পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যা বললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। সোমবার (১৬ জুন) ইরানের পার্লামেন্টে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর শঙ্কা দূর করার পাশাপাশি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও তুলে ধরেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা পরমাণু বোমা চাই না, এটি আমাদের লক্ষ্য নয়। যারা এমনটা মনে করছে, তারা আসলে বাস্তবতা বুঝতে পারছে না।” তিনি আরও বলেন, “শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার ইরানের বৈধ অধিকার, এবং এই প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখা হবে।”
পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগের জবাবে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, “আমরা আগ্রাসী কোনো রাষ্ট্র নই। বরং, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পেতে আগ্রহী। তবে আমাদের বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তার অধিকার আমরা ছাড়বো না।”
প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা এবং গুপ্তহত্যার বিষয়েও সরব হন। তিনি বলেন, “যারা ভাবে হত্যা বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইরানকে দমিয়ে রাখা যাবে, তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। একজন শহীদের পতাকা বহন করতে শত শত সাহসী মানুষ প্রস্তুত থাকে। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নোয়াবো না।”
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বিশ্ববাসীকে এক ধরনের বার্তা দিয়েছেন যে ইরান পারমাণবিক শক্তিকে ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে নয়, বরং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করতে চায়।
উল্লেখ্য, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে এই সন্দেহে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে। ইরান বরাবরই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
-রাফসান, নিজস্ব প্রতিবেদক
খামেনির জানাজার মাঠে ‘কিল ট্রাম্প’ স্লোগান, তেহরানে প্রতিশোধের আগুনে উত্তপ্ত লাখো জনতা
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় এবার সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার স্লোগান উঠেছে। রোববার (৫ জুলাই) তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে খামেনির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত হাজারো জনতা এই চরম প্রতিশোধের আহ্বান জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর, যুদ্ধের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন দাফন প্রক্রিয়া থমকে ছিল। বর্তমানে ইরানজুড়ে তাঁর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত এই বিশাল জানাজা কেবল শোকের আবহে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মার্কিন ও ইসরাইল বিরোধী তীব্র প্রতিশোধের আবেগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আগের রাত থেকেই মসজিদ চত্বরে অবস্থান নেন। শোকগ্রস্ত জনতা এ সময় ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘লাল পতাকা’ হাতে নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই জানাজা পড়ান কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ ও শীর্ষ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। খামেনির মরদেহের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যের জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিলেন খামেনির পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি। বিমান হামলায় নিহত নিষ্পাপ শিশুটির ছোট কফিনটি দেখে জানাজায় উপস্থিত আপামর জনতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর ঠিক আগে ইরানের প্রখ্যাত কবি মোহাম্মদ রাসুলি একটি শোক ও প্রতিবাদী কবিতা পাঠ করেন। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, “এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের একমাত্র পোশাক। হে নেতা, আপনার পবিত্র রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, আমরা কেন তাকে দায়ী করে খতম করব না? এটা না করা আমাদের জন্য চিরকালের কলঙ্ক।”
তাঁর এই ওয়ান-লাইন বক্তব্যের পর উপস্থিত লাখো জনতা তুমুল করতালি ও গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। এ প্রসঙ্গে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ) সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “জনগণ এখন মূলত দুটি স্পষ্ট স্লোগান দিচ্ছেন—প্রথমটি শত্রুদের বিরুদ্ধে অবিচল প্রতিরোধ এবং দ্বিতীয়টি শহীদ নেতার রক্তের চূড়ান্ত প্রতিশোধ।”
পিতার মৃত্যুর পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত মোজতবা খামেনিকে অবশ্য এই জানাজায় প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে তাঁর বাকি তিন ভাই—মুস্তফা, মাসুদ ও মেসাম জানাজায় সামনের কাতারে উপস্থিত ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, ফেব্রুয়ারি মাসের ওই বিমান হামলার সময় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন, তবে বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত এবং তাঁর স্থায়ী কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি। জানাজায় আরও শরিক হন কুদস ফোর্সের প্রধান কমান্ডার জেনারেল ইসমাইল কানি, আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদিসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও বিপ্লবী গার্ডসের সামরিক কর্মকর্তারা।
প্রায় ৩০ হাজার ধারণক্ষমতার মোসাল্লা চত্বরটি ভোর হওয়ার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অনেক ইরানি নাগরিক নিজেদের শরীরজুড়ে সাদা কাফনের কাপড় জড়িয়ে সেখানে অংশ নেন। চারদিক থেকে তখন মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছিল—‘কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, শুধু প্রতিশোধ’। জানাজার মাঠের কিছু অংশে ইংরেজিতে ‘কিল ট্রাম্প’ (Kill Trump) লেখা প্ল্যাকার্ড ও বার্তাও প্রদর্শন করা হয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া তেহরানের বাসিন্দা লায়লা আহমাদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নেতার রক্তের বদলা নিতে প্রয়োজনে আমরা লাঠি-কোদাল নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ব।” হোসেন দেহঘান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে সন্ত্রাসী কায়দায় আকাশপথে হত্যা করার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে। কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক জানাজার পর আজ সোমবার (৬ জুলাই) তেহরানের প্রধান প্রধান রাজপথে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় শোকমিছিল বের করা হবে। এরপর আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ পর্যায়ক্রমে ইরানের ধর্মীয় শহর কোম, তারপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে সর্বশেষ তাঁর জন্মস্থান মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল জানাজা ও ট্রাম্পকে টার্গেট করে দেওয়া স্লোগান মূলত বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে ইরানের অভ্যন্তরীণ ইস্পাত-কঠিন ঐক্য এবং মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধের শক্তির এক প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এক আঘাতেই খতম করার ট্রাম্পের হুমকির জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতা নিয়ে খোঁচা দিল ইরান
ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় সমবেত ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে ‘এক আঘাতেই খতম’ করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া চরম উসকানিমূলক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের জবাবে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র পেশিশক্তি দিয়ে মানুষ হত্যা করতে পারলেও মানুষের ভেতরের ‘আদর্শকে’ কখনো মুছে ফেলতে পারে না। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দীনতাকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করে ইরান সাফ জানিয়েছে, দেশটির কোনো প্রাচীন ‘সভ্যতা’, ‘ইতিহাস’ কিংবা ‘সম্মান’ বলতে কিছুই নেই।
সম্প্রতি মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপচে পড়া স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নিয়ে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন। ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন, “আমি ভেবেছিলাম ইরানের সাধারণ মানুষ খামেনিকে তীব্র ঘৃণা করে। জানাজায় হয়তো এগুলো তাদের সাজানো বা ভুয়ো কান্না।”
এর পরপরই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, শোক প্রকাশ করতে এক মাঠে জড়ো হওয়া ইরানের পুরো শীর্ষ নেতৃত্বকে এক আঘাতেই চিরতরে নির্মূল করার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “তারা সবাই (ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব) সেখানে এক মাঠে উপস্থিত আছে। মাত্র একটি আঘাতেই আমরা তাদের সবাইকে খতম করে দিতে পারি। তবে আমরা এই মুহূর্তে তা করব না, কারণ তাহলে আমাদের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করার মতো ওপারে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”
ট্রাম্পের এমন চরম উসকানিমূলক ও যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের জবাবে আর্মেনিয়াস্থ ইরানি দূতাবাস তাদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হানে। গত ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ঐতিহাসিক প্রসঙ্গটি টেনে ট্রাম্প এবং সামগ্রিক মার্কিন প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে দূতাবাসটি লেখে, “মানুষকে হয়তো শারীরিকভাবে হত্যা করা যায়, কিন্তু মানুষের চিন্তাধারা ও আদর্শকে নয়।
আপনারা হয়তো কাপুরুষের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন, কিন্তু বাস্তবে আপনারা মূলত একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙে ফেলেছেন, যার শাহাদাতের সুবাস এখন বিশ্বজুড়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।” মার্কিন সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে ওই পোস্টে আরও বলা হয়, “আপনারা এই গভীর রাজনৈতিক ও আত্মিক দর্শন কখনো বুঝবেন না, কারণ আপনাদের নিজস্ব কোনো দীর্ঘ সভ্যতা, সমৃদ্ধ ইতিহাস কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মান—কোনোটিই নেই।”
উল্লেখ্য, চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ নির্মমভাবে নিহত হন ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণ ও নিরাপত্তার কারণে বেশ কিছুদিন বিলম্বের পর অবশেষে তেহরানের ঐতিহাসিক মোসাল্লা প্রাঙ্গণে কয়েক দিনব্যাপী বিশাল রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শোকসভার আয়োজন করা হয়। যেখানে খামেনির ঘোষিত উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি ব্যতীত তাঁর বাকি তিন ছেলে এবং ইরানের বর্তমান শীর্ষ রাজনৈতিক ও বিপ্লবী গার্ডসের (আইআরজিসি) সামরিক নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে তেহরানের মোসাল্লা চত্বরে খামেনির মরদেহ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মানে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ ইরানি নাগরিক এবং বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হচ্ছেন। তেহরান, কোম, নাজাফ এবং কারবালা শরিফে সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক শোক শোভাযাত্রা শেষে আগামী ৯ জুলাই আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি।
খামেনির শোক র্যালিতে জনসমুদ্র, প্রতিশোধের লাল পতাকায় মুখর তেহরান
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষের সমাগম ঘটেছে। সোমবার (৬ জুলাই) স্থানীয় সময় সকাল থেকেই শুরু হওয়া শোক র্যালিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢলে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এটি আধুনিক ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোক আয়োজনগুলোর একটি।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৬টায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক র্যালি শুরু হয়। এর আগে দুই দিন ধরে একই স্থানে সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হয়েছিল। ভোর থেকেই নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, শোক র্যালিটি প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী চলবে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই শোকযাত্রা দামাভান্দ স্ট্রিট, ইমাম হুসেন স্কয়ার, ইনকিলাব স্ট্রিট, আজাদি স্ট্রিট, আজাদি স্কয়ার এবং মেহরাবাদ বিমানবন্দরের নিকটবর্তী শহীদ লাশগরি হাইওয়ে অতিক্রম করবে। পুরো পথজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রোববার অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে ইমামতি করেন ইরানের অন্যতম শীর্ষ শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী। ওই জানাজায় খামেনির পাশাপাশি তার জামাতা ড. মেসবাহ-উল-হোদা বাঘেরি-কানি, কন্যা জাহরা হাদ্দাদ-আদেল, ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী-গোলপায়েগানি এবং সাইয়েদেহ বুশরা হোসেইনির জন্যও দোয়া করা হয়।
খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ইরানি সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, তাজিকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এছাড়া একাধিক দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল তেহরানে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার ইরানের পবিত্র নগরী কোমে আরেকটি জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বুধবার মরদেহ ইরাকে নেওয়া হবে। সেখানে নজফে ইমাম আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার এবং কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র মাজারে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
এরপর খামেনির ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী ৯ জুলাই তাকে মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। দাফনের পর দেশজুড়ে স্মরণসভা, শোকানুষ্ঠান এবং ধর্মীয় কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষ বিদায় উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়, বরং ইরানের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও কূটনৈতিক অবস্থানও নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
‘আমেরিকাই একমাত্র নয়, ভারতের মতো বড় বন্ধু আছে’-ভ্যান্সকে জবাব নেতানিয়াহুর
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের আর কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় মিত্র নেই—মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের এমন মন্তব্যের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বিমত পোষণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার, তবে ভারতসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ দীর্ঘদিন ধরে তেল আবিবকে কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে।
রোববার (৫ জুলাই) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল একা নয়। আমেরিকার পাশাপাশি এমন অনেক দেশ রয়েছে, যারা বিভিন্ন ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
ভারতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ভারত নামের একটি ছোট দেশ আছে, যেখানে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ বাস করে। সেখানে আমরা যে পরিমাণ সমর্থন পাই, তা অনেকের কল্পনারও বাইরে।” ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, নয়াদিল্লি বহু বছর ধরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেল আবিবের পাশে রয়েছে।
গাজা, ইরান ও লেবাননকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন ইসরায়েল কঠোর সমালোচনার মুখে, ঠিক সেই সময় ভারতের সমর্থনের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনেন নেতানিয়াহু। তার ভাষায়, বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন নেতৃত্ব সম্পর্কেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্মান করেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে ইসরায়েলের দেখা “সবচেয়ে বড় বন্ধু” বলেও উল্লেখ করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সম্মান থাকলেও সব বিষয়ে ভ্যান্সের সঙ্গে তার মতের মিল নেই।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স মন্তব্য করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা বাস্তবায়নের সময় ইসরায়েলের উচিত হবে না তাদের “একমাত্র শক্তিশালী মিত্র” যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধে জড়ানো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই মন্তব্যেরই পরোক্ষ জবাব।
নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পান। তার অভিযোগ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী এবং ইহুদিবিরোধী প্রচারণা বাড়লেও বাস্তবে বহু দেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা নিয়মিত ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা ও কৌশল সম্পর্কেও আগ্রহ প্রকাশ করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ লেবানন ইস্যুও উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পরও সেখানে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, সীমান্তবর্তী কিছু খ্রিস্টান সম্প্রদায় নিরাপত্তার স্বার্থে ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সেনারা সেখানে অবস্থান করছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে লেবাননের স্থানীয় প্রতিনিধিরা এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের পেছনে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয় এবং এ ধরনের দাবি সত্য নয়।
-রফিক
তাপপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু, এবার ঝড়-বন্যার নতুন শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছেই। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অতিরিক্ত গরমে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পূর্ব উপকূল, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষ তাপপ্রবাহজনিত সতর্কতার আওতায় রয়েছেন। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে প্রবল ঝড়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা।
মার্কিন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিউইয়র্ক সিটিতেই তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতায় ৩৭৮ জনের বেশি মানুষ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত গরমে অবস্থান, পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকের কারণে হাসপাতালে রোগীর চাপ দ্রুত বেড়েছে।
এবারের ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৮টি এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, বাল্টিমোর, র্যালি, নরফোক এবং আটলান্টিক সিটিসহ বহু শহরে তীব্র গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছেন।
রোববার (৫ জুলাই) ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন, বাল্টিমোর, র্যালি, চার্লসটন ও জ্যাকসনভিলে অনুভূত তাপমাত্রা ১০০ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, সপ্তাহের শেষদিকে পূর্বাঞ্চলে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে, তবে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
অন্যদিকে অ্যারিজোনা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) থেকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পর্যন্ত চরম তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফিনিক্স ও টুসন শহরে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১১৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া বিভাগ।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে নিউ জার্সিতে। অঙ্গরাজ্যটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১০টি কাউন্টিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মিসিসিপির হাইন্ডস কাউন্টিতে দুইজন এবং ইলিনয়ের কুক কাউন্টিতে একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
চরম গরমের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী বজ্রঝড়। এর ফলে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যে মিশিগানে ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি, পেনসিলভানিয়ায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার এবং নিউ জার্সিতে ৯৪ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছেন।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য বলছে, শনিবার মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে ৫৪০টিরও বেশি ক্ষতিকর দমকা হাওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ওকলাহোমার নরম্যানে ঘণ্টায় ৯২ মাইল এবং নিউইয়র্কের সাফোক কাউন্টিতে ঘণ্টায় ৮৭ মাইল বেগে ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হয়েছে, যা বহু এলাকায় গাছপালা উপড়ে ফেলে এবং অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে।
রোববারও প্লেইনস, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও মধ্য-আটলান্টিক অঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ঝড়ের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন, বাল্টিমোর ও আর্লিংটন এলাকায় ঘণ্টায় ৭০ মাইলের বেশি গতির ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত এবং বড় আকারের শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, টর্নেডোর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও ধীরগতির বজ্রঝড়ের কারণে ডেলাওয়্যার থেকে কানেকটিকাট পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বন্যা সতর্কতার আওতায় রয়েছেন। নিউইয়র্ক সিটি জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগ বাসিন্দাদের সোমবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। শহরের কিছু এলাকায় ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত এবং প্রতি ঘণ্টায় ২ ইঞ্চি হারে বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্ক ও হার্টফোর্ডসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে মোট ২ থেকে ৮ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে নগর এলাকায় আকস্মিক জলাবদ্ধতা, ফ্ল্যাশ ফ্লাড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
-রফিক
খামেনির জানাজায় জনস্রোত, তেহরানের বার্তা কী?
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির জানাজাকে কেন্দ্র করে তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লা রোববার পরিণত হয় শোক, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শনের এক অভূতপূর্ব মঞ্চে। ইরানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো মানুষ জানাজায় অংশ নেন। সকাল থেকেই মোসাল্লা প্রাঙ্গণ পূর্ণ হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। এরপরও শোকাহত মানুষের ঢল থামেনি। আশপাশের সড়ক ও এভিনিউগুলোও পরিণত হয় বিশাল জনসমাবেশে।
জানাজায় ইমামতি করেন ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। প্রথমে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর একই হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের চার সদস্যের জানাজা পড়ানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন খামেনির জামাতা ড. মেসবাহ আল-হোদা বাঘেরি কানি, তাঁর বড় মেয়ে সাইয়্যেদেহ বোশরা হোসেইনি খামেনি, ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি এবং পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল।
ছোট্ট জাহরার কফিনটি খামেনির কফিনের পাশে রাখা হলে তা উপস্থিত জনতার আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। ইরানি রাষ্ট্রীয় বয়ানে এই দৃশ্যকে হামলাকারীদের নির্মমতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। শোকানুষ্ঠানে খামেনির পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ছেলে মাসউদ, মেইসাম ও মোস্তফা জানাজায় অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি এজেই, আইআরজিসি কমান্ডার মেজর জেনারেল আহমদ ওয়াহিদি এবং কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি।
শোকের আবহের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল প্রতিশোধের সুর। জনতার ভিড় থেকে ‘ডেথ টু আমেরিকা’ এবং ‘ডেথ টু ইসরায়েল’ স্লোগান ওঠে। মোসাল্লা প্রাঙ্গণে দেখা যায় লাল পতাকা ও ব্যানার। শিয়া ঐতিহ্যে লাল পতাকা নিহতের রক্তের প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অনেক ব্যানারে লেখা ছিল ‘ইয়া লাসারাত আল-হুসাইন’ এবং ‘ইয়া লাসারাত আল-খামেনি’। কারবালায় ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে খামেনির হত্যার সঙ্গে যুক্ত করে এই প্রতীকী ভাষা ইরানি শোককে রাজনৈতিক প্রতিরোধের বয়ানে রূপ দেয়।
আয়াতুল্লাহ খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে তাঁর বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন বলে ইরানি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। তাঁর মরদেহ তিন দিন ধরে তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় রাখা হয়। এরপর কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জানাজা ও দাফনের কর্মসূচি শুরু হয়।
এই জানাজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল ইরানি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বার্তা প্রদানের মঞ্চও। তেহরান এই আয়োজনের মাধ্যমে নিজ জনগণকে দেখাতে চেয়েছে যে সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের পরও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। মিত্রদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে ইরান এখনো সংগঠিত, দৃঢ় এবং কৌশলগতভাবে সক্রিয়। প্রতিপক্ষকে জানাতে চেয়েছে, শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত করেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অচল করা যায়নি।
শুক্রবার বিদেশি প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। উপস্থিত ছিলেন তুর্কমেনিস্তানের পিপলস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান গুরবানগুলী বের্দিমুহামেদভ, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি এবং ইরাক, আজারবাইজান, বেলারুশ, বাংলাদেশ, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানসহ বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা। চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার, লেবানন, কিউবা, নামিবিয়াসহ আরও বহু দেশের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ডি-৮ এবং ওআইসির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এই বিদেশি উপস্থিতি তেহরানের জন্য ছিল একটি কূটনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেখাতে চাইলেও, এত সংখ্যক রাষ্ট্র ও সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতি ইরানের পক্ষে এক ধরনের প্রতীকী শক্তি প্রদর্শনে পরিণত হয়। তেহরান যেন দেখাতে চেয়েছে, সামরিক আঘাতের পরও তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বলয় অটুট।
জানাজা ও শোকানুষ্ঠান ঘিরে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তাও স্পষ্ট ছিল। নিরাপত্তা অধ্যয়নের ভাষায়, কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার উদ্দেশ্য সাধারণত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা সৃষ্টি করা। কিন্তু ইরান বহু দিনের আনুষ্ঠানিকতা, বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, জনসমাবেশের ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছে যে দেশটির সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আকস্মিক আঘাত সামলাতে সক্ষম।
খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনির নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়টিও এই আনুষ্ঠানিকতার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়। শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের একসঙ্গে উপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো অন্তত প্রকাশ্যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে।
শোকানুষ্ঠানের প্রতীকী ভাষাও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ইয়া লাসারাত আল-খামেনি’ স্লোগানের মাধ্যমে খামেনির হত্যাকে শুধু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং শিয়া প্রতিরোধ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থাপন করা হয়েছে। কারবালার স্মৃতিকে বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে ইরানি রাষ্ট্র শোককে একধরনের নৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধে রূপ দিতে চেয়েছে। বিশেষ করে শিশুনাতনির কফিনের উপস্থিতি এই বয়ানকে আরও আবেগঘন করে তোলে। সাধারণ শোক তখন পরিণত হয় প্রতিরোধ, প্রতিশোধ ও জাতীয় সংহতির ভাষায়।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এই অনুষ্ঠান ছিল আরেকটি বার্তা। তেহরান দেখাতে চেয়েছে, নেতৃত্বে আঘাত এলেও তার কৌশলগত অবস্থান বদলায়নি। ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ফিলিস্তিন, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও অন্যান্য মিত্র বলয়ের প্রতি এই বার্তা ছিল স্পষ্ট: নেতৃত্ব বদলালেও নীতি বদলায়নি।
এই সপ্তাহজুড়ে শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলবে। সোমবার তেহরানে মূল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মঙ্গলবার কুম শহরে স্মরণসভা হবে। বুধবার মরদেহ ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়ার কথা, যেখানে ইমাম আলী ও ইমাম হুসাইনের পবিত্র মাজার অবস্থিত। ইরাকি আয়োজক কমিটির মুখপাত্র সাদ মান জানিয়েছেন, ইরাকেও লাখো মানুষ জানাজা ও শোকযাত্রায় অংশ নিতে পারেন। নিরাপত্তা ও সেবামূলক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। ইরাকের আনুষ্ঠানিকতার পর বৃহস্পতিবার মরদেহ ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে এবং খামেনির নিজ শহর মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে।
এই শোকযাত্রার ভৌগোলিক বিস্তারও তাৎপর্যপূর্ণ। তেহরান, কুম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদ, শিয়া বিশ্বের পবিত্র ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানগুলোর মধ্য দিয়ে খামেনির শেষ যাত্রা ইরানের ধর্মীয় ও আঞ্চলিক প্রভাবের মানচিত্রকেও সামনে আনে। এটি কেবল একটি জানাজা নয়; বরং শিয়া পবিত্র ভূগোল, আঞ্চলিক মিত্রতা এবং ইরানের প্রতিরোধ রাজনীতির প্রতীকী পুনর্পাঠ।
সব মিলিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ইরানের জন্য শোকের পাশাপাশি ক্ষমতা, স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত বার্তা প্রদানের একটি বড় আয়োজন হয়ে উঠেছে। জনসমাবেশ দিয়ে ইরান দেখিয়েছে তার সমাজ এখনো রাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিতে সক্ষম। বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দিয়ে দেখিয়েছে, দেশটি বিচ্ছিন্ন নয়। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, শাসনব্যবস্থা অচল হয়নি। আর ধর্মীয় প্রতীকের মাধ্যমে শোককে রূপ দিয়েছে প্রতিরোধের রাজনৈতিক ভাষায়।
তাই তেহরানের এই জানাজা শুধু একজন নেতার বিদায় নয়। এটি ছিল যুদ্ধোত্তর ইরানের আত্মপ্রতিকৃতি: ক্ষতবিক্ষত, ক্রুদ্ধ, শোকাহত, কিন্তু নিজেকে অটুট ও অপ্রতিরোধ্য হিসেবে তুলে ধরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রাক্ষুসে রূপ নিয়ে ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘বাভি’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের দিকে প্রবল শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে অতি বিধ্বংসী সুপার টাইফুন ‘বাভি’। শক্তিশালী এই ঝড়টি আঘাত হানার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রোববার (৫ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা চরম জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাভি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রাক্ষুসে রূপ ধারণ করেছে।
উপকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপদ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার এবং শেষ মুহূর্তের জীবনরক্ষামূলক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিজিটিএনের প্রতিবেদনে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরটি জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানিয়েছে, সোমবার (৬ জুলাই) ভোররাত থেকেই সুপার টাইফুনটি সরাসরি পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে উক্ত দ্বীপ অঞ্চলগুলোর ওপর দিয়ে তাণ্ডব চালাতে পারে। আঘাত হানার সময় ঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে, যা তীব্রতার দিক থেকে একটি ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমতুল্য। এছাড়া প্রবল এই ঝড়ের দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া দপ্তর এই টাইফুনটিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সতর্ক করেছে যে, রোববার বিকেল বা সন্ধ্যার পর থেকেই মূলত ওই অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তন আসবে এবং তীব্র ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে যাবে। বিশেষ করে এই শক্তিশালী ঝড়ের কেন্দ্র বা আই অব দ্য স্টর্ম যে এলাকার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে, তার কাছাকাছি অঞ্চলে ব্যাপক, সুদূরপ্রসারী ও বিধ্বংসী ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
টাইফুনের মূল আঘাতের পাশাপাশি এর প্রভাবে সৃষ্ট প্রবল ও টানা বর্ষণের কারণে দ্বীপ দুটিতে ব্যাপক আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্র উপকূলীয় নিচু এলাকায় ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উত্তাল সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৭ মিটার বা প্রায় ৩৫ ফুট পর্যন্ত উঠতে পারে, যা উচ্চতার দিক থেকে একটি ১০ তলা ভবনের সমান। বিশাল উচ্চতার এই সামুদ্রিক ঢেউয়ের কারণে সমুদ্র উপকূল চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও মারাত্মক উত্তাল হয়ে উঠবে বলে জাহাজ ও জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে কর্তৃপক্ষ।
/আশিক
পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত হামলাকারীদের হানা, লোহিত সাগরের নৌপথে নতুন উত্তেজনা
ইয়েমেন উপকূলের কাছে লোহিত সাগরে একটি পণ্যবাহী কার্গো জাহাজে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৫ জুলাই) যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজটি থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছে যে তারা অজ্ঞাতপরিচয় কিছু সশস্ত্র হামলাকারীর আক্রমণের শিকার হয়েছে। তবে এই আকস্মিক হামলায় জাহাজটির কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, এই সশস্ত্র হামলার ঘটনাটির বিষয়ে গভীর তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই অঞ্চলের নৌপথে পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ চালানোর হুমকি দিলেও, এই নির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে তারা এখনও কোনো দায় নেয়নি। হুথি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের বিভিন্ন অংশে সোমালি জলদস্যুদের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রমাণ মিলছে। জলদস্যুদের এই ক্রমবর্ধমান তৎপরতা ওই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
/আশিক
খামেনির কফিনের সামনে বদরের আয়াত: সৌদিকে কী বার্তা দিল ইরান?
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে যখন সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল এগিয়ে যায়, তখন এরপর যে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, তা অনেকের নজর এড়ায়নি। তিলাওয়াত করা হয় সুরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত, যেখানে বদরের যুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে। ইসলামের ইতিহাসে বদর এমন এক যুদ্ধ, যেখানে সংখ্যায় ও সামরিক সরঞ্জামে অনেক দুর্বল মুসলিম বাহিনী আল্লাহর ইচ্ছায় অপেক্ষাকৃত বড় ও শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করেছিল।
প্রশ্ন উঠছে, সৌদি প্রতিনিধিদলের সামনে এই আয়াত তিলাওয়াত কি নিছক ধর্মীয় পাঠ ছিল, নাকি এর ভেতরে ছিল সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বার্তা? এটি কি রিয়াদের প্রতি সৌজন্য, তিরস্কার, নাকি দুটোরই মিশ্রণ? মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনাপূর্ণ বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এমন একটি রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির সময় নির্দিষ্ট আয়াতের নির্বাচনকে পুরোপুরি কাকতালীয় বলা কঠিন।
বদরের যুদ্ধ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান সৌদি আরবের ভূখণ্ডেই সংঘটিত হয়েছিল। সে অর্থে আয়াতটি মুসলিম বিশ্বের একটি অভিন্ন ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত স্মৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। উদারভাবে পড়লে বলা যায়, তেহরান হয়তো সৌদি আরবকে ইসলামের প্রথমদিককার বিজয়, বিশ্বাস ও ঐক্যের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু একই আয়াত সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন অর্থও বহন করে। ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আঘাতের মুখে তারা শুধু টিকে থাকেনি; বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে আরও দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। ফলে বদরের আয়াত তেহরানের নিজের বিজয়-আখ্যানের সঙ্গেও মিলে যায়।
ইরানপন্থী বিশ্লেষকদের একাংশ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধকে ইরানের কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, ইরান সামরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়নি, শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, মিত্র বলয় সক্রিয় রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়েছে। সেই দৃষ্টিতে বদরের আয়াত যেন এই বার্তাই দেয়: সংখ্যায়, প্রযুক্তিতে বা জোটে দুর্বল মনে হলেও বিশ্বাস, কৌশল ও প্রতিরোধের শক্তি শেষ পর্যন্ত বড় শক্তিকে প্রতিহত করতে পারে।
অন্যদিকে সৌদি আরব যুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ্যে সতর্ক ও সংযত অবস্থান নিলেও, তেহরানের দৃষ্টিতে রিয়াদ পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিছু প্রতিবেদনে যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নীরব সামঞ্জস্য, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি প্রতিনিধিদলের সামনে বদরের আয়াত তিলাওয়াতকে কেউ কেউ তেহরানের শীতল কূটনৈতিক স্মরণিকা হিসেবে দেখছেন। বার্তাটি হতে পারে, রিয়াদ পাশে ছিল না, কিংবা প্রতিপক্ষের খুব কাছে দাঁড়িয়েছিল; তবু আজ তাকে বিজয় ও শোকের মঞ্চে এসে শ্রদ্ধা জানাতে হচ্ছে।
সৌদি আরব অবশ্য একমাত্র দেশ ছিল না। ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে উপস্থিত হয়। এই উপস্থিতি ইরানের জন্য নিজস্ব শক্তি প্রদর্শনের একটি সুযোগ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেখাতে চাইলেও, এত সংখ্যক বিদেশি প্রতিনিধির উপস্থিতি তেহরানের পাল্টা বার্তা দেয়: ইরান এখনো একঘরে নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার নেটওয়ার্ক সক্রিয়।
৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে তাঁর বাসভবনে ইসরায়েলি-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই হামলায় তাঁর ১৪ মাস বয়সী নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও নিহত হন। তাঁর মরদেহ তিন দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয়। এই স্থাপনাটি ইরানের বৃহত্তম নামাজ ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্রগুলোর একটি।
খামেনির জানাজা ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কিন্তু একই সঙ্গে তা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতীকী মঞ্চ। ইরান এই আয়োজনের মাধ্যমে নিজ জনগণকে জানাতে চেয়েছে যে রাষ্ট্র শোকাহত হলেও ভেঙে পড়েনি। মিত্রদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে তেহরান এখনো দৃঢ়। বড় শক্তিগুলোকে দেখাতে চেয়েছে যে সামরিক হামলা ইরানি রাষ্ট্রকে অচল করতে পারেনি। আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে করিয়ে দিতে চেয়েছে, তেহরান কে কোথায় দাঁড়িয়েছিল, তা ভুলে যায়নি।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিনিধি বা সংগঠনের সামনে ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তিলাওয়াতের বিষয়টি তাই বিশেষ নজর কাড়ে। আয়াত নির্বাচনের ভেতর যেন তেহরানের কূটনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস ফুটে ওঠে। কারও জন্য ছিল শাহাদাত, অঙ্গীকার ও বিজয়ের ভাষা; কারও জন্য ছিল ন্যায়পরায়ণতা, আশ্বাস ও পুরস্কারের ভাষা; আবার কারও জন্য ছিল সূক্ষ্ম তিরস্কার বা শীতল বার্তা।
হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোতে ছিল প্রতিরোধ, শাহাদাত, অঙ্গীকার ও বিজয়ের সুর। এই সংগঠনগুলোকে তেহরান তার ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে দেখে। ফলে তাদের জন্য কোরআনিক বার্তাও ছিল আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতার ভাষায় সাজানো।
হামাসের জন্য এমন আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, কিছু মানুষ আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার সত্য প্রমাণ করেছে। কেউ অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, কেউ অপেক্ষায় আছে, কিন্তু কেউ প্রতিশ্রুতি বদলায়নি। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আয়াতে বিশ্বাসীদের উচ্চ অবস্থান, ধৈর্য এবং শহীদ নির্বাচনের ধারণা উঠে আসে। ইয়েমেনের হুতিদের জন্য সুরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে নবীর সঙ্গীদের দৃঢ়তা, পরস্পরের প্রতি মমতা এবং চাপের মধ্যেও বিকাশের চিত্র পাওয়া যায়।
ইরাকের হাশদ আল-শাবির জন্য তিলাওয়াত করা হয় শহীদদের জীবিত থাকার সুপরিচিত আয়াত। ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানের জন্য ব্যবহৃত হয় সুরা আল-ফাতহের সূচনা অংশ, যেখানে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’-এর কথা বলা হয়েছে। একদিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন, অন্যদিকে আফগান তালেবান, দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের পক্ষের জন্য একই আয়াতের ব্যবহার ইঙ্গিত করে যে তেহরান তাদের একটি বৃহত্তর আদর্শিক আত্মীয়তার ভেতর দেখতে চায়। এর ভেতরে এমন বার্তাও থাকতে পারে যে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তালেবানের সাফল্য এবং এখন ইরানের টিকে থাকা, ফিলিস্তিনিদের জন্যও ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের অনুপ্রেরণার কাঠামো তৈরি করে।
অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিসরের মতো রাষ্ট্রীয় অংশীদারদের ক্ষেত্রে আয়াতের ভাষা ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। সেখানে সরাসরি যুদ্ধ, শাহাদাত বা প্রতিরোধের বদলে ছিল ন্যায়পরায়ণতা, আশ্বাস, সৎকর্ম ও পুরস্কারের ইঙ্গিত। রাশিয়ার জন্য ব্যবহৃত আয়াতে বলা হয়, আখিরাতের আবাস তাদের জন্য, যারা পৃথিবীতে জুলুম বা বিপর্যয় চায় না। চীনের ক্ষেত্রে আয়াতটি ছিল আরও নরম, যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ এই বার্তা দিয়েছেন সুসংবাদ ও হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য, আর বিজয় কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।
ভারতের ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর জন্য ব্যবহৃত বৃহত্তর আয়াতের একটি নরম অংশ নেওয়া হয়, যেখানে দুর্বল না হওয়া ও শোক না করার বার্তা আছে। মিসরের একটি তিলাওয়াতে সৎকর্মশীল বিশ্বাসীদের সর্বোত্তম সৃষ্টিরূপে উল্লেখ করা হয়। এসব রাষ্ট্র তেহরানের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তারা উপস্থিত হয়ে ইরানকে কূটনৈতিক বৈধতা দিয়েছে, কিন্তু তেহরান তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেনি। তাদের জন্য আয়াতগুলো ছিল কৃতজ্ঞতা, ভারসাম্য ও সম্পর্ক ধরে রাখার ভাষা।
কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের আরেকটি অবস্থান ছিল মাঝামাঝি। তারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, আঞ্চলিক রাজনীতি বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে যুক্ত, কিন্তু সরাসরি সশস্ত্র প্রতিরোধ বয়ানের অংশ নয়। কাতার, যে যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে, তার জন্য ‘সুস্পষ্ট বিজয়’-এর আয়াত ব্যবহৃত হলেও তা কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে নরম অর্থ বহন করে। এটি সমর্থনের স্বীকৃতি, সরাসরি যুদ্ধের ডাক নয়।
তুরস্কের জন্য ব্যবহৃত আয়াতে যারা সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে, তাদের মর্যাদার কথা বলা হয়। আঙ্কারা যুদ্ধের বাইরে থাকলেও প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলকে ‘যুদ্ধাসক্ত’ বলে আঞ্চলিক আধিপত্যের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আয়াতটি ছিল ব্যক্তিগত প্রার্থনার মতো, যেখানে সম্মানের সঙ্গে প্রবেশ ও সম্মানের সঙ্গে প্রস্থানের কথা আছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসলামাবাদ ও দোহা কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পথে সক্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবহার করে পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছে বলে আলোচনায় এসেছে।
লেবানন সরকারের জন্য ব্যবহৃত আয়াতটি ছিল আরও তির্যক। হিজবুল্লাহর জন্য যেখানে প্রতিরোধ ও বিশ্বাসীদের উচ্চতার আয়াত ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে লেবাননের সরকারি প্রতিনিধিদের সামনে সুরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, যদি মানুষকে আত্মত্যাগ বা ঘরবাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, তবে অল্প কয়েকজন ছাড়া তা মানত না; অথচ তারা যদি উপদেশ অনুযায়ী চলত, তা তাদের জন্য উত্তম ও দৃঢ়তর হতো। এই আয়াতকে অনেকেই লেবানন সরকারের প্রতি তেহরানের সূক্ষ্ম ভর্ৎসনা হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, লেবাননের সরকার ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নয়, বরং অনেক সময় হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলাকেই বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সব মিলিয়ে খামেনির জানাজা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় আচার, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শন, কূটনৈতিক বার্তা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতা-রাজনীতির এক জটিল মঞ্চ। আয়াত নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রতীকী ভাষা তৈরি হয়েছে, তা তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলে দেয়। ইরান তার মিত্রদের বলেছে, প্রতিরোধ সফল হয়েছে; অংশীদারদের বলেছে, তেহরান এখনো দৃঢ়; মধ্যস্থতাকারীদের বলেছে, তাদের ভূমিকা মনে রাখা হয়েছে; আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বলেছে, তাদের অবস্থানও নথিভুক্ত আছে।
সৌদি প্রতিনিধিদলের সামনে বদরের আয়াত তিলাওয়াত সেই বৃহত্তর সংকেত-রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। এটি একদিকে ইসলামের যৌথ স্মৃতি, অন্যদিকে সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের আত্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক পাঠ। তেহরানের বার্তাটি সম্ভবত এমন: ইরান পরাজিত হয়নি; বরং পরীক্ষিত, ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অটুট এক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যারা পাশে ছিল, তারা তার বিজয়-বয়ানের অংশ। যারা দূরে ছিল, তাদেরও ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের অবস্থান দেখতে হবে।
পাঠকের মতামত:
- তিতাসের জরুরি বিজ্ঞপ্তি: মঙ্গলবার ১৬ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
- নানিয়ারচর সেনা জোনের উদ্যোগে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ
- ৩ বাহিনীর প্রধানের উপস্থিতিতে পিজিআর সদর দপ্তরে কেক কেটে ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
- ইরানের সাথে বৈষম্যের পর এবার ট্রাম্পের ক্ষমতার খেল, ২০২৬ বিশ্বকাপের সৌন্দর্য নষ্টের নেপথ্যে
- বোলাররা জেতালেও ব্যাটাররা ডোবাল, তুলনামূলক দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হতাশাজনক পরাজয়
- গাজায় দীর্ঘ ২০ বছরের শাসনের অবসান, নিজেদের শাসন কমিটি বিলুপ্ত করল হামাস
- আমাদের সালাহ ও ২৬ জন মেসি আছে: আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে মিশরীয় কোচের হুংকার
- গ্রাম ও শহর সবখানেই ৯ শতাংশের উপরে মূল্যস্ফীতি, খরচের চাপে সীমিত আয়ের মানুষ
- প্রধানমন্ত্রী ১০০ টাকায় লাঞ্চ করেন, আমরা মন্ত্রীরাও তাই করি: সখীপুরে আযম খান
- ব্রাজিল বধের নায়ক হালান্ডের দানবীয় শক্তির অদ্ভুত রহস্য ফাঁস
- খামেনির জানাজার মাঠে ‘কিল ট্রাম্প’ স্লোগান, তেহরানে প্রতিশোধের আগুনে উত্তপ্ত লাখো জনতা
- গুলশান-বনানী লেকের দূষণ রোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ
- এক আঘাতেই খতম করার ট্রাম্পের হুমকির জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতা নিয়ে খোঁচা দিল ইরান
- ‘ভূতুড়ে বিলের’ সুনির্দিষ্ট কারণ ও অভিযোগ সমাধানের উপায় জানালেন বিদ্যুৎ সচিব
- অক্টোবরে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, প্রথম ধাপে ইউপি ও পৌরসভায় ভোটের সম্ভাবনা
- ৬ জুলাই ২০২৬: আজকের শেয়ারবাজারের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
- ৬ জুলাই ২০২৬: শেয়ারবাজারের দরপতনের শীর্ষ ১০ শেয়ার
- ৬ জুলাই ২০২৬: শেয়ারবাজারে লাভে থাকা শীর্ষ ১০ শেয়ার
- খামেনির শোক র্যালিতে জনসমুদ্র, প্রতিশোধের লাল পতাকায় মুখর তেহরান
- সহিহ হাদিসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হওয়ার ১২ আমল
- ‘আমেরিকাই একমাত্র নয়, ভারতের মতো বড় বন্ধু আছে’-ভ্যান্সকে জবাব নেতানিয়াহুর
- বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ, না মানলে বাতিল হবে লাইসেন্স
- তাপপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু, এবার ঝড়-বন্যার নতুন শঙ্কা
- প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
- আজকের ক্রীড়া সূচি, একদিনে তিন বড় লড়াই
- হালান্ডের আঘাতে ভাঙল ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ স্বপ্ন, কান্নাভেজা বিদায় নেইমারের
- অ্যাজটেকার আগুনে ইংল্যান্ডের বেঁচে ফেরা, মেক্সিকোকে কাঁদিয়ে শেষ আটে টুখেলের দল
- প্রিয় দল হেরেছে? মন ভালো রাখার ৭ কার্যকর উপায়
- কলকাতার সেনা আবাসিকে কেন তিন বাংলাদেশি জেনারেল? নতুন তথ্য ঘিরে বাড়ছে নানা প্রশ্ন
- ডেঙ্গুর নতুন হটস্পট ১৪ জেলা, বাড়ছে বড় শঙ্কা
- আজ ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়
- আজ রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ
- খামেনির জানাজায় জনস্রোত, তেহরানের বার্তা কী?
- ৬ জুলাইয়ের নামাজের সময় প্রকাশ, জেনে নিন এখনই
- স্বর্ণ কিনতে বাড়তি খরচ, কার্যকর নতুন মূল্যতালিকা
- আমির-গৌরীর বিয়ে, আলোচনায় গৌরীর সম্পদের পরিমাণ
- সোমবার টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়
- নিরাপত্তা কৌশল যেন সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে না ঠেলে, পিজিআরকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
- ওপারে তীব্র যুদ্ধ ও আতঙ্কের মাঝে মিয়ানমার সীমান্তে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা
- বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই কুমিল্লার উন্নয়ন হয়: গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী
- মেক্সিকোর মাটিতে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ ঘিরে চরম উত্তেজনা, সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রশাসন
- অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রাক্ষুসে রূপ নিয়ে ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘বাভি’
- ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনে দেশজুড়ে সরকারের বহুমাত্রিক কর্মসূচি ঘোষণা
- নির্ভরযোগ্য ডাটাই সঠিক পরিকল্পনা ও জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি: আমির খসরু
- সারা দেশের আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস ছাত্রদল-বিএনপি পুড়িয়ে দিয়েছিল: রাকিব
- আজ রাতে ইতিহাস বদলানোর মিশনের আগেই বড় ধাক্কা খেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল
- ওসলো থেকে মার্সেই: নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়হীন থাকার চার ঐতিহাসিক কারণ
- পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানালেন ইরানি রাষ্ট্রদূত
- জুলাই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচারেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটবে: ভিপি নুর
- পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত হামলাকারীদের হানা, লোহিত সাগরের নৌপথে নতুন উত্তেজনা
- নরওয়ের বিপক্ষে নেইমার খেলবেন? জানালেন আনচেলত্তি
- ‘ইরান এখন সমঝোতায় মরিয়া’, খামেনির দাফনে ‘এক সপ্তাহ সময়’ দিলাম: ট্রাম্প
- আরাগচি-গালিবাফ হত্যাচেষ্টার খবর নাকচ ইসরায়েলের
- আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, আজ কত ভরি
- এলপিজির নতুন দর নিয়ে বড় ঘোষণা আজ
- স্বর্ণ কিনবেন? জেনে নিন আজকের নতুন মূল্য
- রোনালদোর ম্যাচসেরা পুরস্কার ঘিরে তুমুল বিতর্ক
- দোহায় আজ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক, দাবি ট্রাম্পের
- ‘নেতানিয়াহু জানেন, আসল বস কে’- ট্রাম্প
- দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের খবর নাকচ ইরানের
- খামেনির কফিন ঘিরে আবেগে ভাসছে তেহরান
- আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম
- ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’: সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ার শিক্ষা
- আরাগচি-গালিবাফকে ঘিরে হত্যার পরিকল্পনা ইসরায়েলের, ইরানকে আগাম সতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের
- সপ্তাহজুড়ে শেয়ারবাজারে গতি, সূচকে শক্তিশালী উত্থান








