মিশরের বিরুদ্ধে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও নাটকীয় ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে ৩-২ ব্যবধানের এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের পর মাঠের খেলা ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে রেফারিং ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক।
এই ম্যাচ শেষে মিশরের জাতীয় দলের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে, আর্জেন্টিনা এবং তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতেই ম্যাচটিতে সুনির্দিষ্ট কারচুপি করা হয়েছে। মিশরের কোচের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের পর বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে, যা নিয়ে মুখ খুলেছেন ফুটবলের সাবেক কয়েকজন কিংবদন্তি তারকাও।
বিশ্ব ফুটবলের এই মহাতারকাদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য সবার ক্ষেত্রে এক রকম ছিল না। ফ্রান্স ও আর্সেনালের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি মিশরের এই চরম হতাশা ও ক্ষোভের কারণ বুঝতে পারলেও, ম্যাচটিতে কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগকে সরাসরি সমর্থন করেননি। তিনি বিষয়টিকে শান্তভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাঠের উত্তেজনায় সবাই হয়তো চিৎকার করছে, তবে প্রত্যেকে ঘটনাটিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না।
তিনি নিজে কয়েকবার ভিডিও রিপ্লে পর্যবেক্ষণ করেছেন জানিয়ে উল্লেখ করেন, এখানে যেমন মিশরের হতাশ হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে, ঠিক একইভাবে আর্জেন্টিনার কেন মনে হচ্ছে যে সিদ্ধান্তগুলো তাদের পক্ষেই সঠিক ছিল, সেই অবস্থানটিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
থিয়েরি অঁরির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল সমস্যাটি সিদ্ধান্তের সঠিকতা বা ভুল নিয়ে নয়, বরং ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার স্পষ্ট অভাবই এই বড় প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, প্রথমার্ধে মিশরের গোলটি বাতিল করার সময় ভিএআর যেভাবে সূক্ষ্ম ও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছিল, পরবর্তী সময়ে পেনাল্টির আবেদনের ক্ষেত্রে সেই একই ধরনের নিখুঁত ও দীর্ঘ বিশ্লেষণ মাঠে দেখা যায়নি। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই মূলত সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
ফুটবল মাঠে ভিএআর চালুর মূল উদ্দেশ্যই ছিল সব দলের জন্য সমান ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, কারণ সমর্থকরা কেবল নিখুঁত সিদ্ধান্ত চায় না, তারা চায় সবার জন্য যেন একই নিয়মের সুষম প্রয়োগ ঘটে। তবে এই প্রযুক্তিগত বিতর্কের বাইরে গিয়ে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও আর্জেন্টিনার যেভাবে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতেছে, সেই অদম্য মানসিক শক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেন সাবেক এই ফরাসি তারকা।
অপরদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক ও কড়া সমালোচক রয় কিন মিশরের কোচের তোলা কারচুপির অভিযোগটি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর সাধারণ সমর্থকরা আবেগের বশে এমন মন্তব্য করতেই পারে, কিন্তু জাতীয় দলের একজন প্রধান কোচের কাছ থেকে এই ধরনের অপেশাদার বক্তব্য কোনোভাবেই আশা করা যায় না।
ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে স্পষ্ট এগিয়ে থাকার পরও যদি কোনো দল শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হেরে মাঠ ছাড়ে, তবে অন্য কারো ওপর দায় চাপানোর আগে নিজেদের মাঠের ভুলগুলোর দিকে তাকানো উচিত। রয় কিন আরও যোগ করেন, লিওনেল মেসি কোনো ম্যাচ জিতলেই একশ্রেণির মানুষ ফুটবলের মূল সৌন্দর্য বাদ দিয়ে সব জায়গায় কৃত্রিম ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজতে শুরু করে, যা মূলত পরাজয় আড়াল করার একটি সহজ অজুহাত মাত্র। হারের পর সেটি মেনে নিয়ে নিজেদের ভুল বিশ্লেষণ করাই প্রকৃত ফুটবলীয় আচরণ।
সুইডেনের কিংবদন্তি ফুটবলার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও এই বিষয়ে প্রায় একই সুর মিলিয়ে কথা বলেছেন। লিওনেল মেসির অতি জনপ্রিয়তার কারণে আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে রেফারি বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে—এমন বহুল প্রচলিত ধারণাকে তিনি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইব্রাহিমোভিচের মতে, মেসি বিশ্বমঞ্চে জয়ী হলেই প্রতিবার ষড়যন্ত্রের একটি মনগড়া গল্প সাজানো শুরু হয়, যা অত্যন্ত পুরোনো ও সস্তা একটি অজুহাত। কোনো দল যদি ম্যাচের দুই গোলের লিড ধরে রাখতে না পারে, তবে রেফারি কিংবা টুর্নামেন্ট কমিটিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে নিজেদের ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়া দরকার।
বিশ্বকাপে ভুলের মাশুল অনেক বড় উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন জাতীয় দলের কোচের মূল দায়িত্ব হলো হারের পর অজুহাত না দেখিয়ে নিজের কাঁধে দায় নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করা। আর্জেন্টিনা মাঠে লড়াই করেই এই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, তাই পরাজয়কে মেনে নিয়ে তা থেকে শিক্ষা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই তুমুল তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করলেও, মাঠের সেই রেফারিং বিতর্ক এখনো বিশ্ব ফুটবলের প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
/আশিক