর্বলতা, বাজার অস্থিরতা, সংরক্ষণ সংকট এবং নীতিগত সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয় এবং প্রান্তিক পর্যায়ের সংগ্রাহক ও সুবিধাভোগীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নীতিগত বিতর্ক

চামড়া শিল্পকে ঘিরে নীতিনির্ধারণ, মূল্য নির্ধারণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সময় ভিন্নমত ও বিতর্ক দেখা গেছে। এসবের অনেকগুলোই রাজনৈতিক আলোচনার অংশ, যার অধিকাংশই বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়। তবে এগুলো একটি বাস্তব বিষয়কে সামনে আনে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন।

একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য এই খাতে তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।

চামড়ার বৈশ্বিক গুরুত্ব ও শিল্প বাস্তবতা

প্রাকৃতিক চামড়া বিশ্বব্যাপী একটি উচ্চমূল্যের শিল্প উপকরণ। এটি টেকসই, দীর্ঘস্থায়ী এবং সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণে বহু বছর ব্যবহারযোগ্য। সময়ের সঙ্গে এটি আরও উন্নত গুণমান অর্জন করে।

অন্যদিকে কৃত্রিম চামড়া সাধারণত প্লাস্টিক-ভিত্তিক, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং স্বল্পস্থায়ী। এটি দ্রুত নষ্ট হয় এবং বারবার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে বেশি ব্যয়বহুল।

এই কারণে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক চামড়ার চাহিদা এখনো শক্তিশালী। বাংলাদেশ এই খাতে একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান শক্ত করতে পারে।

বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার অর্থনৈতিক বাস্তবতা

বাংলাদেশে মোট কাঁচা চামড়ার প্রধান উৎস কুরবানি মৌসুম। বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী—

মোট চামড়ার প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ আসে কুরবানির সময়

এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণ ও পরিবহন সমস্যায় নষ্ট হয়ে যায়

বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনও বেশ অস্থির—

২০০৫ সালে গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রায় ৩০০–৬০০ টাকা

২০২১–২২ সালে অনেক ক্ষেত্রে দাম ৫০০ টাকার নিচে নেমে যায়

২০২৪ সালে লবণযুক্ত চামড়া ১০০০–১৪০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬০–৬৫ টাকা এবং বাইরে ৫৫–৬০ টাকা দেখা যায়

ছাগলের চামড়া ২২–২৭ টাকা প্রতি বর্গফুটে ওঠানামা করছে

এই পরিবর্তনগুলো বাজারে স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতার অভাবকে স্পষ্ট করে।

অপচয় ও কাঠামোগত সংকট

চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্রুত সংগ্রহ, লবণায়ন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি। কুরবানির পর ৪–৬ ঘণ্টার মধ্যে চামড়া লবণায়ন না করলে গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

লবণের ঘাটতি, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া অপচয় হয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং কুরবানির সামাজিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমাধানের বাস্তব রূপরেখা

চামড়া শিল্পকে টেকসই ও লাভজনক করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ—

দ্রুত সংগ্রহ ও লবণায়ন ব্যবস্থা

কুরবানির ৪–৬ ঘণ্টার মধ্যে লবণায়ন নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করলে গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব।

লবণ ও উপকরণ পূর্বমজুদ

অ-আয়োডিনযুক্ত লবণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্থানীয় কেন্দ্রগুলোতে আগে থেকেই মজুদ রাখা উচিত।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন

ইমাম, কসাই, স্বেচ্ছাসেবক ও সংগ্রাহকদের জন্য পূর্বপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।

পরিবহন ও লজিস্টিক উন্নয়ন

রেলওয়ে, নৌপরিবহন ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়ে বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্প সুদের (১–৩ মাস) ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে তারা লবণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় সহজে সামাল দিতে পারবেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজন

চামড়া শিল্প উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি—

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন

হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি ইনস্টিটিউট

এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন খাত ও দাতব্য সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি কার্যকর সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

কুরবানির চামড়া মূলত দরিদ্র ও এতিমদের অধিকার হিসেবে বিবেচিত। তাই এর সঠিক ব্যবস্থাপনা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

স্বচ্ছ ও ন্যায্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সরাসরি উপকৃত হবে এবং কুরবানির প্রকৃত সামাজিক উদ্দেশ্য আরও অর্থবহ হবে।

কুরবানির চামড়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। কিন্তু দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনা ঘাটতির কারণে এর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

রাষ্ট্রীয় সমন্বয়, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই খাত জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ধর্মীয় দানের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আরও অর্থবহ করবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করবে।

লেখক : ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, গবেষক, লেখক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।


মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ডিজিটাল অসভ্যতা: গণতান্ত্রিক সংহতি রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৬ এপ্রিল ২৬ ১০:৫৭:০৯
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ডিজিটাল অসভ্যতা: গণতান্ত্রিক সংহতি রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে এই স্বাধীনতার চর্চা যখন অন্যের সম্মানহানি, সুসংগঠিত মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে যে কুরুচিপূর্ণ প্রোপাগান্ডা চলছে, তা সুস্থ সমাজ কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত। বিশেষ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে লক্ষ্য করে চালানো কুৎসিত ও কদর্য সাইবার আক্রমণগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক ও ডিজিটাল সংস্কৃতি এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত সংকটে নিমজ্জিত। বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত কুৎসা রটানো কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধ।

বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এই ধরণের অপপ্রচার কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয় বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত 'ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার' বা তথ্যযুদ্ধ। বর্তমানে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ডিসইনফরমেশন (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা) এবং মিস-ইনফরমেশন (ভুল তথ্য) এর এক বিশাল জাল বিছানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমান একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যারিস্টার এবং পেশাগত জীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা একজন নারী। অথচ তাকে লক্ষ্য করে বিকৃত ফটো কার্ড বা অশ্লীল পোস্ট তৈরি করে তা হাজার হাজার বট আইডির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বট আইডিগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দ্বারা পরিচালিত প্রোফাইল যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করে। প্রযুক্তি পরিভাষায় একে বলা হয় 'Coordinated Inauthentic Behavior' (CIB)। যখন কোনো গোষ্ঠী পর্দার আড়াল থেকে বা প্রকাশ্য সমর্থনের মাধ্যমে এই ধরণের নোংরামিকে উৎসাহিত করে, তখন তা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হেয় করে না বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধূলিসাৎ করে দেয়। অন্যদিক থেকে দেখলে, একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যারিস্টার কন্যা যখন সাইবার বুলিং এর শিকার হন তখন দেশের একজন সাধারণ নারী কতটা অসহায় সেটিও ফুটে ওঠে।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তারা বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল স্পেসে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও জাতীয় সংহতি রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির 'নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট' (NetzDG) একটি যুগান্তকারী উদাহরণ। এই আইন অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বাধ্য থাকে যেন তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) বা ভুয়া তথ্য সরিয়ে ফেলে। অমান্য করলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বিশাল অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' (DSA) ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর দায়বদ্ধতা আরোপ করেছে। সিঙ্গাপুরও তাদের 'POFMA' (Protection from Online Falsehoods and Manipulation Act) আইনের মাধ্যমে অনলাইনে মিথ্যে তথ্য প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোর অভাব স্পষ্ট যা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হবে না বরং প্রকৃত অপরাধী, গুজব রটনাকারী এবং পেইড সাইবার ট্রলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।

ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনেও এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার গভীর ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে অস্থিরতা বিরাজ করে তাকে বৈধতা দিতে অনেক সময় অনলাইনে পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করা হয়। একটি ছোট ঘটনাকে বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে কীভাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ফটো কার্ড এবং এডিট করা অডিও ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্তে চরমপন্থা ও অসহিষ্ণুতা দানা বাঁধছে। যারা এসব অপপ্রচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে তারা মূলত তরুণদের মগজ ধোলাই করে সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে বিভক্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।

এই সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ এখন রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে সাইবার স্পেসে 'ফেইক নিউজ ফ্যাক্টরি' পরিচালনা করতে বেশি আগ্রহী। এরা পেশাদার গ্রাফিক ডিজাইনার এবং কন্টেন্ট রাইটার নিয়োগ করে প্রতিপক্ষ নেতার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি করে। তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে যে ধরণের ফটো কার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় তা কোনো সাধারণ নাগরিকের কাজ হতে পারে না। এগুলো স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডা মেশিনের ফসল। যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি এই ধরণের অসভ্যতাকে তাদের অঘোষিত কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে তখন সাধারণ কর্মীরা একে তাদের দলীয় কর্তব্য মনে করতে শুরু করে। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম পতন যা সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষাবাদ করছে।

এমতাবস্থায় প্রোপাগান্ডা, ভুয়া তথ্য প্রচার, সাইবার বুলিং ও সংগঠিত অনলাইন হয়রানির বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা অপব্যাখ্যার সুযোগ না থাকে। অনলাইন স্পেসে সংঘটিত অপরাধকে "ভার্চুয়াল" বলে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই; এর সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাস্তব এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত বট আইডি ও সমন্বিত অপপ্রচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে সেগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে এবং যারা এসব পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কেবল আইনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না বরং ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনগুলো যেন কেবল মুক্তচিন্তা বা সরকারের সমালোচনাকারীদের মুখ বন্ধ করতে ব্যবহৃত না হয়। বরং এর প্রয়োগ হতে হবে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে যারা বট আইডি ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়, নারীদের সাইবার বুলিং করে এবং উস্কানিমূলক মিথ্যা তথ্য প্রচার করে। বট নেটওয়ার্ক এবং সমন্বিত অপপ্রচার শনাক্ত করতে দেশের সাইবার ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর স্থানীয় অফিস বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে।

পরিশেষে গণতন্ত্রের নামে অসভ্যতা বা অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সমালোচনা অবশ্যই গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল এবং শিষ্টাচারসম্মত। ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতির ময়দানে টেনে এনে কদর্য আক্রমণ করা কোনোভাবেই বীরত্ব নয় বরং তা রাজনৈতিক ও নৈতিক হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ। ডিজিটাল স্পেস আজ আমাদের বাস্তব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই এখানে যদি শৃঙ্খলা না থাকে তবে তার প্রভাব সরাসরি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় পড়বে। একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা কি যুক্তি, তথ্য ও সম্মানের সংস্কৃতিতে ফিরব নাকি ডিজিটাল অসভ্যতা ও প্রোপাগান্ডার অন্ধকারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিলীন করে দেব। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো সত্য বলার সাহস রাখা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। মিথ্যার বেসাতি করে অন্যের চরিত্রহনন করা নয়। এই সত্যটি অনুধাবন করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ ও সচেতন নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব।


নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের দূরদর্শী পরিকল্পনা!

শ‌হিদুল ইসলাম
শ‌হিদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
২০২৬ এপ্রিল ১৮ ১৮:১৬:৩৭
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের দূরদর্শী পরিকল্পনা!
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন/ ছবি : শ‌হিদুল ইসলাম

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক দৃশ্যমান গতিপথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্জন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—আমরা একটি ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করি। তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কি বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত?

আধুনিক প্রকৌশল বিশ্লেষণ বলছে, সঠিকভাবে পরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকম্পে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। কারণ এগুলো মাটির স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নড়ে, ফলে উঁচু ভবনের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কম থাকে। উন্নত বিশ্বে নির্মিত আধুনিক বাঙ্কারগুলোতে শক-অ্যাবজরবিং ডিজাইন, শক্তিশালী রিইনফোর্সড কাঠামো, নিরাপদ বায়ুচলাচল, বিকল্প বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে। এগুলো কেবল আশ্রয়স্থল নয়, বরং সংকটকালে কার্যকর কমান্ড সেন্টার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সঙ্গে নিরাপদ টানেল সংযুক্ত থাকার নজির রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তর, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য। ইতিহাস থেকেও দেখা যায়, রাজা-সম্রাটদের সময়েও গোপন সুরঙ্গ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল—যা আধুনিক যুগে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বঙ্গভবন, জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপনা নয়—এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। একটি বড় দুর্যোগে যদি একসঙ্গে বহু নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তা কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এক্ষেত্রে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হতে পারে—কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সঙ্গে আধুনিক ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ। এসব অবকাঠামো এমনভাবে ডিজাইন করা যেতে পারে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। বিকল্প প্রবেশ ও নির্গমন পথ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা—বিশেষ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি—অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য উন্নত জলরোধী প্রযুক্তি, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাম্পিং সিস্টেম এবং বন্যা-সহনশীল নকশা অপরিহার্য। পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি প্রকৌশল দক্ষতার একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে এটি কেবল একটি ধারণা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।

সমাজের কিছু অংশ হয়তো এই ধারণাকে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরঞ্জিত মনে করতে পারে। তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব যে প্রজন্মের হাতে, তারা একটি উন্নত ও নিরাপদ বাংলাদেশ চায়। দূরদর্শী নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো ভবিষ্যতের প্রয়োজন আজই উপলব্ধি করা এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া।

এই উদ্যোগ কোনো পালানোর পথ নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে টিকে থাকার প্রস্তুতি। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সময়ের প্রয়োজনে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে—যা প্রমাণ করে এটি একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর ধারণা।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে নিরাপত্তা অবকাঠামোতেও একই দূরদর্শিতা প্রদর্শনের। এটি কেবল বর্তমানের জন্য নয়—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের বিনিয়োগ।উন্নয়নের পাশাপাশি সুরক্ষা—এই ভারসাম্যই হতে পারে টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের মূল ভিত্তি। এখন প্রশ্ন একটাই: বাংলাদেশ কি সেই দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত?

ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিইআন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক,লেখক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক,চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।


জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ লাইন ভাঙার ডিজিটাল সমাধান—একটি স্মার্ট নীতিমালার প্রস্তাব

শ‌হিদুল ইসলাম
শ‌হিদুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
২০২৬ এপ্রিল ০৪ ১৯:০৬:৫৩
জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ লাইন ভাঙার ডিজিটাল সমাধান—একটি স্মার্ট নীতিমালার প্রস্তাব
ছবি : সংগৃহীত

বি‌শিষ্ট লেখক: ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি—পেট্রোল ও অকটেন সংকট, যা শুধু অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও কঠিন করে তুলছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা। মিরপুর থেকে একটি গাড়ি তেল নিয়ে আবার সেগুনবাগিচায় গিয়ে পুনরায় লাইনে দাঁড়াচ্ছে—এ যেন এক অপ্রতিরোধ্য বিশৃঙ্খলা। এই অতিরিক্ত মজুত প্রবণতাই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তবসম্মত সমাধান। প্রস্তাব করা হচ্ছে—একটি জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়াতে সক্ষম।

সমস্যার মূল চিত্র

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক গাড়ি একদিনে একাধিক পাম্প থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মিরপুর থেকে ২০ লিটার তেল নেওয়ার পর একই গাড়ি সেগুনবাগিচা গিয়ে আবার তেল নিচ্ছে। এই পুনরাবৃত্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকদের বঞ্চিত করছে।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল সমাধান

এই সংকট নিরসনে একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যা Bangladesh Road Transport Authority-এর ডাটাবেসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এই সিস্টেমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হতে পারে:

• প্রতিটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী জ্বালানি ক্রয়ের তথ্য রেকর্ড হবে।

• একটি গাড়ি দিনে একবারের বেশি জ্বালানি কিনতে পারবে না।

• একবার তেল কেনার পর সেদিন দেশের অন্য কোনো পাম্প থেকে পুনরায় জ্বালানি নেওয়া যাবে না।

• পাম্পগুলোতে রিয়েল-টাইম যাচাইকরণ ব্যবস্থা থাকবে, যাতে প্রতারণা বা পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়।

শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শুধুমাত্র সেইসব গাড়িকেই জ্বালানি দেওয়া হবে, যাদের কাগজপত্র সম্পূর্ণ হালনাগাদ। যেমন:

• ফিটনেস সার্টিফিকেট

• ট্যাক্স টোকেন

• রেজিস্ট্রেশন আপডেট

যেসব গাড়ির কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, তারা এই সুবিধা পাবে না। ফলে মালিকরা বাধ্য হবেন নিয়ম মেনে চলতে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াবে।

অর্থনৈতিক সুফল

এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবে

1. রাজস্ব বৃদ্ধি: ট্যাক্স ও ফিটনেস নবায়ন বাড়বে।

2. জ্বালানির সুষম বণ্টন: অতিরিক্ত মজুত কমবে।

3. কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ: অবৈধ বিক্রয় হ্রাস পাবে।

4. সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়: দীর্ঘ লাইনের অবসান ঘটবে।

সামাজিক প্রভাব

এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। মানুষ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে না। কর্মজীবী মানুষ, জরুরি সেবা প্রদানকারী এবং সাধারণ নাগরিক সবাই উপকৃত হবে।

বাস্তবায়নের পথ

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি Bangladesh Road Transport Authority, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং আইটি বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে সারা দেশে এটি চালু করা যেতে পারে।

উপসংহার

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একটি সাময়িক সমস্যা, কিন্তু এর সমাধান হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই। একটি স্মার্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে আমরা শুধু এই সংকট মোকাবিলা করতেই পারি না, বরং একটি আধুনিক, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং রাজস্বসমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারি।

সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব—এখন প্রয়োজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।


আমরা কি আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি?

মো. আরিফুজ্জামান
মো. আরিফুজ্জামান
সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পিরোজপুর
২০২৬ মার্চ ১০ ২২:০১:১৩
আমরা কি আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি?

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের সামনে একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। “সবার আগে বাংলাদেশ” এই স্লোগানকে সামনে রেখে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের অভিজ্ঞতার পর জনগণের বড় একটি অংশ এখন একটি পুনর্গঠিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সরকারের কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি মৌলিক খাত: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতির শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে সেই জাতির মেরুদণ্ড কার্যত ভেঙে পড়ে। তখন তৈরি হয় মেধাহীন প্রজন্ম এবং দুর্বল মানবসম্পদ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে বহু শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।

এই বাস্তবতা থেকেই রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব হিসেবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখায় শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২৪ নম্বর দফায় শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এখানে দুটি ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা। আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমাজ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে এই দুটি ধারণার সমন্বয় অপরিহার্য। প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। এটি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে এবং বেকারত্ব কমাতে সহায়তা করে। অন্যদিকে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা নাগরিকদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং যুক্তিবাদী মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এই দুই ধরনের শিক্ষার সমন্বয় অপরিহার্য। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করে। একই সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং সমাজে উৎপাদনশীল কর্মশক্তি তৈরি করে। ফলে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্র গঠনের প্রধান ভিত্তি।

৩১ দফার শিক্ষা রূপরেখায় আরও বলা হয়েছে যে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা হবে। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ক্রীড়া উন্নয়ন, জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধের কথাও বলা হয়েছে।

এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি মৌলিক পরিবর্তনের পথে যেতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে একটি দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনক্ষম সমাজ।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক সমাজের মধ্যে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি একজন সম্ভাবনাময় ও সক্রিয় শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন অভিজ্ঞ ও সক্ষম ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, শিক্ষা সংস্কার একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা এই খাতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নে যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সমাধান গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু উদ্বেগও সামনে আসছে, যা উপেক্ষা করা যায় না।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের অধীন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে সরকারঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বসেছেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক দখলদারত্ব তৈরি হয়েছে। এর ফলাফল ছিল শিক্ষা খাতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণ এবং ব্যাপক দুর্নীতি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এসব পদে না থাকার একটি নীতিগত অবস্থানও নেওয়া হয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তকে দেশের শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের বড় একটি অংশ স্বাগত জানিয়েছিল। কারণ এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। একই সঙ্গে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়াও চালু করা হয়েছিল, যা স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যদি এই ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এখানেই প্রশ্নটি সামনে আসে: আমরা কি আবার সেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি?

রাষ্ট্র মেরামতের যে অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তবে সেই সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রীর প্রতি শিক্ষক সমাজের আস্থা রয়েছে। তাই আশা করা যায়, শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নে তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না যা শিক্ষা খাতকে আবার রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে ঠেলে দেয়। বরং প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা অপরিহার্য। কারণ শিক্ষা কেবল একটি প্রশাসনিক খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল ভিত্তি।

তাই আজকের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: আমরা কি সত্যিই একটি নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যাচ্ছি, নাকি অজান্তেই আবার সেই পুরনো ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাচ্ছি?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।


ইরান যুদ্ধ, পরিচয়ের রাজনীতি এবং বৈশ্বিক সংকটের নতুন সমীকরণ

মো. অহিদুজ্জামান
মো. অহিদুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
২০২৬ মার্চ ০৩ ১৪:১৬:১৪
ইরান যুদ্ধ, পরিচয়ের রাজনীতি এবং বৈশ্বিক সংকটের নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেবল সামরিক পরিভাষায় ব্যাখ্যা করলে তার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ধরা পড়ে না। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার সংঘর্ষ নয়; বরং পরিচয়, আদর্শ, ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের লড়াই। ইরানকে বোঝার জন্য তাই তার সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার রাষ্ট্রচেতনা, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আদর্শিক কাঠামো। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গভীর প্রশ্ন: ইরান নিজেকে কীভাবে দেখে, এবং বিশ্ব তাকে কীভাবে দেখতে চায়।

ইরানিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আইডেন্টিটি। রাষ্ট্রের ভেতরে রয়েছে বহু জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য—পার্সিয়ান, আজারি, কুর্দি, বালুচি, আরবসহ নানা সম্প্রদায়। শিয়া মুসলিম সমাজের মধ্যেও রয়েছে মতাদর্শিক ভিন্নতা। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে যে পরিচয়টি সবার আগে সামনে আসে, তা হলো পারস্য সভ্যতার ধারাবাহিকতা। এই পরিচয় আধুনিক জাতীয়তাবাদের চেয়েও গভীর; এটি হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যিক অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার।

ইরানের জাতীয় চেতনায় পরাজয়ের স্মৃতির চেয়ে প্রতিরোধ ও পুনরুত্থানের বয়ান অধিক প্রভাবশালী। আরব বিজয়, মঙ্গোল আক্রমণ, ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—প্রতিটি অধ্যায় তারা টিকে থাকার সংগ্রাম হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো বর্তমান সংঘাতে তাদের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করছে। ফলে বাইরের চাপ যত বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ সংহতিও তত শক্তিশালী হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন। হযরত আলী রাঃ, ইমাম হাসান রাঃ ও ইমাম হোসেন রাঃ-এর আদর্শ তাদের নৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক চেতনাকে প্রভাবিত করে। কারবালার ঘটনা তাদের কাছে কেবল ইতিহাস নয়; এটি ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতীক। শাহাদাত এখানে কেবল ধর্মীয় ধারণা নয়, বরং জাতি ও বিশ্বাস রক্ষার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের চূড়ান্ত রূপ।

এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-কে ঘিরে আবেগ ও রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর শাহাদাত নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা অনেকের মতে জাতিকে আরও আবেগপ্রবণ ও সংঘবদ্ধ করেছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জীবিত নেতৃত্বের চেয়ে শহীদের বয়ান দীর্ঘমেয়াদে অধিক শক্তিশালী সামাজিক সমাবেশ ঘটায়। ইরানে এই প্রতীকী রাজনীতি রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধকে নৈতিক বৈধতা দিচ্ছে।

বর্তমান সংঘাতে ইরান এমন দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে অথবা যারা Abraham Accords-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এর মাধ্যমে তেহরানের কৌশলগত বার্তা স্পষ্ট: তারা এই সংঘাতকে সীমিত আঞ্চলিক বিরোধ নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে।

ইরানের ধারণা, হারানোর চেয়ে প্রমাণ করার বিষয় এখানে বড়। তাদের কৌশল “ডিটারেন্স বাই পানিশমেন্ট”—অর্থাৎ প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে যুদ্ধের ব্যথা অনুভব করানো। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাপের মুখে পড়বে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থাপত্য পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি হবে। এই কৌশল সরাসরি সামরিক বিজয়ের চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে এখনো কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এই অস্ত্রভাণ্ডারের একটি বড় অংশ ভূগর্ভস্থ টানেল, পাহাড়ি স্থাপনা ও সুরক্ষিত ঘাঁটিতে সংরক্ষিত। বহু বছর ধরে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিয়ে তারা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।

শুধুমাত্র এয়ার স্ট্রাইক দিয়ে এই সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন। স্থলাভিযান ছাড়া সিদ্ধান্তমূলক ফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু ইরানের পর্বতময় ভূখণ্ড, বিস্তৃত এলাকা ও সুসংগঠিত সামরিক প্রস্তুতি বিবেচনায় এমন অভিযান যে কোনো শক্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ফলে সরাসরি স্থল অভিযান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হবে।

এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকান প্রভাব ও নিরাপত্তা স্থাপত্য গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে আরব দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু যদি সেই ঘাঁটিগুলোই আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে নিরাপত্তা কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এর ফলশ্রুতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার রাজনৈতিক ঝুঁকিকে দ্রুত মূল্যায়ন করে। অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগ হ্রাস, মুদ্রা চাপে পতন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে এমন সম্ভাবনা কম, কিন্তু তারা কৌশলগতভাবে ইরানকে সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে চাপে রাখা তাদের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। জ্বালানি বাণিজ্য, সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে তারা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। ফলে ইরানে পশ্চিমাপন্থী রেজিম পরিবর্তন সহজ হবে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের সম্ভাবনাই বেশি।

এই সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল সংকট ও ঋণচাপের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও স্বল্পোন্নত অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, বাজেট ঘাটতি বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করবে। সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য তার পরিচয়, আদর্শ ও কৌশলগত হিসাবকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এটি কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; বরং শক্তির কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মুহূর্ত। ইরান তার পারস্য পরিচয় ও শিয়া আদর্শকে অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিরাপত্তা ও প্রভাবের প্রশ্নে অবস্থান নিয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলো কৌশলগত সুযোগ খুঁজছে।

পরিস্থিতি জটিল ও অনিশ্চিত। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, অস্ত্র দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, কিন্তু পরিচয় ও আদর্শকে দমন করা যায় না।

আমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করি। কারণ এই সংঘাত কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে অস্থিরতা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন।

পাঠকের মতামত: