বাংলাদেশের সুপরিচিত নির্মাতা ও অভিনেতা গাজী রাকায়েত সম্প্রতি এক পডকাস্ট আলোচনায় নিজের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ও দার্শনিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্যে, কোরআনের ত্রুটি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও সেই অনুসন্ধানই তাকে ভিন্ন এক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত তার চিন্তাভাবনার মৌলিক রূপান্তর ঘটায়।
গাজী রাকায়েত, যিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বহুবার সম্মানিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব, তার এই বক্তব্যে ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। একসময় তিনি নিজেকে দৃঢ়ভাবে নাস্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা তার শিক্ষাজীবন, বিজ্ঞানচর্চা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রভাবেই গড়ে উঠেছিল।
শৈশব থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত এই নির্মাতা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। জীবনের কিছু গভীর ব্যক্তিগত ঘটনা, বিশেষ করে নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু, তাকে স্রষ্টা ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে দূরে সরে গিয়ে যুক্তিবাদী অবস্থানে চলে যান।
এই সময় তিনি আলবার্ট আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানীদের লেখা পাঠ করে এক ধরনের যুক্তিনির্ভর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন। ফলে স্রষ্টার ধারণা তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে এবং তিনি নিজেকে নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে তার জীবনের মোড় পরিবর্তন ঘটে একটি অনুসন্ধানী প্রয়াসের মাধ্যমে। কোরআনের ‘ভুল’ খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে তিনি এর বাংলা অনুবাদ পড়া শুরু করেন। কিন্তু সেই পাঠই তাকে ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করে। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করেন, বিষয়গুলোকে সরলভাবে দেখলে অনেক গভীরতা অনুধাবন করা যায় না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোরআনের কিছু আয়াত তাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। মানুষের মধ্যে স্রষ্টার ‘রূহ’ সঞ্চারের ধারণা কিংবা মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কিত বিভিন্ন ইঙ্গিত তাকে নতুন করে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব বিষয় তার পূর্ববর্তী ধারণার সঙ্গে একটি নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে তিনি কোরআনের গাণিতিক বিন্যাস ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার মতে, সূরা ও আয়াতের বিন্যাসে যে ধরনের অনুপাত ও সুশৃঙ্খলতা দেখা যায়, তা তাকে বিস্মিত করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে গবেষণা করার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
এই অভিজ্ঞতার পর তিনি ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি নতুন করে মনোযোগ দেন। তার ভাষায়, জ্ঞান ও বোধের পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য স্রষ্টার ধারণাকে উপেক্ষা করা যায় না।
পডকাস্টে তিনি আরও বলেন, কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধারণা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে সেটিকে গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। প্রসঙ্গ, ব্যাখ্যা এবং প্রেক্ষাপট ছাড়া কোনো বিষয় বিচার করলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।
নিজের এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা তার মতে সত্যকে উপলব্ধি করার পর তা মেনে নেওয়ার একটি মানসিক প্রক্রিয়া।
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতেও বিষয়টি বিশ্লেষণ করছেন।
বর্তমানে গাজী রাকায়েত নিয়মিত ধর্মীয় চর্চায় যুক্ত রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার এই যাত্রা অনেকের কাছে একটি চিন্তামূলক ও অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
-রাফসান